পাকিস্তানকে ৩২৬ রানে থামাল ইংল্যান্ড

আগের সংবাদ

বাবলি

পরের সংবাদ

করোনা বিজয়

শাহজাহান কিবরিয়া

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ৬, ২০২০ , ১১:০৩ অপরাহ্ণ

আবদুল আজিজের সময় আর কাটতে চায় না। দীর্ঘ তিন মাস ধরে ‘লকডাউনে’ ঘরে বন্দি জীবন কাটাচ্ছে। এতদিন শরীফা ছিল। বিশেষ অসুবিধা হয়নি। করোনা ভাইরাসের আক্রমণ শুরু হবার প্রথম ধাক্কাতেই শরীফা বিদায় নেয়। আগে থেকেই তার হার্ট দুর্বল ছিল। চিকিৎসা চলছিল। একদিন ব্যথা বাড়ায় ডাক্তার দেখাতে চেয়েছিল। কিন্তু করোনা ভাইরাসের ভয়ে ডাক্তার চেম্বার খোলেনি। একটি হাসপাতালে নিয়েছিল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলেছে, ভর্তির আগে রোগীকে রক্ত পরীক্ষা করে করোনা ভাইরাসের নেগেটিভ রিপোর্ট আনতে হবে। রিপোর্ট আনতে দুই দিন দেরি হয়েছিল। বিনা চিকিৎসায় শরীফা মারা যায়। জানাজা ও দাফন করতে আরেক বিপদ। করোনা রোগী ভেবে কেউ কাছে আসতে চয়নি।
শরীফাকে যে এত তাড়াতাড়ি বিদায় নিতে হবে দু’জনের কেউ তা ভাবতে পারেনি। একদিন কথা প্রসঙ্গে শরীফা বলেছিল, তোমার আগে আমি মরতে চাই না। তোমার খাওয়া দাওয়ার কষ্ট হবে। আজিজ বলেছিল, খাওয়ার জন্য কেউ বাঁচে না, মানুষ বাঁচার জন্য খায়। ব্যবস্থা একটা হয়েই যাবে। শরীফা বলেছিল, ওষুধটাও তো ঠিকমতো খেতে পারো না। আজিজ বলে, আমি ঠিক তার উল্টোটা ভাবি। তোমার আগে আমি মরে গেলে তোমার খুব কষ্ট হবে। আমার ডেডবডি নিয়ে তুমি সমস্যায় পড়বে। ব্যাংকের টাকার হিসাব রাখতে পারবে না। তোমার অসুখ হলে তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে কে? ছেলে-মেয়েরা তো বিদেশে। তোমার ভাই মতিন আবার বদলি হয়েছে খুলনায়। দু’জনে ধরে নিয়েছিল তারা মরে যাবে এবং মৃত্যুর পর দুজনকে নিয়েই সমস্যা হবে। শরীফার ইচ্ছা পূরণ হলো না। কোনো সমস্যার সমাধান না করে সে আজিজের আগেই চলে গেল।
সুদূর চীনের উহান প্রদেশ থেকে খুব দ্রুত করোনা ভাইরাস বিশ^ব্যাপী মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশও বাদ যায়নি। ধনী দরিদ্র কোনো দেশকে ছাড়েনি। এক রিকশাওয়ালাকে আজিজ মুখে মাস্ক পরতে বলায় সে বলে, এ রোগে গরিব মরবে না, বড়োলোকেরা মরবে। কিন্তু দেখা গেল ধনী দরিদ্র সবাই মরে।
টেলিভিশন খুললেই হাজার হাজার লাখ লাখ লোকের করোনায় আক্রান্ত আর মৃত্যুর সচিত্র খবর প্রচারিত হয়। এ যেন রূপকথার সেই রাক্ষসের হুমকি, প্রতিদিন আমার একটি করে মানুষ চাই। রাজা অসহায়। রাজ্যের মানুষ অসহায়। কোনো রাজপুত্র তাদের উদ্ধার করতে আসছে না। অসহায় মানুষ অনিবার্য মৃত্যুর প্রতীক্ষায় থাকে। মৃত্যুর চেয়ে মৃত্যুর প্রতীক্ষা অনেক বেশি কষ্টকর, অসহ্য। আদিম গুহাবাসীদের মতো মানুষ আজ প্রকৃতির কাছে অসহায়।
টেলিভিশনে খবর দেখতে দেখতে শরীফা একদিন মজা করে বলেছিল, তোমরা করোনা ভাইরাসকে মারাত্মক বলছ, অথচ তারা দেখতে কত সুন্দর! লাল, নীল, সাদা, সবুজ। কোনোটা গোল, কোনোটা লম্বা। কত বিচিত্র রঙের তারা। আমার তো ওদের নিয়ে খেলতে ইচ্ছে করছে। ওর কথা শুনে আজিজ হাসতে হাসতে বলেছিল, সুন্দরীরা বহুরূপী হয়। মানুষ হত্যার জন্য তারা নানা রকমের রূপের মায়াজাল বিস্তার করে। রূপকথার ডাইনিরা সুন্দরী রমণীর রূপ ধরে রাজাকে, রানীকে হত্যা করে। রাজ্যের গরু, ছাগল, মানুষ সব খেয়ে ফেলে। শরীফা হাসতে হাসতে বলেছিল, ভাগ্যিস আমি সুন্দরী ছিলাম না, তা না হলে তোমাকে চিবিয়ে খেতাম। আজিজ কৃত্রিম বিস্ময়ে বলে, চিবিয়ে খাচ্ছ না কে বলছে, তোমার রূপের আগুনে আমার সারাটা জীবন পুড়ে ছারখার হয়ে গেল। শরীফা লজ্জাঘন হাসি হেসে বলে, বেশি মিথ্যা কথা বললে আয়ু কমে যায়।
আয়ু কমে গিয়েছিল। কিন্তু সেটা আজিজের নয় শরীফার, যে আরো কিছুদিন বাঁচতে চেয়েছিল। বাঁচতে দেয়নি ডাক্তার এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। সব ডাক্তার নিষ্ঠুর নয়। করোনা রোগীর চিকিৎসা করতে গিয়ে করোনা আক্রান্ত হয়ে অনেক পুলিশ, ডাক্তার, নার্স মারাও গেছে।
করোনা ভাইরাসে শরীফার মৃত্যু হলে সেটাকে স্বাভাবিক মৃত্যু বলে মেনে নেয়া যেত। করোনায় মৃত্যুকে নিয়তির বিধান বলে সবাই মেনে নিয়েছে। যে রোগের ওষুধ নেই, চিকিৎসা নেই তার জন্যে কাউকে দায়ী করা যায় না শুধু দুঃখ করা যায়। শরীফার হৃদরোগ হয়েছিল। সুচিকিৎসা পেলে হয়তো আরো কিছুদিন সে বাঁচতো। তার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। কিন্তু তাকে মরতে হয়েছিল করোনা ভাইরাসের অপবাদ নিয়ে। যে জন্যে মৃত্যুর সময়, এমন কি মৃত্যুর পরও কোনো আপনজন তার কাছে যেতে পারেনি, জানাজায় অংশ নিতে পারেনি। তাদের ছেলেমেয়ে দু’টোও মাকে শেষ দেখার জন্য আসতে পারেনি। শরীফা মৃত্যুর সময় ওদের নাম ধরে ডেকেছিল, ওদের একবার দেখতে চেয়েছিল। দেখতে পায়নি। বিশ^ব্যাপী ‘লকডাউন’ চলছে। আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বন্ধ। সর্বজন শ্রদ্ধেয় ড. আনিসুজ্জামান স্যারের মতো জনপ্রিয় শিক্ষকের জানাজায় তাঁর কোনো ছাত্র বা অনুরাগী অংশগ্রহণ করতে পারেনি। এ ঘটনা প্রত্যেকের মনকে পীড়া দেয়।
শরীফার মৃত্যুর পর থেকে ঘরটা শূন্য হয়ে গেছে। কোনো কাজে আজিজের মন বসে না। স্মৃতিকাতর মন নিয়ে কোনো কাজ করা যায় না, লেখা যায় না, পড়া যায় না। সব কিছু তার শেষ হয়ে গেছে। ‘লকডাউন’ শুরু হতেই ছুটা বুয়া কাজ ছেড়ে দিয়েছে। কাজের মেয়েটাকেও বিদায় করে দেয়া হয়েছে। খালি বাসায় যুবতী মেয়েকে রাখা যায় না। অশোভন দেখায়। মেয়েটা যেতে চায়নি আজিজের কষ্ট হবে ভেবে। আজিজ মেয়েটার বাবাকে ডেকে এনে তার হাতে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়ে বলেছে, তোমার মেয়েকে ভালো পাত্র দেখে বিয়ে দিয়ে দাও। আর কোনো বাসায় কাজ করতে দিও না।
মেয়েটার নাম ফরিদা। ছোটবেলা দশ বছর বয়স থেকে সে এখানে কাজ করছে। আজিজের ছেলেমেয়েদের সাথে খেলতে খেলতে বড়ো হয়েছে। তাকে লেখাপড়াও শেখানো হয়েছে। বড়ো মায়া পড়ে গেছে সবার জন্য। শরীফার মৃত্যুতে ফরিদা খুব কেঁদেছিল। বলেছিল, আমি আবার আমার মাকে হারালাম। আমি এতিম হয়ে গেলাম। আমাকে দেখার আর কেউ রইল না। অনেক বুঝিয়ে সুজিয়ে ওকে বিদায় করা হয়। ফরিদার মায়ের মৃত্যুর পর ওর বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে। সৎ মায়ের সংসারে তার ঠাঁই হয়নি। মায়ের স্নেহ মমতা সে পেয়েছিল শরীফার কাছে। আজ শরীফা নেই। তার আর কেউ রইল না।
আজিজের মধ্য-বয়সী একজন ড্রাইভার আছে। তার নাম সুকুমার সাহা। সে গাড়ি চালায়, বাজার করে। লকডাউন থাকায় গাড়ি চালাতে হয় না। এখন রান্নাসহ ঘরের সব কাজ করে। এমন কি আজিজকে ওষুধ খাওয়ার কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়।
সুকুমারের বাড়ি পিরোজপুর জেলায়। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেখানে ব্যাপকহারে হিন্দু নিধন হয়। সুকুমারের স্ত্রী কল্পনা সন্তান-সম্ভবা ছিল। গুণ্ডারা কল্পনাকে ধর্ষণ করে হত্যা করে। সুকুমার ও তার বাবা-মাকে মারপিট করে বাড়ি ঘরে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। থানায় মামলা করেও কোনো লাভ হয়নি। গুণ্ডারা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়। হতাশ হয়ে বাবা-মাকে সাথে নিয়ে সে দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যায়। সেখানে একটি আশ্রয় শিবিরে ওঠে। মাস কয়েক পর কলেরা হয়ে মা-বাবা দু’জনে মারা যায়। সুকুমারের জীবনে আর কেউ রইলো না। কয়েক বছর চাকরির চেষ্টা করে, কাজের খোঁজ করে। সুবিধা করতে না পেরে আবার আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে সে দেশে ফিরে আসে। ফজল শেখের বাড়িতে ওঠে। তার বাড়ি বেদখল হয়ে যায়। ফজল শেখ তার বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সুকুমার তাকে চাচা বলে ডাকে। এখানে থেকে সে চাকরির চেষ্টা করতে থাকে। আজিজের ফ্ল্যাটের দারোয়ান ফজল শেখের ছোট ভাই মনির শেখ। মনির শেখ একদিন সুকুমারকে আজিজের কাছে নিয়ে আসে তার চাকরির জন্য। আজিজ জিজ্ঞাসা করে, তুমি কি কাজ জানো? সুকুমার বলে, আমি কৃষিকাজ ছাড়া কোনো কাজ জানি না। তবে সুযোগ পেলে আমি যে কোনো কাজ শিখে নেব। আজিজ কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল, তুমি এখন আমার বাসায় কাজ করো, বাজার সওদা করবে। থাকবে মনির শেখের সাথে। এই ফাঁকে তুমি ড্রাইভিং শিখে ফেল। আমার বর্তমান ড্রাইভার বৃদ্ধ হয়েছে। বিদায় নিতে চাইছে। সুকুমার এক মাসেই ভালো ড্রাইভিং শিখে ফেলে। আজিজ তাকে ড্রাইভারের কাজে বহাল করে।
সুকুমার অত্যন্ত বিশ্বস্ত আর অনুগত। শরীফাকে মা বলে ডাকে। আজিজকে বলে স্যার। শরীফা একদিন তাকে বলে, তুমি বিয়ে করে ঘর সংসার করো। বিয়ের খরচ আমরা দেব। সুকুমার বলে, সংসারের প্রতি আমার কোনো আগ্রহ নেই। আমার স্ত্রী কল্পনাকে আমি কখনো ভুলতে পারবো না। এরপর তাকে বিয়ের জন্য আর চাপ দেয়া হয়নি। আজিজ লক্ষ করেছে, সুকুমার মাঝে মাঝে কথার ফাঁকে ‘ইনশাআল্লাহ’ আর ‘মাশাআল্লাহ’ বলে। প্রাসঙ্গিক, অপ্রাসঙ্গিক সব কথার মাঝেই শব্দ দু’টি ব্যবহার করে। আজিজ জিজ্ঞাসা করে, তুমি শব্দ দু’টি কেমন করে শিখলে? সুকুমার বলে, ‘ইনশাআল্লাহ’ শিখেছি বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ শুনে। টেলিভিশনে প্রায়ই বঙ্গবন্ধুর ভাষণের এ অংশটি শোনায়। আর ‘মাশাআল্লাহ’ শিখেছি মনির চাচার কাছে। তার কোনো কাজ করে দিলে বলেন, ‘মাশাআল্লাহ’। আমি শব্দ দু’টির অর্থ জানি না। কিন্তু বলতে এবং শুনতে ভালো লাগে।
শরীফাকে আজিজ ভালোবেসে বিয়ে করেছিল। দুই পরিবারের কেউ এ বিয়েতে রাজি ছিল না। শরীফাকে নিয়ে আজিজ প্রথমে তার বড়ো ভাইয়ের বাসায় ওঠে। মাস দু’য়েক থাকার পর বুঝলো, কারো ভারবাহী হয়ে বেশিদিন থাকা যায় না। ইতোমধ্যে একটি বেসরকারি স্কুলে শরীফা চাকরি পেয়ে যায়। এবং আশ্চর্যজনকভাবে একটি বেসরকারি ব্যাংকে আজিজও চাকরি পেয়ে যায়। তিন মাস প্রবেশনারি পিরিয়ড। তারপর স্থায়ীকরণ। বেশি দেরি করলো না। প্রথম মাসের বেতন পেয়েই তারা শান্তিনগরে ছোট একটা ঘর ভাড়া করে। সে আজ কতদিন আগের কথা। পরের বছর ছেলে সুমিতের জন্ম। চার বছর পর মেয়ে দিলারা। ধীরে ধীরে তারা বড়ো হতে থাকে। বিএ পাস করার পর দিলারার বিয়ে হয়ে যায় এক ইঞ্জিনিয়ার ছেলের সাথে। চলে যায় আমেরিকায়। এমকম পাস করে সুমিত চলে যায় কানাডায়। বিদেশেই নাগরিকত্ব নিয়ে তারা স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকে। প্রথম প্রথম প্রতিবছর দু’জনে একবার করে দেশে আসতো। সন্তান হবার পর তাদের আসা যাওয়া কমে যায়। সন্তানেরা স্কুলে, কলেজে পড়ে। সুমিতের দুই ছেলে এবং দিলারার দুই মেয়ে। এখন কয়েক বছর পর পর সন্তানদের নিয়ে তারা দেশে আসে। তখন শরীফাকে আর কাছে পাওয়া যায় না। সারা বছর তারা দু’জন তীর্থের কাকের মতো ছেলেমেয়েদের প্রতীক্ষায় থাকে। মাঝে মাঝে ওরা যখন ফোন করে তখন তাদের দু’জনের বেশ ভালো সময় কাটে। নাতি, নাতনিসহ সুমিত ও দিলারার ছবি দেয়ালে সাজিয়ে রাখে।
দেশে করোনা ভাইরাসের আক্রমণ শুরু হলে প্রায় প্রতিদিনই সুমিত ও দিলারা ফোন করে বাবা-মার খবর নেয়। তাদের কণ্ঠে থাকে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা। আজিজ তাদের উদ্বেগ প্রশমন করার জন্য বলে, আমরা ভালো আছি, তোমরা সাবধানে থেকো। নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোবে, জীবাণুনাশক দিয়ে বারবার হাত পরিষ্কার করবে। গরম পানি খাবে, গরম পানি দিয়ে গার্গল করবে, গরম পানির ভাপ নেবে। কখনো ঘর থেকে বের হবে না। কারো সাথে মিশবে না। বাচ্চাদের সাবধানে রাখবে। ঘরে ব্যায়াম করবে, বই পড়বে, গান শুনবে, টিভি দেখবে। একই উপদেশ অপর প্রান্ত থেকেও আসে।
‘লকডাউন’ যখন প্রথম শুরু হয় আজিজ শরীফাকে বলেছিল, লকডাউন হয়ে ভালোই হলো। আর তিন মাস পরেই তো আমি অবসরে যাব। এখন থেকে ঘরে বসে থাকার অভ্যাস হলে তখন আর অসুবিধা হবে না। কাজ না করে মানুষ যে কেমন করে ঘরে বসে থাকে ভাবতে পারি না। কর্মই হচ্ছে জীবন। সরকারি কর্মচারীদের অবসরে যাবার বয়স আরো দশ বছর বাড়িয়ে দেয়া উচিত। শরীফা বলেছিল, আমার চাকরি করতে আর ভালো লাগছে না। আমি স্বেচ্ছা-অবসরে যাবো। প্রাণ ভরে ঘুমাবো। বন্ধুদের সাথে গল্প করবো। আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি বেড়াতে যাবো। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সুচিত্রা উত্তমের ছবি দেখব, পুরানো দিনের গান শুনবো, রবীন্দ্র সংগীত শুনবো, নজরুল গীতি শুনবো, মাঝে মাঝে শিল্পকলা একাডেমিতে গিয়ে নাটক দেখবো। তোমাকে নিয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থান দেখতে যাব। আল্লাহর কাছে বলি, পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হবার আগে যেন আমার মৃত্যু না হয়। পদ্মা সেতুর উপর দিয়ে ট্রেনে, গাড়িতে সমুদ্রের মতো বিশাল পদ্মার ঢেউ দেখতে দেখতে যাবো। বলতে বলতে শরীফার চোখ মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
পদ্মা সেতুর কাজ এখনো শেষ হয়নি। কবে যে শেষ হবে তা কেউ সঠিক বলতে পারছে না। বারবার উদ্বোধনের তারিখ বদল হচ্ছে। কিন্তু শরীফা মরে গেল। সেই সঙ্গে শেষ হলো তার লালিত সমস্ত আশা, আকাক্সক্ষা আর ইচ্ছা।
বাথরুমে শেভ করতে গিয়ে আজিজ দেখে, শেভিং ফোম ফুরিয়ে গেছে। শেষবার বাড়ি আসার সময় সুমিত আর দিলারা অন্যান্য জিনিসের সাথে শেভিং ফোম আর শেভিং রেজার এনেছিল। রেজার এখনো অনেকগুলো আছে। ফোম ফুরিয়ে গেছে। লকডাউন ওঠার পর কিনবে ভেবেছিল। লকডাউনও উঠছে না, ফোমও আর কেনা হয় না। গা-মাখার সাবান দিয়ে শেভের কাজটা সে সেরে নেয়।
৮ মার্চ ঢাকার মুগদা পাড়ায় প্রথম এক ব্যক্তি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ভদ্রলোক ছিলেন একজন অধ্যাপক। ঢাকা কলেজে তিনি শরীফার সহকর্মী ছিলেন। তার ছেলে এবং জামাতাও করোনায় আক্রান্ত হয়। কিছুদিন কোয়ারেন্টাইনে থাকার পর তারা সুস্থ হয়।
এরপর থেকে সরকার করোনাবিরোধী অভিযান শুরু করে। করোনা যে সুদূর চীন থেকে এত দ্রæত এ দেশে আসবে কেউ ভাবতে পারেনি। শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ^ব্যাপী অতি দ্রæত করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। এই রোগ এত মারাত্মক যে স্পর্শ মাত্র মানুষ সংক্রমিত হয়। বাংলাদেশসহ বিশে^র সকল দেশে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার উদ্দেশ্যে অফিস আদালত, কলকারখানা, দোকানপাট, সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘লকডাউন’ ঘোষণা করা হয়। সকলকে ঘরে থাকতে বলা হয়। বাস, ট্রেন, বিমানসহ সকল গণপরিবহন বন্ধ করে দেয়া হয়। শুরু হয় আদিম গুহাবাসী মানবের মতো জীবনযাত্রা। বিদেশে অবস্থানরত ও কর্মরত বাঙালিরা করোনা ভাইরাসের জীবাণু বহন করে দেশে ফিরতে থাকে। তাদের জন্য কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা করা হয়।
খেলাধুলা বন্ধ হয়ে পড়ে, মসজিদ, মন্দির, গির্জায় উপাসনা বন্ধ হয়ে যায়। রাস্তাঘাট, বাজার কোথাও মানুষ দেখা যায় না। এক কথায় গোটা বিশ্ব স্থবির হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের অবস্থাও তথৈবচ। আজিজের এক বন্ধুর ছোট্ট নাতনি নানাকে কাছে পাবার জন্য ফোন করে বলেছে, নানা তুমি চুপিচুপি চলে এসো, করোনা তোমাকে দেখতে পাবে না। করোনার প্রাদুর্ভাবের অনেক আগেই কবি জীবনানন্দ দাশ বলেছেন, ‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ।’
দোকানপাট, কলকারখানা, পরিবহন বন্ধ হয়ে যাবার ফলে মানুষ বেকার হয়ে পড়ে। দেখা দেয় তীব্র খাদ্য সংকট। মানুষ ‘লকডাউন’ ভেঙে বাইরে বেরিয়ে পড়ে। বিভ্রান্ত হয়ে শহরের মানুষ ছুটতে থাকে গ্রামের দিকে, গ্রামের মানুষ ছুটে আসে শহরে। দেশে শুরু হয় ব্যাপক ত্রাণ তৎপরতা। ক্ষুধার্থ মানুষের জন্য লঙ্গরখানা খোলা হয়। দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি শোনা যায়। মানুষের বাড়ি বাড়ি খাদ্য পৌঁছে দেয়া হতে থাকে। সরকার ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য আর্থিক প্রণোদনা ঘোষণা করে। চিকিৎসার জন্য হাসপাতালের সংখ্যা, স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা বাড়াতে থাকে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সকল জেলা প্রশাসক ও জনপ্রতিনিধিদের সাথে দেশের সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনা করেন। মুজিববর্ষ, নববর্ষ ও স্বাধীনতা দিবসসহ সকল জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়। প্রতিদিন খবর আসে, হাসপাতালের সংখ্যা বাড়ানো সত্বেও করোনা আক্রান্ত রোগীর স্থান সংকুলান হচ্ছে না। চিকিৎসাসেবা না নিয়ে অনেককে ফিরে যেতে হয়। নিম্নমানের ‘স্বাস্থ্য সুরক্ষার যন্ত্রপাতি পিপিই ব্যবহার করে অনেক চিকিৎসক ও নার্স করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যান। নি¤œমানের স্বাস্থ্য সুরক্ষা যন্ত্রপাতির প্রতিবাদ করায় অনেক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি দেয়া হয়।
জাতিসংঘের মহাসচিব এন্টোনিও গুতেরেজ বলেছেন, ‘করোনা ভাইরাস ঘৃণার সুনামি ছড়িয়ে দিয়েছে।’ সংবাদপত্রে ছাপা হয়, ‘পুত্র পিতার লাশ দাফন না করে পালাচ্ছে’, ‘সন্তান করোনা আক্রান্ত মাকে রাস্তায় ফেলে আসছে’। একটি সংবাদের শিরোনাম ‘নওগাঁয় স্বামীর করোনা পজিটিভ শুনে স্ত্রী চলে গেছে বাপের বাড়ি।’ বোন ভাইকে দেখার জন্য ফোনে ভাইয়ের অনুমতি প্রার্থনা করে। করোনা ভাই-বোনকে আলাদা করে দিয়েছে। প্রকৃতিকে জয় করে এক সময় যে মানুষ ঐক্যবদ্ধ জীবন যাপন শুরু করেছিল, আজ তারা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। আজিজের মনে হয়, করোনা মানুষের মন থেকে সকল প্রকার স্নেহ-মমতা, ভালোবাসা, সহমর্মিতাবোধ, দায়িত্ববোধ, কর্তব্যবোধ, মানবিকতাবোধ কেড়ে নিতে শুরু করেছে। ঘৃণা, স্বার্থপরতা, আত্মকেন্দ্রিকতা, অবিশ্বাস ও কুসংস্কার মানুষকে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। মানুষের সমাজ, সভ্যতার সমস্ত কীর্তি, শিল্প-সংস্কৃতি সব বিলীন হতে চলেছে। শ্রেষ্ঠত্বের সমস্ত গৌরব মানুষ হারাতে বসেছে। এক কথায় মানুষ আজ অমানুষ হতে চলেছে। আগের মতো গুহাবাসই কি তার লক্ষ্য? করোনা বিশ^ব্যাপী মানুষের ঐক্যে ফাটল ধরিয়ে দিয়েছে। ‘লকডাউন’ শিথিল করায় বেশি সংখ্যক মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করছে। টিভিতে এক বিশেষজ্ঞ বলেছেন, ‘পৃথিবী এক কালো গহ্বরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে’। কেউ কেউ বলছেন, ‘করোনা পুরাতন পৃথিবীকে ধ্বংস করে নতুন পৃথিবীর জন্ম দেবে। আমরা কেউ হয়তো ততদিন বাঁচবো না।’ খবর ছাপা হয়, ‘এক পুলিশ সদস্য আতঙ্কিত হয়ে পাঁচ তলার ছাদ থেকে পড়ে আত্মহত্যা করেছে।’ ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বোরিস জনসনসহ অনেক বিশ্ব নেতা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। রানী এলিজাবেথ ও তাঁর পুত্র চার্লস কোয়ারেন্টাইনে আছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের বিস্তারকে বৈশ্বিক বিপর্যয়ে মহামারি আখ্যা দিয়ে একে সম্মিলিতভাবে সর্বশক্তি দিয়ে মোকাবিলা করার জন্য বিশ্ব বাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
ইতোমধ্যে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনার ওষুধ আবিষ্কারের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। কয়েকটি দেশ আংশিক সাফল্যেরও দাবি করেছে।
বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কারে মানুষ প্রকৃতিকে ব্যবহার করে বর্তমান সভ্যতায় উন্নীত হয়েছে। অথচ সেই মানুষ পর-রাজ্য দখলের লোভে, ক্ষমতার লোভে, ক্ষমতার দম্ভে আণবিক বোমা, হাইড্রোজেন বোমা, জীবাণু বোমাসহ বিভিন্ন মারাত্মক মারণাস্ত্র আবিষ্কার করে প্রকৃতিকে ধ্বংস করতে শুরু করেছে। প্রকৃতি এখন তার প্রতিশোধ নিতে শুরু করেছে। গোটা মানবসভ্যতা আজ অসহায় হয়ে পড়েছে। কবি হেমচন্দ্র বলেছেন, “দারাপুত্র পরিবার তুমি কার কে তোমার বলে, জীব কোরো না ক্রন্দন।”
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, “আমরা যুদ্ধ করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে যখন পরাজিত করতে পেরেছি, তখন করোনা ভাইরাসকেও পরাজিত করতে পারবো।” তিনি করোনার বিরুদ্ধে বিশ^বাসীকে একযোগে লড়াইয়ের আহ্বান জানান।
আজিজ মনের আনন্দে সিগারেট ধরায়। সিগারেটে দু’টান দিতেই টেবিলে পড়ে থাকা কয়েক দিনের সংবাদপত্রের উপর তার দৃষ্টি পড়ে। তাতে লেখা, “করোনা আক্রান্ত মহিলার মৃতদেহ রাস্তায় ফেলে পরিবারের সদস্যরা পালিয়ে গেছে। পুলিশ তাকে দাফন করেছে।” আরেকটি খবর, “পুলিশ আক্রান্ত ৬ হাজার।” আরো খবরের মধ্যে আছে, “তিন মাসে ১২৭ সাংবাদিকের মৃত্যু।” “মৃত্যুপুরী ব্রাজিল দিশেহারা।” “দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল।” “প্রথম দুই মাসে ১০ হাজার, তৃতীয় মাসে ৫০ হাজার।” প্রতিটি সংবাদই উদ্বেগজনক। মৃত্যু, মৃত্যু, মৃত্যু। সারা বিশে^ কেবল মৃত্যু। তার মনে হতে থাকে সে যেন এক মৃত্যুপুরীতে বাস করছে। যে কোনো মুহূর্তে তারও মৃত্যু ঘটতে পারে। কিছুক্ষণের মধ্যে সেও মৃত্যু-সংখ্যার মধ্যে যুক্ত হয়ে পড়বে। তার মানসিক বিকৃতি শুরু হয়। সে অন্যরকম হয়ে পড়ে। রূপকথার সেই রাক্ষসের কথা মনে পড়ে যার প্রতিদিন একটি করে মানুষ খাওয়া চাই। আজিজের চেতনায় বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে থাকে। তার চক্ষু রক্তবর্ণ হয়। মেজাজ যায় বিগড়ে। সে ভাবে রাক্ষসের পেটে যাবার চেয়ে আত্মহত্যা করাই ভালো। পুলিশটি আত্মহত্যা করায় তাকে রাক্ষসের পেটে যেতে হয়নি। সে উদ্ভ্রান্তের মতো পায়চারী করতে করতে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে। তারপর দেয়ালে টাঙানো শরীফার ছবি লক্ষ্য করে বলে, আমি শীঘ্রই তোমার কাছে আসছি। তুমি বেঁচে থাকলেও লাভ হতো না, করোনা আমাদের মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়াতো।
আজিজ এক গ্লাস দুধে ইঁদুর মারার বিষ মেশায়। তারপর বিষ মেশানো সেই দুধের গ্লাসস হাতে তুলে নেয়। এমন সময় টেবিলের সাথে ধাক্কা লাগায় হাত থেকে গ্লাস ভর্তি দুধ মেঝেতে পড়ে যায়। অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বিড়াল ছুটে এসে সেই দুধ পান করে ছটফট করতে করতে মরে যায়। আজিজ বিড়ালের মৃতদেহে নিজেকে দেখতে পায়। সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এমন সময় বাইরে শোরগোল শুনে তার সম্বিত ফিরে আসে। সে জানালা গড়িয়ে দেখতে পায়, ‘লকডাউন’ ভঙ্গ করে উল্লসিত জনতার এক বিশাল মিছিল বড়ো রাস্তা পার হচ্ছে। সেখান থেকে ধ্বনি উঠছে, ‘আর ভয় নাই ‘বাংলাদেশ করোনার ওষুধ আবিষ্কার করেছে।’ এক বক্তা রিকশায় দাঁড়িয়ে মাইকে ঘোষণা করছে, ‘ভাইসব, একাত্তরে আমরা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করেছিলাম, এবার আমরা করোনা ভাইরাসকে পরাজিত করেছি। এখন আর আমরা একা নই, আমাদের সঙ্গে সমগ্র বিশ্ববাসী রয়েছে। জয় বাংলা।’
মিছিল দেখে আজিজ আপন মনে বলতে থাকে, ‘মানুষ মানুষের জন্য এগিয়ে আসছে। নির্বাসিত স্নেহ, মায়া, মমতা, প্রেম, প্রীতি, ভালোবাসা আবার ফিরে আসবে। আনন্দমুখর হবে, কর্মচঞ্চল হবে পৃথিবী। শিশুদের কলকাকলীর মূর্ছনায় প্রাণপ্রাচুর্যে ভরে উঠবে প্রাঙ্গণ। শরীফা দেখে যেতে পারলো না।’
মিছিলে প্ল্যাকার্ডে বড়ো তিনটি ছবি : জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতিসংঘের মহাসচিব এন্টনিও গুতেরেজ আর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা।

ডিসি