নিরন্ন মানুষের স্বপ্নের বসত

আগের সংবাদ

ঢাকা-৫ ও নওগাঁ-৬ আসনে বিএনপির চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা

পরের সংবাদ

ইমদাদুল হক মিলন

দুই সত্তার লেখক

এমরান কবির

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২০ , ৭:০৭ অপরাহ্ণ

আমাদের প্রকাশনা শিল্পকে একটি শক্ত অবস্থানে দাঁড় করবার পেছনে ইমদাদুল হক মিলনের রয়েছে বিশেষ ভূমিকা। কিন্তু এই ভূমিকা পালন করতে গিয়ে এবং নিজের জীবিকার তাগিদে তিনি লিখে ফেলেছেন কিছু হালকা চালের রচনা। যা লেখককে এখন বিদ্ধ করে। লেখক অনুশোচনায় দগ্ধ হন। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি তা সখেদে প্রকাশও করেন। এও বলেন এছাড়া তার উপায়ও ছিল না ওই সময়। নিয়তি হয়তোবা এটাই চেয়েছিল। কিন্তু গৌরবের কথা হলো তাঁর হাত দিয়েই বের হয়ে এসেছে পরাধীনতার মতো উপন্যাস, বের হয়েছে ভ‚মিপুত্র। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লিখেছেন কালোঘোড়া যা গভীর প্রতীকী ব্যঞ্জনায় উজ্জ্বল। লিখেছেন সাড়ে তিন হাত ভ‚মি’র মতো উপন্যাস যেখানে রয়েছে এমন এক চরিত্র যাঁকে বলা যেতে পারে মুক্তিযোদ্ধার যথার্থ প্রতিনিধি। লিখেছেন নিজের জীবনের ছায়া অবলম্বনে কেমন আছ, সবুজপাতা, জিন্দাবাহার, মায়ানগর। আর নূরজাহানের কথা তো বলাই বাহুল্য। বাংলা সহিত্যের বৃহত্তম উপন্যাস হিসেবে খ্যাত এই মহাকাব্যিক রচনাটির একটি বাক্যও বাহুল্য নয়।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম একটি লেখায় বলেছেন, ‘এই উপন্যাস থেকে একটি শব্দও বাদ দেয়া যাবে না। এর গঠনটি এমন যে, এই রচনার কোনো বাক্য থেকে যদি একটি শব্দ বাদ দেওয়া হয় তবে সেটা হবে এর অঙ্গহানী হয়েছে।’ বিশাল কলেবর হওয়ায় কোনো কোনো মহল ধারণা পোষণ করেন এর ব্যপ্তিক প্রসার নিয়ে। কিন্তু সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম তা খারিজ করে দেন। দেশ পত্রিকায় বাংলাদেশের যে দুএকজনকে বিশেষ মূল্যায়ন করা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে, ইমদাদুল হক মিলন তাঁদের অন্যতম। বলাবাহুল্য, বর্তমান সাহিত্য রচনায় দুই বাংলায় এমন বহুপ্রজ কিন্তু শিল্পমানে উত্তীর্ণ সাহিত্যিক আর একটিও নেই।

স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁর কালোত্তীর্ণ উপন্যাস কালোঘোড়ার কথা। কয়েক দশক আগে লেখা এই উপন্যাসটি তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য রচনা। কালোঘোড়া স্বাধীনতার বহুমাত্রিক প্রতীকী উপন্যাস হিসেবে বিবেচ্য। একটি নিবিড় গ্রাম যুদ্ধের দামামায় কী রূপ পরিগ্রহ করে, বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ কীভাবে এটাকে গ্রহণ-বর্জন করে, বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির মানুষের ভূমিকা কেমন হয় : স্বাধীনতা সংগ্রাম কীভাবে মানুষকে আত্মত্যাগী করে তোলে, পাশাপাশি স্বার্থপর ও কৌশলী হয়ে ওঠার এক মর্মন্তুদ কাহিনী কালোঘোড়া উপন্যাসখানি।

উপন্যাসের শুরু ‘বৃষ্টিটা আছেই’ এই ছোট্ট একটি বাক্য দিয়ে। ছোট্ট এ বাক্যটিই যেন এক বিশাল প্রতীক এই উপন্যাসের। আমরা জানি বৃষ্টি এমন এক নিয়ামক যা সব কিছুকেই জড়িত করে ফেলে। ভিজিয়ে দেয়। বিভ্রান্ত করে। আমরা এও জানি মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এই বৃষ্টি আমাদের জন্য যেমন আশীর্বাদস্বরূপ ছিল তেমনি পাকিস্তানিদের জন্য ছিল বিভীষিকা। লেখক যেন এই প্রতীকী বাক্যের মাধ্যমে প্রথমেই জানিয়ে দিলেন অনেক কথা।

মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-অঙ্গীকার যেটাই বলি না কেন এই কালোঘোড়া এবং কলোঘোড়া নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের কর্মকাণ্ড আমাদের সমগ্র ইতিহাসের একক প্রতীক যা আজও বহমান। ইমদাদুল হক মিলন সেই অগ্রগণ্য সাহিত্য-চিন্তক যার হাত দিয়ে কয়েক যুগ আগেই বেরিয়ে এসেছে এই প্রতীকী চরিত্র যা ভাবলে শিহরিত হতে হয়। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এরকম প্রতীকী এবং প্রায়োগিক কোনো চরিত্র বাংলা সাহিত্যে এক, অনন্য। বিরল তো বটেই।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁর আরেকটি মহামূল্যবান কাজ সাড়ে তিন হাত ভূমি।

মুক্তিযুদ্ধ চলছে। আগরতলায় ট্রেনিং নিয়ে ঢাকায় অপারেশন শুরু করবে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল। এই দলে আছেন রবি। কমান্ডার খালেদ মোশাররফের অনুমতি নিয়ে তিনি এসেছেন নিজেদের গ্রামে। বাড়িতে ঢুকে দেখেন উঠোনে পড়ে আছে বাবার লাশ, বসার ঘরে মায়ের লাশ, বোনের লাশ তার ঘরে, সন্তান সম্ভবা স্ত্রীর লাশ পেছন দিককার উঠোনে। এই দেখে অনুভ‚তিহীন হয়ে যান তিনি। একসময় উঠোনেই কবর খুঁড়তে শুরু করেন। যখন যার কবর খুঁড়ছেন ঢুকে যাচ্ছেন তার স্মৃতির ভেতর। কথাশিল্পী ইমদাদুল হক মিলনের ‘সাড়ে তিন হাত ভূ‚মি’ উপন্যাসের প্রথম পর্বের আখ্যান এরকম।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রচিত উপন্যাসের একটা বড় ঘাটতি হলো একটা নিখুঁত চরিত্র। যার নাম শুনলেই মানসলোকে একজন মুক্তিযোদ্ধার পূর্ণাঙ্গ চরিত্র ভেসে উঠবে। বাংলা সাহিত্যের নায়কদের যদি একটা তালিকা করতে বলা হয় তা করা যাবে খুব সহজেই। নায়িকা বা খলনায়ক বা খলনায়িকা- সবার তালিকাই করা সম্ভব। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যের এমন একটি চরিত্রের কথা কেউ কি বলতে পারবে যার নাম শুনলেই একজন মুক্তিযোদ্ধার রূপ যার যার নিজস্ব কল্পনায় ভেসে উঠবে? (পরিতাপের বিষয় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আশানুরূপ সাহিত্য রচিত হয়নি।) কাজটা কঠিন। কারণ মুক্তিযুদ্ধের বহুমাত্রিকতা। এই বহুমাত্রিকতাকে আঁকতে গেলে, এই বহুমাত্রিকতাকে ধারণ করতে হলে এমন একজন শক্তিশালী লেখকের দরকার যিনি চরিত্রের ভেতরে প্রবেশ করে, তাঁর চরিত্রকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করে ভেতরের সবকিছু উপলব্ধির আওতায় আনতে পারবেন। দৃশ্যে, বাস্তবে, চেতনায় চ‚ড়ান্তভাবে একাত্ম না হলে যেটা আঁকা অসম্ভব।

মুক্তিযুদ্ধের এতদিন পর সম্ভবত কথাশিল্পী ইমদাদুল হক মিলনের হাতেই অঙ্কিত হলো সেই চরিত্রের। যার কথা মনে হলেই মানসলোকে ভেসে উঠবে এমন এক মানুষের ছবি যিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে স্বাধীনতার কাক্সক্ষায় জীবনকে বাজি রেখেছেন। যিনি দেশের মাটিকে মায়ের মতোই পবিত্র মনে করেন। যিনি যে কোনো পীড়নের বিপক্ষে সবচেয়ে বড় প্রতিবাদী। যিনি কাঁদতে জানেন। যিনি কাঁদতে কাঁদতেই বুকের ভেতরে অগ্নুৎপাতের মতো বিস্ফোরণ জমা করেন। সাড়ে তিন হাত ভ‚মি-এর প্রথম পর্ব পড়ার পর মনে হয়েছে ইমদাদুল হক মিলনের হাতে রচিত হলো মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে ভিন্নমাত্রার উপন্যাস।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রচিত উপন্যাসের কতিপয় কমন বিষয় হলো গোলাগুলি, গেরিলা অপারেশনের বর্ণনা, ব্রিজ ভেঙে ফেলা, ক্লাউন সদৃশ কতিপয় রাজাকারদের খুচরা কর্মকাণ্ড ইত্যাদি। এই উপন্যাসে আমরা যেটা খুব সতর্কতার সঙ্গে লক্ষ করি সেটা হলো এখানে স্পষ্ট করা হয়েছে যে মুক্তিযুদ্ধ কেবল গোলাগুলির বিষয় নয়। পাকিস্তানিদের বোকা বানিয়ে ব্রিজ ভেঙে ফেলে কৌতুকানন্দ লাভ করাও নয়। যুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধ একটা চেতনার নাম। এই চেতনার সাথে জড়িত আছে দেশাত্মবোধ। রয়েছে আত্ম-অধিকারের মর্যাদাকাক্সক্ষা। রয়েছে প্রতিবাদ। রয়েছে দ্রোহ। মুক্তিযোদ্ধা রবি এসব কিছুই ধারণ করে। তার বেড়ে ওঠার সাথে সাথে পাওয়া যায় তার শৈশব কৈশোরের যৌবনের বর্ণনা। পাওয়া যায় তার পারিবারিক ঐতিহ্যের কথা। এভাবে তার মানসলোকের সন্ধানও পাওয়া যায়। চেতনা ধারণের সাথে এগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁর আরেকটি কর্ম নয় মাস। রচনাটিতে ভিন্নার্থিক প্রক্ষেপণে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে তুলে আনা হয়েছে।কীভাবে?তা বুঝতে হলে যেতে হবে নয়মাসের গভীরে। প্রকৃত ইতিহাস চাপা দেয়া এবং বিকৃতির মহোৎসবে সম্ভবত সবচেয়ে এগিয়ে পাকিস্তান। পাকিস্তানের পাঠ্যপুস্তক ঘেঁটে দেখা যায় একাত্তর নিয়ে একটিমাত্র বাক্য দিয়েই পুরো ইতিহাস লেখা সম্পন্ন করেছে। বলা হয়েছে, ‘একাত্তর সালে পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়’। দ্বাদশ শ্রেণি পর্যায়ের ইতিহাসে সামান্য কয়েকটি শব্দ যোগ করা হয়েছে মাত্র। আগের বাক্যটির সাথে যোগ করা হয়েছে, ‘ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর সহযোগিতায় পূর্ব পাকিস্তান একাত্তর সালে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।’ পাঠ্যপুস্তকে ইতিহাসের এহেন অবস্থায় সেখানকার বর্তমান প্রজন্মের কাছে অজানা থেকে যায় একাত্তরের প্রকৃত ঘটনা। তাদের অজানা থেকে যায় তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কুকর্মের কথা। সেই অশ্রুত ইতিহাস পাকিস্তানের বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার কাহিনী বিধৃত হয়েছে নয়মাস নামক আখ্যানে।

একই সাথে জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ লেখক হবার বিরল কৃতিত্ব খুব কম সংখ্যক লেখকেরই হয়ে থাকে। ইমদাদুল হক মিলন সেই বিরলতমদের একজন যিনি একই সাথে এই দুই সত্তা ধারণ করেন। গত ৮ সেপ্টেম্বর এই কথাসাহিত্যিকের জন্মদিন ছিলো। জন্মদিনে তাঁকে প্রণতি জানাই।

এসআর