আমি ভেবেছিলাম নেত্রী হয়তো নেই

আগের সংবাদ

মৃত ভেবে তোলে লাশবাহী গাড়িতে

পরের সংবাদ

গ্রেনেড বিস্ফোরণে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি

প্রকাশিত: আগস্ট ২১, ২০২০ , ১১:৫৩ পূর্বাহ্ণ আপডেট: আগস্ট ২১, ২০২০ , ৩:২৩ অপরাহ্ণ

প্রথমে আমি ট্রাকের ওপর স্থাপিত মঞ্চের সিঁড়ির পাশে বসা ছিলাম। পাশে ছিল সাঈদ খোকন। হাত-পা লেগে যাওয়ায় মঞ্চ থেকে নেমে সিঁড়ির সঙ্গেই দাঁড়াই। নেতাকর্মীরাও অনেকেই দাঁড়িয়ে। মঞ্চের নিচে থেকে উঠে এসে কিছু কর্মী নিয়ে আইভী রহমানও আমাদের পাশে এসে দাঁড়ালেন। নেত্রী (শেখ হাসিনা) বক্তব্য শেষ করে জয়বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু বলবেন ঠিক এরইমধ্যে চারিদিক থেকে একের পর এক গ্রেনেড হামলা শুরু হলো। বিকট শুব্দ। একের পর এক শব্দে আমি মাটিতে লুটিয়ে পরি। আইভী রহমানসহ, নেত্রীর দেহরক্ষী মাহবুব, সেন্টু, আদা চাচা অনেকেই মারাত্মক আহন হন। পরে তারা মারাও যান। কিভাবে বেঁচেছি, জানি না। তবে এটুকু বলব ভাগ্য ও উপরওয়ালার বিশেষ সহানুভূতিতেই বেঁচে যাই। মঞ্চে যারা ছিলেন তাদের মধ্যে মেয়র হানিফ, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ভাইসহ অনেকেই মানবঢাল তৈরি করে নেত্রীকে রক্ষা করেছেন। তারা আহত হয়েছিলেন। তিনি বলেন, আমি তখন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ছিলাম। আমি শুনেছি, এই ঘটনায় যদি আহত না হতাম, তাহলে আমাকেই ১ নম্বর আসামি করত।

ভয়াল একুশে আগস্ট সম্পর্কে একজন প্রত্যক্ষদর্শী ও ভিকটিম হিসেবে ভোরের কাগজের কাছে ঐদিনের স্মৃতিচারণ করেন তৎকালীন আওয়ামী স্বেচ্ছাসবক লীগের সভাপতি বর্তমানে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। নিজের বেঁচে যাওয়া, ঘটনার আগে ও পরের বর্ণনা এবং পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, শেখ হাসিনাকে হত্যা ও আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করতে অস্থায়ী মঞ্চ লক্ষ্য করেই গ্রেনেড ছোড়া হয়। মহান আল্লাহর অশেষ কৃপায় জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রাণে বেঁচে যান। সব গ্রেনেড বিস্ফোরিত হলে আমরা কেউই বাঁচতাম না। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত সরকারের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় শাসন ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতেই এই ঘটনা ঘটানো হয়। তিনি বলেন, যখন বোমা হামলা থামল। চারিদিকে গগনবিদারী কান্না, চিৎকার-চেঁচামেচি। ঠিক সেসময় শুরু হয় গুলি ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ। নিজেও গ্রেনেডের আঘাতে জ্ঞান হারিয়ে রাস্তায় পড়েছিলাম। গ্রেনেড, গুলি আর টিয়ারশেলের শব্দে আবার জ্ঞান ফিরে পাই। তখন মনে হচ্ছিল আর বাঁচব না। অসংখ্য নারী-পুরুষ মাটিতে পড়ে কাতরাচ্ছে। আল্লাহ বাঁচাও, মারে-বাবারে করে চিৎকার করছে। চারদিকে রক্তের ছড়াছড়ি। সবার কান্নায় আকাশ ভারি হয়ে গেছে। কি যে একটা পরিস্থিতি- বলার ভাষা নেই।

জ্ঞান ফিরে নেত্রী বেঁচে আছেন কি না সেটা মাথায় ঘুরছিল। আমরা নেত্রীকে খুঁজছিলাম। এ অবস্থায় দেখি নেত্রীকে নিয়ে কয়েকজন নেতা গাড়িতে তুলে দেন। গ্রেনেডের স্প্রিন্টার বা বুলেটের আঘাতে নেত্রীর গাড়ির একটি চাকা ফুটো হয়েছিল। ফলে তার গাড়ি হেলেদুলে ধীরে ধীরে চলছিল। নেত্রী সামনের আসনে বসা। তখন এটুকু শান্তি পাই- নেত্রী বেঁচে আছেন। মাটি থেকে ওঠার শক্তি পাচ্ছিলাম না। মহিলা আওয়ামী লীগের কয়েকজন আমাকে উদ্ধার করে পাশের একটি দোকানে নিয়ে গেল। তখনো গুলি ও টিয়ারশেল চলছিল। আমাদের নেতাকর্মীরাও প্রতিবাদে মিছিল করছিল। তারা আহত-নিহতদের উদ্ধারও করছিল। তারপরও পুলিশ এগিয়ে আসেনি।

পুলিশ ও প্রশাসনের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকার কথা জানিয়ে বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, সেদিন পুলিশের ভূমিকা শুরু থেকেই সন্তোষজনক ছিল না। নেত্রীর অন্যান্য জনসভা বা সমাবেশে পুলিশ প্রটেকশন থাকলেও, সেদিন তাদের তৎপরতা দেখা যায়নি। আশপাশের ভবনগুলোতে পুলিশের যে পাহারার কথা ছিল, সেটাও ছিল না। উল্টো গ্রেনেড হামলার পাশাপাশি পুলিশের লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল নিক্ষেপ এবং গুলিবর্ষণ দেখেছি। হামলাকারীরা সেই সুযোগে পালিয়ে যায়। আমাদের ধারণার মধ্যেও ছিল না, এরকম একটি ঘটনা বাংলাদেশে ঘটতে পারে।

নিজের সম্পর্কে নাছিম বলেন, স্বেচ্ছাসেবক লীগ আর কৃষক লীগের কয়েকজন মিলে যখন আমাকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাচ্ছিলেন। আমার কিছুটা সেন্স ছিল। দোয়েল চত্বরে আসার পর আমি তাদেরকে আমার বাসার পাশেই বাংলাদেশ মেডিকেলে ভর্তি করাতে বলি। ঢাকা মেডিকেলে নিলে আমি হয়তো বাঁচতাম না। যাই হোক বাংলাদেশ মেডিকেলে ভর্তি হই। তিনদিন অজ্ঞান অবস্থায় আইসিইউতে রাখা হয়েছিল। সেখান থেকেও আমাকে বের করে দিতে ডাক্তারদের টেলিফোনে হুমকি দেয়া হয়েছিল। কিছুটা সুস্থ হলে ১০ থেকে ১২ দিন পর নেত্রীর (শেখ হাসিনা) নির্দেশে দেশের বাইরে চিকিৎসা নিতে যাই। সেখানেও পুলিশ বাঁধা দিয়েছিল। সিআইডির তদন্ত অফিসার রুহুল আমিন আমাকে বলেছিল, আপনি কেন চিকিৎসার জন্য ইন্ডিয়ায় যাবেন? আমি বলেছি, রোগী কোথায় চিকিৎসা নেবে সেটা তার ব্যাপার। আমি কোথায় চিকিৎসা নেব, সেই জবাব কি আপনার কাছে দিতে হবে? তিনি বলেন, এই হামলায় একজন ভিকটিম হিসেবে থানায় একটা মামলা বা জিডি করতে গিয়েছিলাম, সেটাও নেয়া হয়নি।

পিআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়