মাস্ক না পরায় হাতিরঝিলে ২৬ জনকে জরিমানা

আগের সংবাদ

ভাইস চেয়ারম্যানের মাদক সেবনের ভিডিও ভাইরাল

পরের সংবাদ

করোনা বিক্ষত অর্থনীতির গাঝাড়া

মোস্তফা কামাল

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ১১, ২০২০ , ৮:২৭ অপরাহ্ণ

করোনা মহামারির চোখ রাঙানির মধ্যে অর্থনীতি ও ব্যবসায়-বাণিজ্যে মন্থর হলেও গতি আসছে ধীরে ধীরে। অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে মন্দদশা চলছিল করোনা মহামারির আগে থেকেই। করোনায় তাতে আরো ছেদ ফেলেছে। বন্যায় আরো বাড়তি যোগ। এই হতাশাজনক অবস্থার মধ্যেও কয়েকটি সূচক অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর বার্তা দিচ্ছে। ইতিবাচক ধারা শুরু হয়েছে আমদানিতে। গত বছরের একই সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে তা অবশ্যই আশাব্যঞ্জক। এরই মাঝে জীবিকার প্রয়োজনে বন্ধ্যত্ব কাটতে শুরু করেছে ব্যবসা-বাণিজ্যে। রপ্তানিও বাড়ছে।
অনেক উদ্যোক্তার ব্যবসায়ে ফেরার অনিশ্চয়তার মধ্যেও ছোট-বড়-মাঝারি শিল্প-কারখানায় উৎপাদন শুরু হয়েছে। করোনার ঝাপটার শুরুতে মার্চ-এপ্রিলের দিকে বাতিল বা স্থগিত হওয়া রপ্তানি আদেশের অর্ধেকের বেশি ফিরে পাওয়া গেছে। আমাদের গর্বের ধন গার্মেন্টস খুলেছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকের সস্তা লোনের টাকায় শ্রমিকদের বেতন দেয়া হচ্ছে। পশ্চিমা দেশে যেখানে আমাদের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয় সেখানে শীতকাল আসছে, ‘বড়দিন’ আসছে। সেই উপলক্ষে তারা নতুন জামাকাপড় কিনে আনন্দ করে ছুটি উপভোগ করে। সেই সূত্রে জামাকাপড়ের অর্ডার আসছে। আকাশপথও খুলে দেয়া হয়েছে। এদিকে রেমিট্যান্সে ভাটা পড়ার যে আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল সেটা এখনো ঘটেনি। বরং বেড়েছে। করোনার ঝড়ে চাকরি হারিয়ে অনেক প্রবাসী দেশে ফিরেছেন। অনেকে ফেরার অপেক্ষায়। তারা জমানো টাকা পাঠাচ্ছে। এর জেরে রেমিট্যান্স বেড়েছে। ঈদের আগের মাসে জুলাইয়ে প্রায় ২৬০ কোটি ডলার এসেছে। বাংলা মুদ্রায় ২২ হাজার ৯৫ কোটি টাকা। দেশে কোনো একক মাসে এত বেশি পরিমাণ টাকা আর আসেনি। এই ভালো খবরের পেছনে কিছুটা মন্দ তথ্য লুকিয়ে রয়েছে। প্রবাসীরা যেভাবে দেশে ফিরছে, আরো ফেরার অপেক্ষা করছে, এতে একটা সময় রেমিট্যান্স প্রবাহে চরম দশার শঙ্কা উঁকি দিচ্ছে।
করোনার হানার মধ্যে বন্যা। করোনার কারণে গেল রোজার ঈদ গেছে নিরানন্দে। দুই-আড়াই মাস পর কুরবানির ঈদেও তাই। উপরন্তু করোনার বিপদের সঙ্গে যোগ হয়েছে বন্যার আপদ। বিপদের ওপর আপদ। জলের তলে অনেকের ঘরবাড়ি। পা রাখার জায়গা নেই। বোনা আমন গেছে। রোপা আমনের কোনো আশা দেখা যাচ্ছে না। বীজতলা ভেসে গেছে। ফসলের যে ক্ষতি হয়েছে তার হিসাব করা কঠিন। গবাদি পশুর খাদ্য নেই। কোথাও আগাম, কোথাও দফায় দফায় বন্যার ধকলের মধ্যেও এখন চলছে ঘুরে দাঁড়ানোর সংগ্রাম। দীর্ঘমেয়াদি বন্যা হওয়ায় আমন চাষ নিয়ে আশঙ্কার মধ্যেও হাল ছাড়ছেন না কৃষকরা। করোনায় গোটা দুনিয়া শেষ হয়ে যাবে না বা সব মানুষ মরে যাবে না। আবার বন্যাও স্থায়ী হবে না, এই বোধ-বাস্তবতায় এগিয়ে চলার বিকল্প নেই। ক্যালেন্ডার পাল্টানোর সুযোগও নেই। জীবন থেমে থাকছে না। এই অবস্থার মধ্যেই কুরবানির ঈদ চলে গেছে দিনপঞ্জির যথানিয়মে।
চামড়া কেনার লোক ছিল না ঈদের কুরবানির পরে। মন্ত্রীর সঙ্গে সভা হয়। বাণিজ্যমন্ত্রীকে ব্যবসায়ীরা কথা দেন। তবু দেখা যাচ্ছে, বরাবরের মতো এবারো তারা সিন্ডিকেট করে চামড়ার বাজারে মন্দা তৈরিতে সফল হয়েছে। আবার করোনার আক্রমণ ঠিকই আছে। মানুষের মৃত্যু ঘটছে। আক্রান্ত হচ্ছে। সেরে উঠে আবার ঝাঁপিয়ে পড়ছে রুটি-রুজির খোঁজে। করোনার সঙ্গে বন্যার হাত মেলানো নিষ্ঠুরতা মোকাবিলার মধ্যেই ঘুরে দাঁড়ানোর সংগ্রাম মানুষের। জাল-জালিয়াত, ঠকবাজ-ঠেকবাজরাই বা বসে থাকবে কেন? নকল মাস্ক, করোনার ভুয়া টেস্ট, রোগীদের পকেট কাটা কোনোটাই বাদ যাচ্ছে না। বিনাবিচারে হত্যা, ধর্ষণ, চুরি, ছিনতাই কমেছে। থামেনি। করোনাচক্রে স্বাস্থ্য খাতের দিগম্বর দশা ও দুর্নীতি, জোচ্চুরি ফাঁস হয়েছে। ঘটনাচক্রে শিক্ষাসহ অন্যান্য মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ খাতের গোমড়ও জানা যাবে। তখন বোঝা যাবে সাহেদ, সাবরিনা একা নয়। এই সম্প্রদায় বিভিন্ন সেক্টরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। এরা আমাদের উন্নয়ন প্রয়াস, সরকারের নানা প্রকল্প, কৃষক-শ্রমিক-অভিবাসীদের কঠোর পরিশ্রম সবকিছুকে সংক্রমিত করে আইসিইউতে পাঠাচ্ছে। করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন একদিন না একদিন আবিষ্কার হবে। বন্যাও চলে যাবে। কিন্তু এদের দমন বা প্রতিরোধের টিকা এই জনমে মিলবে কিনা, কারো জানা নেই।
বড় বড় এবং কম প্রয়োজনীয় প্রকল্পগুলো থেকে টাকা সরিয়ে তা করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় ব্যয় করার একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে সরকারের। এর একটা সুফল গোটা অর্থনীতিতেই যোগ হবে বলে আশা করা যায়। সময় এসেছে শক্ত হাতে সাহসী পদক্ষেপ নেয়ার মাধ্যমে পাচারকৃত টাকা এবং কালো টাকা অর্থনীতির মূলধারায় ফিরিয়ে আনা। প্রবাসীদের পাঠানো বা আনা অর্থ কাজে লাগাতে সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তটিও এ ক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক। সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরা দেশের ব্যাংকে অর্থ সঞ্চয় করতে পারবেন। মাসিক ও ত্রৈমাসিক কিস্তিতে তারা সঞ্চয়ী হিসাবে টাকা জমা রাখতে পারবেন। দেশের প্রয়োজনে এসব হিসাবের বিপরীতে ঋণ সুবিধাও মিলবে। আবার এসব হিসাব থেকে বিদেশে টাকা নিতে চাইলে ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আগে প্রবাসীরা ব্যাংক হিসাব খোলার পাশাপাশি বন্ডে বিনিয়োগ করতে পারতেন। তবে এর আগে সঞ্চয় স্কিমে টাকা জমা রাখার সুযোগ ছিল না। বাংলাদেশ ব্যাংক ৯ আগস্ট এ সুযোগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এতে দেশের ব্যাংকগুলোকে প্রবাসীদের জন্য নতুন এ স্কিম চালুর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অপেক্ষা এখন এর সুফল দেখার। এর ফলে প্রবাসীরা বিদেশের পরিবর্তে দেশে সঞ্চয়ে আগ্রহী হবেন সেই আশা যেন দুরাশা না হয়।
এ প্রসঙ্গে সঞ্চয়পত্রের কথা একটু আনতে হয়। জাতীয় সঞ্চয় প্রকল্পের অধীনে সঞ্চয়পত্র বিক্রির মূল উদ্দেশ্য ছিল স্বল্প সঞ্চয়কারীদের বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি। এসব সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ব্যাংকিং খাত থেকে বেশি। কম আয়ের মানুষ এবং অবসর জীবনে কিংবা বৃদ্ধ বয়সে অনেকের এটাই প্রধান আয়ের উৎস হয়ে ওঠে। কিন্তু এক সময়ে কেবল খুদে নন, বৃহৎ সঞ্চয়কারীরাও এর প্রতি ঝুঁকে পড়েন। একশ্রেণির ধনাঢ্য ব্যক্তিও ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে ব্যবসায় নেমে পড়েন। এতে যাদের উদ্দেশ্যে এই প্রকল্প নেয়া হয়েছিল, সেই স্বল্প সঞ্চয়কারী তথা অবসরভোগী ও স্বল্প আয়ের মানুষগুলো বঞ্চিত হয়। ওই অবস্থায় এতে লাগাম টেনে ধরে সরকার। ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে এক লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কেনার জন্য কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) থাকা, অনলাইনে সঞ্চয়পত্র কেনা, মুনাফার ওপর কর আরোপ, এক নামে বেশি না কেনাসহ বিভিন্ন শর্ত দিয়ে বসে। পরিণতিতে এক বছরের ব্যবধানে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি কমেছে ৩৫ হাজার ৫১১ কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল ৪৯ হাজার ৯৩৯ কোটি টাকা। আর বিদায়ী ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিক্রি হয়েছে ১৪ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা। গত পাঁচ বছরে এটাই সবচেয়ে বেশি সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমে যাওয়া। করোনাকালে অনেকে সঞ্চয় ভেঙে খেয়েছেন। প্রবাসীদের কল্যাণে নেয়া সরকারের এ উদ্যোগটা যেন সঞ্চয়পত্রের মতো মার না খায়, শুরু থেকেই সতর্কতা কাম্য।

মোস্তফা কামাল : সাংবাদিক ও কলাম লেখক; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন।
[email protected]

ডিসি