কচুয়ার স্কুল ছাত্রীর ধর্ষক ও হত্যাকারীদের শাস্তির দাবি

আগের সংবাদ

বগুড়ায় ইউএনওসহ ক‌রোনায় নতুন আক্রান্ত  ৩২ 

পরের সংবাদ

বদলে যাওয়া কাশ্মির

আলমগীর হোসাইন

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ৪, ২০২০ , ৪:৫২ অপরাহ্ণ

ঠিক এক বছর আগে ৩৭০ ধারা বাতিলের পর থেকেই কাশ্মিরে শুরু হয়েছে মানুষের কল্যাণে বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচি। উপত্যকার মানুষ পেতে শুরু করেছেন সেই কর্মসূচির সুফল। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে খোলা হয়েছে ভারতীয় ডাক বিভাগের পার্সেল হাব। বাহারি ফুল থেকে আন্তর্জাতিক পদ্ধতিতে তেল বের করার বন্দোবস্তও করা হচ্ছে এক বছরের কম সময়ে। শ্রীনগরের রাস্তায় জ্বলছে এলইডি লাইট। মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে সরকারের বিভিন্ন জনমুখী কর্মসূচির সুফল। এ এক অন্য কাশ্মির। জম্মু ও কাশ্মির এবং লাদাখের মানুষের কল্যাণে সরকার কতটা যতœশীল সেটা তারা ভালোই বুঝতে পারছেন।
৩৭০ ধারা বাতিলের এক বছরের মধ্যেই শ্রীনগরে পুরোদমে চালু হয়ে গিয়েছে ভারতীয় পোস্ট অফিসের পার্সেল হাব। ফলে পণ্য পাঠাতে বাড়তি সুবিধা পাচ্ছেন উপত্যকার মানুষ। লকডাউন পরিস্থিতিতে ই-কমার্সের সুবিধাযুক্ত এই পার্সেল হাবের কল্যাণে বাড়িতে বসেই ডাক ব্যবস্থার সুবিধা নিতে পাচ্ছেন অনেকেই। আগে শহরে এই সুবিধা ছিল না। তখন বেশ কষ্ট পেতে হতো শহরবাসীকে। এখন ই-কমার্সের কল্যাণে জীবনযাত্রা আরো সহজ হয়েছে। পার্সেল দেয়া-নেয়াতেও এসেছে বাড়তি সুবিধা। জানুয়ারি মাস থেকেই শ্রীনগরসহ বিভিন্ন জায়গার মানুষ ডাকঘরের সুবিধা পুরোদমে ব্যবহার করতে পারছেন।
পার্সেল হাবে ব্যবহৃত হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তির। চিঠি বাছাই বা ওজন করার জন্য বসেছে নতুন প্রযুক্তি। পার্সেল বুকিং হচ্ছে অনলাইনে। ফলে কাজে এসেছে আরো স্বচ্ছতা। কোভিড-১৯ বৈশ্বিক অতিমারির সময় ভারতীয় ডাকঘরের এই বন্দোবস্ত বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে তাদের। স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেরাই বলছেন সে কথা। শ্রীনগরের বাসিন্দা আকিব সুলতান উচ্ছ¡াসিত ডাক পরিকাঠামোর উন্নয়নে। বললেন, মানুষের খুব উপকার হচ্ছে। ই-কমার্সের সুবিধা কাশ্মির উপত্যকায় ব্যবসায়িক শ্রীবৃদ্ধি ঘটাতেও সহায়ক হবে বলে তিনি মনে করেন। শ্রীনগরেরই ফারহান আহমেদ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, বৈশ্বিক অতিমারির সময় পার্সেল দেয়া-নেয়া করতে খুবই কাজে লাগছে পার্সেল হাব। শহরবাসী বাড়ি থেকেই পার্সেল দেয়া-নেয়া করতে পারছেন। সময়ও কম লাগছে। জীবনযাত্রা আরো সহজ হয়ে উঠেছে।
একইভাবে কাশ্মিরে মানুষকে আত্মনির্ভর করারও চেষ্টা চলছে। শ্রীনগরে ফুল থেকে তেল তৈরির কারখানা গড়ে তোলা হচ্ছে। ফলে ফুল চাষিরা পাবেন উৎপাদিত পণ্যের ভালো দাম। আবার বেকারদের কর্মসংস্থানেও বিশেষ ভ‚মিকা নেবে তেলকল। জম্মু ও কাশ্মির গত বছর নতুনভাবে আত্মপ্রকাশের পর থেকেই কর্মসংস্থানকে বাড়তি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। জম্মু ও কাশ্মিরে ফুলচাষ পাচ্ছে বাড়তি গুরুত্ব। আর ফুল চাষিদের স্বার্থেই আধুনিক তেলকল গড়ে উঠেছে শ্রীনগরে। কাশ্মিরের কৃষি অধিকর্তা আলতাফ আইজাজ আন্দরবি সাংবাদিকদের জানান, কাশ্মিরে কৃষি উৎপাদনে বৈচিত্র্য আনতে চাইছে সরকার। লক্ষ্য রাখা হচ্ছে কৃষকদের রোজগারের বিষয়টিও। তিনি জানান, টাকার জোগানে কোনো ঘাটতি নেই। সরকার কৃষি ক্ষেত্রে সব ধরনের আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। ফুলচাষের বিকাশের মাধ্যমে সরকার চাষিদের স্থায়ী রোজগারের বন্দোবস্ত করতে বদ্ধপরিকর বলেও তিনি মন্তব্য করেন। কৃষি অধিকর্তা জানান, শ্রীনগরের লাল মান্ডিতে এই তেলকল গড়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিতে তেলকলটি গড়ে উঠলেই ফুলের চাহিদা আরো বাড়বে। বাড়বে কর্মসংস্থানের সুযোগও। বিকাশের সুফল পৌঁছে যাবে উপত্যকার বিভিন্ন জনপদে।
শুধু তেলকলই নয়, ৩৭০ ধারা বিলোপের পর থেকেই মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে হরেক সুবিধা। এতকাল পর জম্মু-কাশ্মিরের ছাত্ররা পাচ্ছেন সংরক্ষণের সুবিধা। এসসি, এসটি, ওবিসিদের পাশাপাশি শারীরিক প্রতিবন্ধী বা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে শিক্ষার বিস্তারে শুরু হয়েছে বৃত্তি প্রদান। অনাথ শিশুদের থেকে শুরু করে বিধবা বা বয়স্ক মহিলারা পাচ্ছেন সামাজিক ভাতা। এতকাল এই সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত ছিলেন। পড়ুয়াদের মধ্যে দুস্থদের থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্তও করা হয়েছে। সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী সামাজিক সংস্থার মাধ্যমেও শুরু হয়েছে জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি। চলছে কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ, সামাজিক সমস্যা নিরসনে বিভিন্ন পদক্ষেপও। সোজা কথায়, দেশের আর ৫ জন সাধারণ নাগরিকের মতোই ৩৭০ ধারা বিলোপের পর কাশ্মিরের মানুষও এখন ভোগ করতে পারছেন।
সরকারি তথ্য মতে, ২০১৯-২০ অর্থবছরেই জম্মু ও কাশ্মিরের ৫ লাখ ১৭ হাজার ছাত্রছাত্রী প্রাক-মাধ্যমিক স্কলারশিপ পেয়েছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেয়ার পাশাপাশি গৃহহীনদের ঘর দেয়ার কাজও শুরু হয়েছে। ৬২ হাজার ৯৩২টি ঘর নির্মাণের কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যেই ৩৬ হাজার ৭৮০টি বাড়ির সরকারি অনুমোদনও পাওয়া গিয়েছে। বেশকিছু ঘর নির্মাণ করা হয়েছে এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে। পাইপলাইনের মাধ্যমে পানীয়জল সরবরাহ করা হচ্ছে বহু গ্রামে। আরো বহু গ্রামে চলছে পরিশ্রæত পানীয়জল পৌঁছানোর কাজ। মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নকে দেয়া হচ্ছে বাড়তি গুরুত্ব। তাই মন দেয়া হয়েছে শহরের সৌন্দর্যায়নেও। স্মার্ট সিটি প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছে শ্রীনগরকেও। সেই প্রকল্পের অধীনে শহরে লেগেছে এলইডি লাইট। ৩৭০ ধারার বিলোপ উপত্যকার মানুষদের কাছে আশীর্বাদ হয়ে ধরা দিয়েছে। তারা খুশি। সাংবাদিকদের সামনে খোলাখুলি বলছেন উপত্যকার মানুষ।
তাই কমছে সন্ত্রাস। সরকারি তথ্য থেকেই জানা যায় কথায় কথায় পাথর ছোড়াও কমেছে উপত্যকায়। মানুষের মঙ্গলের জন্য সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি নেয়ায় জঙ্গিরা আর আগের মতো জনসমর্থন পাচ্ছে না। তাই অশান্তি কমছে। ২০২০ সালের প্রথম ৬ মাসের সঙ্গে আগের বছরের প্রথম ৬ মাসের পাথর ছোড়ার ঘটনার তুলনা করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে। ২০১৮ সালে পাথর ছোড়ার ঘটনা ছিল ৯৪৪টি ঘটনা। সেখানে চলতি বছরে মাত্র ২১১টি। ফলে নিরাপত্তাকর্মী বা সাধারণ মানুষের রক্তক্ষয়ও অনেক কমে গিয়েছে। উল্লেখ্য, গত বছরের ৫ আগস্টে ৩৭০ ধারা বাতিল করার পর অশান্তি সৃষ্টিকারীদের চিহ্নিত করে জেলে পাঠানো হয়েছে। পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে রক্তপাত কমছে উপত্যকায়। ২০১৮ সালে এ ধরনের ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১৮। সেটা ২০১৯ সালে কমে হয়েছে ৩। আর ২০২০ সালের প্রথম ৭ মাসে পাথরের আঘাতে মাত্র একজন নাগরিক মারা গিয়েছেন। শুধু মৃত্যুই নয়, পাথরের আঘাতে সাধারণ মানুষ থেকে নিরাপত্তারক্ষীদের আহত হওয়াও কমেছে। এই ২ বছরের তুলনামূলক হিসাব বলছে, আহত হওয়ার সংখ্যা ২০১৮ সালে ছিল ৩৩৫। সেখান থেকে কমে ৬৩ হয়েছে ২০১৯ সালে। ২০২০ সালে সেই সংখ্যা আরো কমে এখনো পর্যন্ত আহত ১৪ জন। অশান্তির আগুন নিভিয়ে আসলে কাশ্মিরের মানুষও এখন চাইছেন সরকারি সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন। সরকার তাদের সামনে সেই সুবিধা সরাসরি পৌঁছে দিচ্ছে গত এক বছর ধরে।

আলমগীর হোসাইন : কলাম লেখক।

এসএইচ