বগুড়ায় ইউএনওসহ ক‌রোনায় নতুন আক্রান্ত  ৩২ 

আগের সংবাদ

একটি অযাচিত পরামর্শ

পরের সংবাদ

করোনাকালেও সিন্ডিকেট মুক্ত নয় উৎসব

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ৪, ২০২০ , ৪:৫৬ অপরাহ্ণ

কুরবানিকে কেন্দ্র করে চামড়া ক্রয় বিক্রয় এবং শিল্পজাতকরণটি যেভাবে হচ্ছে তাতে নৈতিকতা ও ধর্মীয় শিক্ষার চেয়ে অনৈতিকতা ও কারসাজির লীলাখেলাই প্রতি বছর জয়ী হচ্ছে। এসব কারসাজি ভাঙার কোনো শক্তি রাষ্ট্র ক্ষমতারও মনে হয় নেই। কারণ এর সঙ্গে যুক্ত থাকে অসংখ্য ছোট-মাঝারি ও বড় স্বার্থবাদী গোষ্ঠী। তাদের কাছে শুধু জনগণ এবং সরকারই নয় ধর্মীয় শিক্ষাও অনেকটাই যেন জিম্মি হয়ে পড়েছে! আমরা কবে হব ধর্মের প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত, কবে হব মানবিক মূল্যবোধের মানুষ?

কুরবানির ঈদ শেষ হয়েছে। ঈদের আগে দেশে করোনা সংক্রমণ এবং বন্যার বিস্তার ব্যাপকভাবে ঘটায় মানুষের জীবন ছিল নাজেহাল। ফলে এবার ঈদ নিয়ে বেশিরভাগ মানুষই দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। অনেকেই বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো সীমিত আকারে ঈদের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার বেশি কিছু ভাবেননি। অনেকের হাতেই ঈদ উৎসব পালনের মতো পর্যাপ্ত পয়সা নেই বলে প্রচার ছিল। কুরবানির ঈদে মূলত গরু, ছাগল, মহিষ, ভেড়া কুরবানি দেয়াকে কেন্দ্র করে এক ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দেশে বেড়ে উঠেছে। এই ঈদে পোশাকের কেনাবেচা কিছুটা কমই থাকে। সে কারণে এ বছর ঈদের আগে বিপণিবিতানগুলোতে খুব বেশি উপচেপড়া ভিড় পরিলক্ষিত হয়নি। তবে মসলাপাতিসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনাকাটায় মানুষের ব্যস্ততা এবং ব্যবসায়ীদের প্রস্তুতি ছিল। তারপরও ধারণা করা হয়েছিল এবার যেহেতু করোনা এবং বন্যার দুর্যোগ আমাদের জীবনকে ভীষণভাবে পর্যুদস্ত করে দিয়েছে, তাই কেনাকাটায় এবার সিন্ডিকেট নামক শব্দটি খুব বেশি শুনতে হবে না। কিন্তু বাংলাদেশে বোধহয় সিন্ডিকেট ছাড়া কোনো ধরনের ব্যবসা, ‘সেবা’ পরিবহন ব্যবস্থা সুস্থ স্বাভাবিক ব্যবসার নজির স্থাপন করতে পারে না। এবারো কুরবানির আগে পশু কেনাবেচা নিয়ে বেশ বড় ধরনের অনাকাক্সিক্ষত সিন্ডিকেট দেশের অনেক জায়গায়ই জাল বিস্তার করতে পেরেছিল। আবার বেসরকারি পরিবহন মালিকরাও ঈদের দুদিন আগ থেকে আকস্মিকভাবে পূর্বনির্ধারিত ৬০ শতাংশ বর্ধিত ভাড়ার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে যার যার খুশিমতো ভাড়া আদায় করে নিয়েছে যাত্রী সাধারণের কাছ থেকে। কুরবানির ঈদের সবচেয়ে বড় সিন্ডিকেটটি ঘটে পশুর চামড়া কেনাবেচা নিয়ে। এবারো তাই ঘটেছে। বিপুলসংখ্যক পশুর চামড়া সাধারণ বিক্রেতারা পানির দামে বিক্রি করতে যেমন বাধ্য হয়েছেন আবার মধ্যস্বত্বভোগীরা একে অপরকে চামড়া নিয়ে বিপাকে ফেলার কারসাজি করতে মোটেও বিবেকের চর্চা করেনি। ট্যানারির মালিকরা তো ‘সাধু’ সেজে দূরের নেপথ্যে বসে আছে! ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট থেকে প্রত্যেকেই নিজেদের স্বার্থ আদায় করে নিচ্ছে। কিন্তু এই ব্যবসাটি সংগঠিত হয় নিজেদের একটি পবিত্র ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে। অথচ পৃথিবীর অনেক দেশেই এসব উৎসব উপলক্ষে সব ধরনের বাজার থাকে সিন্ডিকেটমুক্ত, ন্যায্যমূল্য, এমনকি বিশেষ ছাড়ে ভরপুর। ভোক্তারা উৎসব উপলক্ষে বাজার থেকে কম বা ন্যায্যমূল্যেই সবকিছু ক্রয় করার সুযোগ পান। এই বিষয়টি আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরাও খুব ভালো করে জানেন। আজকাল মিডিয়ার কল্যাণে কিংবা দেশে-বিদেশে যাতায়াতের কারণে কোথায় উৎসবের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রী কিংবা ঈদের আগে পশুর মূল্য কতটা ছাড় দিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে সেটি তাদের খুব ভালো করেই জানা আছে। কিন্তু আমাদের উঠতি, প্রতিষ্ঠিত এবং একচেটিয়া ব্যবসায়ী এবং শিল্পপতিরাও এই সংস্কৃতির চর্চা কিংবা ধর্মীয় বিধানকে শ্রদ্ধা করার বিধানে নিজের দেশের উৎসবকে সিন্ডিকেটমুক্ত, অপবিত্র করতে ছাড়েন না। তারা একবারও এসব ধর্মীয় উৎসবকে আনন্দমুখর, লোভমুক্ত বা বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাজার সংস্কৃতি গড়ে উঠতে নজির স্থাপন করেন না। এবার করোনা ও বন্যার এমন ভয়াবহ অবস্থার মধ্যেও সিন্ডিকেট নামক ষড়যন্ত্রের ব্যবসাটি তারা করতে একবারও বিবেকের চর্চা করেননি।
এবার কুরবানি ঈদের আগে সরকার থেকে বলা হয়েছিল সীমিত আকারে পশু কেনাবেচা করার সুযোগ দেয়া হবে। যদিও দেশে গরু, ছাগল কেন্দ্রিক অসংখ্য খামার গত কয়েক বছরে গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশের ঈদের বাজারের চাহিদা পূরণে আমাদের খামারিরাই যথেষ্ট পরিমাণে গরু, ছাগল, মহিষ, ভেড়া উৎপাদন করতে সক্ষমতা অর্জন করেছে। সুতরাং করোনা ও বন্যার এই দুরবস্থার মধ্যে খামারিরাই বরং তাদের পশু নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন। গণমাধ্যমে বেশকিছু খবরে তাদের মধ্যে দুশ্চিন্তার বিষয়টি প্রকাশিত হয়েছিল। কুরবানির জন্য অনেকেই কিছুটা দ্বিধাদ্ব›েদ্ব থাকার পরও ভেবেছিলেন হয়তো ন্যায্যমূল্যে বাজারে গরু-ছাগল পাওয়া যেতে পারে। সে কারণে অনেকেই ধর্মীয় বিষয় হিসেবে কুরবানি দেয়ার প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন। কিন্তু ঈদের দুদিন আগ থেকে পশুর বাজারে পশুর সংকট দেখে অনেকেই হিসাব মিলাতে পারছিল না। শেষের দিন ঢাকাসহ বড় বড় অনেক শহরেই পশুর বাজার থেকে পশু অনেকটাই উধাও হয়ে যায়। এটি ইজারাদার, ব্যবসায়ী, মধ্যস্বত্বভোগীদের উদ্ভাবিত কারসাজি সেটি বুঝতে বাকি থাকল না। ৫০ হাজার টাকার গরু এক লাখেও কেনা যাচ্ছিল নাÑ এমন পরিস্থিতি দুপুরের পর পর্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনার মতো ঘটতে থাকে। আবার সন্ধ্যার দিকে কৃত্রিম সংকটের জায়গায় পশুর উপস্থিতি একেবারেই ভোজবাজির বিষয় হিসেবে দেখা গেল। এ রকম পরিস্থিতিতে এবারের পশুর বাজার পড়বে সেটি সাধারণ ক্রেতারা একবারের জন্যও ভাবতে পারেনি। মিডিয়ায় দুদিন আগে যে ধরনের প্রচার-প্রচারণা ছিল তার বিপরীতটি ঘটেছিল দুদিন পর। ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট যে কী দুর্বিষহ বিষয় হতে পারে সেটি এবার অনেক ক্রেতাই হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলেন। অস্বাভাবিক সংকট সৃষ্টি করে ইজারাদাররা যেমন অধিক মূল্যের হাসিল আদায় করে নিতে পেরেছে আবার মধ্যস্বত্বভোগীরা পথে-ঘাটে পশুবাহী গাড়ি আটকিয়ে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে নিতে পেরেছে। এসব কাণ্ডকীর্তির সঙ্গে ধর্মীয় শিক্ষার কোনো মিলেই নেই। অথচ কুরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে একাধিক গোষ্ঠী বিপুল অর্থ আদায় করে সাধারণ মানুষকে ক্ষতির সম্মুখীন করেছে। অনেকেই শেষ পর্যন্ত পশু ক্রয় না করেই বাড়ি ফিরেছে এমন তথ্য জানতে চাইলেই ঢের পাওয়া যাবে। আসলে আমাদের গণমাধ্যমগুলো সাধারণ সংবাদের পাশাপাশি দেশের নানা দ্রব্যসামগ্রী, উৎসবে কেনাবেচা পণ্যসামগ্রী, গরু, ছাগল, মসলা ইত্যাদির নানা ধরনের প্রতিবেদন যেভাবে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াগুলোতে বেশ আগে থেকেই প্রচার করতে থাকে, তার ফলে বাজার সিন্ডিকেটের নেপথ্য শক্তিরা নানা ধরনের অঙ্ক কষেই কখন কীভাবে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে হয়, ক্রেতা সাধারণের পকেট কাটতে হয় তা তারা খুব ভালো করেই প্রয়োগ করে থাকে। গণমাধ্যম বা সরকারের সব মহলকে বোকা বানাতে এরা কতটা সিদ্ধহস্ত সেটি বিজ্ঞজনরাও বুঝতে পারেন বলে মনে হয় না। আমাদের ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকালিজম বোঝার ক্ষমতা গণমাধ্যম, সাধারণ ভোক্তা, বাজার পরিদর্শক বা সরকারের নীতিনির্ধারকদের আছে বলে মনে হয় না। প্রতিবার প্রতি ঈদ-পালাপার্বণে বাজারে নানা ধরনের সিন্ডিকেটের তৎপরতা এবং অস্বাভাবিক অর্থ হাতিয়ে নেয়ার ঘটনা ঘটেই থাকে। এর কারণ হচ্ছে বাজার সিন্ডিকেটের সঙ্গে যারা যুক্ত তাদের দুর্বুদ্ধিতা, কুযুক্তি এবং নানা ধরনের কারসাজি বোঝার ক্ষমতা অনেকেরই নেই।
ঈদের দিন থেকে পশুরু চামড়া নিয়ে প্রতি বছরই নানা ধরনের সিন্ডিকেট কাজ করে থাকে। এবার চামড়া ব্যবসায়ীরা তাদের সিন্ডিকালিজমের যে নজির স্থাপন করেছেন সেটি গত বছরকেও ছাড়িয়ে গেছে। ছাগলের চামড়ার দাম ১০-২০ টাকা নেমে এসেছে। একটি ছাগলের চামড়া এত কম দামে বিক্রি হবে এটি কি সাধারণ যুক্তিতে ভাবা যায়? একটি মোটামুটি বড় গরুর চামড়া দাম ৪০০-৫০০ টাকায় নেমে যাবে এটিও কি মানতে হবে? আন্তর্জাতিক বাজারের যে দোহাই তারা দিচ্ছেন বাস্তবে কি চামড়ার দাম পৃথিবীতে এতটাই কমে গেছে। সাধারণ খোঁজখবর যারা রাখেন তারাও জানেন চামড়ার দাম এতখানি কমে যায়নি যতখানি বাংলাদেশে কুরবানির মৌসুমে ও ট্যানারি মালিকরা দাবি করে থাকেন। নানা অজুহাতের তাদের শেষ নেই। কখনো বা আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য পতন, কখনো বা টাকার সংকট, কখনো বা লবণ সংকট, কখনো বা সংরক্ষণের সংকট ইত্যাদি অজুহাত দেখিয়ে পারে তো বিনামূল্যে বাজারের চামড়া নিয়ে মধ্যস্বত্বভোগী আড়তদার ও ট্যানারি মালিকরা লাভবান হতে চান। অথচ তারা ভালো করেই জানেন এই চামড়া বিক্রিকৃত অর্থ গরিব সাধারণ মানুষকে দেয়া হয়। কিন্তু চামড়া ব্যবসায়ীরা নানা অজুহাতে চামড়া ক্রয়ে খুব একটা আগ্রহ দেখান না। ফলে মানুষজন বাধ্য হন কমমূল্যে চামড়া বিক্রি করে দিতে। এর ফলে অর্জিত অর্থ কোনো গরিব মানুষ কিংবা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে দিতে গিয়েও দাতারা সন্তুষ্ট হতে পারেন না। এখানে চামড়াকে কেন্দ্র করে তৃণমূল থেকে ট্যানারি প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত নানা ধরনের সিন্ডিকেট ক্রিয়াশীল থাকে, তাদের হাতে সবাই জিম্মি হয়ে পড়ে বস্তুত বাংলাদেশে কুরবানিকে কেন্দ্র করে চামড়া ক্রয় বিক্রয় এবং শিল্পজাতকরণটি যেভাবে হচ্ছে তাতে নৈতিকতা ও ধর্মীয় শিক্ষার চেয়ে অনৈতিকতা ও কারসাজির লীলাখেলাই প্রতি বছর জয়ী হচ্ছে। এসব কারসাজি ভাঙার কোনো শক্তি রাষ্ট্র ক্ষমতারও মনে হয় নেই। কারণ এর সঙ্গে যুক্ত থাকে অসংখ্য ছোট-মাঝারি ও বড় স্বার্থবাদী গোষ্ঠী। তাদের কাছে শুধু জনগণ এবং সরকারই নয় ধর্মীয় শিক্ষাও অনেকটাই যেন জিম্মি হয়ে পড়েছে! আমরা কবে হব ধর্মের প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত, কবে হব মানবিক মূল্যবোধের মানুষ? সেই শিক্ষা ও মানুষ হওয়ার ওপরই নির্ভর করবে আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ, যাপিত জীবন, সামাজিক, ব্যবসা-বাণিজ্যিক সংস্কৃতি যা আমাদের আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তুলনীয় করা যাবে।

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক।
[email protected]

এসএইচ