দলের আয়-ব্যয়ের হিসাবের সময় বাড়াল ইসি

আগের সংবাদ

মাস্ক না পরায় হাতিরঝিলে ২৬ জনকে জরিমানা

পরের সংবাদ

দম বন্ধ হয়ে আসছে

আলমগীর খান

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ১১, ২০২০ , ৮:২৫ অপরাহ্ণ

১৯৬৪ সালের ১০ ডিসেম্বর অসলোয় নোবেল শান্তি পুরস্কার গ্রহণকালে আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ জননেতা মার্টিন লুথার কিং তার বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘আমি নোবেল শান্তি পুরস্কার গ্রহণ করছি সেই মুহূর্তে যখন জাতিগত অবিচারের দীর্ঘ রাত্রি অবসানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ২ কোটি ২০ লাখ নিগ্রো অনন্য সংগ্রামে লিপ্ত।… আমি স্মরণ করছি যে, মাত্র গতকাল আলাবামার বার্মিহামে ভ্রাতৃত্বের দাবি জানানোর অপরাধে আমাদের সন্তানদের আগুনের, ক্ষিপ্ত কুকুরের ও এমনকি মৃত্যুর অভ্যর্থনা জানানো হয়েছে। আমি স্মরণ করছি যে, গতকাল মিসিসিপির ফিলাডেলফিয়ায় ভোটাধিকার চাওয়ার জন্য তরুণদের পাশবিক নির্যাতন ও খুন করা হয়েছে। আর মাত্র গতকাল মিসিসিপি রাজ্যে ৪০টি উপাসনালয় বোমা মেরে ও পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে, কারণ যারা বর্ণবাদী আলাদাকরণের ব্যবস্থা (সেগ্রিগেশন) মেনে নেয়নি তারা এখানে আশ্রয় পেয়েছিল। আমি মনে রাখছি, এক নিস্তেজকারী ও হাড়ভাঙা দারিদ্র্য আমার জনগণকে নিষ্পেষণ করছে এবং তাদের অর্থনৈতিক মইয়ের সর্বনিম্ন ধাপে শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছে।’
তবে মার্টিন লুথার কিং যেসব ঘটনার বর্ণনা করছিলেন তার নোবেল-বক্তৃতায়, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস তার চেয়ে অনেক ভয়ঙ্কর ঘটনার সাক্ষী। আর সেসব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো একটা নৃশংস ব্যবস্থার প্রতিফলন যার মূল অনেক গভীরে। নানা রঙে এর শিকড় আছে আরো অনেক দেশে।
প্রসঙ্গক্রমে বলা যায়, ভারতের বর্ণপ্রথা কেবল ব্রাহ্মণ্যবাদীদের নিজস্ব আবিষ্কার ও সম্পদ নয়, সব দেশেই এটি বিভিন্ন রূপে থাকে। মানুষকে পেশার ভিত্তিতে বর্ণে বা সামাজিক শ্রেণিতে ভাগ করা আর গাত্রবর্ণের ভিত্তিতে পেশা বা সামাজিক শ্রেণিতে ভাগ করা মূলে অভিন্ন। এক প্রথা আরেক প্রথায় দ্রবীভ‚ত হয়ে একইরূপ লাভ করে। ভারতের বর্ণপ্রথায় বা কাস্ট সিস্টেমেও গায়ের রং অনুপস্থিত ছিল না। আর্যদের ভারতে আসা থেকে এখন পর্যন্ত ভারতীয় ও আশপাশের সমাজে ফর্সা ও উজ্জ্বল রঙের প্রতি একটা বদ্ধমূল পক্ষপাতিত্ব রয়েছে। ২শ বছরের ইংরেজ শাসনে সে পক্ষপাতিত্ব আরো পোক্ত হয়। ফর্সা-উজ্জ্বল রঙের প্রতি এ পক্ষপাতিত্বকে পুঁজি করে ‘ফেয়ার এন্ড লাভলি’র মতো নানারকম প্রসাধনী বিক্রির মাধ্যমে করপোরেটরা কোটি কোটি টাকা সাধারণ মানুষের পকেট থেকে লুটে নেয়। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়েই এ ফর্সা-সংস্কার প্রবল। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নির্মূলে ও নির্যাতনেও এ গায়ের রং একটা ছুতা হিসেবে ব্যবহার হয়।
এ সংস্কারাচ্ছন্নতা এত বদ্ধমূল যে, কালো মানুষ পুঁজিপতি বা মজুরিদাস যাই হোক না কেন, তাকে, তার সন্তানকে ও তার সন্তানের সন্তানকে সবসময় কমবেশি বিভিন্ন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের শিকার হতে হয়। এমনকি ধারাবাহিকভাবে হতে হয় পুলিশি নির্যাতনের শিকার। এ বছর ২৫ মে যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটায় কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডকে পুলিশ ধরে, সিগারেট কিনতে ২০ ডলারের একটি জাল নোট ব্যবহারের অভিযোগে। এক শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কর্মকর্তা তাকে হাতকড়া পরিয়ে সাড়ে ৮ মিনিট তার গলায় হাঁটু গেড়ে বসে থাকে। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার আগে পর্যন্ত ফ্লয়েড ষোলবার বলেন, ‘আমি শ্বাস নিতে পারছি না।’
একইভাবে ২০১৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর অস্ট্রেলিয়ার একজন আদিবাসী ডেভিড ডুঙ্গে সিডনির এক কারাগারে বিস্কুট খাওয়া বন্ধ না করায় পুলিশের হাতে খুন হন। মৃত্যু তাকে ছিনিয়ে নেয়ার আগ পর্যন্ত তিনিও পুলিশের হাঁটুর নিচে বারবার বলেন, ‘আমি শ্বাস নিতে পারছি না।’ দেশটিতে ১৯৯১ সাল থেকে পুলিশের হাতে ডুঙ্গের মতো ৪৩৬ জন আদিবাসী মৃত্যুবরণ করেছেন।

এরও আগে ২০১৪ সালের ১৭ জুলাই নিউইয়র্কের পুলিশের হাতে একইভাবে খুন হন কৃষ্ণাঙ্গ এরিক গার্নার। অবৈধ সিগারেট বিক্রির অভিযোগে যখন পুলিশ তাকে মাটিতে ফেলে তার গলায় হাঁটু গেড়ে বসে, তিনিও এগারোবার উচ্চারণ করেন, ‘আমি শ্বাস নিতে পারছি না।’
যুক্তরাষ্ট্রে কালোদের জীবনের মূল্য সাদাদের জীবনের চেয়ে অনেক কম। বর্ণবাদ সেখানে দৈনন্দিন জীবনাচরণ, সাংস্কৃতিক চর্চা, সামাজিক প্রথা, রাষ্ট্রীয় আইনকানুন ইত্যাদি সবকিছুতেই গভীরভাবে প্রোথিত। কালোদের প্রতি দৈনন্দিন বৈষম্য প্রায়ই হত্যাকাণ্ডে পর্যবসিত হয়। এরই প্রতিবাদে গড়ে ওঠে সামাজিক গণমাধ্যমভিত্তিক আন্দোলন ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’। ট্রেভন হত্যার প্রতিবাদ দিয়ে শুরু।
২০১২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা রাজ্যের স্যানফোর্ডে ১৭ বছর বয়সের আফ্রিকান-আমেরিকান কিশোর ট্রেভন মার্টিন বৃষ্টি স্নাত রাতে এক দোকান থেকে বরফ-চা ও ক্যান্ডি কিনে ফিরে যাওয়ার পথে খুন হয় স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী জর্জ জিমারম্যানের গুলিতে। বিচারে জিমারম্যান নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে খালাস হয়ে গেলে রায়ের ৬ দিন পর ২০১৩ সালের ১৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা হোয়াইট হাউসে প্রদত্ত এক আবেগী বক্তৃতায় বলেন, ‘ট্রেভন মার্টিন হতে পারত আমার ছেলে। অন্যভাবে বলা যায়, ৩৫ বছর আগে সে আমিও হতে পারতাম।’
এবিসি নিউজে ১৭ বছরের ওবামার ও মার্টিনের ছবি পাশাপাশি রেখে দেখানো হয় তাদের চেহারায় আশ্চর্য মিল। সে বক্তৃতায় ওবামা আরো বলেন, ‘এমন কোনো আফ্রিকান-আমেরিকান নেই, যার অভিজ্ঞতায় নেই কোনো ডিপার্টমেন্ট স্টোরে কেনাকেটার পর পুলিশের পিছু লেগে থাকা। আমিও ব্যতিক্রম নই।’ তিনি বলেন, এসব অভিজ্ঞতা থেকে এই ধারণাই জন্মায় যে, একজন শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তির বেলায় প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ঘটনা ভিন্ন হয়।
ট্রেভনকে হত্যার প্রতিবাদে ২০১৩-এর শুরু হয় ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলন। এরপর মিজৌরি রাজ্যের ফারগুসন শহরে ২০১৪ সালের ৯ আগস্ট ১৮ বছর বয়সের কিশোর মাইকেল ব্রাউন এক শে^তাঙ্গ পুলিশের গুলিতে খুন হয়। ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার রাস্তায় নামে।
এ বছর ফ্লয়েডকে হত্যার প্রতিবাদ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। ফ্লয়েডের মৃত্যুতে ন্যায়বিচার ও সাম্যতার দাবিতে তাদের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী। যে আন্দোলনে অংশ নিচ্ছে সাদা, কালো, বাদামি সব বর্ণের, ধর্মের ও জাতির মানুষ। এ আন্দোলনের দাবিগুলো হয়ে উঠেছে বহুমুখী ও সুদূরপ্রসারী।
শ্বাসরোধী এই ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের একার নয়, পৃথিবীর বহু দেশের। এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, আমেরিকার বহু দেশের নির্যাতিত মানুষ গার্নার, ডুঙ্গে ও ফ্লয়েডের সঙ্গে নিজেদের ভাগ্যকে একাত্ম করে দেখছে। এ গণআন্দোলন এখন আর কেবল সাদা-কালোর প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। ঔপনিবেশিক শোষণ, পুলিশি বর্বরতা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যসহ বহু বিষয় সামনে চলে এসেছে। দেশে দেশে বহু রকম অবিচারের বিরুদ্ধে রুষে উঠেছে সাধারণ মানুষ। তারাও চিৎকার করে বলছে দম বন্ধ হয়ে আসছে হে শাসক-শোষক, হে পেটোয়াবাহিনী, হে রাষ্ট্র।

আলমগীর খান : নির্বাহী সম্পাদক, শিক্ষালোক।
[email protected]

ডিসি