ভাইস চেয়ারম্যানের মাদক সেবনের ভিডিও ভাইরাল

আগের সংবাদ

কৃষকদের সহায়তায় গুরুত্ব আগে দিন

পরের সংবাদ

স্বাস্থ্য বিভাগ কি আজো গভীর ষড়যন্ত্রে?

রণেশ মৈত্র

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ১১, ২০২০ , ৮:৩১ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশের জনগণের দুর্ভাগ্য, তারা তাদের স্বাস্থ্য বিভাগকে ষড়যন্ত্রমুক্ত করতে পারছেন না। মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নানাভাবে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে বহুকাল ধরে ঢালাও অবাধ দুর্নীতির মহোৎসবকে। সে প্রতিবাদ উপেক্ষিত হয়ে আসছিল বাড়ছিল মানুষের অসহায়ত্ব।
অবশেষে এলো করোনা ভাইরাস। এ ভাইরাস প্রতিরোধে সারা বিশ্ব আজো সফলতা অর্জন করতে পারেনি, বাংলাদেশও নয়। তাই প্রতিরোধে আজতক স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অক্ষমতা নিয়ে কোনো অভিযোগ তেমন একটা নেই। তারপরও অর্থাৎ দিনে দিনে ওই প্রাণঘাতী ভাইরাসে লাখ লাখ নাগরিক সংক্রমিত হচ্ছেন এবং হাজার হাজার মানুষ অসহায় মৃত্যুবরণ করছেন এর বিরুদ্ধে যে যে ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব থাকলেও আজো যে তা করা হয়নি তাই নিয়ে স্বভাবতই মানুষ ক্ষুব্ধ। মানুষ ক্ষুব্ধ, আজো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্যমন্ত্রী বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তাকে দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়নি, কারো বিরুদ্ধে একটিও মামলা দায়ের বা গ্রেপ্তার করা হয়নি এই কারণে। কতদিনে অবস্থার পরিবর্তন হবে, দুর্নীতিবাজরা চিহ্নিত হবে, কতদিনে স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে আসবে তার কোনো হদিসও এই দীর্ঘ ছয় মাসের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে না। হ্যাঁ, তীব্র সমালোচনার মুখে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তাকে পদত্যাগ করানো হয়েছে, আরো কিছুসংখ্যক কর্মকর্তাকে সংবাদপত্রের ভাষায়, ‘সরিয়ে দেয়া’ হয়েছে। কিন্তু তাদের ‘সম্মান’ রক্ষার্থে বলা হয়েছে, ‘না তাদের দুর্নীতির অভিযোগে’ সরানো হয়নি এই রদবদল ‘রুটিন ওয়ার্ক’ মাত্র।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তীব্র সমালোচিত ডিজি অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ ‘পদত্যাগ’ করার পর একজন সৎ ও জনপ্রিয় চিকিৎসককে ওই পদে নিয়োগের পর সব মহল থেকেই তাকে অকুণ্ঠ অভিনন্দন জানানো হয়েছিল এই প্রত্যাশায় যে তিনি কঠোর হাতে সব দুর্নীতির অবসান ঘটিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতি জনগণের হৃত আস্থা পুনরুদ্ধার করবেন ও দুর্নীতির সিন্ডিকেটকে কঠোরভাবে ভেঙে দেবেন। তা হয়নি আজো। তবে তিনি এতই কম দিন হলো দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন তার মধ্যে যে দুর্নীতির শক্তিশালী চক্র ভঙ্গ সম্ভব না তা সবাই উপলব্ধি করে ধৈর্য ধারণ করে আছেন। আশা করি মানুষ তার কাছে হতাশ হবেন না।
ইতোমধ্যেই খবর বেরিয়েছে, সংক্রমণের দিক থেকে বাংলাদেশ ইতালিকে অতিক্রম করেছে। আবার মজার ব্যাপার হলো এ খবর প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই জানানো হলো ‘সংক্রমণের হার বাড়লেও হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা কমছে’। তাৎপর্যপূর্ণ খবর বটে। মে-জুন-জুলাইয়ের তুলনায় ভুয়া, তা কি আজো সরকার অসত্য বলে মনে করেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী, অন্যান্য মন্ত্রী ও এমপি কি ওই হাসপাতালগুলোতে গিয়ে সপরিবারে করোনা পরীক্ষা করাতে সম্মত হবেন? সরকার হঠাৎ করে করোনা টেস্টের বাবদে ফি নির্ধারণ করে কঠোর দারিদ্র্যপীড়িত কোটি কোটি মানুষের জন্য করোনা টেস্ট অসম্ভব করে তোলেনি?
ধন্যবাদ জানাতে হয় আমাদের জনগণকে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুলিশ-র‌্যাব প্রমুখকে। জনগণের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ-র‌্যাব কয়েক হাসপাতালে অভিযান চালাল। আমরা দেখলাম, বেশিরভাগ বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকের কোনো রেজিস্ট্রেশন নেই, জানলাম বেশকিছু হাসপাতাল থেকে বিপুল অঙ্কের টাকার বিনিময়ে করোনা টেস্ট করে ভুল বা ভুয়া সার্টিফিকেট দিচ্ছে। ফলে কয়েকজন ধরাও পড়লেন র‌্যাব-পুলিশের হাতে। অপরাপর বহু হাসপাতালের বহু দুর্নীতির অভিযোগ গোপনে আসতে লাগল র‌্যাবের কাছে। অভিযান পরিচালনা করল বাহিনীদ্বয় অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ হলো। হাসপাতালের কয়েক কর্মকর্তা গ্রেপ্তার হলেন। তারা পুলিশের কাছে বহু রাঘব-বোয়ালের নাম প্রকাশ করে জানালেন যে তাদের যোগসাজশে বা আশ্রয়-প্রশ্রয়েই তারা এমন দুর্নীতি করছেন। ওই রাঘব-বোয়ালরা কোথায়? তারা একজনও ধরা পড়ছেন না কেন? কোনো শক্তিশালী চক্র ওই রাঘব-বোয়ালদের রক্ষা করছে।
অভিযান বন্ধ নতুন নির্দেশনা
লক্ষণীয় যে অনেক হাসপাতালে র‌্যাব-পুলিশ কর্তৃক পরিচালিত অভিযান বেশকিছু সফল হওয়ায় জনমনে স্বস্তির ভাব সৃষ্টি হয়েছিল। সম্ভবত ওপরের হাতছানিতে ধরা পড়া অভিযুক্তরা রাঘব-বোয়ালদের নাম পুলিশের কাছে প্রকাশ করলেও তাদের কোনো তালিকা আজো প্রকাশ করা হয়নি বা ওই রাঘব-বোয়ালদের টিকিটিও আজতক কেউ ছোঁয়ার সাহস পায়নি। সম্ভবত ভেতরে ভেতরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা কোনো শক্তিশালী মহল কলকাঠি নাড়ার ফলেই এমন গোপনীয়তা ও নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করতে বাধ্য হয়েছেন র‌্যাব-পুলিশ কর্মকর্তারা। কিন্তু অভিযান বন্ধ হলো কেন? আর কি করোনার জাল সার্টিফিকেট ইস্যু হচ্ছে না? দেশের যেসব বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক দিব্যি বিনা লাইসেন্সে কাজ চালাচ্ছিল তারা কি ইতোমধ্যে তাদের লাইসেন্স সংগ্রহ করে নিয়েছে? না, এগুলোর কোনোটিই হয়নি, হলেও অতি সামান্যসংখ্যক হাসপাতাল-ক্লিনিক তাদের লাইসেন্স হয়তো নবায়ন করে নিয়েছে। সরকার বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কি করণীয় নয় কখন বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিক তাদের লাইসেন্স নবায়ন করে নিচ্ছে বা কোনো কোনো হাসপাতাল-ক্লিনিক আজো তা করেনি? যারা নবায়ন করেনি তাদের নামের তালিকা দ্রুত প্রকাশ করা জরুরি, কারণ সেসব জেনে-বুঝে তবেই তো মানুষ হাসপাতালে রোগী ভর্তি করাবেন। শুধু তাই নয়, সব হাসপাতালে আসন সংখ্যা অনুযায়ী ডাক্তার (বিশেষজ্ঞসহ), নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী আছে কিনা বা তারা রোগীর কাছ থেকে অত্যধিক টাকা আদায় করছে কিনা তাও দেখা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্তব্য।
যা হোক, অভিযান বন্ধ হওয়ার কারণ এখন অনুমান করা যায়। কথিত ও রাঘব-বোয়ালদের সিন্ডিকেটের স্বার্থে যখন-তখন হাসপাতালগুলোতে অভিযান নিষিদ্ধ ঘোষণা করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নির্দেশনা জারি করেছে। ওই নির্দেশনায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমতি ব্যতিরেকে কোনো হাসপাতালে অভিযান চালানো যাবে না।
প্রশ্ন করি, কেন এই নির্দেশনা? আগের অভিযানগুলো পরিচালনাকালে র‌্যাব বা পুলিশের কোনো কর্মকর্তা বা তাদের কেউ কি বেআইনি কিছু করেছেন? যদি তা করে থাকেন, তিনি সে ব্যাপারে নিশ্চিতভাবেই অপরাধী। তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি বিধান করা হোক অব্যাহত রাখা হোক হাসপাতালগুলোর মালিক-কর্মকর্তার অন্যায়, অবৈধ কার্যকলাপের বিরুদ্ধে অভিযান। অভিযানকে আরো জোরদার করা হোক এবং ঢাকা ও ঢাকার বাইরে সর্বত্র তা প্রসারিত করা হোক। একই সঙ্গে দেশের সব এলাকার মানুষকে যতটা সম্ভব করোনামুক্ত রাখার জন্য অবিলম্বে করোনা টেস্টিং ফি প্রত্যাহার, দেশের সব জেলায় এবং সম্ভব হলে উপজেলাতেও করোনা টেস্ট কিটস যথেষ্ট পরিমাণে সরবরাহ করে সর্বাধিক সংখ্যক মানুষকে পরীক্ষা করে যাদের ক্ষেত্রে শনাক্ত হবে তাদের সবার অবিলম্বে যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হোক। প্রতিটি জেলাতেই কমপক্ষে ৮টি করে করোনা পরীক্ষার ল্যাব স্থাপন এখন অপরিহার্য। এ ব্যাপারে অতীতেরও লিখেছি কিন্তু তার কোনো ফল না হওয়ায় পুনরায় বিষয়টি উল্লেখ করতে হলো। কিন্তু অভিযান পরিচালনার পথ আইন করে রোধ করা, দুর্নীতিবাজ ও তাদের গডফাদাররা আজো ধরা-ছোঁয়ার ঊর্ধ্বে থেকে নিরাপদে ঘুরে বেড়ানো প্রভৃতি দেখে মনে হয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এক গভীর ষড়যন্ত্রে শিকার। এ আশঙ্কা সত্য হলে তা থেকে উদ্ধারে অত্যধিক তৎপর হওয়া প্রয়োজন।
উদ্বেগের খবর হলো বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে করোনার দ্বিতীয় ওয়েড আসন্ন। তা থেকে পরিত্রাণের প্রচেষ্টা দ্রুত শুরু করা প্রয়োজন। যেমন করোনা পরীক্ষার কিটস দেশের সর্বত্র যথেষ্ট পরিমাণে সরবরাহ, প্রতি জেলায় কমপক্ষে আটটি করে করোনা পরীক্ষার ল্যাব স্থাপন, প্রতিটি হাসপাতালে উপযুক্ত সংখ্যক আইসিইউ, ভেন্টিলেটর, গ্যাস সরবরাহ, উপযুক্ত সংখ্যক ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী ও প্রয়োজনীয় উপকরণাদির সরবরাহ অতি শিগগিরই করা প্রয়োজন। প্রয়োজন করোনা চিকিৎসার হাসপাতাল, ওয়ার্ড ও বেড সংখ্যা বৃদ্ধি এবং তা অতি সত্বরেই শুরু করা।

রণেশ মৈত্র : রাজনীতিক ও কলাম লেখক।
[email protected]

ডিসি