লাদাখের রহস্যঘেরা চুম্বক পাহাড়

আগের সংবাদ

আর্থিক সংকটেই নেইমারকে ফেরাতে চাচ্ছে না বার্সা

পরের সংবাদ

এই শ্রাবণে সেই ‘ডিফরেন্ট টাচ’

বোরহান বিশ্বাস

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ৪, ২০২০ , ৩:৩৮ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীত জগতে ‘ডিফরেন্ট টাচ’ একটি ভিন্ন ছোঁয়ার নাম

মূলত মেলো ও সফট রক, ফোক ফিউশন আর সেমি ক্ল্যাসিক্যাল গান করে থাকে ব্যান্ডটি। কম গান করেও দীর্ঘদিন সংগীতপিপাসুদের মনে জায়গা নিয়ে থাকা খুব সহজ কথা নয়। সেই ৯০-দশকের শুরুর দিকে রিলিজ হওয়া ব্যান্ডের প্রথম অ্যালবাম ‘ডিফরেন্ট টাচ’ এর গানগুলো আজও সমান জনপ্রিয়। এখনো ঘন বরষায় নিজের অজান্তেই অনেকে গুণ গুণ করে গেয়ে ওঠেন ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’। কিংবা আনমনে উদাস হাওয়ায় মুখ থেকে বেরিয়ে যায় ‘দৃষ্টি প্রদীপ জ্বেলে খুঁজেছি তোমায়’, ‘জীবন মাঝি’, ‘আমার ভালোবাসার তানপুরা’, ‘মন কী যে চায়’, ‘কিছু কথা কিছু গান আছে’। এতোদিন পরেও গানগুলো শ্রোতাদের মণিকোঠায় সজিব হয়ে আছে।

জনপ্রিয়তা যখন তুঙ্গে ঠিক সেই সময় ব্যান্ডটির তরুণ তুর্কিদের কেউ কেউ ব্যক্তিগত কারণে ও জীবন-জীবিকার বাস্তবতায় দল ছেড়ে দেন। তিনজন সদস্য বিদেশ চলে যান। এরই মধ্যে দলের প্রধান মেজবাহ’র বাবা মারা যান। পরিবার এবং পারিবারিক ব্যবসা দেখাশোনার জন্য তিনি চলে যান খুলনায়। ফলে, ৮৫-এর মাঝামাঝিতে ব্যান্ড নিয়ে যে স্বপ্নযাত্রা শুরু হয়েছিল ডিফরেন্ট টাচের, ৯৯-তে এসে তা স্থবির হয়ে যায়। এক দশকেরও বেশি সময় পর নতুন সদস্য নিয়ে আবারো পথচলা শুরু করে ডিফরেন্ট টাচ।

সম্প্রতি ‘ডিফরেন্ট টাচ’র প্রতিষ্ঠাতা এবং নামটি যার দেয়া সেই মেজবাহ রহমানের সঙ্গে কথা হয় ব্যান্ড গঠন ও পরবর্তি কার্যক্রম নিয়ে, আর সামান্য পথ পাড়ি দিলেই হয়তো বাংলাদেশের ফুটবলে মোহামেডান ভক্তরা সাব্বির, বাদল রায়, খোরশেদ বাবুল, রঞ্জিত কিংবা এমিলির মতো ‘মেজবাহ’ নামে আরেকজন ফুটবল তারকার দেখা পেতেন। কিন্তু সেটি হয়নি।

না হওয়ার কারণটি মেজবাহ নিজেই বললেন, ‘আমার বাড়ি খুলনায়। ছোটবেলা ওখানেই কাটিয়েছি। খেলাধুলার ভীষণ পাগল ছিলাম। বিশেষত ফুটবল। জেলা ও বিভাগ পর্যায়ে অনেক খেলেছি। শিল্পী না হলে হয়তো খেলোয়াড়ই হতাম। এসএসসি পরীক্ষার অবসরে পরিচিত বড় ভাই কামাল আহমেদের সঙ্গে ঢাকা মোহামেডান ক্লাবে এসেছিলাম। তিনি ওই ক্লাবের আজীবন সদস্য ছিলেন। সালাম মুর্শেদী, আবুল ভাইসহ অনেকের সঙ্গে কথা হয়েছিল। পরে খুলনায় ফিরে গেলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়।

মেজবাহ

একদিন হঠাৎ আমার এক বন্ধু বলল সে গিটার শিখতে যাবে। আমিও তার সঙ্গে যেতে রাজি হয়ে গেলাম। সেখানে গিয়ে ওর শেখা দেখে প্রথমবারের মতো আমার গিটার শেখার ইচ্ছে হলো। পরে টুকটাক গানের পাশাপাশি গিটার বাজাতে থাকলাম। কলেজের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার পর সময় উৎসাহ পেতে লাগলাম। তখন থেকেই ভাবলাম গান করবো। বাবা গান-বাজনা পছন্দ করতেন না। আমার আগ্রহ দেখে দুলাভাই ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডের একটি দোকান থেকে গিটার কিনে দিলেন। বাবার চোখ ফাঁকি দিয়ে বাড়ির ছাদে প্র্যাকটিস শুরু করলাম। একটা সময় ডাক আসতে থাকলো। আমিও ছুটে চললাম।’

ডিফরেন্ট টাচ নামটি মেজবাহরই দেয়া। বললেন, ‘প্রথম দিকে খুলনার নামকরা ‘রিপল ট্রাক’ ব্যান্ডের সঙ্গে ছিলাম। এক সময় ভাবলাম সমমনাদের নিয়ে একটি দল করবো। সেই ভাবনা থেকেই নতুন ব্যান্ড প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যাই।’

‘৮০-র মাঝামাঝি সময়ের কথা। তখনো ব্যান্ডের নাম ঠিক হয়নি। খুলনাসহ বিভিন্ন জায়গায় প্রচুর কনসার্ট করছি। এক সময় ভাবলাম যদি অ্যালবাম করি তাহলে শ্রোতারা আমাদের গান আরো বেশি করে শুনতে পাবেন। সেই চিন্তার ধারাবাহিকতা থেকেই ঢাকার মালিবাগের একটি স্টুডিওতে রেকর্ডিংয়ের কাজ শুরু করি। লক্ষ্য করলাম, আমাদের কিছু গান অন্যরা নিয়ে যাচ্ছে। তাই, দ্রুত অ্যালবাম করার সিদ্ধান্ত নিই।

এদিকে, বন্ধু-শ্রোতারা সবাই বলতে লাগলেন, আমাদের গানগুলো একটু ভিন্ন ধরণের, ডিফরেন্ট। তাদের সেই ‘ডিফরেন্ট’ মন্তব্য থেকেই ব্যান্ডের নাম রাখলাম ‘ডিরেন্ট টাচ’। এই নামেই আমাদের প্রথম অ্যালবাম বাজারে আসে এবং ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়’। স্মৃতির অ্যালবামের পাতা উল্টে কথাগুলো বলছিলেন ডিফরেন্ট টাচের ভোকাল মেজবাহ।

আকাশ ছোঁয়া শ্রোতাপ্রিয় হওয়া ‘শ্রাবণের মেঘ’ গান প্রসঙ্গে মেজবাহ বলেন, আশরাফ বাবুর লেখা ও সুরে গানটি ছিল আমাদের প্রকাশিতব্য অ্যালবামের ১২তম অর্থাৎ, শেষ গান। এটি কম্পোজিশনের সময় উইনিং ব্যান্ডের শেলি ভাই এবং চন্দন ভাই আমাদের সহযোগিতা করেছিলেন। এজন্য আমরা ব্যান্ডের সবাই তাদের কাছে কৃতজ্ঞ। অ্যালবাম প্রকাশের পর ক্যাসেট কোম্পানির পক্ষ থেকে বিটিভিতে দুটি গান পাঠানো হয়। এর একটি ছিল ‘শ্রাবণের মেঘ’। প্রচারের পর দেশজুড়ে হৈচৈ পড়ে গেল। শ্রোতারা ডিফরেন্ট টাচের অ্যালবামের খোঁজ করতে লাগলেন।

‘ডিফরেন্ট টাচ’ দলের প্রধান মেজবাহ

মাঝে ব্যান্ডের কার্যক্রম থেমে গেলেও গান ছাড়তে পারেননি মেজবাহ। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মাঝে-মধ্যে গান করতেন। ২০০০ সালের দিকে খুলনা থেকে ঢাকায় চলে আসেন। পুরনো সঙ্গী পিয়ালের সঙ্গে যোগাযোগ করে আবারো ডিফরেন্ট টাচকে উজ্জীবিত করার চেষ্টায় নামেন। নতুন সদস্যদের নিয়ে শুরু হয় নতুন পথচলা। মেজবাহ বলেন, এখন আর আগের মতো ক্যাসেট বের করা সম্ভব নয়। তাই কোনো গান করলে টিভির সঙ্গে যোগাযোগ করি কিংবা ইউটিউব চ্যানেলে দিয়ে দিই।

সম্প্রতি শ্রাবণের আরো একটি গান চেয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে একটি টিভি চ্যানেল। সেই সৃষ্টিতেই এখন ব্যস্ত তারা। তাই, এই শ্রাবণেই হয়তো শ্রোতারা ডিফরেন্ট টাচের নতুন আরেকটি শ্রাবণের গান পেতে যাচ্ছেন। গানের কথা ও সুর মেজবাহ নিজেই করছেন বলে জানালেন।

অন্তর্মুখী স্বভাবের এই মানুষটি চার ভাই, দুই বোনের মধ্যে দ্বিতীয়। দুই ছেলের জনক মেজবাহ গানের মতো একজন সফল ব্যবসায়ীও। বললেন, গানের সঙ্গেই থাকতে চাই। তবে, কখনো যদি মনে হয় আমাকে দিয়ে আর গান হচ্ছে না তখন নিজ থেকেই সরে দাঁড়াবো।

এনএম