ঢাকার ২৫টি ওয়ার্ড এখনও ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে

আগের সংবাদ

অসময়ের বৃষ্টি ও সাহিত্যশিল্পী আবুল হোসেন

পরের সংবাদ

বাবলি

আন্দালিব রাশদী

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ১৩, ২০২০ , ৭:৫৩ অপরাহ্ণ

স্যার, আপনি আমাদের এলাকায় নতুন মানুষ। নতুন মানুষকে ধোঁকা দেয়া সহজ। নতুন মানুষকে ধোঁকা দেয়াটা আমাদের রুটিন কাজের অংশই বলা যায়। এখানকার ভালোমন্দ অনেক কিছুই আপনার জানা নেই। এখানকার ফুল-পাখি-গাছ সব মিলিয়ে প্রাকৃতিক দৃশ্য যত ভালো, এখানকার মানুষ ততই মন্দ। আমার মুখে কথাটা শুনলে আপনার মনে হবে খুব পাকামি করছি, হয়তো তা-ই।

দখিনদুয়ারি গার্লস হাইস্কুল

শ্রদ্ধেয় অংক স্যার

হাজার হাজার সালাম বাদ আরজ এই যে আমি এই এলাকার স্বনামধন্য দখিনদুয়ারি গার্লস হাইস্কুলের দশম (পুরাতন) শ্রেণির ছাত্রী। পুরাতন দশম শ্রেণি মানে আপনি অবশ্যই বুঝবেন। আমাদের টেস্ট পরীক্ষার বাকি আর মাত্র এক মাস আর এসএসসির সাড়ে তিন কি চার মাস।
যারা নতুন দশম শ্রেণির তাদের কেবল ক্লাস শুরু হয়েছে। দশম মানেই স্কুলের সবচেয়ে বড় ক্লাস। দশম (পুরাতন) হলে আরো বড়।
আমি যখন দশম (নতুন) শ্রেণিতে ছিলাম, আমার বয়স তখন ফিফটিন। দশম (পুরাতন) হওয়াতে আমি এখন সিক্সটিন। আসলে ষোলো বছর সাত মাস।
একমাত্র সিক্সটিনকেই বলা হয় সুইট।
সুইট সিক্সটিন!
তাছাড়া আমাকে যারা দেখেছে সবাই স্বীকার করেছে মেয়েটি দেখতেও সুন্দর। এমন নয় যে আমি জীবনে কখনো আয়নার সামনে দাঁড়াইনি। আমার নিজের প্রতিবিম্ব আমি দেখেছি। প্রতিবিম্ব মানে পদার্থ বিজ্ঞানের আলো অধ্যায়ের প্রতিফলন। ইংরেজিতে রিফ্লেকশন। কোনটা আলোর প্রতিফলন আর কোনটা প্রতিসরণ আমি ভালোই জানি। কাকের প্রতিবিম্ব কখনো পেখম-তোলা ময়ূরী নয়। আমার প্রতিবিম্বই আমাকে বলে দেয়। আমি ক্লাসের যে কোনো মেয়ের চেয়ে সুন্দর। আমার বাম গালে টোল। কেবল মিষ্টি করে হাসলেই টোলটা স্পষ্ট দেখা যায় এমন নয়। এমনিতেই, এমনকি আমি মন খারাপ করে রাখলেও টোলটাই আগে চোখে পড়ে।
হেডস্যার গম্ভীর মানুষ হলেও একদিন বলে ফেললেন, মেয়েটা যে কী মিষ্টি!
যাক নিজের প্রশংসা আপনাকে আর শোনাতেই চাই না। নিজের সম্পর্কে ঠিক বলেছি না বাড়িয়ে বলেছি আপনিই সে বিচার করবেন।
আমার একটা খুঁতও আছে। বাইরে থেকে এটা দেখা যায় না। কেবল আমি যদি দেখাতে চাই তাহলেই দেখা সম্ভব। আমার নামটাও এখন আপনাকে বলতে চাচ্ছি না। আপনি মেধাবী মানুষ। অংক স্যাররা মেধাবীই হয়ে থাকেন। বাংলা আর দ্বীনিয়াত স্যাররা একটু অগা টাইপের। অগা মানে তেমন খারাপ কিছু নয়, একটু মাথামোটা। এই আর কি। মাথামোটা মানুষেরা কোনটা সাধারণ দৃষ্টি আর কোনটা ভালোবাসার বুঝতে পারেন না। ক্লাস নাইন-টেনের একটা মেয়ে তাকালেই ধরে নেন তার প্রেমে পড়ে গেছে। দ্বীনিয়াত স্যার ভাবেন তার নূরানী চেহারা, সুরমাপরা চোখ আর চিবুকঝোলা দাড়ি মেয়েদের খুব পছন্দ; বাংলা স্যার মনে করেন দু’চারটে কবিতার লাইন আর মিষ্টি মিষ্টি ছন্দমেলানো কথা শুনে ছাত্রীরা তার জন্য পাগল।
অংক স্যারকে মেধাবী হতে হয়। মেধাবী হওয়ায় তারা কম বোকামি করেন। ছাত্রীর হাসিমুখ দেখেই গলে যান না।
ইনশাল্লাহ এ বছরই, সাড়ে চার মাস পর আমি এসএসসি পরীক্ষায় বসতে যাচ্ছি। আপনি বলবেন টেস্ট পরীক্ষার রেজাল্ট হবার আগে এতো জোর দিয়ে এতো বড় গলায় এ কথা বলা ঠিক নয়।
আমি খুব বেশি জোর দিয়ে বলিনি। শুরুতেই ইনশাল্লাহ বলেছি। ইনশাল্লাহ মানে আল্লাহ যদি চান।
এটা ঠিক অংকে যদি ফেল করি তাহলে নামই তো রেজিস্ট্রি হবে না। আরো এক বছর অপেক্ষা করে নতুন দশম শ্রেণির সাথে পরীক্ষায় বসতে হবে। আমাদের হেডস্যার, মানে তোফাজ্জল হোসেন স্যার ভারি গলায় আমাদের শুনিয়ে দিয়েছেন মেজর কোনো সাবজেক্টে ফেল করলে এসএসসির জন্য সেন্টআপ করা হবে না। স্যারের সিদ্ধান্ত সেন্ট গার্মেন্ট কারেক্ট। তিনি পরীক্ষা দিতে পাঠালেন কিন্তু ছাত্রীটি ডাব্বা মেরে ফিরে এলো তাতে কি স্কুলের সুনাম হবে? বদনাম যত বাড়বে ছাত্রী তত কমবে, টিচাররা তত কম বেতন পাবেন, বেতন যত কমবে টিচারদের ওয়াইফদের সাথে সম্পর্ক তত খারাপ হবে, টিচারদের মেজাজ তত খারাপ হবে, মেজাজ যত খারাপ হবে ছাত্রীদের গায়ে তত বেশি তুলবেন, তারপর আমাদের উপজেলা নারী সংঘ আন্দোলন করে চাকরিটাই খেয়ে দেবে।
কিন্তু আমি জানি অংকে আমাকে ফেল করানো সহজ হবে না, কারণ আমি আশা করি আপনি হবেন আমার অংকের প্রাইভেট টিচার।
অংক বললেও আসলে সাবজেক্টটার নাম গণিত। গণিত মানে পাটিগণিত- সরল, গড়, সুদ-কষা, লাভ-ক্ষতি এসব হচ্ছে পাটিগণিত, তারপর বীজগণিত- এ প্লাস বি হোলস্কোয়ার সমান সমান এ স্কোয়ার প্লাস টোয়াইস এবি প্লাস বি আর জ্যামিতি- ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি দুই সমকোণের সমান। এতসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যিনি পড়ান তাকে বলি অংক স্যার।
স্যার আগে থেকেই বলে রাখি আমাদের ক্লাসের পাঁচজন অংকে ধরা খাবে- তিনজন একেবারে নিশ্চিত মেহের নিগার, খাতুনে জান্নাত এবং নয়নতারা বেগম। পদ্মাবতী রায় এবং হাস্নাহেনাও ধরা খাবার পথে তবে আপনি যদি নজর দেন এই দুটোকে পার করে নিয়ে আসতে পারবেন। আর তিনটার পেছনে যদি গাধায় খাটনিও দেন, লাভ হবে না। আপনার খাটনি হবে উলুবনে মুক্তো ছড়ানো। আমি যে বাংলা বাগধারাতেও ভালো তারও প্রমাণ দিলাম।
এমনিতে আমার ধরা খাবার সম্ভাবনা নেই। আমি নিজগুণে থার্টি ফাইভ থেকে ফর্টি পার্সেন্ট মার্কস আদায় করে নিতে পারব। দুধ বেচে টেন পার্সেন্ট লাভ করতে হলে আড়াইশ টাকার দুধ যে দুশ পঁচাত্তর টাকা বিক্রি করতে হবে এটা আমি কাগজে-কলমে না লিখেই বলে দিতে পারব। আর দাম ঠিক রেখে আড়াইশ টাকার দুধে কতটুকু পানি মেশালে সাড়ে তিনশ টাকা বেচা যাবে পাঁচ মিনিটে খাতা-কলতে হিসাব করে দেখাতে পারব। এ কিউব মাইনাস বি কিউবের ফর্মুলা আমার মুখস্থ। আর সমবাহু ত্রিভুজের কোণের মাপ চাঁদা না বসিয়েই আমি বলে দিতে পারব।
কাজেই আমাকে নিয়ে আপনার বেশি ভাবতে হবে না- আমি আর যাই হই, অংকের জন্য আপনার ঘাড়ের বোঝা যে হবো না এটা আমি নিশ্চিত। তবে প্রথম যে তিনজনের কথা বললাম তাদের বোঝা না বইয়ে আপনার ছাড় নেই। পরের দু’জনরেও।
আমি যদি বোঝা হই হবো অন্য কারণে, জেনেশুনে একবার আপনার ঘাড়ে উঠতে পারলে আমি যদি নিজে থেকে না নামি তাহলে আমাকে নামায় এমন সাধ্য কারো নেই। সিন্দাবাদের ভ‚তের কথা জানেন তো স্যার? আমি তখন হয়ে যাব সিন্দাবাদের ভূত।
নেভার মাইন্ড স্যার, আমার আপুর জন্য পাত্র খোঁজা হচ্ছে। আমার আব্বু আমাদের ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এবং স্কুল গভর্নিং বডির গুরুত্বপূর্ণ মেম্বার বলে আমরা আগেই জানতে পেরেছি আপনি ব্যাচেলর। যদিও পুরুষ মানুষের চেহারা কেমন সেটা নিয়ে তেমন কথা উঠে না তবুও জেনে গেছি আপনি দেখতেও নাকি ভালোই। আপনার নামের আগে সৈয়দ বসানো আছে। আপনি সৈয়দ বংশের মানুষ নাকি? বাহ্ দারুণ তো- অতি উচ্চ বংশ। নাটকে দেখেছিলাম সৈয়দ বংশের পুরুষ নীচু মানের কাজ যেমন রিকশা চালানো, দুধ বেচা- এসব করতে চান না। তবে খানাপিনার খরচ যোগাতে প্রতিবন্ধী সেজে দিনে ভিক্ষা করে আর শরীরে নির্ভেজাল সর্ষের তেল মেখে রাতের বেলা সিঁধ কাটে।
স্যার, সৈয়দ বংশের লোকদের ভিক্ষা করা নিয়ে আমার তেমন কোনো আপত্তি নেই, আগ্রহও নেই। কিন্তু সিঁধ কাটা নিয়ে আমার আগ্রহ আছে। সিঁধ কাটার চেয়েও বেশি আগ্রহ সৈয়দ বংশের চোরদের সারা গায়ে খাঁটি সর্ষের তেল মাখা নিয়ে। তারা শরীর এতোটাই পিচ্ছিল করে রাখত তিনজনে চেপে ধরলেও ফুস করে বেরিয়ে যেতে পারত। এই কায়দাটি কি স্যার আপনি জানেন?
ধ্যাৎ বোকার মতো কি বললাম, এটা আপনি জানতে যাবেন কেন। আপনার তো ট্রেনিং হয়েছে টিচার্স ট্রেনিং কলেজে। সেখানে তো আর গায়ে তেল মেখে চোর পালানোর ট্রেনিং দেয়া হয় না। তবু সৈয়দ হিসেবে কমবেশি আপনার জানার কথা।
তাহলে ভেতরের কথা জেনে রাখুন, আপনাকে আমাদের বাড়িতে লজিং মাস্টার রাখা হবে। আপনাকে তো কোথাও না কোথাও থাকতে হবে। আপনি জয়েন করার সাথে সাথেই আমাদের স্কুলের হেডস্যার আপনাকে বলবেন, এই যে সৈয়দ সাহেব, তোমার থাকার জায়গার ঠিক করে রেখেছি। আমাদের স্কুলের গভর্নিং বডির মেম্বার সাহেবের বাড়িতে। অবস্থাপন্ন ঘর। সিঙ্গেল রুম পাবে, খানাপিনাও ভালো হবার কথা। মেয়েটাকে পড়াতে হবে, ছোটটাকেও টেবিলে বসাতে হবে। যাও, দপ্তরি তোমার ছুটকেস নিয়ে আগে আগে যাবে। হাতমুখ ধুয়ে, বিশ্রাম নিয়ে রাতটা পার করে একেবারে কাল সকালে আবার এসো।
এই তো শুরু। হেডস্যার মেজো আর ছোটো মেয়ের কথা বলবেন কিন্তু বড় মেয়ের কথা কিছুই বলবেন না। অথচ আপনাকে লজিং মাস্টার রাখার আসল কারণ আমার আপু।
মানতেই হবে আমার আপু দেখতে আমার চেয়েও সুন্দর। একবার চোখ পড়লে আপনিও হ্যাঁ করে তাকিয়ে থাকবেন। চোখ ফেরাতে পারবেন না। আমাকে পড়ানোর জন্যই আপনাকে লজিং মাস্টার হয়ে আমাদের বাড়িতে থাকতে হবে। কিন্তু আমার কাঁধের উপর দিয়ে আপনার চোখ গিয়ে পড়বে আমার আপুর উপর।
স্যার, আপনি আমাদের এলাকায় নতুন মানুষ। নতুন মানুষকে ধোঁকা দেয়া সহজ। নতুন মানুষকে ধোঁকা দেয়াটা আমাদের রুটিন কাজের অংশই বলা যায়। এখানকার ভালোমন্দ অনেক কিছুই আপনার জানা নেই। এখানকার ফুল-পাখি-গাছ সব মিলিয়ে প্রাকৃতিক দৃশ্য যত ভালো, এখানকার মানুষ ততই মন্দ। আমার মুখে কথাটা শুনলে আপনার মনে হবে খুব পাকামি করছি, হয়তো তা-ই। শহরের স্কুলের ফার্স্ট গার্ল সেকেন্ড গার্লের মতো আমি লিখে রেখেছিলাম কথাটা- আমি আমার দেশকে ভালোবাসি, কিন্তু দেশবাসীকে নয়। কথাটা ইংলিশ পোয়েট লর্ড বায়রনের, আজকাল মফস্বলের মেয়েরা ইংলিশ পরীক্ষায় ফেল করলেও লর্ড বায়রনের নাম বলতে পারে, মাইকেল জ্যাকসনের নামও জানে। আমি কথাটা লিখে রেখেছিলাম কারণ কথাটা আমার ভালোলাগছিল। আমাদের এলাকাটা আমার পছন্দের কিন্তু মানুষগুলো- মানে পুরুষ মানুষগুলো সম্পর্কে আমার ধারণা একেবারেই ওয়াক থু।

এসআর