রাজধানীতে বন্যার হানায় পানিবন্দি নগরবাসী

আগের সংবাদ

কক্সবাজার এসপির প্রত্যাহার চান সাবেক সেনা সদস্যরা

পরের সংবাদ

মুখোশওয়ালা

হাম্মাদ নূর

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ১০, ২০২০ , ২:২৯ অপরাহ্ণ

 

মাখন আলী। লোকে অবশ্য মুখোশ মাখন বলে হরহামেশাই ডাকে। এতে তার একপ্রকার গর্বই হয়। মাখন আলী যে বস্তিতে থাকে তার পাশেই নীল রংয়ের পাঁচতলার বাড়ির মালিকের নামও মাখন। তবে তাকে কেউ সোহাগ করে মুখোশ মাখন বলে না। মাখন আলী অলিগলি ঘুরে মুখোশ বা মাস্ক ফেরি করে বেড়ায়। বেচাবিক্রি নাই বললেই চলে। মাখনের হিংসা মানুষের উপরে। লোকে ‘সাহায্য চাই’ বলে হাত বাড়ালেই পাঁচ টাকা পেয়ে যায়, অথচ সে একটা পণ্যের বিনিময়ে পাঁচ টাকা চাইলে সেখানেও মাঝেমাঝে ডিসকাউন্ট দিতে হয়।
ফুলজান, মাখনের মেয়ে। দেখতে দেখতে বড় হয়ে গেল। অবশ্য সবকিছু দেখতে দেখতেই বেড়ে ওঠে।

এখন আব্বা বলে ডাক দেয়। মাখনের শক্ত বাসি রুটির মতো এবড়োখেবড়ো হাতে যখন মেয়ের মাথায় হাত বুলায় তখন মনে হয় সে এক টুকরো কোহিনূর নেড়েচেড়ে দেখছে। গরিবের ছেলেমেয়ে সুন্দর হতে নেই। এটা সমাজের প্রচলিত সত্য। তবুও অন্যায়ভাবে ফুলজান দেখতে খুব সুন্দর হয়েছে।

জ্যোৎস্না রাতের আলোয় ঘরের চাল ভেদ করে অবৈধভাবে প্রবেশ করা কিছু আলো চোখের পাশে এসে চিমটি কাটছে। তোতলা মুখে ফুলজান বলছে, আব্বা, গোত্ত কাব।
মাখনের মনে আছে গত কুরবানির ঈদে বেশকিছু গরুর মাংস ভাগ্যে জুটেছিল। এরপরে প্রায় আট মাস গেল গরুর মাংসের দেখা মিললেও জিহ্বে স্বাদ মেটানো হয়নি। তখন ফুলজান দুধ খেতো। সে জানে না মাংসের গন্ধ কেমন হয়। ছোট মানুষকে সান্ত¡না দেয়া সহজ, তাই সান্ত্বনা দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল মাখন আলী।

ভোরে উঠে চোখে পানি দিয়ে মুখোশের পুঁটলিটা নিয়ে ছুটল রাস্তায়। সকালবেলা কসাইরা মজা করে হাড্ডি কাটে। মাথায় গামছা পেঁচানো থাকে, মুখে পান গুঁজে ভুঁড়িটা রানের উপরে মেলে দিয়ে বসে হাড্ডিতে কোপ দিতে শুরু করে। মাখনের ইচ্ছা করে সে ব্যবসা পরিবর্তন করে কসাই পেশায় নামবে। অন্তত মাংস দিয়ে একবেলা খেতে তো পারবে! তবে শরীরের যে গঠন তাতে কসাই পেশায় সে বেমানান। মোটে তিপ্পান্ন কেজি ওজন তার।

গত মাসে মেপেছিল। এক কেজি বেড়েছে। আগে বায়ান্ন ছিল। হয়তো এই এক কেজি মাংসের ওজন না, বয়সের ওজন বেড়েছে। মোড়ের দোকানে চা খাওয়ার জন্য বসল মাখন। চারপাশের লোকগুলো যেন তার দিকে তেড়ে আসছে!

কারণ কি? কিছু না বুঝেই উঠে দৌড় দেবে ভাবছিল মাখন। কারণ শহরে কাকে কে কখন মারে, কোন দোষেই বা মারে তার হদিস নেই। এটা শহুরে মানুষের স্বভাববৈচিত্র্যই বলা যায়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে না গিয়ে দাঁড়াল সে। মানুষ তার দিকে আসছে মুখোশ কিনবে বলে! বলে কি! কাল সকালেও এই দোকানেই সে চা খেয়েছে। কিন্তু কেউ তো এমন তেড়ে আসেনি। আলাদিন বেচারা এই আধুনিক যুগে হয়তো সরাসরি দৈত্য না পাঠিয়ে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে তার কার্যক্রম চালায়। তা না হলে এই অবস্থা! মাখনের জীর্ণ ঝুলি মুহূর্তেই খালি করে দিল জনতা।
কয়েক’শ পিস মাস্ক। সুখাতঙ্কিত মাখন অতি সুখে হাসতেও ভুলে গেছে। ভাবছিল সারাদিন রোদ গায়ে করে পঞ্চাশ পিস মাস্ক বিক্রি করার সাধ্য হয় না, সেটা এখন পাঁচ মিনিটেই হয়ে গেল? কিছু কিছু সময় বাস্তবতাকেও রূপকথা মনে হয়।

কিন্তু এখন কী করবে সে? বাড়িতে চলে যাবে? হয়তো যাওয়াই ভালো হবে! মাখনের চাহিদা খুবই সামান্য। খেয়েপরে বাঁচতে পারলেই জীবনটা তার রাজার মতো মনে হয়। কিন্তু এই সাত সকালে বাড়ি ফিরে যাবে? একটাবার মহাজনের বাড়ি থেকে ঘুরে আসা যায় না? সমস্ত মাল পাঁচ মিনিটেই শেষ! যদি আরো কিছু মাল আনা যায় তাহলে কি মন্দ হয়? মাখন গিয়ে হাজির হলো মহাজনের বাড়ি। মুখে সবসময় হাসি থাকলেও আজকের হাসিতে মধুর পরিমাণ বেশি। খুব মিষ্টি করে হাসতে জানে মাখন। অভাবের কারণে চোয়ালের দুপাশটা যদিও ভেঙে পড়েছে তবে হাসিটা আসে ভেতর থেকে। প্রথমে ভেবেছিল মহাজনকে খুশির সংবাদটা দিবে। সব কথাই সে শেয়ার করে মহাজনের সঙ্গে। কিন্তু আজ ইরাদা থাকলেও কেন যেন বলা হলো না মাখনের।
মহাজনের কাছে চাইলো এক হাজার পিস মাস্ক। অবাক মহাজন তোতলাতে তোতলাতে বলল, মাখন! সারা মাসে তুই এক হাজার পিস বেচতে পারস না। আর আইজকে এক দিনেই নিতাসোস…? ব্যাপার কি ক তো!

মাখনের মুখ থেকে বের হয়ে যাচ্ছিল কিন্তু মনটা ধুক করে আটকে দিল। বলল, মহাজন সাব, খাটাখাটনি একটু করব ভাবতাছি। মাইয়াডা বড় হইতাসে! হেরও তো শখ আল্লাদ থাকে। তাই কামে একটু মনোযোগ দিব ভাবতাসি।

মহাজন মিটিমিটি হাসি দিয়ে এক হাজার পিস তুলে দিল মাখনের হাতে। মাখন বস্তা ঘাড়ে বের হলো গন্তব্যের দিকে। মন বলছে, এগুলো সব বিক্রি হয়ে যাবে। কিন্তু একটা জিনিস অজানা। মানুষ এত মাস্ক কিনছে ক্যান! বিষয়টা একটু ভাবায় মাখনকে। সে ভাবনা খুব সামান্য সময়ই মাথায় থাকে। সব ভাবনা ঝেড়ে মাখন বিক্রিতে মন দেয়।

মাস্ক লাগব মাস্ক… মৌচাকে ঢিল মারতে দেরি, মাছিগুলো উড়ে আসতে দেরি কওে না। ঠিক সে রকম মাখনেরও হলো। এবারো ফলাফল তাই…

কিন্তু মাখন ১০ টাকায় আর মাস্ক বিক্রি করতে পারল না। তার মন সায় দিল না। সোজা ১৫ টাকা হাঁক ছাড়ল। এতে করে জনমনে খুব বেশি প্রভাব পড়ল না। দু-চারজন প্রতিবাদ করলেও মাখন তাতে কান দিল না। এতে কাজ হলো। ঘণ্টা দুই দাঁড়াতেই মাখনের সব বিক্রি শেষ।
কিন্তু এবার কি করবে? বাড়ি? নাকি মহাজনের বাড়ি?

কোনদিকে যাবে ভাবতে থাকে। এখন মহাজনের কাছে গেলে নিশ্চিত সন্দেহ করবে। এত মাস্ক কীভাবে বিক্রি হচ্ছে! ঝামেলা হতে পারে। অবশেষে চিন্তা করে পুরনো এক মহাজনের কাছে গেল মাখন। সেখান থেকে তিন হাজার পিস আনলো। যদিও এই মাস্কগুলো বেশ নিম্নমানের। এই জন্যই এই মহাজনের থেকে জিনিস নেয় না সে। তবে আজ সে আনন্দের সঙ্গেই নিয়ে এলো। তবে এখন বাড়ি যাবে ঠিক করল।

এক কেজি গরুর মাংস নিয়ে বউয়ের হাতে দিল। এরপর রান্নাঘরের পাশে গিয়ে জমিদারি একটা পোজ নিয়ে বসল মাখন। রাহেলা, মাখনের বউ শুধু অবাক হয়ে দেখছে কারবার। এক কেজি গরুর মাংস পাঁচ বছরে কেনেনি মাখন! একবার হাফ কেজি আনছিল। তবে দিন তারিখ মনে নেই। কিন্তু জিজ্ঞেস করতে সাহস পেল না। হয়তো মেয়ের শখ মেটাতেই কিনেছে। বাবা বলে কথা! কিন্তু মনে মনে খুশিই হয়েছে রাহেলা। কতদিন পরে আজকে মাংস খাবে! মাখন মুখে পান গুঁজে বউয়ের দিকে ভালোবাসার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল। হয়তো সে কিছু ভাবছে। একটু পরে মাংসের ঝাঁঝালো গন্ধে বাড়ি মাতাল হয়ে গেল।

রাতের বেলায় শুয়ে শুয়ে মাখন ভাবছে, এবার নতুন কিছু করতে হবে। জীবনের হয়তো এটাই সুযোগ! আল্লাহ সবসময় সুযোগ দেয় না, কিন্তু যখন দেয় তা লুফে নিতে হয়। এটা ধর্মের বাণী না, তবে মাখনের মনের সরল বিশ্বাস। যদিও পুরোটা সরল না। সকালে মাখন বের হলো আজকে ১০ পনেরো না একেবারে ৩০ টাকা দাম হাঁকলো। অদ্ভুত রকমের মানুষগুলো বড় কোনো প্রতিবাদ ছাড়াই কিনতে শুরু করল। এভাবে প্রতিদিন দাম বাড়তে থাকল মাস্কের। বিগত এক সপ্তাহে মাখনের সংগ্রহে লাখ টাকা জমে গেল। মাখন জীবনে কোনোদিন দেখেনি লাখ টাকা। তবে এখন তার হাতের মাঝেই মৃদু বাতাসে দুলছে লাখ টাকা।

টাকার গরমে মানুষ গরম হয়ে যায়। কথাটার সত্যতা যাই হোক, মাখনের শরীরটা সত্যি গরম হতে শুরু করল। গত কয়েকদিন টানা পরিশ্রম করায় ঠা-া লেগেছে তার। খুকখুক করে কাশিও হচ্ছে। আজ থেকে জ্বরও বাসা বাঁধলো। ফার্মেসি থেকে কিছু নাপা আর ঠা-ার সিরাপ নিয়ে ঘরে ফিরল। কিন্তু ওষুধে জ্বরের কোনো ক্ষতি হলো না। বরং মাখনই দুর্বল হয়ে পড়ল। বালিশের নিচে লাখ টাকার বান্ডিলটা দেখে মাখন। কিন্তু ভিতরটা কেমন বন্ধ বন্ধ লাগছে। শ্বাস নিতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে তার। বউয়ের কথায় ডাক্তারের পরামর্শ নিতে গেল মাখন। ডাক্তার পরীক্ষা করলেন। হাসপাতাল ভরা রোগী… মাখন দেখল সবাই মুখে মাস্ক পরে আছে। তারই দেয়া মাস্কগুলো। কি এক ভাইরাস নাকি এসেছে দেশে। মাখনের রিপোর্টে ধরা পড়ল সেই ভাইরাস।
সবাই মাখনের দিকে অপরাধীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। পকেটে টাকার বান্ডিলটা ছুঁয়ে দেখল আরেকবার। কেউ আর তাকে স্পর্শ করছে না। সবার মুখে মাস্ক তার মুখে মাস্ক নেই… বাইরের বাতাস প্রচ- রকম ভারী মনে হলো মাখনের কাছে। নাকের সামান্য ফাঁকা দিয়ে ঢুকতে চাইছে না অক্সিজেন।

মুখোশাবৃত শত শত মানুষের ভিড়ে সে মুখোশহীন মুখোশওয়ালা।যে অন্যের মুখোশ পরাতে ব্যস্ত তার নিজের মুখোশ পরার সময় কোথায়?

– রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

পিআর