করোনাকালেও সিন্ডিকেট মুক্ত নয় উৎসব

আগের সংবাদ

চামড়ার বাজারে শৃঙ্খলা ফিরল না!

পরের সংবাদ

একটি অযাচিত পরামর্শ

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ৪, ২০২০ , ৫:০০ অপরাহ্ণ

ইমরান খানরা সুযোগের প্রতীক্ষায় সব সময়ে ছিল, এখনো আছে, তাদের পথচারী ও ব্রতচারীদের সংখ্যা একেবারে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে তা বলব না। যে কোনোভাবে তার প্রকাশ ঘটতে পারে। তাই আমার শেষ কথা হলো বন্ধুত্বে সব সময় উইন-উইন অবস্থা স্থিতিশীল রাখতে হবে। অভ্যন্তরীণ দ্ব›দ্ব নিরসনে সমাজ স্বীকৃত দ্বিপক্ষীয় বা বহুমাত্রিক পন্থা মেনে না নিলে আন্তর্জাতিক সংকটের আশঙ্কা থেকে যাবে।

বেশ কিছুদিনের পর্যবেক্ষণ ও সাম্প্রতিক অবলোকন থেকে আমি একটি উপসিদ্ধান্ত নিচ্ছি যে বাংলাদেশে বাক-স্বাধীনতা অবারিত। এটা প্রিন্ট মিডিয়া ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া খুললেই সহসা চোখে পড়বে। অবারিত বাক-স্বাধীনতার এই সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটালাইজেশনের কারণে। আমরা এখন ইচ্ছা করলেই নিজস্ব পত্রিকা বের করতে পারি অর্থাৎ আমি ব্যক্তিক ফেসবুককে নিজস্ব পত্রিকা বলে চিহ্নিত করছি। এই পত্রিকা প্রকাশের খরচ নেহাত কম এবং তার ওপর সেন্সরশিপের তোড়জোড় হলেও কর্তৃত্ব আরোপের উপায় এখনো সীমিত। তারপর আছে ইউটিউব এবং অন্যান্য প্লাটফর্ম। এখন যার মনে যে কথা উদয় হয়, সে কথা সে স্বল্প ব্যয়ে, অনেকটা নির্দ্বিধায় প্রকাশ করতে পারছে। যার কারণে হাঁড়ির খবর আর কষ্ট করে হাঁড়ি থেকে সংগ্রহ করতে হচ্ছে না, হাঁড়ি নিজেই খবর উপহার দিচ্ছে। বিনিয়োগ অতি সামান্য; হাতে স্মার্ট মোবাইল ফোন অনেকের রয়েছে; ইন্টারনেট সুবিধা গ্রাম-গ্রামান্তরে পরিব্যাপ্ত; ব্রডব্র্যান্ডের অতি সরবরাহ, বিদ্যুতের চাহিদা সরবরাহের চেয়ে অনেক কম। তাই এসব তথ্যাদি পেতে গেলে এখন বিনিয়োগ হচ্ছে কেবল চোখের দৃষ্টি আর সময়। দৃষ্টিহীন হওয়ার আগ পর্যন্ত দৃষ্টি নিয়ে আমাদের উৎকণ্ঠা নেই; আর এখন তো সময়ের মূল্যই নেই। অর্থনীতিবিদদের মতে যে জিনিসের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় মাত্রাতিরিক্ত সেটা বিনা অর্থ ব্যয়ে পাওয়া যায়। করোনার দুর্যোগ ও দুর্ভোগের কালে সময়টা হয়ে গেছে আমাদের ছোটবেলার পানির মতো। তখন ফ্রি পণ্যের উদাহরণ দিতে গিয়ে সবাই পানির প্রসঙ্গ টেনে আনত। এখন বোধহয় সময়কে ফ্রি পণ্য বিবেচনা করলে খুব ভুল হবে না।
এই সময় ও চোখ দুটিকে নিয়োজিত ও বিনিয়োজিত করে আজকাল শুধু হাঁড়ির খবর নয় বহু দুষ্প্রাপ্য খবরে রংচং মাখিয়ে অযথা মানুষের মস্তিষ্কে আলোড়ন সৃষ্টি করা যায়। তাতে সামাজিক বিশৃঙ্খলতার আভাস মিলে। আমাদের এই অবস্থা নিরসনে কখনো সঙ্গত কখনো অসঙ্গত আচরণ লক্ষণীয় এবং মাঝে মাঝে প্রশংসা ও সমালোচনার মুখোমুখি। অবারিত বাক-স্বাধীনতার পরিনামে ফেসবুক বা অন্যান্য মাধ্যমকে পর্নোগ্রাফির আধার বললে ভুল হবে না; রাজনৈতিক প্রচার-অপপ্রচার লক্ষণীয়, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এমনকি ধর্মীয় মতবাদকে পর্যন্ত আঁচড় কাটা হচ্ছে। এগুলোতে সৃষ্টিধর্মী বিষয়াদির সাক্ষাৎ মিলে। তাই হয়তো অনেকেই শত ফুল ফুটাবার পক্ষে। আমিও তবে আমার মনে হচ্ছে কতিপয় ক্ষেত্রে আমরা মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছি যখন টকশোতে ভব্যতা আনা হয়েছে। অন্তত ব্যক্তিক চরিত্র হননের প্রবণতাটা রোধ করা গেছে আর করোনার কারণে টকশো শিল্পীদের আনাগোনা কিছুটা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। ফেসবুক কিংবা ইউটিউবে এখন শনি ভর করছে। দেশের জনসংখ্যার একটা বিশালাংশ তরুণ কিশোর কিংবা যুবা না হলে যৌন সুড়সুড়িময় প্রকাশনা সহ্য করা যেত। সহনশীলতার মাত্রাটা একটু বেশি হলে ধর্মীয় বিতর্কটাকে মেনে নেয়া যেত। সাম্প্রতিককালে সবকিছুকেই ছাপিয়ে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী কিংবা বৈদেশিক নীতিকে নিয়ে এমন সব বিতর্ক উসকে দেয়া হচ্ছে, যাতে যে কোনো সচেতন মানুষ শঙ্কিত হতে বাধ্য।
দিন কয়েক আগে একজন অবসরপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তাকে সেনানিবাস এলাকায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা থেকে যে বিতর্কের জন্ম হয়েছে, আমরা সাধারণ মানুষ তার সামান্যই জানতাম যদি ফেসবুক, ইউটিউবে বা এ জাতীয় সামাজিক গণমাধ্যম না থাকত। তারপরও সশস্ত্র বাহিনীর এসব স্পর্শকাতর বিষয়াদি প্রকাশে আরো সংযত আচরণ কামনা করছেন সাধারণ মানুষ। কারণ এসব সশস্ত্র মানুষের মধ্যে ঝগড়া উসকিয়ে অনভিপ্রেত সামাজিক ও রাজনৈতিক পারিপার্শি¦কতার জন্ম দিতে পারে, যারা অন্তিমে কারো মঙ্গল বয়ে আনবে না। এসব বিতর্কে বিদেশিরা জড়াচ্ছে বা বিদেশিদের টেনে আনা হচ্ছে। সরকারের অবস্থান সুস্পষ্ট করার জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে সেই বহুল প্রচারিত ও ব্যবহৃত কথা পুনরাবৃত্তি ঘটাতে হচ্ছে। আমাদের পররাষ্ট্র নীতির মূল কথাই হচ্ছে যে সবার প্রতি বন্ধুত্ব ও কারো প্রতি শত্রুতা নয়। সবাই বলতে সব প্রতিবেশীর কথাই এসে যায়। দূরের প্রতিবেশীদের সঙ্গে আমাদের গা-ঘেঁষা সম্পর্কে নেই। তবে গা-ঘেঁষা সম্পর্কের কারণে ছোটখাটো টুকাটুকি সংঘর্ষ হিসেবে দেখা দিতে পারে। প্রতিবেশীদের উচ্ছেদ করা সম্ভব নয় এমনকি কাউকে যদি উচ্ছেদ বা বিলোপ করা হয় তাহলে নতুন যে গা-ঘেঁষা প্রতিবেশীর সাক্ষাৎ পাওয়া যাবে তার সঙ্গে সমতা বা ভারসাম্য বিধান বর্তমানের চেয়ে কঠিন হয়ে যেতে পারে। ব্যক্তিগত বন্ধুত্বে যেমন সমতার প্রসঙ্গ জড়িত তেমনি রাষ্ট্রীয় বন্ধুত্বের ক্ষেত্রেও সমতার প্রসঙ্গটি বেশি তাৎপর্যময়। তাকে হতে হবে সর্বদাই উইন-উইন মাত্রার অর্থাৎ উভয় পক্ষকে অন্যান্য যেসব বিকল্প আছে তা সজ্ঞানে পরিহার করতে হবে। অন্য বিকল্পগুলো হলো লস-লস, উইন-লস এবং লস-উইন।
আমাদের অভ্যন্তরীণ কোনো ঘটনা যেমন বন্ধুর মনে দাগ কাটতে পারে তাদের অভ্যন্তরীণ কোনো বিষয়ও আমাদের মনোক্ষুন্ন করতে পারে। অস্বীকার করার জো নেই যে ভারতের নাগরিকত্বের প্রশ্নে তাদের নেতৃত্বের একাংশের বাংলাদেশকে নিয়ে অসংলগ্ন উক্তি, গঙ্গার পানি বণ্টনে অচলাবস্থা ও সীমান্ত হত্যার মতো ঘটনা বা রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমাদের বন্ধুত্বের উইন-উইন জায়গাটাতে কিছুটা হলেও চিড় ধরিয়েছে। তার প্রতিবিধান শুরু হয়েছে। আশা করছি রোহিঙ্গা প্রশ্নে আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের নিরবচ্ছিন্ন সহায়তা আমরা পাব। ক্রিয়া বা প্রতিক্রিয়া হিসেবে চীনের টনক নড়বে। ভারত ও চীন মিলে রোহিঙ্গা সমস্যায় আমাদের মুখী আচরণ করলে এটা আর সমস্যা থাকবে না।
এসব না হলে বাক-স্বাধীনতা ও অবধারিত প্রকাশের তাগিদ মুখ চেপে কথা বন্ধ রাখা যাবে না। নিজেদের অসন্তোষ ও অভ্যন্তরীণ অসন্তোষকে আন্তর্জাতিক বলয়ে নিয়ে যাওয়ার লোকের অভাব হবে না। ইমরান খানরা সুযোগের প্রতীক্ষায় সব সময়ে ছিল, এখনো আছে, তাদের পথচারী ও ব্রতচারীদের সংখ্যা একেবারে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে তা বলব না। যে কোনোভাবে তার প্রকাশ ঘটতে পারে। তাই আমার শেষ কথা হলো বন্ধুত্বে সব সময় উইন-উইন অবস্থা স্থিতিশীল রাখতে হবে। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নিরসনে সমাজ স্বীকৃত দ্বিপক্ষীয় বা বহুমাত্রিক পন্থা মেনে না নিলে আন্তর্জাতিক সংকটের আশঙ্কা থেকে যাবে।

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী : মুক্তিযোদ্ধা; ও উপাচার্য, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

এসএইচ