নতুন পাসপোর্টের আবেদন নেয়া শুরু

আগের সংবাদ

কী বার্তা দিল দিল্লি

পরের সংবাদ

ভয়াল ২১ আগস্ট

চূড়ান্ত বিচারের অপেক্ষা

প্রকাশিত: আগস্ট ২১, ২০২০ , ৯:০৮ পূর্বাহ্ণ আপডেট: আগস্ট ২১, ২০২০ , ৫:২৬ অপরাহ্ণ

মাস্টার মাইন্ড তারেকের যাবজ্জীবনের
পরিবর্তে মৃত্যুদণ্ড চায় রাষ্ট্রপক্ষ

স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে পনের আগস্টের পর আরেকটি কলঙ্কজনক দিন একুশ আগস্ট। ২০০৪ সালে আজকের এইদিনে প্রকাশ্য দিবালোকে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে নজিরবিহীন নারকীয় সন্ত্রাসের ঘটনায় শুধু বাংলাদেশ নয়, স্তব্ধ হয়েছিল গোটা বিশ্ব। দীর্ঘ চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ১৪ বছর পর বিচার প্রক্রিয়া শেষে ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর ৪৯ আসামিকে সাজা দিয়ে বিচারিক আদালতের রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ দায়মুক্তির প্রাথমিক পর্যায় অতিক্রম করলেও রায় কার্যকরে বাকি রয়েছে আরো বেশ কিছু ধাপ। হাইকোর্ট, আপিল বিভাগ ও সর্বশেষ রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষাসহ বাকি যে ধাপগুলো রয়েছে, সেগুলো দ্রুততার সঙ্গে শেষ করে চূড়ান্তভাবে অপরাধীদের দণ্ড কার্যকরের মধ্য দিয়ে ভুক্তভোগীদের আক্ষেপ ঘোচানোর পাশাপাশি দেশকে কলঙ্কমুক্ত দেখার অপেক্ষায় পুরো জাতি।

বর্তমানে মামলার অবস্থা : বিচারিক আদালতের রায় ঘোষণার প্রায় দুই বছর পর বহুল আলোচিত এই মামলার পেপারবুক সরকারি ছাপাখানা (বিজি প্রেস) থেকে প্রস্তুত হয়ে হাইকোর্টে পৌঁছেছে গত রবিবার (১৬ আগস্ট)। মামলার পেপারবুক হাইকোর্টে পৌঁছনোর ফলে মামলাটির ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিলের ওপর হাইকোর্টে শুনানির পথ খুলল। জানা গেছে, ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিল শুনানির জন্য প্রস্তুত করার উদ্যোগ নিয়েছে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখা। দুটি মামলায় প্রায় ২২ হাজার পৃষ্ঠার পেপারবুক হাতে পাওয়ার পর কোনো নথি বাদ পড়েছে কি না তা পর্যালোচনার পাশাপাশি শেষ মুহূর্তের যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। এছাড়া নিয়ম অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কোনো আসামি পলাতক আছে কি না, সব আসামি আপিল করেছে কি না, কোনো আসামির পক্ষে সরকারি খরচে আইনজীবী (স্ট্রেট ডিফেন্স) নিয়োগের প্রয়োজন আছে কি না তা খতিয়ে দেখা শুরু হয়েছে। কারণ আদালতে শুনানির জন্য নথি পাঠানোর আগেই এই কাজগুলো সম্পন্ন করতে হয়। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের মুখপাত্র ও হাইকোর্ট বিভাগের বিশেষ কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুর রহমান বলেছেন, সংশ্লিষ্ট শাখা মামলা শুনানির জন্য প্রস্তুত করছে। প্রস্তুত হলেই শুধু প্রধান বিচারপতির কাছে উপস্থাপন করা হবে।

এদিকে জনগুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় মামলা দুটি শুনানির জন্য অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। পেপারবুক যাচাই-বাছাই শেষে মামলা শুনানির জন্য প্রস্তুত হলেই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির জন্য প্রধান বিচারপতি একটি বেঞ্চ ঠিক করে দিলে রাষ্ট্রপক্ষ শুনানির দিন নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট হাইকোর্ট বেঞ্চের নজরে আনবে। একই সঙ্গে শুনানিতে দণ্ডপ্রাপ্তদের সাজা যেন হাইকোর্টে বহাল থাকে সেই চেষ্টা চালিয়ে যাবে রাষ্ট্রপক্ষ। এছাড়া বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের যাবজ্জীবন সাজার পরিবর্তে যেন সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত হয় সেই চেষ্টাও করা হবে।

নিয়ম অনুযায়ী ফৌজদারি মামলায় বিচারিক আদালত যখন আসামিদের মৃত্যুদণ্ড দেয়, তখন সে দণ্ড কার্যকরের জন্য হাইকোর্টের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। এজন্য সংশ্লিষ্ট বিচারিক আদালত ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা অনুযায়ী মামলার সব নথি হাইকোর্টে পাঠিয়ে দেন; যা ডেথ রেফারেন্স নামে পরিচিত। পরে ডেথ রেফারেন্স শাখা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সংশ্লিষ্ট মামলার পেপারবুক প্রস্তুত করে। একটি মামলার যাবতীয় নথি (নিম্ন আদালতের রায়, সাক্ষীদের সাক্ষ্য, জেরা, আসামির জবানবন্দিসহ সব নথি) একসঙ্গে যুক্ত করে বাঁধাই করা নথিকেই পেপারবুক বলে। আর পেপারবুক প্রস্তুত হলে মামলাটি হাইকোর্টে শুনানির জন্য প্রস্তুত বলে ধরে নেয়া হয়। এই পেপারবুক প্রস্তুত না হলে হাইকোর্টে শুনানি শুরু হয় না। এর আগে ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর দেয়া রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের সাজা অনুমোদনের জন্য দুটি মামলায় ৩৭ হাজার ৩৮৫ পৃষ্ঠার রায়ের কপি (ডেথ রেফারেন্স) ২০১৮ সালের ২৭ নভেম্বর হাইকোর্টে পাঠানো হয়। এর মধ্যে ছিল হত্যা মামলায় ৩৬৪ পৃষ্ঠা ও বিস্ফোরকদ্রব্য মামলায় ৩০৭ পৃষ্ঠার মূল রায়। এরপর কারাবন্দি আসামিরা ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন। এরপর পেপারবুক প্রস্তুত করতে বিজি প্রেসে পাঠায় সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন।

মামলা নিষ্পত্তিতে বিশেষ বেঞ্চ : জনগুরুত্ব বিবেচনায় চাঞ্চল্যকর মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির স্বার্থে উচ্চ আদালতে বিশেষ বেঞ্চ গঠনের নজির রয়েছে। সে অনুযায়ী এই মামলাটিও দ্রুত নিষ্পত্তির স্বার্থে প্রধান বিচারপতি উদ্যোগ নেবেন বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করছেন। কারণ কোন মামলা কোন বেঞ্চে শুনানি হবে তা নির্ধারণ করার প্রশাসনিক এখতিয়ার প্রধান বিচারপতির। এ বিষয়ে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, হাইকোর্টে মামলার পেপারবুক এসেছে। বর্তমানে শুনানির জন্য প্রস্তুত করার কাজ চলছে। এখন মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ বেঞ্চ গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে। এই বিশেষ বেঞ্চ গঠন করার এখতিয়ার শুধু প্রধান বিচারপতির জানিয়ে তিনি এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসকেও উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি তিনি প্রধান বিচারপতির পদক্ষেপ প্রত্যাশা করেন। উচ্চ আদালতে এ মামলা নিষ্পত্তিতে কতদিন লাগতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আসামিপক্ষ চাইবে সময়ক্ষেপণ করতে, কিন্তু সরকারপক্ষকে আন্তরিকভাবে মামলার গুরুত্ব ও জনগণের চাহিদার বিষয়টি আদালতকে বোঝাতে হবে। আদালতকে কনভিন্স করতে পারলে মামলা নিষ্পত্তিতে খুব বেশি সময় লাগার কথা নয়। এজন্য অবশ্যই সরকারপক্ষকে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হবে।

মামলার পেপারবুক প্রস্তুত হওয়ার পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, প্রধান বিচারপতি এই পেপারবুক শুনানির জন্য বেঞ্চ নির্ধারণ করে দিলে তা কার্যতালিকায় আসার পর দ্রুত শুনানির জন্য সংশ্লিষ্ট আদালতে মেনশন করব। আর প্রধান বিচারপতি যাতে অবিলম্বে বেঞ্চ নির্ধারণ করে দেন সেজন্য চেষ্টা করব।

মামলার ইতিহাস : ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনায় দলটির ২৪ জন নেতাকর্মী নিহত হন। আহত হয় কয়েক’শ কর্মী। এ ঘটনায় হত্যা ও বিম্ফোরক আইনে পুলিশ বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় দুটি মামলা করে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে এ ঘটনার প্রথম থেকেই হামলাকে ভিন্ন খাতে নেয়ার চেষ্টা করা হয়। সাজানো হয় ‘জজ মিয়া’ নাটক। তবে সময়ের পরিক্রমায় ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় গ্রেনেড হামলা মামলার পুনর্তদন্ত শুরু হলে বেরিয়ে আসতে থাকে অনেক তথ্য। তদন্ত শেষে সিআইডির এএসপি ফজলুল কবীর ২০০৮ সালের ১১ জুন দুই মামলায় অভিযোগপত্র দেন। এতে বিএনপি নেতা আবদুস সালাম পিন্টু, তার ভাই মাওলানা তাজউদ্দিন ও হরকাতুল জিহাদ (হুজি) নেতা মুফতি হান্নানসহ ২২ জনকে আসামি করা হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত। ২০১১ সালের ৩ জুলাই তারেক রহমানসহ ৩০ জনকে আসামি করে সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করা হয়। এ নিয়ে মামলায় মোট আসামির সংখ্যা হয় ৫২।

আসামিদের মধ্যে যুদ্ধাপরাধ মামলায় জামায়াতে ইসলামী নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও সিলেটে ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীকে হত্যাচেষ্টা মামলায় হুজি নেতা আবদুল হান্নান ও শরীফ শাহেদুল ইসলাম বিপুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। ফলে এ মামলা থেকে তাদের নাম বাদ পড়ে। এরপর দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া শেষে ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর রায় দেন ঢাকার দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনাল-১। রায়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক শিক্ষা উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুর রহিমসহ ১৯ জনকে ‘ডাবল’ মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। আর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী ও সাবেক সংসদ সদস্য কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদসহ ১৯ জনকে ‘ডাবল’ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। দুটি মামলায় তাদের অভিন্ন সাজা দেয়া হয়।

হত্যা মামলায় ১৯ জনকে ফাঁসির দণ্ড, ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ১১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়। আর বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলায় ১৯ জনকে ফাঁসি এবং ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। একই সঙ্গে এই ৩৮ জনকে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের অন্য ধারায় ২০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়। এদের সবাইকে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডও দেয়া হয়। দুই মামলায় আলাদাভাবে সাজা দেয়া হলেও তা একযোগে কার্যকর হবে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়। সাজাপ্রাপ্ত ৪৯ আসামির মধ্যে ১৮ জন পলাতক। যার মধ্যে দুজন ফাঁসির ও ১২ জন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি রয়েছে।

পিআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়