নারিকেল চিংড়ি

আগের সংবাদ

বাবা-মাকে বেঁধে মেয়েকে ধর্ষণ, গ্রেপ্তার ৩

পরের সংবাদ

বাঙালি হার না মানা জাতি

নিউটন মজুমদার

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ৯, ২০২০ , ৭:০৬ অপরাহ্ণ

হিমালয় পর্বতমালার পাদদেশে বঙ্গোপসাগরের পাড়ে সৃষ্ট পৃথিবীর বৃহৎ বদ্বীপ বাংলাদেশ। তাই প্রকৃতিগতভাবেই এটি ভাটির দেশ। ফলে সুপ্রাচীনকাল থেকেই এ দেশের ধমনীতে বন্যার প্রবাহ। এই বন্যায়ই পলিমাটি এ দেশের সমতলভ‚মিতে ছড়িয়ে যেমনি মাটির উর্বরতা বাড়ায়, তেমনি মাত্রাতিরিক্ত বন্যা জীবন ও সম্পদের জন্য ব্যাপক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই বন্যা এ দেশের জন্য একদিকে আশীর্বাদ, অন্যদিকে আবার অভিশাপ। বাংলাদেশে সাধারণত চার ধরনের বন্যা হয়ে থাকে; মৌসুমি বৃষ্টির কারণে, বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি উপচে উঠে প্লাবন, উজান দেশ থেকে ঢলের পানি এবং জলোচ্ছ্বাস। বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া পানির নদীগুলোর উৎপত্তিস্থল হচ্ছে ভারত, নেপাল ও চীন। এসব দেশ থেকে প্রবাহিত পানি এ দেশের ওপর দিয়ে বয়ে গিয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়ে। এই উজানের দেশগুলো থেকে বয়ে আসা পানির প্রধান নির্গমন পথ হচ্ছে জিএমবি বেসিনস, অর্থাৎ গঙ্গা, ব্রহ্মপুর ও মেঘনা অববাহিকা। যা সম্পূর্ণ বাংলাদেশের মধ্যভাগ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। কিন্তু দিন দিন এসব নদীগর্ভ সংকুচিত হওয়ার দরুন প্রতি বছরই বন্যা উন্নয়নশীল এ দেশটির অর্থনীতির শিরদাঁড়ায় মারাত্মক আঘাত হানছে।
ইতোমধ্যে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের মানবিক সংকটে পড়ার বিষয়ে আভাস দেয়া হয়েছে। কারণ করোনা ভাইরাস সংকটে নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই কিছুদিন আগে বাংলাদেশ ‘আম্ফান’ নামক মারাত্মক একটি ঘূর্ণিঝড়ের সম্মুখীন হয়েছিল এবং তখন দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। আর এখন দীর্ঘমেয়াদি বন্যা এ দেশের জন্য মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা নয় কি? ইতিহাসই বা কী বলে? বিভিন্ন উপনিবেশবাদীর শোষণ থেকে সদ্যই স্বাধীনতা লাভ করা এই দেশটি ভ‚তপূর্বে বেশ কয়েকটি বড় বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সম্মুখীন হয়েছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে বন্যা সাধারণত মৌসুমি ঋতুতে হয়ে থাকে (জুন থেকে সেপ্টেম্বর)। প্রতি বছর বাংলাদেশের প্রায় ২৬ হাজার বর্গ কিলোমিটার (১৮ শতাংশ) এলাকা স্বাভাবিক বন্যায় প্লাবিত হয়। বিশ্বের স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালে ব্যাপক ধ্বংসাত্মক বন্যা হয়, দুটি বন্যায় দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা প্লাবিত হয়।
উল্লেখ্য, ১৯৭০ সালের ১৩ নভেম্বর বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার ওপর দিয়ে বয়ে যায় প্রলয়ঙ্করী ‘গ্রেট ভোলা সাইক্লোন’। এই ঝড়ে প্রাণ হারায় প্রায় সাড়ে ৫ লাখ মানুষ। এরপর ১৯৮৮, ১৯৯১, ১৯৯৭-এর ঘূর্ণিঝড় এবং ২০০৭ সাল থেকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ শুরুর পর থেকে সিডর (২০০৭), আইলা (২০০৯), মহাসেন (২০১৩), ফণী ও বুলবুল (২০১৯) এবং সর্বশেষ আম্ফান ঘূর্ণিঝড়সহ বিভিন্ন সময়ে সৃষ্টি অসংখ্য ঘূর্ণিঝড় এবং এ থেকে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হয়েছে কোটি বাঙালির জীবন তথা স্বপ্ন! পৃথিবীর মানচিত্রে বোধহয় এমন আর একটি দেশ বা জাতি খুঁজে পাওয়া দুর্লভ, যারা প্রকৃতির এত নিষ্ঠুর কশাঘাতের পরও বারবার ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে।
ভাটির দেশ হওয়ার কারণে বাংলাদেশে বন্যা প্রতিহত করা সম্ভব নয়, তবে পরিকল্পিত উপায়ে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। এতদলক্ষ্যে সর্বাগ্রে মানুষের পরিবেশ বিধ্বংসী নানামুখী কার্যক্রম হ্রাস করতে হবে। তৎসঙ্গে পলি জমে নদীগর্ভ ভরাট না হয়, উন্নয়ন প্রকল্প ও সড়ক-সেতু ইত্যাদির কারণে পানি নিষ্কাশনের পথগুলো যেন প্রয়োজনের তুলনায় সংকুচিত না হয়ে পড়ে সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। এছাড়া এ দেশে বন্যার প্রকোপ কমাতে উজানে পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বাংলাদেশের নদনদীর পানির ৯৩ শতাংশই আসে উজানের দেশগুলো অর্থাৎ নেপাল, ভারত এবং কিছুটা ভুটান থেকে, তাই এসব দেশের সঙ্গে মাত্রাতিরিক্ত পানির প্রবাহ বিভিন্ন গতিপথে প্রবাহের ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। ইতোপূর্বে বন্যা নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশে নির্মিত হয়েছে অসংখ্য বাঁধ। তবে প্রবল বর্ষণ এবং পানির প্রবাহে এগুলো খুব একটা কাজ দিচ্ছে না। ফলে এ খাতে ব্যয় হওয়া বিপুল পরিমাণ ঋণের টাকা প্রতি বছর বানের জলে ভেসে যাচ্ছে বললে খুব একটা ভুল বলা হবে না। তবে আশার কথা হচ্ছে, অসংখ্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করে, বাংলাদেশের মানুষ আজ এসব প্রতিক‚লতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে অসাধারণ এক অভিযোজন ক্ষমতা আয়ত্ত করেছে। যা কোটি বাঙালির মধ্যে দারুণ এক মনোবল সৃষ্টির সহায়ক। স্বভাবতই বাঙালি এক লড়াকু জাতিসত্তা, তারা হারতে জানে না; তাই তো শত প্রতিকূলতার মাঝেও তাদের মুখে ফুটে উঠেছিল ঈদের এক ফালি বাঁকা চাঁদের হাসি। এ হাসি-আনন্দের বারতা নিয়েই কেটেছে কোটি বাঙালির এবারের পবিত্র ঈদুল আজহা।

শিক্ষার্থী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ।
[email protected]