নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় প্লাবিত হচ্ছে সুনামগঞ্জ

আগের সংবাদ

২৭ আগস্ট থেকে চালু হচ্ছে আরো ১৮ জোড়া ট্রেন

পরের সংবাদ

হাঁটুব্যথা: কারণ ও চিকিৎসা পদ্ধতি

ডা. মোহাম্মদ আহাদ হোসেন

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ২০, ২০২০ , ৪:১৩ অপরাহ্ণ

হাঁটু ব্যথা শুধু আমাদের দেশেই না সারা পৃথিবীতে অনেক মানুষ এই সমস্যার ভুক্তভুগী। আমাদের প্রত্যেকের ঘরে আমাদের বৃদ্ধ বাবা, মা, দাদা, দাদী, নানা। নানী ও অন্যান্য কারো না কারো এই সমস্যা থাকতেই পারে। তাই আজকের লেখাটি এই বিষয় নিয়ে লেখার চেষ্টা করব।

হাঁটু আমাদের শরীরের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জয়েন্ট। আমাদের পুরো শরীরের উপরিভাগের ওজন অভিকর্ষের টানে মাটিতে স্থানান্তরের একমাত্র মাধ্যম এই দুই হাঁটু।এর সাথে যদি মাথায় বা কাঁধে কোন বোঝা নেয়া হয় তাও এর সাথে যুক্ত হয়। এ কারণে হাঁটু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ। এ কারণে শরীরের সব থেকে শক্তিশালী জয়েন্ট হিসেবে এর দুটি অংশ রয়ে গেছে। আমাদের শরীরের যে কোনো অংশে ব্যথার জন্য চারটি বিষয় জড়িত। মাংশপেশি, লিগামেন্টস, হাড় ও স্নায়ুতে ইনজুরি বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। এখানেও এর ব্যাতিক্রম নয়। শরীরের সব থেকে বড় দুটি হাড় বেশ কিছু মাংসপেশি ও লিগামেন্টস এই শক্তিশালী জয়েন্টকে নিয়ন্ত্রণ করে। লিগামেন্টসগুলোর মধ্যে কিছু ভেতরের দিকে কিছু বাইরের দিকে থাকে।

হাঁটু ব্যথার কারণ কি?
আঘাত: আঘাত হাঁটু ব্যথার অন্যতম একটি কারণ। যে কোনো বয়েসেই আঘাতজনিত ব্যথা হতে পারে। আঘাতের মাধ্যমে হাঁটু নিয়ন্ত্রণকারী মাংসপেশি, লিগামেন্টস, হাড় ও স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যে সকল কারণে আঘাতজনিত কারণে হাঁটু ব্যথা হতে পারে।
১. একসিডেন্ট: মোটরযান বা অন্যান্য যানবাহন একসিডেন্ট আমাদের দেশে হাঁটুসহ অন্যান্য ব্যথার কারণ। কোনো কোনো সময় এটা তাৎক্ষণিক বোঝা না গেলেও পরে ব্যথা অনুভূত হয়।
২. অস্বাভাবিক ভার বহন করা: কুলি ও মজুরেরা যদি অস্বাভাবিক ওজন বহন করে সেক্ষেত্রেও হাঁটুর উপর চাপ পড়ে ভেতরের বা বাইরের লিগামেন্টস ক্ষতিগ্রস্ত।
৩. অনিয়ন্ত্রিত এক্সারসাইজ: যে সব এক্সারসাইজ হাঁটুর সঙ্গে সম্পৃক্ত সে সব ক্ষেত্রে অনিয়ন্ত্রিত এক্সারসাইজজনিত অতিরিক্ত চাপে ছোট মাংসপেশি বা লিগামেন্টস ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ব্যথা হতে পারে।
৪. যারা খেলাধুলা করেন তাদের ক্ষেত্রে হাঁটুর ভেতরে ক্রুশিয়েট লিগামেন্ট থাকে সেটা ইনজুরি হতে পারে। এতে সঠিক ভাবে দাঁড়ানো যায় না ও সিঁড়িতে ওঠা যায় না। দাঁড়াতে বা সিঁড়িতে ওঠার সময় এই লিগামেন্টসগুলো লক করার কাজ করে।
৫. ছোট খাটো ইনজুরি অবজ্ঞা করার কারণে অনেক সময় তা হাঁটুতে ক্রনিক ব্যথার কারণ হতে পারে। যেহেতু এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জয়েন্টস তাই অবজ্ঞা করা ঠিক না।

হাঁটতে গিয়ে ব্যথায় ককিয়ে ওঠা

হাঁটুর বিভিন্ন রোগ যাতে হাঁটুর ব্যথা হয়:
১. ওস্টিও আরথ্রাইটিস
২. রিউম্যটয়েড আরথ্রাইটিস
৩. বাত
৪. জয়েন্টে ইনফেকশন

অস্টিও আরথ্রাইটিস:
হাঁটু ব্যথার একটি খুব সাধারণ একটি কারণ। মাঝ বয়েসী থেকে শুরু করে অধিক বয়স্ক ব্যক্তিদের মাঝে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। বিভিন্ন কারণে এই রোগ হতে পারে।
কারণগুলোর মধ্যে এক নম্বর হলো জেনেটিক বিষয়। সাধারণত এটা জন্মগতভাবেই পেয়ে থাকেন বাবা-মায়ের কাছ থেকে। আর যাঁরা বিভিন্ন মেকানিক্যাল কাজ বেশি করেন, যেমন, ড্রিল মেশিন চালান, কাঠ কাটেন, করাতের কাজ করেন, ভারী জিনিস তোলেন এই ধরনের কারণে জয়েন্টগুলো একটু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তা ছাড়া যাঁরা খেলাধুলা করেন তাঁদেরও অন্যান্য মানুষের থেকে অস্টিও আরথ্রাইটিসের আশঙ্কা বেশি।

এরপর নারীর ৪৫ বছর পর, মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর, মেনোপোজ হয়ে যাওয়ার পর, অস্টিও আরথ্রাইটিসের আশঙ্কা থাকে। পুরুষের চেয়ে নারীর অস্টিও আরথ্রাইটিস হওয়ার আশঙ্কা বেশি। ধূমপান যাঁরা করেন, তাঁদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। যাঁদের ওজন বেশি, তাঁদেরও অস্টিও আরথ্রাইটিস হওয়ার প্রবণতা বেশি। আবার জন্মগত কতগুলো হাঁড়ের রোগ আছে তাদেরও অস্টিও আরথ্রাইটিস হতে পারে। এসব হাড়ের রোগের জন্য ১০ বছর বয়সেই এই রোগ কারো কারো ক্ষেত্রে হতে পারে।

অস্টিও আরথ্রাইটিস রোগে মূলত হাঁটুর মধ্যে যে দুটি হাড় সংযুক্ত থাকে তাদের মধ্যেকার দূরত্ব কমে যায় এবং দুটি হাড়ের মাথায় আরটিকুলার কারটিলেজ নামে এক ধরনের পদার্থ থাকে যা হাড়কে পিচ্ছিল করে ও জয়েন্টের মধ্যে ফ্রি মুভমেন্টে সাহায্য করে সেটি ক্ষয় হয় বা নষ্ট হয়। এতে তাদের মধ্যে ঘর্ষণ হয় এবং ব্যথা নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ু সক্রিয় হয়ে ব্যথা করে।
অস্টিও আরথ্রাইটিস থেকে বেচে থাকার উপায় কি?

আক্রান্ত হওয়ার আগে ওজন কমানো, ধূমপান বন্ধ করতে হবে। এরপর হাড়ের ঘনত্ব যেন ঠিক থাকে এ জন্য ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি এগুলো ঠিকমতো খেতে হবে। নিয়মিত হাঁটুর ব্যায়াম করা। খাদ্যভ্যাস সঠিক রাখা। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা। সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় না করেই বার বার জয়েন্টের ভেতর বাহির থেকে ইনজেকশন নেয়ার কারণেও হাঁটু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যেসব জয়েন্ট আক্রান্ত হয়, যেসব জয়েন্টের জন্য ফিজিওথেরাপি, বিভিন্ন অকুপেশনাল থেরাপি আছে সেই সাহায্যকারী থেরাপিগুলো দিলে জয়েন্টগুলো ধীরে ধীরে কর্মক্ষম হয়ে যায়। ভালোর দিকে থাকে। ব্যক্তির কাজ যদি ওজন তোলা বা মেকানিক্যাল কঠিন কাজ হয়- এগুলো সাধারণত অস্টিও আরথ্রাইটিস হতে সাহায্য করে। প্রয়োজন হলে তাকে পেশা পরিবর্তন করতে হবে। তবে লেখাপড়া, সাধারণ ঘরের কাজ এসব করলে কোনো সমস্যা নেই।

হাঁটুব্যথায় ব্যায়াম উপকারী

রিউম্যাটয়েড আরথ্রাইটিস ও গাউট:
রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস একটি ক্রনিক ইনফ্লামেটোরি (জ্বালাপোড়া) ব্যধি যা হাত ও পায়ের ক্ষুদ্রাকারের অস্থিসন্ধির (জয়েন্ট) ক্ষতি করে থাকে। অস্টিও আর্থ্রাইটিসের ক্ষেত্রে অস্থিসন্ধির তরুণাস্থি ক্ষয় হতে থাকে এবং নষ্ট হয়ে যায়।

অপরদিকে, রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিসের ক্ষেত্রে হাড়ের সংযোগস্থলের আস্তরণের ক্ষতি হয় ও ব্যথা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাড় ফুলে যায়। যার ফলে হাড় ক্ষয় হতে শুরু করে ও হাড়ের গঠনে বিকৃতি দেখা দেয়। রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস একটি অটোইমিউন ডিসঅর্ডার (Autoimmune Disorder), কারণ এই রোগের ফলে প্রতিরোধকারী কোষগুলো ভুলক্রমে শরীরের টিস্যুগুলোকে আক্রমণ করে থাকে। হাড়ের সংযোগস্থল ছাড়াও এ রোগ দেহের অন্যান্য অঙ্গ যেমন ত্বক, চোখ, ফুসফুস ও রক্তনালীরও ক্ষতি করে থাকে। রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস যে কোনো বয়সেই হতে পারে। তবে এটি ৪০ বছর বয়সের পর বেশি হয়। নারীরা এই রোগে বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে। চিকিৎসার সাহায্যে এ রোগের লক্ষণগুলো নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং হাড়ের সংযোগস্থল নষ্ট হওয়া প্রতিরোধ করা যায়।

এছাড়াও গাউট নামের আরেকটি অবস্থা হয়ে হাঁটু তে ব্যথা হতে পারে। অস্থি সন্ধিতে ইউরিক অ্যাসিড জমা হয়ে এই রোগের উৎপত্তি হয়। মূত্রের মাধ্যমে প্রয়োজনের অধিক পরিমাণ ইউরিক অ্যাসিড আমাদের শরীর থেকে বের হয়ে যায়। কোন কারণে যদি আমাদের যকৃৎ অধিক পরিমাণে ইউরিক অ্যাসিড তৈরি করে তখন রক্তে এর পরিমাণ বেড়ে যায়। আবার খাবারের মাধ্যমে যেমন লাল মাংশ, ক্রিম ও রেড ওয়াইন ইতাদি গ্রহণের মাধ্যমেও এটি রক্তে বেড়ে যায় আর কিডনি যদি তা অধিক পরিমাণে ফিল্টার করতে না পারে এক্ষেত্রে ইউরিক অ্যাসিড শরীরে বেড়ে যায়।

সময়ের সঙ্গে ইউরিক অ্যাসিড অস্থিসন্ধিতে ক্রিস্টাল রূপে জমা হতে থাকে। এতে ধীরে ধীরে জয়েন্ট ফুলে যায়, প্রদাহ হয় ও ব্যথা হয়। আর সেই সঙ্গে অস্থিসন্ধি ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে যায়। স্বাভাবিক মুভমেন্ট বাধাগ্রস্ত হয়। গাউট সাধারণত হাত ও পায়ের আংগুলের ছোট জয়েন্টস থেকে শুরু করে হাতের কব্জি, হাঁটু ও টাকনু গিড়া আক্রান্ত হয়।

নিয়মিত ব্যায়াম, কিছু খাবার (লাল মাংস, ক্রিম, লিভার, কমল পানীয়, এলকোহল, সামুদ্রিক মাছ) এ সতর্কতা ও চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী ওষুধ সেবন এই রোগ থেকে আমাদের নিরাপদ রাখতে পারে।

হাঁটতে গিয়ে হঠাৎ ব্যথা

হাঁটু ব্যথায় ব্যায়াম:
ব্যায়ামের মাধ্যমে জয়েন্টে রক্ত চলাচল বাড়ে এবং জয়েন্ট নিয়ন্ত্রণকারী মাংস পেশী, লিগামেন্টস, স্নায়ু নিউট্রিশন পায় ও কর্মক্ষমতা বাড়ে। যে কারণে ব্যথা কমে যায়। ব্যায়ামের মাধ্যমে জয়েন্টসের মুভমেন্টের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় ও আমরা স্বাচ্ছন্দে সব কাজ করতে পারি। ব্যায়ামের মাধ্যমে শরীরের মধ্যে এনডরফিন নামক পদার্থ নিঃসরণ বাড়ে যা আমাদের ব্যথা কমাতে সক্রিয় থাকে। হাঁটু ব্যথায় ব্যায়াম অত্যন্ত কার্যকরী। তবে খেয়াল রাখতে হবে ব্যথা অবস্থায় ব্যায়ম করা যাবে না। আর এমন ধরনের ব্যায়াম করা যবে না যাতে আমাদের হাঁটু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। নিচে হাঁটুর কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যায়াম দেয়া হলো:

১. স্ট্রেইট লেগ রাইজ্র: ফ্লোরে শুয়ে আপনার এক পা সোজা করে উপরে উঠান এবং পায়ের পাতা উপরের দিকে বাকা করুন। এভাবে ১০ সেকেন্ড ধরে রাখুন। এতে আপনার হ্যমেস্ট্রিংমাসল শক্তিশালী হবে। এভাবে প্রক্রিয়া টি উভয় পায়ে ৫-১০ বার করুন।
২. হ্যমেওস্ট্রিং কারল: চেয়ারের পেছনে দাঁড়ান। চেয়ারে হাত রাখুন। এক পায়ের উপর দাঁড়িয়ে আরেক পায়ের হাঁটু পেছনের দিকে ভাঁজ করুন। ধীরে ধীরে পা বাটক বরাবর যতদূর পর্যন্ত আনা যায় অনুন এবং ধরে রাখুন ৫-১০ সেকেন্ড। প্রক্রিয়াটি উভয় পায়ে ৫-১০ বার করুন।
৩. প্রন স্ট্রেইট লেগ রাইজ: ফ্লোরে উপুর হয়ে শুয়ে পড়ুন। এবার যে কোনো এক পা হাঁটু ভাজ না করে সোজা করে উপরের দিকে উঠান যতটুকু পারেন। পায়ের পাতা নিচের দিকে সোজা রাখুন। এভাবে ধরে রাখুন ৩-৫ সেকেন্ড। প্রক্রিয়াটি উভয় পায়ে ৩-৫ বার করুন।
৪. ওয়াল স্কোয়াট: আপনার শরীরের পেছনের অংশ দিয়ে দেয়াল ঘেঁষে দাড়ান। হাঁটু ভাঁজ করে চেয়ারে বসায় মতো অবস্থানে আসুন ও ধরে রাখুন ৫-১০ সেকেন্ড। এভাবে প্রক্রিয়াটি ৫-১০ বার করুন।
৫. কাফ রেইজ: সোজা হয়ে দাঁড়ান। এবার দুই পা এক সঙ্গে শুধু পায়ের অংগুলের উপর ভর রেখে দাঁড়ান। ১০ -১৫ সেকেন্ড ধরে রাখুন ও প্রক্রিয়াটি ৩-৫ বার করুন।
৬. সাইড লেগ রাইজ: ডানদিকে কাত হয়ে শুয়ে পরুন। বাম পা সোজা করে উপরে উঠান হাঁটু ভাঁজ না করে। পায়ের পাতা ডান পায়ের দিকে হালকা বাকিয়ে রাখুন। এভাবে উভয় পাশে ৩-৫ বার করুন ৫-১০ সেকেন্ড ধরে রাখুন।
৭. মনে রাখতে হবে ব্যথা অবস্থায় ব্যায়াম করা যাবে না। ব্যায়াম করার সময় ব্যথা হলে ব্যায়াম বন্ধ করুন চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

হাঁটু ব্যথায় চিকিৎসা পদ্ধতি ও ইন্টারভেনশন:
হাটু ব্যথায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যথানাশক ঔষধ হিসাবে NSAID ব্যাবহার করা হয়। দীর্ঘ মেয়াদি এসকল ওষুধ সেবনে কিডনি সমস্যাগ্রস্ত হতে পারে। প্রেশার বেড়ে যেতে পারে। রক্তক্ষরণ জনত সমস্যা ও আলসারের মতো সমস্যাও হতে পারে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে NSAID এর বিকল্পও থাকে না। তবে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে খেতে হবে। এই সমস্যাগুলোর কারণে এখন হাঁটু ব্যথায় ইন্টারভেনশন চিকিৎসা খুবই কার্যকারী। এতে গুরুতর কোন সাইড ইফেক্ট নেই আবার দীর্ঘ মেয়াদে NSAID এর ব্যবহার কমে যায়। এতে মূলত ব্যথার চক্র ভেঙে দেয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে একবারই যথেষ্ঠ হয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে একাধিক প্রয়োজন হতে পারে। ইন্টারভেনশনগুলো প্রায় ব্যথা মুক্তভাবে করা হয়। ইন্টারভেনশনাল থেরাপির মধ্যে পিআরপি (প্লাটিলেট রিচ প্লাজমা) থেরাপি একটি অত্যাধুনিক পদ্ধতি।

হাঁটুব্যথার অত্যাধুনিক চিকিৎসা পিআরপি:
পিআরপি বা প্লাটিলেট রিচ প্লাজমা ইন্টারভেনশন চিকিৎসা পদ্ধতির মধ্যে একটি অত্যাধুনিক ও কার্যকরী চিকিৎসা পদ্ধতি। বিভিন্ন চিকিৎসায় এখন এটি ব্যবহার হচ্ছে। ব্যথার চিকিৎসায় বিশেষ করে হাঁটুব্যথায় এটি খুবই কার্যকারী একটি পদ্ধতি। পিআরপি চিকিৎসার ক্ষেত্রে রুগীর শরীর থেকে ২০ সিসি রক্ত নেয়া হয়। সেটি নির্দিষ্ট কনটেইনারে রেখে সেন্ট্রিফিউজ মেশিনে দিয়ে রক্ত থেকে প্লাজমা আলাদা করা হয়। যেটিতে প্রচুর পরিমাণে প্লাটিলেট ও অন্যান্য ফ্যাক্টর থাকে। পরে এই প্লাজমা ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে দেয়া হয়।

হাঁটুব্যথা

কিছু ক্ষেত্রে আল্ট্রাসাউন্ড মেশিনের সাহায্যে আক্রান্ত স্থান দেখে এই পি আর পি দেয়া হয়। ব্যথার স্থানে এটি দেয়া হলে লোকাল গ্রোথ ফ্যাক্টর রিলিজ করে যা মাংস পেশী টেন্ডন বা লিগামেন্টস এর ক্ষত পূরনে সাহায্য করে ও ব্যথা কমিয়ে দেয়। এটি মূলত ব্যথার মূল কারণের চিকিৎসা করে তাই এটা খুবই কার্যকারী চিকিৎসা পদ্ধতি। পাশাপাশি ব্যথার ঔষধ শুধু ব্যথা কমিয়ে রাখে কিন্তু মূল কারণ থেকেই যায় এবং আরো গভীর হয়। হাঁটুব্যথার যে কোনো ধরনের ইনজুরির জন্য পিআরপি অত্যন্ত কার্যকরী।

অস্টিও আরথ্রাইটিস চিকিৎসায় পিআরপি:
অনেকের ধারণা অস্টিও আরথ্রাইটিসের চিকিৎসা নেই। একবার হলে আর রক্ষা নেই। এটি ভুল ধারণা। বিভিন্ন গবেষণা দ্বারা এটি প্রমাণিত যে পিআরপি চিকিৎসা অস্টিও আরথ্রাইটিস এ খুবই কার্যকারী। অস্টিও আরথ্রাইটিস এ হাড়ের সংযোগস্থলে আরটিকুলার কারটিলেজ এ যে ক্ষয় হয় পিআরপি দেয়ার ফলে তা সেই ক্ষতস্থানে লোকাল গ্রোথ ফ্যাক্টর রিলিজের মাধ্যমে ক্ষতপূরণে ভূমিকা রাখে। অস্টিও আরথ্রাইটিসের প্রথম ও দ্বিতীয় স্টেজে এটি খুবই কার্যকরী। তৃতীয় বা শেষ স্টেজে এটি ব্যথা কমিয়ে দেয় ও হাঁটু প্রতিস্থাপনের মতো জটিল অপারেশনকে অনেক ক্ষেত্রে রহিত করে।

হাঁটুব্যথায় ম্যাসেজ

হাঁটুব্যথায় বিভিন্ন সময় স্টেরয়েড ইনজেকশন, ওজন ইনজেকশন ও পিচ্ছিলকারক পদার্থ হায়ালিউরনিক অ্যাসিড ইঞ্জেকশন দেয়া হয়। এগুলোর মূল সমস্যা বার বার দেয়া লাগে ও দীরঘমেয়াদী ইঞ্জেকশনে কিছু ক্ষতিকর দিকও আছে। গবেষণায় দেখা গেছে পিআরপি এই সব পদ্ধতি থেকে অধিক কার্যকরী পদ্ধতি। পিআরপির পাশাপাশি স্টেম সেল ইনজেকশন আরো একটি কার্যকরী পদ্ধতি।

শেষ কথা:
হাঁটু আমাদের শরীরের একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এটি ক্ষতিগ্রস্ত বা ব্যথায় আক্রান্ত হলে আমরা শারীরিকভাবে মানসিকভাবে ও অর্থনৈতিক ভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হই। তাই এই হাঁটু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগেই সতর্ক হোন। ব্যথায় আক্রান্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সঠিক পদ্ধতির চিকিৎসা গ্রহণ করুন। চিকিৎসা শুরুর আগে সঠিক রোগ নির্ণয় জরুরি। সঠিক রোগ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসক এর হাঁটু দেখে পরীক্ষা করা ও কিছু ল্যাব পরীক্ষার( এক্সরে ও অন্যান্য কিছু রক্তের পরীক্ষা) দরকার হয়। এই সব বিষয়ে দেরি করা ঠিক নয়। অসুস্থ হওয়ার আগেই সুস্থতাকে প্রাধান্য দিন। সুস্থ থাকুন ভালো থাকুন।

লেখক: কনসালটেন্ট ও পেইন ফিজিশিয়ান, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকা।

এনএম