আবারো ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জানাজায় মানুষের ঢল

আগের সংবাদ

প্রদীপ ও লিয়াকতের রিমান্ড নিয়ে ধোঁয়াশা

পরের সংবাদ

সিনহা হত্যাকাণ্ড

কাল হলো সাক্ষাৎকারই!

কক্সবাজার প্রতিনিধি

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ১০, ২০২০ , ৯:১০ পূর্বাহ্ণ

টেকনাফে পুলিশের গুলিতে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান আদনান নিহত হওয়ার পর সেখানকার পুলিশের অপকীর্তি এখন মুখে মুখে। এতদিন ‘ক্রসফায়ার আতঙ্কে’ কেউ মুখ খুলতে সাহস না পেলেও ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের বর্ণনায় উঠে আসছে লোমহর্ষক অনেক ঘটনার বিবরণ। কারাফটকে শনিবার র‌্যাব কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে ৪ পুলিশ সদস্য ওই দিনের ঘটনা বর্ণনা করেছেন। পৃথকভাবে তাদের জবানবন্দি রেকর্ড করার পর তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এরই মধ্যে বেরিয়ে এসেছে সিনহার মৃত্যুর কারণ নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য। মৃত্যুর মাত্র সাড়ে ৫ ঘণ্টা আগে একটি ডকুমেন্টারির জন্য ওসি প্রদীপের ভিডিও সাক্ষাৎকার নেন সিনহা। এতে প্রদীপের মুখ থেকে মাদক কানেকশনের যোগসূত্র বেরিয়ে গেলে ক্ষুব্ধ হন তিনি। এরপরই সিনহাকে হত্যার ছক আঁকেন প্রদীপ।

এদিকে কক্সবাজার জেলগেটে গতকাল রবিবার এএসআই লিটন মিয়া, কনস্টেবল সাফানুর করিম, কামাল হোসেন ও আবদুল্লাহ আল মামুনের নাম-ঠিকানা ও তথ্য যাচাই-বাছাই করেছে র‌্যাব। ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ ৩ জনকে আজ র‌্যাব হেফাজতে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হবে। সিনহা নিহতের পর মাদক মামলায় গ্রেপ্তার স্ট্যাম্পফোর্ডের শিক্ষার্থী শিপ্রা দেবনাথ জামিনে ছাড়া পেয়েছেন। সিনহার অপর সহযোগী সাহেদুল ইসলাম সিফাতের জামিন আবেদনের শুনানি হবে আজ।

মামলার তদন্ত প্রসঙ্গে র‌্যাব লিগ্যাল এন্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ গতকাল জানান, মামলার বাদী প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা মতে এজাহার দায়ের করেছেন। তবে এজাহারে বর্ণিত এসআই টুটুল ও কনস্টেবল মোস্তফা নামে কোনো পুলিশ সদস্য টেকনাফ থানা বা বাহারছড়া ফাঁড়িতে কর্মরত থাকার তথ্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ ব্যাপারে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে একটি লিখিত প্রতিবেদন দিবেন। তিনি জানান, ওসি প্রদীপ, এসআই লিয়াকত ও এসআই নন্দদুলাল রক্ষিতকে সোমবার রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হবে। কারাফটকে ৪ জনের তথ্য যাচাই-বাছাই করা হয়েছে।

অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া বাংলাদেশ প্রতিদিনের সিনিয়র সাংবাদিক সাইদুর রহমান রিমানের একটি পোস্টে দেখা গেছে, সিনহা টানা কয়েকদিন ইয়াবা বাণিজ্যের নেপথ্য কাহিনী নিয়ে ডকুমেন্টারি তৈরির শেষ মুহূর্তে পুলিশের টার্গেট হন। ডকুমেন্টারি তৈরির শেষ মুহূর্তে টেকনাফের ওসি প্রদীপ কুমার দাশের সাক্ষাৎকার রেকর্ডের সময় সিনহার প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে ভড়কে যান প্রদীপ। ইয়াবা ব্যবসা, কারবারি ও ক্রসফায়ার নিয়ে সিনহার প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে বারবার আটকে যান তিনি। ৩১ জুলাই ঘটনার দিন বিকাল ৪টার দিকে থানার ভেতরে সিনহার লাগাতার প্রশ্নের মুখে ইয়াবা ব্যবসা-পাচারে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রদীপ ও তার ঘনিষ্ঠদের জড়িত থাকার তথ্য উঠে আসে। সাক্ষাৎকার নেয়ার পর সিনহা দ্রুত থানা থেকে বের হয়ে নিজের গাড়িতে উঠেন। তার সঙ্গে ভিডিও রেকর্ডিংয়ে থাকা সাহেদুল ইসলাম সিফাত ক্যামেরা, ট্রাইপড, ব্যাগ গুছিয়ে গাড়িতে উঠতেই টেকনাফ সদর ছেড়ে গাড়িটি ছুটতে থাকে উত্তর দিকে বাহারছড়ার পথে।

অন্যদিকে, থানা থেকে সিনহা বেরিয়ে যেতেই প্রদীপ কক্সবাজারের এসপি এবিএম মাসুদকে ফোন করে বিস্তারিত জানান। খবর শুনে এসপি নিজেও বিব্রত হন। এর মধ্যে প্রদীপ ঘনিষ্ঠ খলনায়ক ইলিয়াস কোবরাকে দায়িত্ব দেয়া হয় কৌশলে সন্ধ্যা পর্যন্ত সিনহাকে তার নিভৃত পাহাড়ি গ্রামে ব্যস্ত রাখার। বাহারছড়া সংলগ্ন মারিসঘোণা এলাকাতেই থাকেন চলচ্চিত্রের ফাইটিং গ্রুপ পরিচালনাকারী খলনায়ক ইলিয়াস কোবরা। এর মধ্যে তিনি হঠাৎ ফোন করেন সিনহাকে। কোবরার আমন্ত্রণ এড়াতে পারেননি সিনহা।

ইলিয়াস কোবরা বিকাল সাড়ে ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সিনহাকে মারিসঘোণায় নিজের বাগানবাড়ি ঘুরিয়ে দেখান। এর মধ্যে সিনহার অবস্থান এবং কতক্ষণ পর কোন রাস্তায় কোথায় যাবেন সেসব তথ্য জানিয়ে কোবরা ৯টি এসএমএস পাঠান প্রদীপকে। ভিডিও যাতে ফাঁস না হয় সে জন্য সিনহাকে গণপিটুনিতে হত্যার জন্য গ্রামে ডাকাত পড়েছে এমন প্রচার করে গ্রামবাসীকে উসকে দেয় পুলিশ। ব্যবহার করা হয় ওই এলাকার কমিউনিটি পুলিশ সদস্যদের। দক্ষিণের বড়ডিল পয়েন্টে ও উত্তরদিকের শামলাপুর চেকপোস্টে অবস্থান নেয় লিয়াকতের টিম। এর মধ্যে সাদা রংয়ের নোহা মাইক্রোবাসে টিম নিয়ে ওই পথে বের হন প্রদীপ। সন্ধ্যা ৭টার দিকে ইলিয়াস কোবরা প্রদীপকে ফোন করে জানান, সিনহা ও তার ভিডিওম্যান সিফাত মারিসঘোণার পাহাড় চূড়ায় উঠছেন। পাহাড়ের ওপর থেকে মেরিন ড্রাইভ, টেকনাফ সদর, নাফ নদী-মিয়ানমার সীমান্ত এবং দক্ষিণ দিকে সমুদ্রের বিস্তীর্ণ অংশ দেখা যায়। গভীর সমুদ্রের দিক থেকে ছোট-বড় ইঞ্জিনবোটগুলো সার্চ লাইটের আলো ফেলে সমুদ্র সৈকতের দিকে আসতে থাকে, আবার ডজন ডজন ইঞ্জিনবোট সমুদ্র সৈকত ছেড়ে গভীর সমুদ্রের দিকে যেতে থাকে। পুরো দৃশ্যপটের ভিডিওচিত্র ছিল তার ডকুমেন্টারির শেষ দৃশ্য। এ দৃশ্যপটের সঙ্গে নেপথ্য কণ্ঠজুড়ে দিতে চান সিনহা। তিনি বলতে চান- ‘রাত যত গভীর হয়, আধারে নিমজ্জিত হয় সমুদ্রের মাইলের পর মাইল জলরাশি, ঠিক তখনই টেকনাফ সীমান্তঘেষা জনপদের কয়েকশ’ মানুষ জেগে উঠেন, তারা মেতে উঠেন অন্যরকম কর্মযজ্ঞে। শত শত ইঞ্জিনবোট হঠাৎ করেই যেন সমুদ্রের পানি ফুড়ে উঠে আসে উপরে, এদিক-সেদিক ঘোরাফেরা করেই ট্রলারগুলো অজ্ঞাত গন্তব্যে ছুটে যায়। তখন এসব ট্রলারের প্রতিটি হয়ে উঠে কোটি টাকার সম্পদ। কোনো ট্রলারে থাকে পাচারের শিকার নারী-পুরুষ, কোনোটায় ভরাট থাকে লাখ লাখ পিস ইয়াবা। আবার গভীর সমুদ্রে অপেক্ষমাণ মাদার ভেসেল থেকে কোনো কোনো ট্রলারে নামিয়ে আনা হয় একে-৪৭ রাইফেল, থাকে আরজিএস গ্রেনেডের ছড়াছড়ি’।

ইলিয়াস কোবরা মোবাইল ফোনে ওসিকে জানান, সিনহা তার টিম নিয়ে পাহাড় থেকে নেমে কিছু সময়ের জন্য মেরিন ড্রাইভ ব্যবহার করে টেকনাফের দিকে যেতে পারেন। তারপর সেখান থেকে ফিরবেন হিমছড়ির নীলিমা রিসোর্টে। বার্তা পেয়ে সিনহার মরণফাঁদ তৈরি করেন প্রদীপ। মারিসঘোণা থেকে টেকনাফ যাওয়ার পথে তিন কিলোমিটার দূরের বড়ডিল নামক স্থানে প্রদীপ ও তার সঙ্গীরা সিনহার অপেক্ষায় থাকেন। এর মধ্যেই ওসি প্রদীপ মারিসঘোণা এলাকার দুই সোর্স ছাড়াও স্থানীয় আবদুল গফুর মেম্বার, হাজী ইসলাম, মুফতি কেফায়েত উল্লাহ ও হায়দার আলীকে ফোন করে জানান, মারিসঘোণা পাহাড়ের চূড়ায় বেশ কয়েকজন ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে জড়ো হয়েছে। তারা কেউ পাহাড় থেকে নামার চেষ্টা করলেই যেন এলাকার লোকজনকে নিয়ে ডাকাত ডাকাত চিৎকার করে তাদের গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলে। বাকি সব ওসি দেখবেন এবং এ জন্য তিনি মারিসঘোণার দিকে রওনা দিয়েছেন বলেও জানান। ওসির কাছ থেকে পাওয়া এমন খবর পাহাড় সংলগ্ন চারপাশে মুহূর্তে ছড়িয়ে যায়। অবস্থা বুঝে সিনহা নিচে নামতেই ডাকাত ডাকাত চিৎকার শুনতে পান। তিনি কৌশলে প্রায় আধা কিলোমিটার জায়গা পেরিয়ে পাকা সড়কে পৌঁছে যান এবং দ্রুত নিজের গাড়িতে উঠেই উত্তরদিকে হিমছড়ির দিকে রওনা হন।

এদিকে, বাহারছড়ার মারিসঘোণা থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে শামলাপুরের চেকপোস্টে অপেক্ষায় ছিল লিয়াকতের টিম। এ নিয়ে প্রদীপের সঙ্গে কথা হয় লিয়াকতের। সিনহার গাড়িটি সেখানে পৌঁছামাত্রই খুব কাছ থেকে অস্ত্র তাক করে তাদের হাত তুলে সামনের দিকে মুখ করে নামতে বলেন লিয়াকত। তারা গাড়ি থেকে নামতেই লিয়াকত পর পর ৪টি গুলি করেন সিনহার দেহে। লুটিয়ে পড়েন তিনি। বড়ডিল এলাকায় থাকা এ খবর শুনে ১৫-১৬ মিনিটের মধ্যে শামলাপুর ক্যাম্পে পৌঁছেন ওসি প্রদীপ। লুটিয়ে পড়া সিনহার দেহে বুট দিয়ে চেপে ধরে নিজের অস্ত্র থেকে পর পর দুটি গুলি করে লাথি মেরে নিথর দেহ রাস্তার ধারে ফেলে দেন। এর অনেক সময় পর পিকআপে করে সিনহাকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। হাসপাতালে পৌঁছার আগেই তার মৃত্যু হয়। অবশ্য এ ঘটনার সঙ্গে যোগসূত্র নেই এবং সামাজিকভাবে হেয় করতে তার যোগসূত্র রটানো হচ্ছে বলে দাবি করেছেন খলনায়ক ইলিয়াস কোবরা।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার (এসপি) এ বি এম মাসুদ বলেছেন, সিনহা ঘটনার দিন বিকালে টেকনাফ থানায় গিয়েছিলেন এমন কিছু তার জানা নেই। তিনি এর বেশি কিছু বলতে অপরাগতাও প্রকাশ করেন।

প্রসঙ্গত, গত ৩১ জুলাই রাত সাড়ে ১০টার দিকে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সাবেক মেজর সিনহা মোহা. রাশেদ খান। এ ঘটনায় চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানকে প্রধান করে একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। একইভাবে তদন্তের স্বার্থে টেকনাফের বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ লিয়াকত আলিসহ ২০ পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার ও ৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পিআর