নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের জন্মদিন

আগের সংবাদ

জন্মদিনে হাসপাতালের বিছানায় ফারুক

পরের সংবাদ

পাঁচ মাসে হারমোনিয়ামের কাছেই যাইনি

প্রকাশিত: আগস্ট ১৮, ২০২০ , ৩:১৮ অপরাহ্ণ আপডেট: আগস্ট ১৮, ২০২০ , ৬:২৪ অপরাহ্ণ

বিশেষ সাক্ষাৎকার
কল্যাণী ঘোষ
কণ্ঠযোদ্ধা

কল্যাণী ঘোষ। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠযোদ্ধা। চট্টগ্রামের দেওয়ানজী পুকুর পাড়ের তাদের বাড়িটি ছিল সংগীতমুখর এক বাড়ি। আর তাই সংগীতময় আবহে বেড়ে উঠেছেন শিল্পী কল্যাণী ঘোষ, প্রবাল চৌধুরী, উমা খান। তিন রত্নই স্বাধীন বাংলা বেতারের কণ্ঠযোদ্ধা। সংস্কৃতিমনা মা লীলাবতী চৌধুরী, বাবা ইঞ্জিনিয়ার ও মুক্তিযোদ্ধা মনোমোহন চৌধুরীর কারণে সংগীতের অমিয় ধারায় নিজেকে সিক্ত করার ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা পান। কিন্তু একাত্তরে কল্যাণীদের জীবনে নেমে আসে অকল্যাণ। ২৬ মার্চের রাতে পাক হানাদাররা গোলাগুলি শুরু করলে চট্টগ্রাম শহর ছেড়ে সপরিবারে চলে গেলেন গ্রামের বাড়ি রাউজানের বীনাজুড়িতে। রাজাকারদের অত্যাচারে সেখানেও

থাকতে পারেননি। পায়ে হেঁটে পাহাড়, জঙ্গল, বৃষ্টি ও বজ্রপাতের মধ্য দিয়ে রামগড় হয়ে ত্রিপুরা পৌঁছান। এরপর নদী জল পেরিয়ে আগরতলা হয়ে কলকাতা পৌঁছান। যেখানে অনেক বিশিষ্টজনের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। সেখানকার ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটে কল্যাণী, প্রবাল ও উমা গান করতে গেলে ওই সময় দেখা হয় সনজীদা খাতুনের সঙ্গে। তাদের গান শুনে খুশি হয়ে দলে নিয়ে নিলেন।

এরপর গড়িয়া হাটের মোড়ে সুরকার সমর দাস ও শিল্পী আবদুল জব্বারের সঙ্গে দেখা। তারাই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই শুরু। সেই সময় তার জাদুকরী কণ্ঠ দিয়ে উজ্জীবিত করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের, সংগঠিত করেছিলেন লাখ লাখ শরণার্থীসহ সাধারণ মানুষদের। তার উল্লেখযোগ্য গানের মধ্যে ‘বিজয় নিশান উড়ছে ওই’, ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে’ ইত্যাদি। এই কণ্ঠযোদ্ধার গানের সিডি ও রেকর্ডের সংখ্যা প্রায় দুই শতাধিক। এতো অবদানের পরও কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মেলেনি কল্যাণী ঘোষসহ তার পরিবারের অন্য দুই সহোদরেরও!
কল্যাণী ঘোষ বেতার এবং বিটিভির স্পেশাল গ্রেডের শিল্পী। বাংলা একাডেমিতেও কাজ করেছেন ৩২ বছর। ২০০৪ সালে বাংলা একাডেমির উপপরিচালক হিসেবে অবসরে যান।

এই কণ্ঠযোদ্ধার করোনাকাল কেমন কাটছে ভোরের কাগজের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ১৬ মার্চ থেকে স্বেচ্ছা গৃহবন্দি। দরজার বাইরেও পা রাখিনি। তবে কোনো অবসর নেই। বাড়িতে কাজের মানুষ নেই। মেয়ে আর মেয়ে জামাই আমার কাছেই থাকে। তারা তো সব কাজে সহযোগিতা করেই। তারপরও নিজেই করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। কিন্তু রাতে ওষুধ না খেলে এখন আর ঘুম হচ্ছে না। অথচ আমি কখনো কোনো ওষুধ খেতাম না। এখন ওষুধ খেয়ে ঘুমানোর কারণে বেলা হয়ে যায় ঘুম থেকে উঠতে। অবচেতন মনের উৎকণ্ঠা ঘুম কেড়ে নিচ্ছে। যে কারণে জীবনের ছন্দটা হারিয়ে গেছে। অথচ দুবছর আগে আমার হার্টে রিং পড়ানো হয়েছে।

সব কিছু নিয়ম করে চলতে হয়। কিন্তু ঘুমের কারণে সব এলোমেলো হয়ে গেছে। মাঝে একটু জ¦রও এসেছিল। আত্মীয় এক ডাক্তারের চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে উঠেছি। এই ৭৪ বছর বয়সেও আমি ভয় পাইনি। মনোবল অনেক শক্ত আছে। এখন সবাইকে মনোবল শক্ত রাখতে হবে।

এছাড়া পড়াশোনার মুড ওভাবে আসছে না। বাসায় এখনো পত্রিকা আসতে দিচ্ছি না। অনলাইনেই পড়ছি। এছাড়া করোনার আগে আমি নিয়মিত গানের চর্চা করতাম। অবশ্য সেই ৫ বছর বয়স থেকে করছি। নিজের জন্যই প্রতিদিন আধা ঘণ্টা রেওয়াজ করি। নিজেকেই গান শোনাতে আমার ভালো লাগে। কিন্তু ৫ মাসে আমি হারমোনিয়ামের কাছেই যাইনি। হারমোনিয়ামের দিকে তাকালে মনে হয়, চারদিকে এতো হাহাকার, দুঃখ, অভাব এবং অভিশাপ নেমে আসা পৃথিবীতে কি করে রেওয়াজ করব? গান গাইব? আশপাশের মানুষ শুনলে কি বলবে! তাই সেসব থেকে বিরত রেখেছি।

করোনার কারণে চেনা পৃথিবীর কতটা বদল ঘটেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমূল বদলে গেছে। তবে দেশের মানুষের মন একেবারেই বদলায়নি। বরং উল্টো হয়েছে। কানে দিয়েছে তুলো, পীঠে বেঁধেছে কুলো। যে যাই বলুক না কেন তাল গাছটা আমার এমন ভাব। মানুষ স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক, লোভী, অসৎ, দয়ামায়াহীন পাষণ্ড হয়ে গেছে। যাদের মা-বাবা, ভাই-বোন কারো জন্য মায়া মমতা নেই। ওরা কি চায়? কি পেলে বাংলাদেশের মানুষের অতৃপ্ত আত্মা তৃপ্ত হবে? ৫০ বছর আগে প্রত্যেকের জন্য প্রত্যেকের কি ভীষণ মমতা ছিল! কত সুখি ছিলাম আমরা। মানুষ এখন ত্যাগে নয়, ভোগেই বিশ্বাসী। ত্যাগ শব্দটা বাংলাদেশের ডিকশনারি থেকে মুছে গেছে।

তারপরও ঘুরে দাঁড়ানোর আশা রাখতেই হবে। তবে মানুষের লোভ সংবরণ করতে হবে। যতদিন মানুষ অল্পে খুশি হতে পারবে না ততদিন এ দেশ দাঁড়াতে পারবে না।

পিআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়