চূড়ান্ত বিচারের অপেক্ষা

আগের সংবাদ

সিরিজ বাঁচাতে নামছে পাকিস্তান

পরের সংবাদ

হাসিনা-শ্রিংলা বৈঠক নিয়ে কৌতূহল

কী বার্তা দিল দিল্লি

প্রকাশিত: আগস্ট ২১, ২০২০ , ৯:২২ পূর্বাহ্ণ আপডেট: আগস্ট ২১, ২০২০ , ১০:৪৭ পূর্বাহ্ণ

করোনা ভাইরাস মহামারির মধ্যে ঢাকায় ২ দিনের আকস্মিক সফরে এসে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বার্তা দিয়েছেন বলে বলা হচ্ছে। কিন্তু ওই বার্তার ব্যাপারে সুস্পষ্ট কিছু বলা হচ্ছে না। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, ঢাকাকে কী বার্তা দিল দিল্লি? এছাড়াও হাসিনা-শ্রিংলা বৈঠকের পর যে রোডম্যাপ বা প্যাকেজের কথা বলা হচ্ছে, সেটাই বা কী তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রসঙ্গত, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের কথা বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে স্বীকারই করা হয়নি। আর ভারতের পক্ষ থেকে বৈঠকের কথা বলা হলেও আলোচনার বিষয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট কিছু জানানো হয়নি। হাসিনা-শ্রিংলা বৈঠকের বিষয় নিয়ে এত গোপনীয়তা কেন, এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন ভোরের কাগজকে বলেন, আমি ঠিক জানি না, কেন এত গোপনীয়তা। হয়ত পুরনো কোনো ইস্যু ছিল।

বিভিন্ন সূত্রের দাবি, বাংলাদেশ যেভাবে চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ছে, তাতে ভারত ও বাংলাদেশের উভয়েরই ক্ষতি হচ্ছে। এই ক্ষতির মুখ থেকে বাংলাদেশকে ফিরিয়ে আনার বিষয়টাই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে শেখ হাসিনাকে জানিয়ে গেছেন হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা। বিষয়গুলো এতই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যার কারণে বৈঠকের কথা কাউকে জানানো হয়নি। কারণ এসব বিষয় আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হলে, যে রোডম্যাপ বা প্যাকেজের কথা বলা হচ্ছে, সে অনুযায়ী কাজ করা যাবে না। এসব কারণে হাসিনা-শ্রিংলার বৈঠকে কঠোর গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়। সব মিলিয়ে পুরো বিষয়টি শেখ হাসিনা নিজেই দেখভাল করছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, বৈঠকের ধরনটি ছিল নরেন্দ্র মোদি ‘স্টাইলে’। নরেন্দ্র মোদি নিজে যে কাজগুলো করেন, তার বিন্দুবিসর্গ গণমাধ্যমকে জানান না। গণমাধ্যম তাদের মতো করে বিষয়গুলো বের করে আনে। ঠিক সেভাবেই হাসিনা-শ্রিংলা বৈঠক হয়েছে। কাউকে কিছু জানানো হয়নি। এমনকি ওই বৈঠকে ওরা দুজন ছাড়া অন্য কেউ ছিলেনও না। এখানেও গণমাধ্যম তাদের মতো করে খবর বের করার চেষ্টা করছে।

নানা সূত্র বলেছে, সম্পর্ক সুদৃঢ় করা কিংবা ভারতে উৎপাদিত ভ্যাকসিন বাংলাদেশে দেয়া, আটকে থাকা প্রকল্পগুলো পুনরায় চালুর বিষয়ে আলোচনার জন্য শ্রিংলার মতো একজন অভিজ্ঞ কূটনীতিককে নরেন্দ্র মোদি ঢাকায় পাঠাননি। শ্রিংলাকে ঢাকায় পাঠানোর আগে মোদি-হাসিনা কথা হয়েছে। ওই কথার সূত্রেই বৈঠকের আদ্যোপান্ত ঠিক হয়েছে। বৈঠকে কোভিড পরবর্তী সময়ে চীন বাংলাদেশে কী করতে চায় এবং এতে বাংলাদেশের কতটুকু লাভ বা ক্ষতি হবে এবং চীনকে বাইরে রেখে বাংলাদেশ-ভারত কতটুকু লাভবান হবে, সেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং আগামী ২ বছর কিভাবে বাংলাদেশ-ভারতের পথচলা হবে, তারও রোডম্যাপ তৈরি হয়েছে।

ওই সূত্রের মতে, হাসিনা-শ্রিংলা বৈঠকে মূলত যেসব বিষয়ে জোর দেয়া হয় তার মধ্যে একটি হচ্ছে যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে চীনে ব্যবসারত বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সেখান থেকে সরিয়ে অন্য কোনো দেশে প্রতিস্থাপিত হতে পারে। বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভারতেও স্থানান্তরিত হতে পারে। সেক্ষেত্রে ওইসব কোম্পানির বাজারের আওতায় বাংলাদেশকেও অন্তর্ভুক্ত করতে চায় ভারত। পাশাপাশি, বিনিয়োগের নামে পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় ঢুকে চীন প্রকৃতপক্ষে কী কী করছে, তারও বিশ্লেষণ করা হয় ওই বৈঠকে। এক্ষেত্রে বিনিয়োগের নামে চীন বাংলাদেশে ঢুকে কী কী করতে পারে, তারও সম্ভাব্য একটি গতিপথ শ্রিংলা হাসিনাকে দিয়েছেন। ভারত এই মুহূর্তে পাকিস্তানের সঙ্গে কিভাবে সম্পর্ক ধরে রাখছে, তাও বর্ণনা করা হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন শ্রিংলার সফরের ব্যাপারে জানেন না বললেও, বিষয়টি সঠিক নয়। তিস্তার উৎস মুখে যদি চীন বাঁধ দেয় তাহলে ভারত-বাংলাদেশ উভয়ের ক্ষতি হবে। সব মিলিয়ে ওই বৈঠকের মাধ্যমে একটি রোডম্যাপ বা প্যাকেজ বাংলাদেশের সামনে হাজির করে দিয়েছে ভারত, এখন সিদ্ধান্ত নেবে বাংলাদেশ।

এদিক, ভারতে চীনের ব্যবসা আপাতত সুফল বয়ে আনছে না। এক্ষেত্রে চীন চাইছে, তারা বিভিন্ন পণ্য বাংলাদেশে উৎপাদন করে ভারতের বাজারে নিয়ে যাবে। কিন্তু ভারত এখানে আপত্তি জানিয়ে বলেছে, বাংলাদেশে যদি চীন তাদের পণ্য উৎপাদন করে তাতে বাংলাদেশের কী লাভ হবে? এক্ষেত্রে বাংলাদেশ বলছে, চীন বাংলাদেশে তাদের পণ্য উৎপাদন করলে বাংলাদেশ শ্রমিক সরবরাহ করবে এবং তা থেকে বহু মানুষ সুফল পাবে। এছাড়া রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলাদেশের ট্যাক্স বাড়বে। কিন্তু ভারত তা খারিজ করে দিয়ে বলেছে, চীন মূলত বাংলাদেশের বাজারটাই দখলে নেয়ার কথা ভাবছে, উপকার করার কথা নয়।

জানতে চাইলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক রওনক জাহান সাংবাদিকদের বলেছেন, বড় দেশ হিসেবে ভারত প্রতিবেশী ছোট দেশগুলোর সমর্থন তাদের পেছনে আছে বলে এক রকম ধরেই নিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ গত কয়েক বছরে ভারতের বিভিন্ন নীতির কারণে অনেক ক্ষুব্ধ। তিনি বলেন, তিস্তা চুক্তি, রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশ ভারতের কাছে কাক্সিক্ষত সমর্থন পায়নি। তারপরেও প্রতিবেশীদের মধ্যে ভারতের সবচেয়ে ভাল বন্ধু যদি কেউ থাকে, সেটা হলো বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ কখনই আগ বাড়িয়ে এমন কোনো পদক্ষেপ নেবে না যেখানে ভারতের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক খারাপ হয়। কিন্তু তার মানে এই নয়, বাংলাদেশ যদি নিজের স্বার্থে কখনো মনে করে, চীনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক উন্নয়ন করতে হবে, সেটা তারা করতে পারবে না। ভারতের আচরণের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে চীন একটা জায়গা করে নিচ্ছে। এই অঞ্চলে নেপাল-শ্রীলংকাও চীনের দিকে ঝুঁঁকে পড়েছে বলে তিনি মনে করছেন। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ঘাটতির বিষয়টা হয়ত ভারত এখন অনুধাবন করছে। সেজন্য ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের শীতলতা হয়তো কাটানোর চেষ্টা করছে।

এদিকে, বিশ্লেষকরা বলেছেন, বাংলাদেশে চীন এবং পাকিস্তান একটা সুযোগ তৈরি করে নিতে চায়। এ কারণেই ভারত শঙ্কিত হয়ে পড়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান চীনা স্বার্থের পটভূমিতে শঙ্কিত হয়ে ঢাকায় ছুটে গেছেন। শ্রিংলা তার পক্ষে যতটা সম্ভব এটা সারিয়ে তোলার জন্য চেষ্টা করেছেন। তিনি হয়ত বাংলাদেশের চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ার বিষয়টি সামাল দেয়ার চেষ্টা করে গেছেন।

এদিকে, ভারতের পররাষ্ট্রসচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলার আকস্মিক ঢাকা সফরের খবর ভারতের গণমাধ্যমে গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ হয়েছে। এতে বলা হয়, ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ দুটির মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় অবকাঠামো প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছেন। প্রকল্প দেখভালের জন্যে বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিবকে প্রধান করে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি দ্রুত গঠন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এতে আরো বলা হয়, দ্বিপক্ষীয় প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের জন্যে প্রতিবেশী দেশ দুটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে জয়েন্ট কনসালটেটিভ কমিশনের বৈঠক আয়োজনের বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এছাড়াও, আলোচনায় আখাউড়া ও আগরতলার মধ্যে রেল সংযোগ, ১৩২০ মেগাওয়াটের খুলনা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্যান্য প্রকল্পগুলো আগামী বছর উদ্বোধন করার বিষয়ে আশা প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশ-ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছরপূর্তি ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকীর চলমান কর্মসূচিকে সামনে রেখে প্রকল্পগুলো উদ্বোধন করার সম্ভাবনার কথা আলোচিত হয় একই বৈঠকে।

পিআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়