২৪ বছরেও উদঘাটন হয়নি মৃত্যুর রহস্য

আগের সংবাদ

আজ পৃথিবীর খুব কাছ দিয়েই ছুঁটছে একটি বিশাল গ্রহাণু

পরের সংবাদ

চলচ্চিত্রের নতুন ধারার প্রবর্তক সালমান শাহ

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ৬, ২০২০ , ১১:৩৬ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের নায়ক হিসেবে সাফল্যের তুঙ্গে থাকা অবস্থায় ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরণ করেন সালমান শাহ। তাঁর এই আকস্মিক মৃত্যু সেদিন চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্ট সবাইকে হতবাক করেছিল। চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্টরা ছাড়াও দেশ এবং দেশের বাইরে সালমানের অসংখ্য ভক্ত-দর্শক তাঁর এ মৃত্যুকে সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি। মাত্র চার বছরের ক্যারিয়ারে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিলেন সালমান। যত দিন ছিলেন, কাজ করে গেছেন মন-প্রাণ উজাড় করে। বাংলা চলচ্চিত্রের সফল এই নায়কের অকাল প্রয়াণে এ দেশের চলচ্চিত্রশিল্পের যে ক্ষতি হয়েছে, তা এখন পর্যন্ত পূরণ হয়নি। মৃত্যুর পর অনেক বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো পর্যন্ত মানুষের হূদয় থেকে মুছে যাননি সালমান। এখনো সবাই গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় স্মরণ করে এ দেশের চলচ্চিত্রের স্বল্পায়ু এই আলোচিত নায়ককে।

নব্বইয়ের দশকে যখন বাংলা চলচ্চিত্র এক চরম দুঃসময় পার করছিল, ঠিক তখনই এ দেশের চলচ্চিত্রে ধূমকেতুর মতো আবির্ভাব ঘটে সালমান শাহের। ১৯৯৩ সালে সোহানুর রহমান সোহানের পরিচালনায় নির্মিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবির মাধ্যমে দেশীয় চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে তাঁর। প্রথম ছবিতেই বাজিমাত করেন তিনি। সালমান শাহ অভিনীত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবিটি মুক্তির পর বাংলাদেশের চলচ্চিত্রও যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। এরপর শুধুই এগিয়ে চলা। সালমানের ক্যারিয়ারে একের পর এক যোগ হতে থাকে সাফল্যের পালক। এ যেন এলেন, দেখলেন এবং জয় করলেন। প্রথম ছবি থেকে শুরু করে শেষ ছবিটি পর্যন্ত সমানতালে নিজের জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছিলেন সালমান শাহ। বাংলা চলচ্চিত্রের সাফল্যের রাজপুত্র হিসেবেও সালমানকে অভিহিত করা হয়। প্রথম ছবিতে মৌসুমীর সঙ্গে জুটি বাঁধলেও পরে শাবনূরের সঙ্গেও একটি সফল জুটি গড়ে ওঠে সালমানের। এসব জুটির একেকটি ছবি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে মাইলফলক হিসেবে আছে। এ ছাড়া তাঁর সঙ্গে জুটি হয়ে অভিনয় করেছেন শাবনাজ, শাহনাজ, লিমা, শিল্পী, শ্যামা, সোনিয়া, বৃষ্টি, সাবরিনা ও কাঞ্চি।

সালমান শাহ/ ফাইল ছবি

সালমান শুধু অভিনেতাই ছিলেন না, চলচ্চিত্রের নতুন ধারার প্রবর্তকও ছিলেন তিনি। একক কৃতিত্বে সামাজিক-অ্যাকশনধর্মী ও নিটোল প্রেমের ছবির নতুন একটি ধারার সঙ্গে সবাইকে পরিচিত করেছিলেন তিনি। ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ মুক্তির পর মাত্র চার বছর রাজত্ব করেছিলেন সালমান। আর এই চার বছরে ব্যবসাসফল ২৭টি ছবি উপহার দেন তিনি। সালমান শাহ অভিনীত ছবিগুলো হচ্ছে—‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ (১৯৯৩), ‘তুমি আমার’, ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘সুজন সখী’, ‘বিক্ষোভ’, ‘স্নেহ’, ‘প্রেম যুদ্ধ’ (১৯৯৪), ‘কন্যাদান’, ‘দেনমোহর’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘আঞ্জুমান’, ‘মহামিলন’, ‘আশা ভালোবাসা’ (১৯৯৫), ‘বিচার হবে’, ‘এই ঘর এই সংসার’, ‘প্রিয়জন’, ‘তোমাকে চাই’, ‘স্বপ্নের পৃথিবী’, ‘সত্যের মৃত্যু নেই’, ‘জীবন সংসার’, ‘মায়ের অধিকার’, ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’ (১৯৯৬), ‘প্রেমপিয়াসী’, ‘স্বপ্নের নায়ক’, ‘শুধু তুমি’, ‘আনন্দ অশ্রু’, ‘বুকের ভেতর আগুন’ (১৯৯৭)।

চলচ্চিত্রে সালমানের সাফল্যের পারদ যখন আরও ঊর্ধ্বমুখী হতে থাকল, ঠিক তখনই ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর আচমকা তাঁর মৃত্যুসংবাদে স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল সবাই। আর এ কারণেই চুক্তি স্বাক্ষর হওয়া বেশ কয়েকটি ছবির কাজও শেষ করে যেতে পারেননি তিনি। এর মধ্যে রয়েছে ‘শেষ ঠিকানা’, ‘প্রেমের বাজি’, ‘আগুন শুধু আগুন’, ‘কে অপরাধী’, ‘মন মানে না’, ‘ঋণ শোধ’, ‘তুমি শুধু তুমি’।

শুধু নায়ক পরিচয়ই নয়, একাধারে মডেল ও গায়ক হিসেবেও সালমানের পরিচিতি ছিল। ছোটবেলা থেকেই শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি তীব্র ঝোঁক ছিল তাঁর। কৈশোর থেকে বন্ধুমহলে সবাই তাঁকে কণ্ঠশিল্পী হিসেবে চিনত। ১৯৮৬ সালে ছায়ানট থেকে পল্লিগীতিতে উত্তীর্ণও হয়েছিলেন তিনি। ১৯৯৩ সালে চলচ্চিত্রে অভিনয়ে আসার আগেই মায়ের বান্ধবীর মেয়ে সামিরার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন সালমান। অভিনয়ের মাধ্যমে সালমান শাহ যেমন সবাইকে মোহাবিষ্ট করে রাখতেন, ঠিক তেমনি অমায়িক ব্যবহারের জন্য পেয়েছিলেন অনেকেরই প্রশংসা। চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট অনেকেরই মতে, নব্বইয়ের দশকে ঢালিউড আর বলিউডের ছবিগুলো দেখলে দেখা যাবে, কোনো অংশেই শাহরুখ খান, সালমান খান ও আমির খানের চেয়ে কম ছিলেন না সালমান শাহ।

একনজরে সালমান শাহ

নাম: শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন (সালমান শাহ)
রাশি: বৃশ্চিক
উচ্চতা: ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি
জন্মস্থান: সিলেট
জন্মতারিখ: ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭১
বাবা: কমর উদ্দিন চৌধুরী
মা: নীলা চৌধুরী
ভাই: শাহরান ইভান চৌধুরী
বিয়ে: ১২ আগস্ট ১৯৯২
স্ত্রী: সামিরা

পড়ালেখা: খুলনা বয়রা মডেল হাইস্কুল। এসএসসি: ১৯৮৭, আরব মিশন স্কুল, ধানমন্ডি। আইকম: আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ। বিকম: মালেকা সায়েন্স কলেজ, ধানমন্ডি। বিজ্ঞাপন: ইস্পাহানি গোল্ডস্টার টি (১৯৮৩), জাগুয়ার কেডস (১৯৮৪), মিল্কভিটা (১৯৮৮), কোকা-কোলা (১৯৮৯), ফানটা (১৯৯১), জাগুয়ার কেডস (১৯৮৫)।

ধারাবাহিক নাটক: পাথর সময় (১৯৯০), ইতিকথা (১৯৯৪)। একক নাটক: আকাশ ছোঁয়া (১৯৮৫), দেয়াল (১৯৮৫), সব পাখি ঘরে ফিরে (১৯৮৫), নয়ন (১৯৯৬), স্বপ্নের পৃথিবী (১৯৯৬)। প্রথম চলচ্চিত্র: কেয়ামত থেকে কেয়ামত (১৯৯৩) শেষ চলচ্চিত্র: বুকের ভেতর আগুন (১৯৯৭)

সালমানের পরিচালকেরা: সোহানুর রহমান সোহান, জহিরুল হক, মহাম্মদ হান্নান, গাজী মাজহারুল আনোয়ার, জীবন রহমান, শিবলি সাদিক, শফি বিক্রমপুরী, শাহ আলম কিরণ, নুরুল ইসলাম পারভেজ, দেলোয়ার জাহান ঝন্টু, হাফিজ উদ্দিন, তমিজ উদ্দিন রিজভী, দিলীপ সোম, মালেক আফসারী, রানা নাসের, মতিন রহমান, বাদল খন্দকার, ছটকু আহমেদ, জাকির হোসেন রাজু, নাসির খান, এম এম সরকার, রেজা হাসমত, কাজী মোর্শেদ।

প্লে-ব্যাক: প্রেমযুদ্ধ এবং ঋণ শোধ।

মৃত্যু: ৬ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬।

তথ্য সূত্র: নীলা চৌধুরী (সালমান শাহর মা)

এসএইচ