গ্রেনেড বিস্ফোরণে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি

আগের সংবাদ

আপা দাঁড়ান, আমি ছবি তুলতে পারিনি

পরের সংবাদ

মৃত ভেবে তোলে লাশবাহী গাড়িতে

প্রকাশিত: আগস্ট ২১, ২০২০ , ১১:৫৮ পূর্বাহ্ণ আপডেট: আগস্ট ২১, ২০২০ , ৩:০২ অপরাহ্ণ

‘আমার ডান হাত ধরে ছিলেন আইভি আপা। বিকট শব্দের সঙ্গে আপার ‘মাগো’ চিৎকার। দুজনেই পড়ে গেলাম। জ্ঞান হারানোর আগে দেখলাম, দুজনেরই পা উড়ে গেছে। চোখের সামনে পায়ের বিভিন্ন অংশগুলো টুকরা টুকরা হয়ে যাচ্ছিল। শাড়ি ছিঁড়ে গেছে। চারদিকে শুধু লাশ আর লাশ। জ্ঞান হারাই। খুব অল্প সময়ের জন্য জ্ঞান ফিরেছিল। দেখি আইভি আপাও আমার পাশেই পড়ে রয়েছেন। নিজের উড়ে যাওয়া পায়ের আঙুলগুলো জড়ো করার চেষ্টা করেছিলাম। আর জানি না।

পরে জেনেছি, মৃত ভেবে আরো ১২/১৩টা লাশের সঙ্গে আমাকেও ট্রাকে করে ঢাকা মেডিকেলের মর্গে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। দোয়েল চত্বরের কাছাকাছি যাওয়ার পর কখন হঠাৎ মাকে ডেকেছি জানি না। ক্ষীণ স্বরের ওই আওয়াজ শুনতে পেয়েছিলেন লাশবহনকারী সহকর্মীরা। ট্রাক থামিয়ে শুরু হয় মৃতের মধ্যে জীবিতের সন্ধান। তারাই আমাকে জীবিত শনাক্ত করে মর্গের বদলে জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। কিন্তু সেখানে ডাক্তার চিকিৎসা সম্ভব নয় বলে অস্বীকৃতি জানায় এবং করিডোরে ফেলে রেখে দেয়। এভাবে কতক্ষণ পড়ে ছিলাম জানি না। শরীর থেকে সব রক্ত বেরিয়ে যাচ্ছে।

এক সাংবাদিক ভাই আমার মোবাইল থেকে আমার বাসায় জানান। ফোন পেয়ে আমার ছেলে ধানমন্ডি অফিস থেকে দৌড়িয়ে আসে। গাড়ি নিয়ে আসার চেষ্টা করছিল, পুলিশি বাধায় পারেনি। হাসপাতাল ভর্তি আহতরা। আইভি আপার নাকি পা কাটছিল। মেডিকেলে আমাকে খুঁজে বের করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালের দ্বারে দ্বারে ঘোরে। আমাদের নেতাকর্মীরাও পাশে দাঁড়ান। নেত্রীর সহযোগিতায় ঢাকা, দিল্লি, জার্মানির উন্নত চিকিৎসায় আমি বেঁচে আছি। কিন্তু হারিয়ে ফেলেছি আইভি আপাকে। আপার সেই মাগো চিৎকার আজও হৃদয়ে রক্ত ঝরায়।’

২০০৪ সালে ঢাকা মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ছিলেন নাসিমা ফেরদৌসী। মৃত্যু উপত্যকা ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে নারীনেত্রী আইভি রহমানের হাত ধরে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। শেখ হাসিনার বক্তৃতা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিকট শব্দ, ধোঁয়া আর আগুন। রক্তাক্ত অবস্থায় জ্ঞান হারালেন। লাশের ট্রাক থেকে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী নাসিমা ফেরদৌসী সেদিনের নিষ্ঠুরতা তুলে ধরেছেন ভোরের কাগজের কাছে। রক্তাক্ত অবস্থায়ও কোনো চিকিৎসাই হচ্ছিল না তার। হাসপাতালের দ্বারে দ্বারে ঘুরছিল তার ছেলে। চিকিৎসকদের একই কথা, আগে পা কেটে ফেলে দিয়ে পরে চিকিৎসা। ছেলে রাজি হয়নি। ডাক্তাররা ১০ ব্যাগ রক্ত জোগাড় করতে বলেন। খুঁজে খুঁজে যখন রক্ত জোগাড় করা হলো তখন রক্ত দেয়ার জন্য ব্যাগ পাওয়া যাচ্ছিল না। ব্যাগ কেনার পর পাওয়া যাচ্ছিল না অ্যাম্বুলেন্স। ডিএমসি বলল সিএমএইচে নিয়ে যেতে। যখন সবকিছু পাওয়া গেছে তখন অনেক রাত হওয়ায় সিএমএইচে ঢুকতে দেয়নি।

এরপর একের পর এক হাসপাতালে নেয়া হলেও বাঁচানো অসম্ভব ভেবে কেউ তার চিকিৎসা করাতে রাজি হয়নি। তবুও হাল ছাড়েননি স্বজনরা। এরমধ্যে কোনো চিকিৎসা হয়নি। অ্যাম্বুলেন্সে একদিকে রক্ত দেয়া হচ্ছিল আর অন্যদিকে রক্ত সব বের হয়ে যাচ্ছিল। সাড়ে ৪টার দিকে ধানমন্ডির একটি হাসপাতালে তাকে রাখে, পরদিন সকালে বাংলাদেশ মেডিকেলে নেয়া হয়। সেখানে রুহুল হক নাসিমা ফেরদৌসীর পায়ে অপারেশন করেন। অবস্থা অবনতি হওয়ায় আব্দুর রাজ্জাক, আমির হোসেন আমু, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, অজয় কর খোকন, ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিমসহ জাতীয় নেতাদের সঙ্গে তাকেও দিল্লি পাঠান শেখ হাসিনা। ওখানে এ্যাপোলো হাসপাতালে দীর্ঘদিন চিকিৎসা শেষে তাকে জার্মানি পাঠানো হয়। তবুও ১২ বছর পঙ্গুত্বই ছিল তার সঙ্গী। নাসিমা ফেরদৌসী বলেন, ‘উন্নত চিকিৎসার জন্য দিল্লি থেকে জার্মানিতে যাই। জার্মানিতে আমাকে জানানো হয়েছে, বেঁচে থাকতে হবে স্প্লিন্টারের সঙ্গেই। স্প্লিন্টার বের করতে হলে নার্ভগুলো নষ্ট হয়ে যাবে, কেটে যাবে। এরচেয়ে ব্যায়াম আর থেরাপি দেয়াই বেটার। ঢাকাতেই থেরাপি দিই। চেকআপ করাতে জার্মানিতে যেতে হয়।’

গ্রেনেডের স্প্লিন্টারের সঙ্গেই তার বসবাস। মাথা, ফুসফুস সব জায়গায় স্প্লিন্টার। এখনো দেড় হাজার স্প্লিন্টার শরীরে। মাঝেমাঝে অসহ্য যন্ত্রণায় কঁকিয়ে ওঠেন। হাত-পা ফুলে অবশ হয়ে যায়। সারাক্ষণ ঝিঁঝিঁ করে। বললেন, ‘দেড় যুগ ধরে যন্ত্রণাময় এই জীবন কাটছে। এই ভয়াবহ যন্ত্রণা শুধু যার শরীরে আছে তিনিই বুঝতে পারবেন। অন্য কারো পক্ষে বোঝা অসম্ভব। রাতের পর রাত ঘুমাতে পারি না। তাড়া করে ফেরে দুঃস্বপ্ন। যেন প্রতিটি নিঃশ্বাসে স্প্লিন্টারগুলো যন্ত্রণা দেয়। দুই পা অচল হওয়ায় ৪ বছর শয্যাশায়ী ছিলাম। সারা শরীরে স্পঞ্জ লাগানো ছিল। পরে হুইল চেয়ার, স্ট্রেচার এবং ওয়াকারের মাধ্যমে হাঁটা শেখানো হয়। লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটতে হতো। এখনো খুঁড়িয়ে হাঁটি। আমার পুরো শরীরটাই যেন জোড়াতালি দেয়া। চূর্ণবিচূর্ণ। হাঁটতে কষ্ট, শুতে কষ্ট। প্রতিমুহূর্তে তাড়া করে গ্রেনেড হামলার দুঃসহ স্মৃতি। আহত অবস্থার ছবি দেখে চোখ ঝাপসা হয়ে ওঠে। কোনো শব্দ শুনলেই আঁতকে উঠি।’

নাসিমা ফেরদৌসী বলেন, গ্রেনেডের আগুন আর স্প্লিন্টারে সব আশা-আকাঙ্ক্ষা জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। নেত্রীর সহযোগিতায় উন্নত চিকিৎসার কারণে আজ দুই পায়ে ভর করে দাঁড়ানো। আমার পুনর্জন্ম হয়েছে। মানসিক সাহস ও শক্তি আমি হারাইনি কখনো। দলীয় কর্মকাণ্ড কখনোই ছাড়িনি। পঁচাত্তরে আমরা বঙ্গবন্ধুকে বাঁচাতে পারিনি। কিন্তু ২১ আগস্ট আমার অঙ্গ দিয়ে, শরীরের তাজা রক্ত দিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে রক্ষা করতে পেরেছি এটা আমার গর্ব।

পিআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়