করোনায় মৃত্যু আরো ৪১ জনের, শনাক্ত ১৮২৭

আগের সংবাদ

বৈষম্যের প্রতিবাদে মশাল হাতেই সেমিতে ওসাকা

পরের সংবাদ

চীন-ভারত দ্বৈরথে বাংলাদেশ কোন পথে?

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৯, ২০২০ , ৩:৫৯ অপরাহ্ণ আপডেট: সেপ্টেম্বর ৯, ২০২০ , ৪:০৪ অপরাহ্ণ

পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পর দেশে ফেরার পথে লন্ডন হয়ে দিল্লিতে যান বঙ্গবন্ধু। সেখানে অভ্যর্থনা সভায় বক্তব্য রাখেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধে প্রতিবেশি এই দেশের অবদানের কথা স্মরণ করে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘‘আপনাদের প্রধানমন্ত্রী, আপনাদের সরকার, আপনাদের সৈন্যবাহিনী, আপনাদের জনসাধারণ যে সাহায্য ও সহানুভূতি আমার দুঃখী মানুষকে দেখিয়েছে চিরদিন বাংলার মানুষ তা ভুলতে পারবে না। ব্যক্তিগতভাবে আপনারা জানেন, আমি পশ্চিম পাকিস্তানের অন্ধকার সেলের মধ্যে বন্দি ছিলাম কিছুদিন আগেও। শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী আমার জন্য দুনিয়ার এমন জায়গা নাই যেখানে তিনি চেষ্টা করেন নাই আমাকে রক্ষা করার জন্য। আমি ব্যক্তিগতভাবে তার কাছে কৃতজ্ঞ। আমার সাড়ে সাত কোটি মানুষ তার কাছে এবং তার সরকারের কাছে কৃতজ্ঞ। আমার জনসাধারণ ভারতবর্ষের জনসাধারণের কাছে কৃতজ্ঞ। আর যেভাবে এক কোটি লোকের খাওয়ার বন্দোবস্ত এবং থাকার বন্দোবস্ত আপনারা করেছেন…আমি জানি ভারতবর্ষের মানুষ খুব দুঃখী আছে সেখানে, তারাও কষ্ট পাচ্ছে, তাদেরও অভাব অভিযোগ আছে- তা থাকতেও তারা সর্বস্ব দিয়েছে আমার লোকের সাহায্য করার জন্য, চিরদিন আমরা তা ভুলতে পারবো না।’

বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘‘আমাকে প্রশ্ন করা হয়, শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে আপনার আদর্শে এত মিল কেন? আমি বলি, এটা আদর্শের মিল, এটা নীতির মিল, এটা মনুষ্যত্বের মিল, এটা বিশ্ব শান্তির মিল।’’ তাই বিশ্লেষকরা বলে থাকেন ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কটা কেবল ঐতিহাসিকই নয় আত্মিকও বটে।

বিশ্ব বাণিজ্যের নবধারায় উন্মোচিত এশিয়ার অন্যতম পরাশক্তি চীন একাত্তরে বাংলাদেশের জন্মটা মেনে নিতে পারেনি। তারা অবস্থান নিয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানের পক্ষে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ গণহত্যা এবং নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি নিধন সর্বোপরি ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যা- কোনো বিষয়েই বাংলাদেশের পক্ষে চীন নূন্যতম সহমর্মিতা দেখায়নি। বাংলাদেশকে তারা স্বীকৃতি দেয় বঙ্গবন্ধু মারা যাওয়ার ১৬দিন পর। অন্যভাবে বললে, চীনের কাছে ৭১-এর ২৬ মার্চ কিংবা ১৬ ডিসেম্বর কোনো স্পর্শকাতর দিবস নয়। তাদের কাছে মোটা দাগে ৩১ আগস্টই বড় কিছু, যেদিন তারা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মোস্তাক, জিয়াউর রহমান, এরশাদ, খালেদা জিয়া মতাদর্শে একই হওয়ায় তাদের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়তে চীনের তেমন বেগ পেতে হয়নি। একটা সময় এমনও শোনা গেছে, বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে দেশ চীনের হয়ে যায়। আর আওয়ামী লীগ থাকলে ভারতের। কথাটি সর্বাংশে সত্য না হলেও একেবারে অমূলক নয়। এমন ভাবনায় আমরা ফিরে যাই সেই অতীতে। বঙ্গবন্ধু-আওয়ামী লীগ-মুক্তিযুদ্ধ-বাংলাদেশ-ভারত। খন্দকার মোস্তাক-জিয়াউর রহমান-বিএনপি-চীন।

১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর রেসকোর্স ময়দানে আয়োজিত জনভায় বঙ্গবন্ধু তার বক্তৃতায় ভারত বিষয়ে আবারো স্মরণ করিয়ে দেন- ‘যারা জানতে চান আমি বলে দিবার চাই আসার সময় দিল্লিতে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে কথা হয়েছে। আমি আপনাদের বলতে পারি তাকে জানি আমি, তাকে আমি শ্রদ্ধা করি। সে পন্ডিত নেহেরুর কন্যা। সে মতিলাল নেহেরুর ছেলের মেয়ে। তারা রাজনীতি করেছে, ত্যাগ করেছে। তারা আজকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েছে। যেদিন আমি বলবো সেদিন ভারতের সৈন্য বাংলার মাটি ছেড়ে চলে যাবে এবং তিনি আস্তে আস্তে কিছু সরিয়ে নিচ্ছেন।’

বঙ্গবন্ধু আরো বলেন, ‘যে সাহায্য তিনি (ইন্দিরা গান্ধী) করেছেন, আমি আমার ৭ কোটি বাঙালির পক্ষ থেকে তাকে, তার সরকারকে ভারতের জনগণকে শ্রদ্ধা অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে মোবারকবাদ জানাই।’

আজকে আমরা যারা পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে বাস করছি, কোনো দ্বিধা ছাড়া জাতিসত্তার পরিচয় তুলে ধরে বলছি, বাংলাদেশ আমার দেশ- তারা একাত্তরকে অস্বীকার করবো কী করে? বাংলাদেশ জন্ম নেয়ার আগে প্রসবকালীন বেদনায় যখন ভারতের মতো প্রতিবেশি রাষ্ট্র পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল, বিশ্ব জনমত তৈরি করে জনককে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত করেছিল তাদের সেই অবদানের কথা কি ভোলা যায়, না উচিত?

তবে, কালক্রমে ভারতও যেন বন্ধুত্বের নিগূঢ় বন্ধন থেকে কিছুটা সরে গিয়েছে। তিস্তা সমস্যা জিইয়ে থাকায় দুই দেশের সম্পর্কের মাঝে সন্দেহের দানা বেঁধে আছে। দিল্লী মসনদের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তিস্তার ব্যাপারে আশার বাণী শোনালেও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় টলছেন না। সীমান্তে এখনো সংকট কাটেনি। সর্বশেষ ভারতের নাগরিকত্বের (এনআরসি) বিষয়েও বাংলাদেশ খুব একটা সন্তুষ্ট হতে পারেনি। যদিও ভারতেই গৃহিত ওই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ব্যাপক আন্দোলন হয়েছে। এখনো সমালোচনা হচ্ছে। রোহিঙ্গা প্রশ্নেও জাতিসংঘে ভোটদানে বিরত থেকেছে ভারত। অবশ্য এ বিষয়ে চীন সরাসরি বাংলাদেশের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বাংলাদেশকে নিয়ে চীনের সাম্প্রতিক অতি আগ্রহের বিষয়টি ভারত বুঝতে পারছে। তাই, বাংলাদেশের সঙ্গে অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে নতুন করে আলোচনার সূত্রপাতের পাশাপাশি বাণিজ্যিক সুবিধার কথাও তারা ভাবছে।

বঙ্গবন্ধু ও ইন্দিরা গান্ধী

চীন অর্থনৈতিক এবং প্রযুক্তিগতভাবে ভারতের চেয়ে এগিয়ে। কিন্তু একনায়কতন্ত্রে মোড়ানো শাসন ব্যবস্থা অনেকটাই ফ্রাঙ্কেস্টাইন দৈত্যের ভূমিকায় তাদের দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ভূ-রাজনীতির খেলায় নেপাল, মালদ্বীপ, শ্রীলংকার পর বাংলাদেশের সঙ্গেও তারা ভারত বিষয়ে মেতেছে। ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এ বিষয়ে তাদের সুনাম রয়েছে। একনায়কতন্ত্রের খেলায় চীন একচ্ছত্রভাবে যে আধিপত্যের দিকে এগুচ্ছে তা শেষ পর্যন্ত না তাদের একঘরে করে দেয়! আসলে গণতন্ত্র ছাড়া কারো মুক্তি নেই। সবাই স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে চায়। চীনে শেষ কবে স্বাধীন মত প্রকাশিত হয়েছিল তা খুঁজে বের করা দুষ্কর বৈকি!

বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারের প্রথম চাহিদাটি মেটাতে বিশেষ বিশেষ সময়ে আমাদের ভারতের দ্বারস্থ হতে হয়। চাল, ডাল, মসলাসহ নিত্য অনেক পণ্য প্রায় সারা বছরই ভারত থেকে বাংলাদেশকে আমদানি করতে হয়। আবার ইলেক্ট্রনিক, ইলেক্ট্রিক্যাল, ডেন্টাল পণ্য, কাপড়, এমনকি অবকাঠামোগত কাজের জন্য বাংলাদেশ চীনের বিশাল বাজার। অনেক ভেবে সম্প্রতি চীন তাদের দেশে বাংলাদেশের পণ্য শুল্কমুক্ত প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে। এক্ষেত্রে ভারত কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে। বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হকের মন্তব্যেই তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশ-ভারতের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে নানা রকম অশুল্ক বাধার (নন ট্যারিফ ব্যারিয়ার) কারণে বড় ধরণের বাণিজ্য ঘাটতি সৃষ্টি হচ্ছে। ভারতের উচিৎ বাংলাদেশকে মুক্তবাজার অর্থনীতির সুযোগ দেয়া এবং সাফটা চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন ঘটাতে সহযোগিতা করা।’

অতিসম্প্রতি ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে ভারত ও চীনের ভূমিকা শীর্ষক এক অনলাইন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিশিষ্টজনরা বলেছেন, ‘ভারত ও চীনের সঙ্গে বৈদেশিক সম্পর্ক নির্ধারণে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত। একাত্তরে পাকিস্তান, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ কখনো বিজয়ী হতে পারত না, যদি ভারত সার্বিক সহযোগিতা প্রদান না করতো। একইভাবে বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পেছনেও পাকিস্তান ও চীনের মদদ ছিল, যা ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে উঠে এসেছে। তাই ভারত ও চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক বা বাণিজ্যিক সম্পর্ক নির্ধারণে যে কোনো পরিস্থিতিতে অতীতের ভূমিকাকেই গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।’

এনএম

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়