লিবিয়ার ৩ টর্চার সেলে চলে অমানসিক নির্যাতন

আগের সংবাদ

শুরুতেই প্রস্তুতিতে ধাক্কা ১১ ফুটবলার করোনায় আক্রান্ত

পরের সংবাদ

খোঁয়ারি : অসাধারণ মমত্বময় গল্প

আশরাফ উদ্দীন আহ্মদ

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ৬, ২০২০ , ১০:৪৬ অপরাহ্ণ

আধুনিক বাংলা সাহিত্যে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস (১৯৪৩-১৯৯৭) এক রৌদ্রোজ্জ্বল প্রতিভার নাম। ছোটগল্পের শরীরে আখ্যান বা কাহিনী কিংবা বিষয় কতখানি জড়ানো হবে, সেটা বড় নয়, তার বাইরে একটা গল্পকে সময়ের দাবির কাছে পৌঁছে দেয়া, চরিত্রের আপদমস্তক খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করাই ইলিয়াসের গল্পের কৌশল। মাঝে মাঝে আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাই আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সর্বসাকল্যে ৩০টি গল্প, (৫টি গল্পসংকলন এবং অগ্রন্থিত আরো কয়েকটি গল্প) দুটো উপন্যাস এবং একমাত্র প্রবন্ধগ্রন্থ লিখে বাংলা সাহিত্যাঙ্গন দখল করে নিলেন, বারেক আবদুল্লাহ বা কায়েস আহমেদ বা মাহমুদুল হক অথবা শহীদুল জহির, এঁরাও একটা সময় থেমে যায় পেন্ডুলামের কাঁটার মতো, আসলে কি থেমে যাওয়া নাকি পলায়ন, যবনিকার আড়ালে প্রস্থান করা, ওঁদের সাহিত্যের মুগ্ধ পাঠক আমি বরাবরই, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অহংকার, তার গল্প-উপন্যাস নিজস্ব স্টাইলে দাঁড়িয়ে, তিনি উদাহরণ, তার ভাষা ব্যবহার-চরিত্রচিত্রায়ণ-আঙ্গিকগঠন-শহর-নগরের মানুষের আপদমস্তক বিশ্লেষণ-নাগরিক জীবনের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ…তিনি সর্বদা গল্পের ব্যাকারণকে দূরে ঠেলে সামাজিক সময়ের প্রেক্ষাপটে কাহিনীর স্তরে খনন কাজ করেন, বৃহত্তর মহাকাশে তা নিক্ষেপ করেন, সমাজ-সচেতনই নয়, অন্তর্ভেদি দৃষ্টি এবং উপস্থাপনের নিজস্ব শৈলীর সমন্বয়ে ইলিয়াস বরাবরই গল্পের অস্থি-মজ্জায়-করোটিতে নির্মিত করেছেন এক উজ্জ্বল স্বাতন্ত্র্য, বিষয়-বক্তব্য-ভঙ্গি-মেজাজের দিক থেকে তার গল্প হয় এমনি এক ভাস্কর্য। তার সমসাময়িক সাহিত্যিক বা পূর্ববর্তী সাহিত্যিক খুঁজে পাওয়া যায় না, যার যোগ্য সহোদর, এখানেই তার ভিন্নতা দৃষ্টি কাড়ে। ১৯৬৫ থেকে ১৯৭৫ অবধি লেখা নিয়ে প্রথম গ্রন্থ ‘অন্য ঘর অন্য স্বর’ (১৯৭৬) পরবর্তী সময়ে ‘খোঁয়ারি’ (১৯৮২) ‘দুধভাতে উৎপাত’ (১৯৮৫) ‘দোজখের ওম’ (১৯৮৯) সর্বশেষ গল্পগ্রন্থ ‘জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল’ (১৯৯৬) অর্থাৎ পাঁচটি গ্রন্থে প্রকাশিত গল্পের সংখ্যা এবং পত্র-পত্রিকায় বা অগ্রন্থিত আরো কয়েকটি নিয়ে মোটামুটি ৩০টি গল্প লিখেছেন ইলিয়াস। দুটো উপন্যাস ‘চিলেকোঠার সেপাই’ (১৯৮৬) ‘খোয়াবনামা’ (১৯৯৬) এবং প্রবন্ধসংকলন ‘সংস্কৃতির ভাঙা সেতু’ (১৯৯৭), এই আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সাহিত্যসম্ভার, প্রকৃতপক্ষে তাকে গল্পের কারিগর বলা যায়, গতানুগতিক গল্পের ধারা বা আঙ্গিক ভেঙে নতুন একটা শৈলী বা স্টাইল নির্মাণ করেছেন, ইলিয়াসের গল্পজগৎ প্রধানত পুরান ঢাকার অলিগলি-এবড়ো-থেবড়ো ঠিকানাহীন রাস্তা-যত্রতত্র ভগ্নপ্রায় কোঠাঘর-দাঁত কেঁলানো প্যালেস্তরা ক্ষয়া পোড়ো বাড়ি-সেকেলে চিন্তার মানুষজন, এগুলোর ভেতর দিয়েই তার গল্পের চরিত্রেরা আপনা-আপনি বেরিয়ে আসে, গভীর রাগে কখনো ক্ষোভে কথা বলে ওঠে, আবার সেগুলো কখনো হয়তো চরিত্র হয়ে যায় সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে, পুরান ঢাকার বলয়-বৈচিত্র্যে-আভিজাত্যে আর ঐতিহ্যের সঙ্গে চরিত্রেরা একাত্ম হয়, আবার কখনো প্রতিবাদ করে, সেই ঝলসানো প্রতিবাদের ভেতর চলে জীবনের দরকষাকষি, মানুষ যে ঘোরের ভেতর থাকে এবং তা তাকে জীবনেরই অঙ্ক শেখায় অথবা জীবন থেকে বিচ্যুত করে, সেই গল্পেই ইলিয়াস করেছেন পাঠকের মুখোমুখি বসে, তার কাহিনীমালা তো এভাবেই ডানা ঝাঁপটিয়ে বিশাল আকাশ ছুঁয়ে যায়।

অসাধারণ মমত্বময় গল্প ‘খোঁয়ারি’ এর পটভ‚মি পুরান ঢাকা, আর কেন্দ্রস্থল বৃদ্ধ অমৃতলালের জরাজীর্ণ বিশাল বসতবাড়ি, শতাব্দী প্রাচীন বাড়িটির এবং বসত করা মানুষজনের স্মৃতিমন্থন করেছে অমৃতলাল, সাতচল্লিশ পূর্ব ঢাকা শহরের হিন্দু-মুসলমানের আর্থ-সামাজিক অবস্থার জ্বলজ্বলে অথচ কুয়াশা ঢাকা একটা নির্মম ছবি পাঠকের সামনে টেনে এনেছেন, সাতচল্লিশের দেশভাগে বাঙালি যে দুভাগে বিভক্ত হয়েছিল সে রেশে অমৃতলালের পরিবার বা পূর্বপুরুষেরা বলি হয়, ইলিয়াস তার ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে সমাজের ত্রæটি-বিচ্যুতি ভবিষ্যৎ স্বপ্ন বিদ্রুপ অপূর্ব রসায়নে তুলে ধরেছেন নির্মোহভাবে গল্পের আদলে। বিচিত্রমুখী সংকট এবং অবক্ষয়ের আবর্তে বিপন্ন মানবতা, সংকটবিদ্ধ সমাজব্যবস্থা আর তার শরীরের ক্ষতবিক্ষত আত্মচেতনা, এর ভেতর নিঃস্ব-নিরন্ন মানুষের হাহাকার, যা আমাদের চিরচেনা মানুষের ছবিগুলো মনে করিয়ে দেয় দারুণভাবে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পূর্বে অমৃতলাল বা তার পূর্বপুরুষেরা ঐশ্বর্য ও দাপটের সঙ্গে বসবাস করত ঢাকায়, দেশ ভাগে হয়ে গেল সংখ্যালঘু রাতারাতি। বিশাল একান্নবর্তী পরিবারের অনেকেই কলিকাতামুখী হলো, ঢাকার সঙ্গে সম্পর্কোচ্ছেদ ঘটে ক্রমশ, সময়ের ব্যবধানে বিশাল বাড়ির দেয়াল থেকে ক্ষয়ে চুন-সুড়কি পড়তে থাকে, সাতচল্লিশের পরে চৌষট্টির দাঙ্গা এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মতো তিন তিনটে বিশাল ঝাঁকুনি সহ্য করেছে বাড়িটি, একাত্তরে রাজাকারেরা বা পাকিস্তানিরা বাড়িটিকে ক্ষতবিক্ষত করেছে, দেশ স্বাধীন হলেও পরিবর্তন হয়নি অমৃতলালের পরিবার বা বাড়ি-ঘরের ভাগ্য, গোঁদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো বরং নতুন আরেক সংকট সামনে দাঁড়ালো, অমৃতলালের ছেলে সমরজিতের বন্ধুরা বাড়িটির কিছু অংশ ভাড়া বাবদ দখল চায়, মুক্তিযুদ্ধ ও বাম রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীরা অমৃতলালের বিশাল বাড়িখানা তাদের আঞ্চলিক অফিসের জন্য উপযুক্ত স্থান বলে বিবেচনা করে, সে কারণে সমরজিতের সঙ্গে মদ পানের আসর বসায় তার বন্ধু জাফর-ইফতেখার-ফারুক। তাদের মধ্যে যতই কথকথন হউক না কেন মিষ্টিমধুর, প্রকৃতপক্ষে বাড়ি ভাড়ার অজুহাতে দখল নেয়ার ধান্ধা বড় হয়ে দেখা দেয়। কিন্তু বাড়ি ছাড়ার চাপ বা হুমকি দেয়ায় অমৃতলাল ক্রমশ প্রতিবাদী হয়ে ওঠে, বাপ-ঠাকুরদার পৈতৃক বাড়ি কেন ছাড়বেন, কেন যাবেন অচীন দেশে, মাটির শিকড় ছেড়ে কোথাও তিনি যাবেন না, কারণ ঢাকা শহরের কত বড়-বড় মানুষ তাদের একটা সময় খ্যাতির-যত্ন করত, স্বয়ং নবাব বাহাদুর নিজেও একদিন এসেছিলেন, স্মৃতিমন্থনের ভেতর দিয়ে অমৃতলাল অতীতে ফিরে গেলেও সমরজিতের নেশা বাড়ে, বন্ধুরা ওকে মদের নেশা ধরিয়ে ভুলিয়ে-ভালিয়ে বাড়ির অধিকার চায়। ইলিয়াস এভাবেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অস্তিত্বের কঠিন সংকটের স্বরূপটি তুলে ধরেছেন গল্পের আঙ্গিকে, স্বাধীনতা পরবর্তী মূল্যবোধহীন রাজনীতির একটা স্বচ্ছ পরিচয় ফুটে উঠেছে, সংখ্যালঘু উৎখাত-রাজনৈতিক কর্তৃত্বে নিজস্ব স্বার্থ উদ্ধারের চরম নীলনকশা প্রতিফলিত হয়েছে, সেইসঙ্গে অবক্ষয়িত নষ্ট-ভষ্ট যুবসমাজের বলয় নির্মিত হয়েছে গল্পের ছত্রে-ছত্রে, ফারুক-জাফর-ইফতেখার হতাশাগ্রস্ত যুবক, নেশা-আড্ডা বা রকে বসে গুলতানি মারে, উচ্চ ব্র্যান্ডের মদ পান করে, সুযোগ পেলে বিশেষ এলাকায় কর্তৃত্ব করতে ছাড়ে না, তিনজনে তিনরকম চরিত্রের হলেও কেউ কাউকে ছাড়া চলতে পারে না, সমরজিত ওদের খুব কাছের বন্ধু, আর সে সুযোগটা ওরা নিতে চায়। তাই সমরজিতের বাবা-ঠাকুরদার সেকেলে বাড়িটা রাজনৈতিক অফিস বানাতে চায়, অমৃতলাল একাত্তর যুদ্ধ পরবর্তী যুবসমাজের দিকে তাকিয়ে শিউরে শঙ্কিত হয়ে ওঠে, মানুষের পরিবর্তন নাকি সময়ের পরিবর্তন নির্ণয় করতে ভারী কষ্ট হয়, নিজেকে খোঁয়ারির মধ্যে রেখে সময়ের মানুষ দেখার চেষ্টা করে। স্বাধীনতার সুফল ভোগ করতে আজ যারা তৎপর, তাদের পূর্বপুরুষেরা এ বাড়ির অন্নে মানুষ হয়েছে একদিন, অথচ নিয়তির কি চরম পরিহাস, এ’ বাড়ির মানুষেরা আজ সংখ্যালঘু হওয়ার কারণে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়েছে, পুরান ঢাকার জীবন বৈচিত্র্যের নানাবিধ অনুষঙ্গ নিয়ে খোঁয়ারির মতো গল্প লিখে ইলিয়াস শুধু বাংলা ছোটগল্পকেই সমৃদ্ধ করেননি, নগর জীবনের বিকৃত মানবীয় মূল্যবোধের বিপর্যয়কে চিহ্নিত করে পাঠক সমাজকে সচেতন করার চেষ্টা করেছেন বললে নেহাত ভুল হবে না। প্লট নির্মাণের দক্ষতায় পুরান ঢাকার বিশাল বাড়ি অন্যরকম একটা মডেলে রূপান্তর লাভ করে, গল্পটি রচনায় ইলিয়াসের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত নির্মোহ-নিরাসক্ত এবং পক্ষপাতহীন লক্ষ করা যায়।

ডিসি