কেমন আছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা?

আগের সংবাদ

দুর্গম চরাঞ্চলের বানভাসি মানুষের পাশে খেলাঘর

পরের সংবাদ

তিনজন অভিযুক্ত নারী এবং আজকের সমাজ

মেজর (অব.) সুধীর সাহা

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ৭, ২০২০ , ৮:৪৯ অপরাহ্ণ

এই তিনজন নারীর গল্প যেন আমাকে তাই মনে করিয়ে দিচ্ছে। তারা নিজেরা হয়তো বুঝেশুনে এ জায়গায় আসেননি। নতুন এক উপলব্ধি তাদের এখানে টেনে নিয়ে এসেছে। গ্রেপ্তার হওয়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তারা হয়তো এ কাজকে তাদের বুদ্ধিমত্তার চরম বিকাশের একটি দিক হিসেবেই দেখেছেন।

তিনজন মানুষের গল্প বলব। তিনজনই মহিলা এবং তিনজনই মেধাবী। পড়াশোনায়-কাজে তারা অনন্যা এবং কিছুটা হলেও ব্যতিক্রমী ছিলেন। গত ২৩ জুন জেকেজি হেলথ কেয়ারে অভিযান চালায় র‌্যাব। গ্রেপ্তার করা হয় প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী আরিফ চৌধুরীকে। তারই সঙ্গে ওঠে আসে ডা. সাবরিনার নাম। গত ১২ জুলাই জিজ্ঞাসাবাদ শেষে সাবরিনাকে গ্রেপ্তার করা হয়। জেকেজির বিরুদ্ধে অভিযোগ- সংস্থাটি ১৫ হাজার ৪৬০ জনের করোনা পরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট দিয়েছে। ডা. সাবরিনা জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের কার্ডিয়াক সার্জারি ইউনিটের ডাক্তার। ছাত্রাবস্থায় সাবরিনা মেধাবী ছাত্রী ছিলেন। তিনি স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ থেকে ডাক্তারি পড়াশোনা করেন এবং ২৭তম বিসিএস উত্তীর্ণ হয়ে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন। তার বাবা একজন অবসরপ্রাপ্ত সচিব। ছোটবেলা থেকে সাবরিনাকে খুব কাছ থেকে দেখা একজন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন- সাবরিনা অত্যন্ত ভদ্র এবং পড়ুয়া ছাত্রী ছিলেন। অমায়িক ব্যবহারে সাবরিনার খ্যাতি ছিল। একজন ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তার মেয়ে হিসেবে সুনামের সঙ্গে তার ছাত্রজীবন এবং চাকরি জীবনের শুরুটা ছিল উজ্জ্বল। আরিফ চৌধুরীর চতুর্থ স্ত্রী তিনি। এখানে কারো প্রশ্ন থাকতে পারে। তবে তা একেবারেই তাদের পারিবারিক একান্ত বিষয়। তার অতীত ইতিহাস বলে- সামাজিক বিষয়ে এর কোনো প্রভাব নেই। সাবরিনা এবং স্বামী আরিফ দুজন মিলে প্রতিষ্ঠা করেন জেকেজি। সরকারি চাকরিতে থেকেও সাবরিনা জেকেজির মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষকে প্রতারণা করেছেন- ঠিক এভাবেই আমরা এখনো বিষয়টিকে জানি। পরবর্তী সময় তদন্ত, আদালত আমাদের আরো নিশ্চিত করে বলতে পারবে- সাবরিনার গল্পটি ঠিক কীভাবে এবং কোথায় গিয়ে শেষ হবে।
দ্বিতীয় নারী শারমিন জাহান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ে নকল এন-৯৫ মাস্ক সরবরাহের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন ‘অপরাজিতা ইন্টারন্যাশনাল’-এর স্বত্বাধিকারী শারমিন জাহান। তিনি একইসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী রেজিস্ট্রার। বর্তমানে তিনি পিএইচডি করছেন চীনের উহানে। অর্থাৎ পিএইচডি করার জন্য তিনি শিক্ষাছুটিতে আছেন। শারমিন জাহান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ থেকে সুনামের সঙ্গে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। তিনি ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
২০০২ সালে তিনি বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল শাখা ছাত্রলীগের সভানেত্রী ছিলেন। পড়াশোনা শেষে তিনি সহকারী রেজিস্ট্রার হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিতে যোগ দেন। ২০১৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি গবেষণার জন্য শিক্ষাছুটি নিয়ে চীনের উহানে যান। সেখানে তিনি গবেষণার পাশাপাশি ব্যবসা শুরু করেন। ডিসেম্বর ২০১৯ শারমিন বিশেষ বিমানে উহান থেকে ঢাকা ফেরত আসেন। তার পিএইচডি পড়াশোনা এখনো চলছে। তিনি তার পরিচয় এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে করোনার সময়ে মাস্ক সরবরাহের ব্যবসায় এগিয়ে যান। এরই এক প্রক্রিয়ায় তিনি তার কোম্পানি ‘অপরাজিতা’র নামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে নকল এন-৯৫ মাস্ক সরবরাহ করেন। এই নকল মাস্ক স্বাস্থ্যকর্মী এবং ডাক্তারদের অনেককেই করোনা আক্রান্ত করার জন্য দায়ী ছিল। কেননা ব্যবহারকারীরা এই মাস্ককে আসল মাস্ক হিসেবে ধরে নেয়ায় তা অনেককেই আক্রান্ত করতে সাহায্য করে। শারমিন জাহান বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি করেই শেষ করেননি, বরং পিএইচডি করার জন্য বিদেশে পড়াশোনা করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি সহকারী রেজিস্ট্রার হিসেবে চাকরিরত ছিলেন। চাকরির পাশাপাশি তিনি অনুমোদনহীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেন এবং সেই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নকল এন-৯৫ মাস্ক সরবরাহ করে জাতির জন্য অনেক বড় ঝুঁকি এনে দিলেন। তার কাজের বিশদ বিবরণ পাওয়ার জন্য আমাদের আরো তদন্ত এবং আদালতের রায়ের ওপর নির্ভর করতে হবে।
তৃতীয় নারীর গল্পে যাচ্ছি। রাহাত আরা ত‚র্ণা। ত‚র্ণা আহসান নামের ফেসবুক আইডি নিয়ে তিনি বিজয়লক্ষ্মী নারী নামের একটি গ্রুপের নেতৃত্ব দিতেন। টেলিভিশনে অনেকেই তাকে বিভিন্ন টকশোতে দেখে থাকবেন। ২০১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনফরমেশন এন্ড লাইব্রেরি সায়েন্সে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়াশোনা শেষ করেছেন। পুলিশের ধারণা, ছদ্মনামে ফেসবুকে নিজেকে উপস্থাপনের মাধ্যমে অঢেল টাকার মালিক হওয়ার স্বপ্ন থেকেই তিনি জড়িয়ে যান একটি অপরাধ চক্রের সঙ্গে। গত ২১ জুলাই পল্লবী বেনারসি পল্লীর একটি ভবন থেকে অভিযান চালিয়ে রাহাত আরা ত‚র্ণা এবং ১২ জন নাইজেরিয়ানকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি পুলিশ। তাকে কয়েকটি নাম ব্যবহার করতে দেখা গিয়েছে। তার আসল নাম রাহাত আরা খানম। ফেসবুক আইডিতে ব্যবহার করতেন ত‚র্ণা আহসান। কখনো নিজেকে পরিচয় দিতেন ফারজানা মহিউদ্দিন বলে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে তিনি ব্যাপকভাবে পরিচিত ছিলেন। তিনি এবার গ্রেপ্তার হলেন ফেসবুকের মাধ্যমে প্রতারণা করার অভিযোগে। প্রতারণার সঙ্গী ১২ জন নাইজেরিয়ান।
আমার মতো অনেকেই হয়তো অপরাধের সঙ্গে মেয়েদের জড়িয়ে কিছু বলার আগে সাতবার ভাববেন। কেননা পরিসংখ্যান তেমনটাই বলে। বাংলাদেশে অপরাধের সঙ্গে জড়িত নারীর সংখ্যা পুরুষের সংখ্যা থেকে অনেকাংশেই কম। আর তাই নারী নিয়ে হুট করে কোনো অপরাধীর গন্ধ খুঁজতে আমরা অভ্যস্ত নই। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারীদের নিয়ে হুট করে খারাপ কিছু ভাবতে আমরা স্বাভাবিকভাবেই বাধাগ্রস্ত হই। তৃতীয় বিষয়টি আরো অধিক গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের জন্ম অর্থাৎ বংশপরিচয়, পারিবারিক এবং সামাজিক পরিচয়- এসব কিছুও আমাদের কোনো অপরাধী বিবেচনায় সক্রিয়ভাবে সাহায্য করে। তিনটি বিষয়ই এই তিনজন নারীর ক্ষেত্রে বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছেন। বংশপরিচয়, লেখাপড়া এবং সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রে এরা তিনজনই শীর্ষে অবস্থান করছিলেন। এখন প্রশ্ন হলো- অপরাধী কি শুধু তারাই হবেন, যারা কম লেখাপড়া জানা এবং বংশগত ও সামাজিকভাবে কিছুটা নিচে অবস্থান করেন? না, সেটা সত্যি নয়। অপরাধ এবং অপরাধী কখন কাকে ধরে ফেলবে তা বলার সুযোগ নেই। তারপরও পৃথিবীর সব দেশে অপরাধ জগতের সঙ্গে মেয়েদের বিশেষ করে শিক্ষিত মেয়েদের সম্পর্কটা ততখানি মধুর এবং নিবিড় নয়। কিন্তু এখানে কেন ঘটে গেল এর ব্যত্যয়? সমাজে বিশেষ পরিচিতি এবং উচ্চশিক্ষা লাভ করার পরও এই তিনজন আলোচিত নারী কেন আজ অপরাধের কাঠগড়ায়? তাদের কে নিয়ে এলো এই অন্ধকার পথে? গভীরভাবে ভেবে দেখার মতো বিষয় এগুলো। সমাজ-রাষ্ট্র আজ অনেক বেশি বিচলিত হওয়ার কথা এসব সংবাদের প্রেক্ষিতে। কোন আকর্ষণে সমাজের এই পর্যায়ের তিনজন নারী আজ অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছেন? তাদের ব্যক্তিগত দায় তো অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। কিন্তু আর কি কারো দায় নেই? সুস্থ সমাজে কেউ বিপথে গেলে সেই ব্যক্তির দায় অনেক বেশি। কিন্তু আমাদের আজকের সমাজকে কি সুস্থ সমাজ বলার সুযোগ আছে? এই সমাজ কি মানুষকে স্বাভাবিক জীবন ধারণার নিশ্চয়তা প্রদান করতে পারছে? কেন যেন মনে হয় এখানে গলদ আছে।
এই তিনজন নারীর গল্প যেন আমাকে তাই মনে করিয়ে দিচ্ছে। তারা নিজেরা হয়তো বুঝেশুনে এ জায়গায় আসেননি। নতুন এক উপলব্ধি তাদের এখানে টেনে নিয়ে এসেছে। গ্রেপ্তার হওয়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তারা হয়তো এ কাজকে তাদের বুদ্ধিমত্তার চরম বিকাশের একটি দিক হিসেবেই দেখেছেন। নতুন এক সমাজের সঙ্গে তাল মিলাতে মিলাতে তারা কখন যে একদিন মানবী থেকে দানবী হয়ে দাঁড়িয়েছেন তা হয়তো বুঝতেই পারেননি। গ্রেপ্তার হওয়ার পর হয়তো তারা বুঝতে পেরেছেন- তারা কতটা অন্যায় করেছেন, কতটা ভুল করেছেন। তার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত আমার-আপনার সমাজ তাদের কখনো বুঝতে দেয়নি- তারা ভুল করছেন কিনা! কেননা তারা হয়তো তাদের পাশে আরো অনেককেই এমন অন্যায় প্রতিযোগিতার মধ্যে পেয়েছেন। তাদের ধরে আমরা কতজনকেই বা এই প্রচলিত সমাজ থেকে আলাদা করতে পারব? তাহলে কী করব? এদের বিচ্ছিন্নভাবে ধরব, না যে সমাজ তাদের সৃষ্টি করেছে সেই সমাজকে ধরব? তাদের আলাদা আলাদাভাবে পরিবর্তনের ছাঁচে ফেলব, না সমাজকে পরিবর্তনের ছাঁচে ফেলব?

মেজর (অব.) সুধীর সাহা : কলাম লেখক।

[email protected]

এসআর