দুঃসময়ে সুসংবাদ : রেমিট্যান্স প্রসঙ্গ

আগের সংবাদ

বিতর্কমুক্ত স্বচ্ছ তালিকা হোক

পরের সংবাদ

কবে শিক্ষাঙ্গনে প্রাণ ফিরে আসবে

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ১০, ২০২০ , ১০:৩৫ অপরাহ্ণ

করোনা ভাইরাস গোটা বিশ্বব্যাপী মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে উলট-পালট করে দিয়েছে। এখনো করোনার সংক্রমণ থেকে আমাদের জীবন কবে নিরাপদ হবে তার কোনো নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারছে না। ইতোমধ্যেই বিশ্বের অনেক দেশেই করোনার সংক্রমণে দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়েছে। সুতরাং আমরাও নিশ্চিত নই করোনার দ্বিতীয় ঢেউ থেকে আমরা মুক্ত থাকতে পারব কিনা? তবে প্রথম ঢেউই আমাদের আর্থ-সামাজিক থেকে সর্বক্ষেত্রে যে এলোমেলো সৃষ্টি হয়ে গেছে তাতেই বেশিরভাগ মানুষের জীবন-জীবিকা ও বেঁচে থাকা নিয়ে সন্দিহান হয়ে উঠছে। এর মধ্যে দেশে আম্ফান ও দীর্ঘমেয়াদি বন্যায় অনেক মানুষ জীবনের সব হারিয়ে পথে বসার অবস্থা। বাংলাদেশের বিরাট সংখ্যক এলাকায় বানভাসি মানুষ আর নদী ভাঙা মানুষের স্রোত এখনো শুকনো জায়গার সন্ধানে বেড়াচ্ছে। একদিকে করোনা ভাইরাস অন্যদিকে বন্যা ও নদীভাঙনের শিকার মানুষের হাহাকার আমাদের জীবনকে আরো যেন বেশি করে স্বপ্নহীন করে তুলেছে। সবচেয়ে দুর্ভাবনার বিষয় হয়ে উঠেছে শিশু-কিশোর, তরুণদের ভবিষ্যৎ চিন্তা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে সেই মার্চ মাসে। অনেক শিশুই ঘরে নিরানন্দ জীবনযাপন করছে। গ্রামের শিশু শিক্ষার্থীদের জীবন পুরোপুরিই লেখাপড়া থেকে দূরে সরে গেছে। যদিও অনলাইন পদ্ধতিতে সরকার পাঠদানের একটি উদ্যোগ নিয়েছে, সংসদ টিভির মাধ্যমে স্কুল শিক্ষার্থীরা কিছু কিছু পাঠ শেখার সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু তাতে কত সংখ্যক শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হচ্ছে তা কেউ বলতে পারছে না। শহরের কিছু কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনলাইন পদ্ধতির পাঠদান নিয়ে শিক্ষার্থীদের ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করছে। তাতে সমস্যা যেটি দেখা যাচ্ছে তা হচ্ছে শিশু-কিশোরদের বড় অংশই অনলাইন অনুসরণ করতে গিয়ে চোখের সমস্যায় ভুগছে। তাদের বিশ্রাম যেমন খুব একটা হচ্ছে না, ঘরে বসে বদ্ধ অবস্থায় অনলাইন ক্লাসের চাপ অনেকেই ঠিকমতো নিতে পারছে না। এসব সমস্যা শহরের কিছুসংখ্যক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক। বাকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আগে থেকে শিক্ষার্থীদের অনলাইন পদ্ধতিতে ক্লাস নেয়ার সুযোগ কতটা সৃষ্টি করা গেছে সেটা নিয়ে প্রশ্ন আছে। আমাদের শিক্ষকরা মূলতই ফেস টু ফেস (মুখোমুখি) পদ্ধতিতে পাঠদানে অভ্যস্ত। শিক্ষার্থীরাও তাই কিন্তু করোনা সংক্রমণের পর থেকে উভয় সংকটে পড়েছে অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। অভিভাবকরা আছেন হতাশার মধ্যে। এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হওয়ার পর সবেমাত্র ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু করা গেল। এটি শেষ হতে এক মাসেরও বেশি সময় দরকার হবে। কিন্তু এইচএসসি পরীক্ষাই অনুষ্ঠিত করা গেল না। করোনার সংক্রমণ নিম্নগামী না হওয়া পর্যন্ত এত বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার্থীকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে পরীক্ষা নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। শুধু পরীক্ষার্থীই নয় শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও সংশ্লিষ্টতা এর সঙ্গে অপরিহার্য। তবে আগস্ট মাসটি পর্যবেক্ষণ করে বিশেষজ্ঞরা মতামত দিতে পারবেন সেপ্টেম্বর শেষে এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত করা যাবে কিনা। যদি সেপ্টেম্বর মাঝামাঝি পরবর্তী সময়ে এইচএসসি পরীক্ষা নেয়ার অনুক‚ল পরিবেশ সৃষ্টি হয় তাহলে স্কুল-কলেজগুলো আরো এক মাস পরীক্ষার কাজে ব্যবহৃত হবে। তাতেও শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে ফিরে আসা সম্ভব হবে না। সবকিছুই নির্ভর করবে সংক্রমণ প্রবণতা নিম্নগামী হওয়ার ওপর। যদি নিম্নগামী না থেকেও বর্তমান অবস্থাটি প্রলম্বিত হয় তাহলেও পাবলিক পরীক্ষা নেয়ার ঝুঁকি প্রশাসন নিতে রাজি হবে বলে মনে হয় না, অভিভাবকরাও চাইবেন না সন্তানদের জীবন নিয়ে সমস্যায় পড়তে। এ ধরনের এক জটিল বাস্তবতা মুখোমুখি আমরা সবাই কমবেশি রয়েছি। পৃথিবীর অন্য দেশগুলোতেও শিক্ষাঙ্গনের হালচাল প্রায় একই রকম। যে কারণে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে পৃথিবীর শতকোটি শিক্ষার্থীর জীবন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বছরটি গড়িয়ে গেল, শিক্ষার্থীরা শিক্ষাঙ্গনের স্পর্শ খুঁজে পায়নি, বইপুস্তক আর নিয়মিত পাঠ পঠন-পাঠনের প্রক্রিয়া থেকেও বঞ্চিত হয়েছে। এই এক বছরের শিক্ষাজীবন থেকে বঞ্চিত হওয়ার ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া মোটেও সহজ কাজ হবে না। আমাদের মতো অনেক দেশে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অর্থ সংকটে বন্ধ হয়ে যাবে। আবার অনেক অভিভাবক অর্থনৈতিক সংকটের কারণে শিশুদের শিক্ষাঙ্গনে পাঠাতে নাও পারেন। ফলে দরিদ্র ও প্রান্তিক শিশু-কিশোররা এমনিতেই মানসম্মত শিক্ষার যে অভাবে পড়ত তারা এখন হয়তো শিক্ষা জীবন থেকেই ঝরে পড়তে বাধ্য হবে। খাদ্যের সংস্থান করতে অনেককেই শিশুশ্রম দিতে হতে পারে। বাংলাদেশেও অসংখ্য শিশু-কিশোর রয়ে গেছে যাদের শিক্ষাঙ্গনে ফিরে আসার সম্ভাবনা কমে গেছে। তাদের অনেকের পরিবার শহর ছেড়ে গ্রামে আশ্রয় নিয়েছে। গ্রামে তারা কাজের সন্ধান কতটা করতে সক্ষম হবে তার ওপর নির্ভর করবে শিশুদের গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করানো। এ তো গেল প্রাথমিক বা মাধ্যমিক শিক্ষার কথা। এক্ষেত্রে বিরাট ধরনের ভাঙন ও পরিবর্তন আসবেই এতে কোনো সন্দেহ নেই।
উচ্চ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার অবস্থাও কী রূপ পরিগ্রহ করবে তা বলা মুশকিল। তবে বেসরকারি বেশকিছু নামি-দামি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির যে পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে তাতে উদ্বেগ অনেকটাই বেড়ে গেছে। কাম্যসংখ্যক শিক্ষার্থী নতুন সেশনে ভর্তি হয়নিÑ এ কারণে খণ্ডকালীন শিক্ষকদের চাহিদাও অনেকটাই কমে গেছে। কেননা নিয়মিত শিক্ষকদেরই ক্লাস দেয়ার মতো শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি। এটি যদি হয় নামি-দামি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা তাহলে মানহীন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থা কী হবে তা কেবল পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই বুঝা যাবে। এটি নিশ্চিত করে বলা যায় যে, ব্যাঙের ছাতার মতো যেসব বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছিল তাদের ছাতা বোধহয় মেলে ধরার মতো পরিস্থিতি থাকবে না। একই পরিস্থিতি দেশে কিন্ডারগার্ডেন থেকে ব্যক্তিপর্যায়ের নানা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও ঘটার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ওইসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেসব শিক্ষার্থী পড়াশোনা করত তাদের অনেকেই সেই অর্থ খরচ করে আর হয়তো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে আসবে না। ফলে শিক্ষার্থী সংকটে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান আপনা আপনিই বন্ধ হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে সরকারের গণশিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিত হবে সরকারি এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ভর্তি ও পাঠদানের জন্য প্রস্তুত করা। প্রতিটি এলাকায় সরকারি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে সেগুলোর পরিবেশ অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা শিক্ষক সংখ্যা ইত্যাদি বৃদ্ধি করার কথা গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা। এছাড়া দেশে যেসব বৃত্তিমূলক, টেকনিক্যাল নানা ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কীভাবে শিক্ষার্থীর চাহিদা অনুযায়ী প্রস্তুত করা যায় সেটিও ভাবা দরকার। বাংলাদেশে আগামী দিনের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বৃত্তিমূলক এবং টেকনিক্যাল বহু ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। সাধারণ শিক্ষার সীমাবদ্ধতা অনেক আগেই অনুভ‚ত হলেও বৃত্তিমূলক, টেকনিক্যাল এবং প্রযুক্তি শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের আশানুরূপ আগ্রহী করা যায়নি। কিন্তু করোনার তাণ্ডব মানুষের জীবনকে যেভাবে বিপর্যস্ত করেছে তার ফলে এ শিক্ষাই নতুন করে উপলব্ধিতে এসেছে যে বৃত্তিমূলক, টেকনিক্যাল ও প্রযুক্তিনির্ভর পেশার শিক্ষা ছাড়া তরুণদের কর্মসংস্থান আমাদের মতো দেশে হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই। যুগটাই এখন কৃষি, মৎস্য, ক্ষুদ্র মাঝারি শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য সেবাধর্মী নানা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। সুতরাং আমাদের দেশেও সেই ধারাতেই শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশকে পড়াশোনায় উদ্বুদ্ধ করতেই হবে। দেশে একদিকে যেমন বেকারত্ব রয়েছে, আবার বৃত্তিমূলক পেশায় কিংবা টেকনিক্যাল ও প্রযুক্তিগত কর্মক্ষেত্রে দক্ষ ও শিক্ষিত মানুষের ব্যাপক অভাব রয়েছে। সুতরাং শিক্ষাকে জ্ঞান ও কর্মমুখী করার কোনো বিকল্প নেই। আমাদের দেশে অসংখ্য কলেজ ও মাদ্রাসা রয়েছে। যেখান থেকে সনদ পেয়ে শিক্ষার্থীরা কোথাও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারছে না। এটি ঘটেছে অপরিকল্পিতভাবে দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা, অনুমোদন দেয়া এবং আর্থিক সুযোগ-সুবিধা দেয়ার কারণে প্রয়োজন-অপ্রয়োজন বিবেচনা না করেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। অনেক আগে থেকেই দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যাপিং না হওয়ায় অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই শিক্ষার্থী সংকটে রয়েছে। এটি আমাদের মতো দেশে ঘটতে দেয়া উচিত হয়নি। শিক্ষা খাতে সরকারি এবং বেসরকারিভাবে একটা বড় ধরনের অপচয় দীর্ঘদিন থেকে চলতে দেয়া হয়েছে। বর্তমান করোনার কারণে যে সংকট সৃষ্টি হতে যাচ্ছে তা থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তরগুলোর উচিত হবে কাম্যসংখ্যক মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেন বহাল থাকে। শিক্ষার্থীরা যেন আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞান, ব্যবসা-বাণিজ্য, তথ্যপ্রযুক্তি ইত্যাদি বিষয়ে দক্ষ মানবশক্তি হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। সেই বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। আমাদের উচ্চশিক্ষার কারিকুলাম নতুন করে ঢেলে সাজাতেই হবে। শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে জ্ঞানবিজ্ঞানের আধুনিক শাখা-প্রশাখায় গবেষণা করতে। গবেষণাহীন উচ্চশিক্ষা একেবারেই অর্থহীন। কারণ গবেষণায় শিক্ষার্থীরা উদ্ভাবন করার মৌলিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিগুলো সম্পর্কে পরিচিত হওয়ার সুযোগ লাভ করে। দেশে নতুন নতুন কর্মক্ষেত্রে উদ্ভাবনী জ্ঞান ছাড়া কোনোভাবেই টিকে থাকা সম্ভব নয়। এটি আমাদের জাতীয় অর্থনীতির জন্য যেমন জরুরি একইভাবে বিপুল জনগোষ্ঠীকে আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞান প্রশিক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে তৈরি করা না গেলে মানবসম্পদ তৈরিতে আমরা নিদারুণ ব্যর্থতার পরিচয় দেব। সে কারণে আমাদের নীতি-নির্ধারকদের এখনই ভাবা উচিত শিক্ষার ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ করার সঙ্গে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সচেতন করে তোলাও দরকার হয়ে পড়েছে। তাহলেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ফলোদায়ক এবং আনন্দদায়ক হয়ে উঠবে। আমরা সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আমাদের আগামীদিনের শিক্ষার্থীদের দেখতে চাই, পেতে চাই।

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক।
[email protected]

ডিসি