মানব-বন্ধু সৈয়দ আহমদুল হক

আগের সংবাদ

দুই সত্তার লেখক

পরের সংবাদ

সেলিনা হোসেনের উপন্যাস

নিরন্ন মানুষের স্বপ্নের বসত

বুলান্দ জাভীর

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২০ , ৬:৫০ অপরাহ্ণ

বই আলোচনা

সেলিনা হোসেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একজন প্রতিষ্ঠিত ঔপন্যাসিক। তিনি তাঁর ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে সেই সীমানার বেড়িটি তুলে ফেলেছেন বহু আগেই। যে গুটিকয়েক ঔপন্যাসিক বিভিন্ন ধরনের বিষয়, চরিত্র এবং কাল ধরে ধরে সিরিয়াস কাজ করেছেন, তাঁদের মধ্যে সেলিনা হোসেন অন্যতম। এ কারণে তাঁর একটি উপন্যাসের সঙ্গে অন্য উপন্যাসের উদ্দেশ্য, বিষয়, আঙ্গিকের খুব একটা মিল পাওয়া যাবে না। প্রতিটি নতুন উপন্যাসে তিনি নতুন বিষয় নিয়ে নিরীক্ষা করেছেন এবং ফলস্বরূপ বেরিয়ে এসেছে এক একটি কালজয়ী উপন্যাস। লিখবার জন্যেই লিখার লোক তিনি নন। প্রতিটি উপন্যাস তিনি যথেষ্ট পরিকল্পনা করে সযত্নে গড়ে তোলেন। প্রতিটি উপন্যাসে তিনি কোনো না কোনো বাণী (Message) পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে চান। তাঁর উপন্যাসের কাল-পরিধি চর্যাপদ যুগ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত, বিষয় পরিধি ঐতিহ্যিক পুরাণ থেকে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম হয়ে সাম্প্রতিক ঘটনাবলী পর্যন্ত বিস্তৃত। বর্তমান উপন্যাসটি লেখা হয়েছে সামুদ্রিক ধীবর অধ্যুষিত শাহপরী দ্বীপ এবং সেন্টমার্টিন দ্বীপের সুখ-দুঃখের কাহিনী নিয়ে।

আঞ্চলিক ভাষার ওপর এই উপন্যাসে অসাধারণ কাজ করেছেন। আমাদের রেডিও, টেলিভিশন, সিনেমা ইত্যাদি প্রচার মাধ্যমসমূহে এবং পত্র-পত্রিকায় আঞ্চলিক ভাষার ওপর যে সমস্ত কাহিনী গড়ে উঠে তাতে আঞ্চলিক ভাষার শ্লীলতাহানি ঘটে থাকে। এটি হয় দু’টি কারণে। একটি হচ্ছে- ঐ নির্দিষ্ট আঞ্চলিক ভাষা সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে ঐ আঞ্চলিক ভাষা আয়ত্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় নিষ্ঠা দিয়ে এই প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করেছেন নিঃসন্দেহে। এখানে তিনি একটি বড় ঝুঁকি গ্রহণ করে অসম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। কারণ কক্সবাজারের ভাষা জটিল এবং তার চেয়ে জটিল এর উচ্চারণ রীতি। এই কথ্য ভাষাকে লিখিত রূপ দেয়া একটি দুঃসাধ্য ব্যাপার। কারণ, এই অঞ্চলে বিভিন্ন বর্ণের উচ্চারণ মিশ্র শব্দের একটি নির্দিষ্ট অংশে উচ্চারণের সময় চাপ দেয়া হয়। ফলে সঠিক উচ্চারণ রীতিকে নির্দেশ করার জন্য লিখিতরূপে ভাষাতাত্তি্বক কিছু প্রতীক বা চিহ্ন ব্যবহার করার প্রয়োজন দেখা দেয়। কিন্তু এতে করে উপন্যাসটি একটি ধ্বনিতত্তে¡র বই-এ রূপান্তরিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং উপন্যাসের সুখপাঠ্যতা বজায় রাখা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। লেখিকা এই জটিল সমস্যাটিতে খুব নিপুণভাবে মোকাবিলা করেছেন এবং সফল হয়েছেন নিঃসন্দেহে। দুই একটি শাব্দিক ত্রুটি ছাড়া এটি প্রায় নিখুঁত।

জেলেদের জীবন এত নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন যে পদ্মানদীর মাঝির পর জেলেদের জীবনের এত বিস্তারিত ও বাস্তব ছবি বাংলা সাহিত্যে আর পাওয়া যায়নি। পদ্মানদীর মাঝি লেখার আগে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় অনেক দিন জেলেদের সঙ্গে পদ্মানদীর বুকে বাস করেছেন বলে কথিত আছে। তবে অভিজ্ঞতা যে সব সময় প্রত্যক্ষ হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। লেখক যদি শক্তিমান হন তবে তিনি পরোক্ষ অভিজ্ঞতা কল্পনার রস সঞ্জাত করে বাস্তবরূপ সার্থকভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারেন। সৈয়দ শামসুল হকের ‘নিষিদ্ধ লোবান’ উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের এত নিখুঁত চিত্র পাই যে তিনি সে সময় লন্ডন প্রবাসী ছিলেন একথা বিশ্বাস হয় না। অর্নেস্ট হেমিংওয়ের ক্ষেত্রেও এ ঘটনাটি ঘটেছে। তিনি বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে ছিলেন। সমুদ্রের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ছাড়াই তিনি লিখলেন ‘ওল্ড ম্যান এন্ড দ্যা সি’। কিন্তু সমুদ্রে মাছ ধরার কি নিখুঁত বিস্তারিত বর্ণনা। মনে হবে তিনি যুগ যুগ ধরে বংশপরম্পরায় ঐ জেলেদের সঙ্গে মাছ ধরে ধরে ঐ মৎসজীবী তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন। সেলিনা হোসেনের ‘পোকামাকড়ের ঘরবসতি’ পড়তে গিয়ে আমি সেই অবাক বিস্ময়ের শিকার হয়েছি। কি করে এটি সম্ভব হলো। তবে ‘ওল্ড ম্যান এন্ড দ্যা সি’র সঙ্গে এ উপন্যাসের বিষয়গত পার্থক্য আছে। ওল্ড ম্যান দেখানো হয়েছে একজন বুড়ো জেলের জীবন, সে বার্ধক্যজনিত কারণে মাছ ধরার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে কিন্তু যৌবনের ভালো মৎসজীবিকার ইগো তার মধ্যে রয়ে গেছে। যে কারণে সে হারতে রাজি নয়। সে ফুরিয়ে গেছে এই চিন্তা তাকে অস্থির করে তোলে। সে প্রমাণ করতে চায় তার যৌবনের অমিত তেজ শেষ হয়ে যায়নি। ‘A man can be destroyed but can not be destroyed but can not be defeated’|

তবে তার সংগ্রাম ব্যক্তিকেন্দ্রিক। কিন্তু ‘পোকামাকড়ের ঘরবসতি’র কেন্দ্রীয় চরিত্র মালেকের সংগ্রাম সমষ্টিগত। সে তার একার জন্যে লড়াই করে না। সমস্ত জেলে পাড়ার ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য লড়াই করে। ফলে ‘ওল্ড ম্যান এন্ড দ্যা সি’ এর সঙ্গে এর সাদৃশ্যও আছে। লক্ষ্য অর্জনের জন্যে যে তারুণ্যের তেজ তা উভয়ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান। মালেক যখন হাঙ্গর তুলছে, একটি হাত চলে যাওয়ার পরও যখন ২য় হাঙ্গর তোলার নির্দেশ দেয় তখন মনে হচ্ছিল সে ধ্বংস হলেও পরাভব মানবে না। এতে করে আরো একটি বিষয় বের হয়ে এসেছে আর তা হচ্ছে মালেকের নেতৃত্বের ক্ষমতা। বাদল যখন মায়ের চিকিৎসার অর্থ সংগ্রহের টোপ গিলে তোরাব আলীর কাছে সব ফাঁস করে দেয়, তখন তার মধ্যে সুজার হাতে জীবন দেয়ার ভয় এসে ভর করে। পক্ষান্তরে তার মধ্যে এক ধরনের অনুশোচনাও সৃষ্টি হয়। স্বগোত্রীয় সতীর্থদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার জন্য। তখন সে তার অসহায় অবস্থার কথা মালেকের কাছে বলেই হালকা বোধ করে, নির্ভরতা পায়। যেন মালেকই তাকে বিপদসংকুল অবস্থা থেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে এবং মালেক যেন সেই গির্জার পাদ্রী যার কাছে কনফেস করে নিজের মানসিক যন্ত্রণার বোঝা হালকা করা যায়, আত্মপক্ষ সমর্থন করা যায়। মালেকের মধ্যে নেতৃত্বসুলভ কারিশমা রয়েছে অর্থাৎ নিজের বক্তব্যের প্রতি অন্যের সমর্থন জোগানোর ক্ষমতা, সে যখন সমবায়ের কথা বলে, নিজেদের নৌকা এবং জালের কথা বলে তখন সবাই মুগ্ধ শ্রোতা হয়ে তার কথা শোনে এবং তার পেছনে সংগঠিত হয়। সে তেরাব আলীর গুণ্ডা বাহিনী কর্তৃক আক্রান্ত হলে সবাই মিছিল নিয়ে তোরাব আলী বাড়িতে প্রতিবাদ জানাতে যায়। জয়গুণ তার সমস্ত সঞ্চিত অর্থসহ মেয়ে সাফিয়ার সমস্ত সঞ্চিত অর্থ মালেকের নিরাময়ে অকাতরে ব্যয় করে। সে যেন এই ভাবে সমগ্র জনগোষ্ঠীর হয়ে ওঠে। ‘ও বুঝতে পারে না যে ও আর শুধু মায়ের ছেলে নেই, ওর কাছে এখন হাজার লোকের দাবি। ও এখন অনেক মানুষের। …কার কণ্ঠ? ও বুঝতে চায়, পারে না।

কাকতালীয়ভাবে ঘটনাটি ঘটে যাওয়া খুবই সম্ভব। কিন্তু সচেতনভাবে লেখা একটি উপন্যাসে এ প্রশ্নটি আমাদের সামনে মীমাংসার অপেক্ষায় থেকেই যাচ্ছে। পোকামাকড়দের জীবনচক্র যেমন জন্ম, মৃত্যু, বংশবিস্তার, জীবনধারণ এর সবই নির্ধারিত। এতে কোনো বৈচিত্র্য নেই। যূথবদ্ধতা আছে, কিন্তু মুক্তি আন্দোলন নেই। আলোচ্য উপন্যাসের বাসিন্দারাও শুরুতে পোকামাকড়ের মতো পরিবর্তনহীন জীবন মেনে নেয়া নিরুচ্চার জনগোষ্ঠী। মালেকই প্রথম তাদের প্রকৃত মানবজীবনের সন্ধান দেয়। বিদ্রোহ করতে শেখায়। মুক্তির স্বপ্ন দেখায়।

এসআর