শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী ও তাঁর অমর বার্তা

আগের সংবাদ

কবে শিক্ষাঙ্গনে প্রাণ ফিরে আসবে

পরের সংবাদ

দুঃসময়ে সুসংবাদ : রেমিট্যান্স প্রসঙ্গ

মজিবর রহমান

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ১০, ২০২০ , ১০:৩২ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশ প্রকৃতই ব্যতিক্রম। হিসাব মেলে না অনেক কিছুরই। করোনা ভাইরাসের প্রকোপে দেশের অর্থনীতি লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবে ধরে নেয়া হয়েছিল। অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে তো বটেই, মনে করা হচ্ছিল বৈদেশিক বাণিজ্যে ধস নামবে। রপ্তানি আয় কমবে, প্রবাসীদের রেমিট্যান্স সংকুচিত হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ হ্রাস পাবে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। রপ্তানি বাড়ছে, বাড়ছে রেমিট্যান্স, সঙ্গে বাড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি বিপর্যয়ের শিকার হলেও মুখথুবড়ে পড়েনি। করোনার বিপর্যয়ের ভেতর এলো বন্যা ও নদীভাঙন। এরকম ভয়াবহ প্রতিক‚লতার ভেতরও মানুষ মাথা তুলে দাঁড়াতে শুরু করেছেন।
রপ্তানি বাণিজ্যের কথা বলছিলাম। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর হিসাব মতে, গত জুলাই মাসে মোট ৩৯১ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অর্জন ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি, বিগত ১৩ মাসের মাসওয়ারি হিসাবে সর্বোচ্চ। অর্জনের সিংহভাগ যথারীতি পোশাকশিল্প খাতের অবদান। অনেক অপবাদ মাথায় নিয়ে তারা এই অসাধ্য সাধন করেছে। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত থেকে দেখা যাচ্ছে, ৩৯১ কোটি ডলারের ভেতর ৩২৪ কোটি ডলার এসেছে পোশাক শিল্প খাত থেকে। প্রবৃদ্ধি ভালো ছিল প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রপ্তানিরও। বিগত বছরের একই সময়ের চেয়ে এ খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩১ শতাংশ। পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানিতেও এ সময় সুখবর ছিল। ৩৮ দশমিক ২৩ শতাংশ বেশি রপ্তানি হয়েছে পাট ও পাটজাত পণ্য। দুঃখজনক যে পাটের এই সুসময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো একযোগে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তাতে বেকার হয়েছেন হাজার হাজার শ্রমিক। করোনার কঠিন সময়ে এরকম ব্যাপক বেকারত্ব মেনে নেয়া যায় না। সুযোগ হলে এ নিয়ে পরে অন্য কোনোদিন আলোচনা করব।
সবাই অবহিত আছেন, আমাদের মোট রপ্তানির হ্রাস-বৃদ্ধি নির্ভরশীল তৈরি পোশাকশিল্প খাতের ওপর। জুলাই মাসের উৎসাহব্যঞ্জক রপ্তানিতে এ খাতের অবদান উল্লেখ করেছি। বেশ কিছু কারণে এরকম আশাতীত অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। মালিক-শ্রমিক উভয়পক্ষ ভাইরাসের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে উৎপাদনের গতি বাড়িয়ে রপ্তানির আদেশগুলো রক্ষা করেছেন। সক্ষমতা বিবেচনা
করে আদেশদাতারাও তাদের স্থগিতকৃত আদেশগুলো আবার সচল করেছেন। সরকার এবং ব্যাংকের অবদানও এক্ষেত্রে প্রশংসনীয়। সরকার শ্রমিকদের মজুরি প্রদানের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার যে প্রণোদনা প্যাকেজ সময়মতো ঘোষণা করেছিল তা খুব কাজে দিয়েছে। প্রায় ১ হাজার ৮শ কারখানা এর সুযোগ নিয়েছে। প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন করেছে ব্যাংক। করোনা ভাইরাসের ভয়ে অধিকাংশ পেশজীবী যখন ঘরে আবদ্ধ তখন ব্যাংকাররা সুরক্ষা সামগ্রীবিহীন অবস্থায় অফিস করে প্রণোদনার অর্থ বিতরণ করেছেন। এলসি খুলেছেন রপ্তানির। ঈদের ছুটির কারণে আগস্ট মাসের রপ্তানিতে কিছুটা ভাটা পড়তে পারে হয়তো, কিন্তু আশা করা যায় পরে তা গতি পাবে।
আশাব্যঞ্জক চিত্র আছে প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রেও। মার্চ-এপ্রিলের মন্দা কাটিয়ে মে মাস থেকেই রেমিট্যান্স প্রবাহ গতি পেতে শুরু করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, মে মাসে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল ১৫০৪ দশমিক ৬০ মিলিয়ন ডলার, জুনে ১৮৩২ দশমিক ৬৩ মিলিয়ন ডলার। আর জুলাই মাসে সে অঙ্ক দাঁড়ায় রেকর্ড পরিমাণ ২৫৯৯ দশমিক ৫৬ মিলিয়ন ডলার। অনেকের মতামত এরকম যে বসবাসরত দেশে সংকট হতে পারে এ আশঙ্কায় প্রবাসীরা তাদের সঞ্চিত অর্থ দেশে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। তাতে রেমিট্যান্স বৃদ্ধি পাচ্ছে। যুক্তি আংশিক সত্য হয়তো বা। তবে আরো কারণ আছে এর পেছনে। প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থের একটা বড় অংশ দেশে আসত হুন্ডির মাধ্যমে। হুন্ডি পরিহার করে প্রবাসীরা যাতে ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ প্রেরণে উৎসাহিত হয় সেজন্য সরকারের তরফ থেকে ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছিল। পদক্ষেপ কাজে দিয়েছে, প্রবাসীরা পূর্বের তুলনায় বেশি অর্থ প্রেরণ করছেন ব্যাংকের মাধ্যমে। তাছাড়া রেমিট্যান্স আহরণের জন্য বিভিন্ন ব্যাংকের ভেতর তীব্র প্রতিযোগিতা আছে। তারাও দেশে-বিদেশে প্রচারণা ও রেমিট্যান্স সার্ভিসের মানোন্নয়ন ঘটিয়ে রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে অবদান রাখছেন। ঈদুল আজহা আসন্ন ছিল বলে হয়তো জুলাই মাসে রেমিট্যান্স বেশি এসেছে, তবে হুন্ডি নিয়ে সতর্ক থাকলে ভবিষ্যতেও এ নিয়ে হতাশ হতে হবে না।
অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির কথা শুরুতেই বলছিলাম। করোনার প্রভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নিঃসন্দেহে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন শহরাঞ্চলের মানুষ। বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মহীন হয়েছেন। অনেকে কর্মহারা না হলেও বেতন হ্রাস বা কম রোজগারের কবলে পড়েছেন। করোনা পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ায় এবং ভাইরাসটির সঙ্গে মানিয়ে চলার
প্রবণতা সৃষ্টি হওয়ায় ধীরে ধীরে মানুষ কাজে ফিরতে শুরু করেছেন। যদিও সরকারি বেতনভুক্তদের বাদ দিলে প্রায় সবারই আয়-রোজগার কমে গেছে। দেশজুড়ে বড় ধরনের সমস্যা এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে। এগুলোর সবই বন্ধ আছে। মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন ধাঁচের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অগুনতি। এতে যারা শিক্ষক বা কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন তাদের সংখ্যা বিপুল। মোট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তুলনায় সরকারি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা নগণ্য। সরকারি সহায়তাপ্রাপ্ত এসব প্রতিষ্ঠান বাদ দিলে অন্যরা বেতনভাতা বলতে গেলে পাচ্ছেনই না। ফলে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তারা। আত্মসম্মানবোধের কারণে তারা হাতও পাততে পারছেন না কারোর কাছে। সরকারও তাদের সহায়তার ব্যাপারে তেমন ভাবছে বোধহয় না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার প্রভাব ব্যাপক। এর উপকরণের ব্যবসার সঙ্গে যারা যুক্ত তারা কষ্টে আছেন, কষ্টে আছেন যাতায়াত-সহযোগীরা। স্বাস্থ্যবিধি মেনে যত তাড়াতাড়ি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো চালু করা যায় ততই মঙ্গল। শিক্ষার্থীরা ঘরে আবদ্ধ থেকে মানসিকপীড়াগ্রস্ত হচ্ছে এটিও দুশ্চিন্তার কারণ।
চলমান বন্যা পরিস্থিতি গোদের ওপর বিষফোড়া হয়ে যন্ত্রণার ভীষণ কারণ হচ্ছে। প্রাথমিক হিসাব-নিকাশের পর গণমাধ্যম আনুমানিক ১ হাজার কোটি টাকা ক্ষতির হিসাব দিচ্ছে কৃষি খাতে। আউশ ধানের আবাদ বিপন্ন হয়েছে, নষ্ট হয়েছে আমন ধানের বীজতলা, সবজি চাষ বিনষ্ট হয়েছে। বানের পানি এখনো না সরায় আমনের আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে অবকাঠামোর। রাস্তা ভেঙেছে, ভেঙেছে বাঁধ-কালভার্ট-ব্রিজ। ধসে গিয়েছে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ঝরে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অনেক শিক্ষার্থীর। সব মিলিয়ে সর্বমুখীন সহায়তা দরকার। এক্ষেত্রে সঠিক পরিকল্পনা ও স্বচ্ছতার বিকল্প নেই।
সামষ্টিক অর্থনীতির সুসংবাদ দিয়ে লেখাটি শুরু করেছিলাম। শেষাংশে সঙ্গত কারণেই ব্যষ্টিক অর্থনীতির দুর্দশার কথা এসে গেল। দুর্দশা কাটানোর সামর্থ্য জাতির আছে। দেশের আমজনতা যথেষ্ট কর্মঠ, তাদের সৃষ্টিশীলতারও ঘাটতি নেই। নীতি সহায়তা পেলে মানুষের ঘুরে দাঁড়াতে সময় লাগবে না। সরকারের অর্থনৈতিক ভিতও আগের মতো দুর্বল নেই। বিদেশ-সংযোগ ভালো থাকায় বিশ্ব সম্প্রদায়ের শক্তিশালী অনেককেই পাশে পাবে সরকার। অর্থের টানাপড়েন হবে বলে মনে হয় না। সমস্যা হলো সেই অর্থের ব্যবহার নিয়ে। বেড়ায় খেত খায়। অসততা কতটা প্রবল জাতি তা প্রত্যক্ষ করেছে করোনাকালে স্বাস্থ্য খাতে নেয়া বিভিন্ন উদ্যোগ থেকে। ত্রাণ বিতরণেও বেরিয়ে এসেছে কদর্য চেহারা। জোচ্চুরদের দমনে জাতি একজোট আছে। ক্ষমতা সরকারের হাতে। সরকার সত্যিকার অর্থেই এদের দমন করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায় কিনা সময় সাক্ষ্য দেবে।

মজিবর রহমান : কলাম লেখক।
মেইল: [email protected]

ডিসি