চির বিদায়ের তিন বছর

আগের সংবাদ

গ্রেনেড বিস্ফোরণে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি

পরের সংবাদ

আমি ভেবেছিলাম নেত্রী হয়তো নেই

প্রকাশিত: আগস্ট ২১, ২০২০ , ১১:৪৯ পূর্বাহ্ণ আপডেট: আগস্ট ২১, ২০২০ , ৪:৩৫ অপরাহ্ণ

ঘটনার দিন সকাল থেকেই আমরা বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে ছিলাম। সাংবাদিকরাও ছিলেন। বিকেলে সমাবেশ। অন্যদিন সমাবেশস্থল ও আশপাশের ভবনে পুলিশ পাহারা থাকে। আমাদের জিজ্ঞেসও করে কোনো সমস্যা আছে কি না। কিন্তু ঐদিন কোনো পুলিশ নেই। সন্দেহ আরো গভীর হয়, উদ্বেগ বাড়ে। প্রশ্ন জাগে, সমাবেশকে ঘিরে তাদের পরিকল্পনা কী? হঠাৎ একজন এসে জানাল পীর ইয়ামেনী মার্কেটে কিছু লোক রহস্যজনকভাবে ঘোরাঘুরি করছে। সুধাসদন থেকে খবর পেলাম নেত্রী রওনা দিচ্ছেন। যুবলীগের প্রায় হাজারখানেক নেতাকর্মী ওসমানী মিলনায়তন থেকে নেত্রীর গাড়ি স্কট করে সমাবেশে নিয়ে আসি।

ধানমন্ডির নিজ অফিসে বসে গত মঙ্গলবার ভয়াল একুশে আগস্টের মর্মান্তিক ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে নিজের দেখা সেদিনের বিবরণ এভাবেই ভোরের কাগজের কাছে তুলে ধরেন আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য এডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক।

নানক বলেন, সমাবেশ শেষে মিছিল হবে। নেত্রীকে নিয়ে সমাবেশে ঢুকতেই কাটা তারের বেড়া ছিল। নেত্রীর গাড়ি ঢোকার পর আমরা আর ভেতরে গেলাম না, কারণ সেখানে জায়গা ছিল না। আমরা মিছিলের প্রস্তুতি নিচ্ছি। দাঁড়িয়ে বক্তৃতা শুনছি। নেত্রীর বক্তৃতা শেষ পর্যায়ে। হঠাৎ মঞ্চ ঘিরে শুরু হলো একের পর এক গ্রেনেড বিস্ফোরণ। সবকিছু তছনছ হয়ে গেল। প্রথম ভেবেছিলাম নেত্রী বোধহয় নেই। চারিদিকে মানুষের চিৎকার-আহাজারি, বাঁচাও..মাগো, বাবাগো..চিৎকার। এমন সময় দেখলাম নেত্রীর বিশেষ সহকারী আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিমকে। তাকে দেখে চিৎকার করে জিজ্ঞেস করলাম, নাসিম, নেত্রীর অবস্থা কী? সে বলল, নেত্রী নিরাপদে বের হয়ে সুধাসদনের দিকে গেছেন। যুবলীগের কিছু নেতাকর্মী আমি ও আজমকে খদ্দের মার্কেটের ভেতরে নিয়ে কেচি গেট আটকে দিল।

আধা ঘণ্টার মধ্যেই বের হয়েই আমরা দ্রুত সুধাসদনে ছুটলাম নেত্রীর কাছে। মির্জা আজম নিচের ওয়াসরুমে ঢুকেছেন। আমি ঢুকে দেখি নেত্রী সোফায় বসা আর সোফার হাতলে বসে নেত্রীর গলা জড়িয়ে ধরে কান্না করছেন ছোট আপা (শেখ রেহানা)। কারণ নেত্রী বেঁচে ফেরত এসেছেন। নেত্রী কিংকর্তব্যবিমূঢ়, কোনো কথা বলছেন না। একেবারেই নীরব। আমাকে দেখে নেত্রী দ্রুত বললেন, আজম কোথায়? উনি ভেবেছেন আজম বোধহয় মারা গেছে। আমি বললাম আপা..আজম নিচে আছে, আসতেছে। ঘটনাস্থলের বিস্তারিত নেত্রীকে জানালাম। এরইমধ্যে নেত্রীর নিরাপত্তায় পুরো সুধাসদন কর্ডন করে রেখেছে আমাদের নেতাকর্মীরা। আমি আপাকে বললাম…ওদের (বিএনপি-জামায়াত) আর ছাড়ব না। ক্ষমতায় থাকতে দেব না। অনির্দিষ্টকালের হরতাল দিয়ে সব কলাপস করে দিব। রক্তের বদলা নেবই। ওদের পতন না ঘটা পর্যন্ত হরতাল চলবে। যেখানে যার বাড়িঘর আছে, সব জ্বালিয়ে দেব।

নেত্রী তখন বললেন…আমি রাজনীতি করি মানুষের জন্য। আগে আমার মানুষকে বাঁচাও। হরতাল হলে তারা চলাচল করতে পারবে না। রাজনীতি পরে। তিনি কেঁদে কেঁদে বললেন ‘আমার জন্য আর কত মানুষ জীবন দিবে’? ওদের বাঁচাও। আমার আর রেহানার সব গহনা বিক্রি করে হলেও ওদের চিকিৎসার ব্যবস্থা কর। তিনি আমাদের ডাক্তারদের নিয়ে তিনটি চিকিৎসক টিম করে হাসপাতালে নামিয়ে দিতে বললেন। কারণ ড্যাবের ডাক্তাররা সরে গেছে, আহতদের কোনো চিকিৎসা তারা দেবে না।

জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, সেদিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ফেনীতে ছিলেন। সেখান থেকে তিনি খোঁজ নিচ্ছিলেন গুলিস্তানের কী খবর। কারণ তার নির্দেশেই এই হামলা করা হয়েছিল। কারণ ঘটনাগুলো ছিল পরিকল্পিত।

নানক বলেন, মধ্যরাতে নেত্রী সুধাসদনে আমাদের ডেকে পরদিন বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে যেতে বললেন। সবকিছু সংরক্ষণের নির্দেশ দিলেন। সকাল ৮টায় পার্টি অফিসের গেলাম। মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়াও এলেন। আমরা পার্টি অফিসে ঢুকতে গেলে পুলিশ বাধা দেয়। আমি চিৎকার করে বললাম, আমাদের অফিসে আমরা যাব, কালকে তোমরা মারছ পাইকারিভাবে। আজকে অফিসে যাব, সেখানে যাইতে দিবা না? আমরা যাবই…বাধা দিলে মেরেই ফেলব। ওয়াকিটকিতে কথা বলার পর আমাদের ভেতরে যেতে দিল। চারিদিকে ছোপ ছোপ রক্ত, তখনো শুকায়নি। হাতের আঙুল, নখ, কাঁচা গোস্ত, হাজার হাজার জুতা পরে আছে। লাল ব্যানার ছিঁড়ে লাঠিতে বেঁধে ট্রাকসহ পুরো এলাকা আমরা ঘিরে রাখলাম। গ্রেনেডের চিহ্নিত জায়গাগুলোতে লাল পতাকা টানিয়ে দিলাম। একজন আর্মি অফিসার আর বিচারপতি জয়নুল আবেদীন এসে আমাদের দেখে বিরক্তবোধ করছিলেন। ওইদিন রাতেই (২২ আগস্ট) সিটি করপোরেশনের গাড়ি সব আলামত ধুয়ে ফেলল। ট্রাকটা নিয়ে গেল। কোনো আলামত রাখল না।

পিআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়