প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মমতার ঈদ শুভেচ্ছা

আগের সংবাদ

মাসুদ-মুনীরের গাড়ি দুর্ঘটনায় দণ্ডিত বাসচালকের মৃত্যু

পরের সংবাদ

মনে হচ্ছে প্রকৃতি এখন নিঃশ্বাস নিচ্ছে

শরীফা বুলবুল

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ১, ২০২০ , ৮:৪০ অপরাহ্ণ

বিশেষ সাক্ষাৎকার
ফেরদৌস আহমেদ
চলচ্চিত্র অভিনেতা

ফেরদৌস আহমেদ। দুই বাংলার জনপ্রিয় নায়ক। তাকে অনেকে চেনে ‘হঠাৎ বৃষ্টি’ খ্যাত নায়ক হিসেবেই। অজিতের চরিত্রে অভিনয় করে দুই বাংলায় তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন এই অভিনেতা। চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেও সফল হয়েছেন ফেরদৌস। অভিনয়ের আগে ফেরদৌস একজন র‌্যাম্প মডেল হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেলের হাত ধরে র‌্যাম্প জগতে যাত্রা শুরু করেন। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বেশ কিছু বড় ফ্যাশন শোর র‌্যাম্পিংয়ে অংশ নিয়েছিলেন ফেরদৌস। বর্তমানে চলচ্চিত্রের পাশাপাশি বিজ্ঞাপনের মডেল হিসেবেও কাজ করছেন।

ফেরদৌসের প্রথম চলচ্চিত্র ‘বুকের ভিতর আগুন’। প্রথম ছবির পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি মিষ্টি মুখের এই নায়ককে। তার গুণের আগুন ছড়িয়ে গেল যেন সবখানে। পাশাপাশি তিনি কলকাতার চলচ্চিত্রে অভিনয় করছেন নিয়মিতই। ১৯৯৮ সালে চলচ্চিত্রকার বাসু চ্যাটার্জির ‘হঠাৎ বৃষ্টি’তে অভিনয় করে ব্যাপক জনপ্রিয়তার পথ ধরে এগিয়ে চলা ফেরদৌস বলিউডে মিট্টি নামে চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন। সেইসব সফলতার সজীব ফসলের স্বীকৃতিস্বরূপ চারবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র অভিনেতার পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন ফেরদৌস।

জনপ্রিয় এবং মানবিক এই নায়কের করোনাকাল কেমন কাটছে ভোরের কাগজের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই মুহূর্তে সিনেমার শুটিং করছি না। বাইরে গিয়ে শুটিং করতে হবে- এমন কিছুও হচ্ছে না। ঘরে থেকেই সচেতনতামূলক কিছু কাজ কর্ম করেছি। কাজের মধ্যে এটাই করেছি। এ ছাড়া গত চার মাসের মধ্যে আর কিছুই করা হয়নি। বাইরে যাওয়ার ব্যাপারে আমি এখনও পর্যন্ত স্বতস্ফূর্ত নই। কারণ শুটিংয়ে ব্যাপক মানুষের উপস্থিতি থাকে। যে কারণে সিনেমার শুটিংয়ে সবাই স্বাচ্ছন্দবোধ করছে না। ঈদের পরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে হবে। জীবন আর জীবিকার মেলবন্ধনে এগুতে হবে।

আর এই চারমাসে মেয়েদের সময় দিয়েছি। তাদের নিয়ে একসঙ্গে রান্না করেছি। আমরা এক সঙ্গে ভালো ভালো অনেকগুলো সিনেমা দেখেছি। এক সঙ্গে ইয়োগা করেছি। মাকে এবং স্ত্রীকে প্রচুর সময় দিয়েছি। যেটা আগে কখনও সম্ভবই হতো না।

চিত্রনায়ক ফেরদৌস

এ ছাড়া বেশ কিছু জুম লাইভ অনুষ্ঠানে ছিলাম। আমি কিছু সচেতনতামূলক কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। সেদিকে একটু সময় দিয়েছি। সংগ্রহে থাকা প্রচুর বই ছিল সেসব পড়েছি। কিছু স্ক্রিপ্ট পড়ার প্রয়োজন ছিল সেসব পড়ছি। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুর জীবনী নিয়ে সিনেমা করার কথা, সেই স্ক্রিপ্টটা খুব ভালো করে অনেকবার পড়েছি। এই চার মাসে মূলত নিজের জন্য নিজেকে সময় দিয়েছি। যাকে বলে আত্মশুদ্ধি। নিজের কিছু পুরনো সিনেমা দেখেছি, সেখানে কী কী ভুল-ত্রুটি ছিল, সেগুলোকে শুধরে কীভাবে সামনের দিকে যাওয়া যায়।

এসব করে আমার মনে হয়েছে, মানসিক সুস্থতাটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আশেপাশে অনেককে দেখছি বিরক্ত এবং মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে। সেই রকম অবস্থায় যাতে না পড়ি সেই চেষ্টাই করেছি। আমার মনে হয়েছে এই সময়ে বেঁচে থাকাটাই বেশি জরুরি। অর্থাৎ সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য যা যা করা দরকার এবং আমার আশে পাশের মানুষদের যতোটুকু ভালো রাখা সম্ভব ততটুকু করছি। বললেন, বই পড়ছেন, তা কোন মাধ্যমের বই পড়ছেন? ফেরদৌস বললেন, আমার খুব বই পড়ার অভ্যাস আছে। আমি সাধারণত হুমায়ূন আহমেদের বইই বেশি পড়ি। এ ছাড়া সুনীল এবং সুচিত্রা ভট্টাচার্যের বইও পড়ি। আনিসুল হকের বেশ কিছু সিরিজ বই পড়েছি। এছাড়া বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী পড়েছি।

পরিবারের সঙ্গে ফেরদৌস

করোনায় চেনা পৃথিবীর কতেটা বদল ঘটেছে জানতে চাইলে এই অভিনেতা বলেন, অনেক বদল হয়েছে। আমরা জন্মগতভাবেই সামাজিক জীব। আর আমরা বাঙালিরা অনেক বেশি অতিথিপ্রবণ এবং বন্ধুত্বপ্রবণ মানুষ। বিশেষ করে আমি নিজেই বন্ধুত্বপ্রবণ একজন মানুষ। আমি বন্ধুদের ভালোবাসি। বন্ধুত্ব করতে ভালোবাসি। সেই পরিস্থিতিতে এমন একটা ভাইরাস এসেছে, যেটার কারণে আমাদের সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হচ্ছে। এটা সাময়িকভাবে হলেও আমাদের জন্য প্রথমদিকে বড়ো একটা ধাক্কাই ছিল। এরপরে আমাদের বাইরের পৃথিবী থেকে একেবারে ঘরে নিয়ে এসেছে।

ঘরের ভেতরে ঢুকে আমার মনে হলো, এই যে চারিদিকের এতো হানাহানি, এতো খুন রাহাজানি, অনৈতিক কাজ করা- এসব কেন হচ্ছে? আমার মনে হচ্ছে আমাদের মধ্যে সামাজিক বন্ধনটা কমে যাচ্ছিল বলেই এসব হচ্ছে। আমরা অনেক ভাইবোন একসঙ্গে বড়ো হয়েছি। বাবা-মা এতো বেশি মনোযোগ আমাদের দিকে দিতে পারেননি। তারপরও পরিবার আত্মীয়স্বজন মিলে একটা অন্যরকম বন্ধন ছিল। ঘরের বাইরে খুব বেশি যাওয়ার প্রয়োজনই হয়নি।

সেই পারিবারিক বন্ধনটা ইদানিং অনেক কমে যাচ্ছে। আমরাও অনেক ব্যস্ত হয়ে গেছি যে, বাচ্চারা হয়তো নিজেরাই নিজেদের আলাদা একটা জগত করে নেয়। সেই জগতের খোঁজ কেউ নিই না। কারো জগতটা ভালো, কারো জগতটা খারাপ। ওরা আইপ্যাড, ল্যাপটপ আর কার্টুন দেখে দেখেই ওরা বড় হচ্ছে। যে কারণে ওদের মধ্যে বন্ধুত্বের বিকাশটা পরিপূর্ণভাবে হয় না।

এই চার মাসে আমি আমার দুই মেয়েকে প্রচুর সময় দিয়ে দেখেছি, ওদের এটা খুব দরকার ছিল। ওদের বড় হয়ে ওঠার পেছনে এটা একটা বড় ফ্যাক্টর। আমি নিজে এবং আমার স্ত্রী খুব ব্যস্ত থাকি। এই চার মাসে আমরা আমাদের প্রয়োজনীয় কাজগুলো একসাথেই করতাম। এরমধ্য দিয়ে মানসিকভাবে আমরা আরো বেশি কাছে আসতে পেরেছি।

আমার মনে হয়েছে করোনা আমাদের বড় একটা শিক্ষা দিয়েছে। আমরা যাচ্ছেতাইভাবে প্রকৃতিকে ধ্বংস করেছি। ঢাকা শহরকে ইট-কাঠের জঞ্জাল বানিয়ে ফেলেছি। আমরা অ্যাপার্টমেন্টের নামে খুপড়িতেই থাকি। আমার মা অ্যাপার্টমেন্টকে বলেন, ‘কবুতরের ঘর’। সত্যি সত্যিই আমরা কবুতরের ঘরে থাকতে থাকতে কুক্ষিগত হয়ে গেছি। আমরা প্রকৃতিকে ধ্বংস করেছি নির্দয়ভাবে। মনে হচ্ছে প্রকৃতি এখন নিঃশ্বাস নিচ্ছে। এখন ঢাকা শহরে বের হলে মনে হয় ঢাকা শহর এতো সুন্দর! শহরের গাছগুলো কালো হয়ে গেছিল, কোনো সবুজ দেখা যেত না। যে কারণে বহুদিন প্রকৃতির অপরূপ রূপ আস্বাদন করতে পারিনি।

চিত্রনায়ক ফেরদৌস

মনে হচ্ছে করোনা আমাদের প্রকৃতির কাছে যাওয়া, প্রকৃতির সঙ্গে বন্ধন গড়ার সময় করে দিয়েছে। আমাদের আরো বেশি সচেতন করেছে। বাইরে গেলে মাস্ক পরব, হাত ধোব, এটাই তো স্বাভাবিক নিয়ম হওয়ার কথা ছিল। বাইরে দুষণযুক্ত পরিবেশে গেলে মাস্ক ব্যবহার করা উচিত নিজের ভালোর জন্য। আমরা করছি কী? এখন এই করোনাকে সঙ্গে নিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে এবং বাঁচতে হবে। আমরা তো শরীরের ভেতরে অনেক কিছু নিয়েই চলি। সবকিছু তো দেখা যায় না। আবরণের মধ্যেই রেখে দেই।

করোনা অদেখা একটা শত্রু। এর সঙ্গে লড়াই করেই বাঁচতে হবে। ভুলে যাওয়া উচিত নয়, আমরা নিজেদের সুশৃঙ্খল রাখলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সুন্দর পৃথিবী পাবে। বাঁচার জন্য হিংসা বিদ্বেষের প্রয়োজন নেই। লক্ষ কোটি টাকা খরচ করে আণবিক অস্ত্র বানানোরও দরকার নেই। আমাদের শরীরটা অনেক মূল্যবান। নিজের জীবনটা অনেক মূল্যবান। আমরা অনেক মূল্যবান জীবন দিয়েই এটা শিখলাম।

করোনার এই ধাক্কা থেকে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি না জানতে চাইলে ফেরদৌস বলেন, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বাঙালি বীরের জাতি। এই অভিঘাত থেকে বাঙালি ঘুরে দাঁড়াতে পারবেই। অনেক চড়াই উৎড়াই পার করে বাংলাদেশ এখানে এসেছে। সেই ৫২ থেকে শুরু করে ৭১, ৭৫ পরবর্তী সময়, দুর্ভিক্ষ, স্বৈরাচারসহ অনেক কিছু দেখেছি আমরা। আমরা তো হারতে পারি না। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেভাবে দৃঢ় প্রত্যয়ে সুন্দরভাবে এই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন এতে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি আমরা ঘুরে দাঁড়াতে পারব।

এনএম