চাঁদপুরেও ৪০ গ্রামে আগাম ঈদ

আগের সংবাদ

ঈদুল আজহায় আমাদের করণীয়

পরের সংবাদ

পাকিস্তানের বালখিল্য প্রয়াস

ফারাজী আজমল হোসেন

প্রকাশিত হয়েছে: জুলাই ৩০, ২০২০ , ৯:২২ অপরাহ্ণ

হঠাৎ করে একটি বিষয় নিয়ে দেশ-বিদেশের গণমাধ্যম সরব হয়েছে। খুশিমতো বয়ান দিচ্ছে, ভবিষ্যদ্বাণীও করছে। বিষয়টি হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের ফোন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে তিনি এই ফোনটি করেন। ১১ মাসের ব্যবধানে তার এটি দ্বিতীয় ফোন। আলাপের বিষয়বস্তু হচ্ছে পাকিস্তান বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক চায়। ইমরান খানের ধারণা হয়ে থাকতে পারে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দূরত্ব সৃষ্টি হওয়ায় বংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তর্কের খাতিরে মেনেই নেয়া যায়, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আগের মতো নেই। তাই বলে পাকিস্তানের সঙ্গে শেখ হাসিনার সরকার সুসম্পর্ক গড়বে এমনটা কেবল বোকারাই ভাবতে পারে। কারণ এই সেই পাকিস্তান যারা ’৭১ সালে এ দেশের ৩০ লাখ নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছিল। এজন্য তারা লজ্জিতও হয়নি, ক্ষমাও চায়নি। এখন ইমরান খান মনে করতে পারেন বাংলাদেশ ৫০ বছর আগের কথা ভুলে গেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আলাপে তিনি হয়তো তেমনটাই অনুমান করেছেন। দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে মূলত দুটি বিষয়ে কথা হয়েছে। প্রথমত মহামারি করোনা এবং দ্বিতীয়ত বাংলাদেশের চলমান বন্যা পরিস্থিতি। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং থেকে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানা যায়। তবে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে এর সঙ্গে আর একটি বিষয় যুক্ত করা হয়েছে। এতে বলা হয়, দুই প্রধানমন্ত্রীর টেলিফোন আলাপে কাশ্মির বিষয়ও স্থান পেয়েছে। ইমরান খান ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের মুসলমানদের ওপর অত্যাচার নির্যাতনের কথা তুলে ধরেছেন। কিন্তু এ ব্যাপারে শেখ হাসিনার কোনো প্রতিক্রিয়ার কথা তারা জানায়নি। অর্থাৎ ইমরান খান কাশ্মির বিষয়ে কিছু বলে থাকলেও শেখ হাসিনা ভদ্রতার খাতিরে তা কেবল শুনে গেছেন। কারণ পাকিস্তানিদের মুখে আর যা-ই হোক না কেন মুসলমানদের জন্য আহাজারি বেমানান। ’৭১ সালে তারা বাংলাদেশে পোড়া মাটি নীতি গ্রহণ এবং ৩০ লাখ লোককে হত্যা করেছিল। যার ২৯ লাখেরও বেশি মুসলমান, ২ লাখ মা-বোনের ওপর চালিয়েছে পাশবিক নির্যাতন।
তবে তাদের শেষ রক্ষা হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের শেষদিকে প্রায় ১ লাখ পাকিস্তানি সৈন্য চারদিক থেকে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল। ভারতের দয়ায় তারা জীবন নিয়ে নিজ দেশে ফেরত যেতে পেরেছে। ভারত দায়িত্ব না নিলে মুক্তিযোদ্ধারা এসব নরপিশাচকে হত্যা করতে বুলেট খরচ করত না। দুর্র্ধর্ষ খুনি এবং নারী নির্যাতনকারীদের নিজ দেশে নিয়ে বিচার করা হবে বলে ভারতের কাছে লিখিত অঙ্গীকার করলেও পাকিস্তানের সেদিনের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টো তা করেননি। নানা ঘটনার জন্য বিতর্কিত এই ভুট্টোই ’৭১ সালে জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে ১০ লাখ বাঙালিকে হত্যার পরামর্শ দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করান সেনানায়ক জেনারেল জিয়াউল হক। ভুট্টোর বিরুদ্ধে পাকিস্তানের জনপ্রিয় বিরোধীদলীয় রাজনীতিবিদ আহমেদ রাজা কাসুরিকে হত্যা পরিকল্পনার অভিযোগ ছিল। তবে ভুট্টোর নির্দেশিত ওই হামলায় আহমেদ রাজা কাসুরি নয়, তারা বাবা নিহত হন। এমন এক ব্যক্তিকে বিশ্বাস করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী ভুলই করেছিলেন।
একই কারণে ইমরান খানকেও বিশ্বাস করা যায় না। যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর সেদিন পাকিস্তানের পার্লামেন্টে এর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি সরব ছিলেন এই ইমরান খান। তিনি কাদের মোল্লাকে শহীদ ঘোষণা দেন। কারণ হিসেবে বলেন, কাদের মোল্লা ’৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষ নেয়ায় ফাঁসিতে প্রাণ দিয়েছেন। তবে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর উল্লেখ করেননি ইমরান খান। এ ঘটনা একটি স্বাধীন দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নির্লজ্জ হস্তক্ষেপের শামিল। এককালের প্লে বয়ের হয়তো সে কথাটি জানা নেই।
সেদিন পাকিস্তান প্রকাশ্যে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরোধিতা করে। ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির রায় কার্যকরের পর থেকে পাকিস্তান এর বিরুদ্ধে একের পর এক ঔদ্ধত্যপূর্ণ বিবৃতি দিতে শুরু করে। বিচার ও ফাঁসির রায় কার্যকরের প্রতিবাদ জানিয়ে পাকিস্তানের পার্লামেন্টে উত্তপ্ত আলোচনা ও নিন্দা প্রস্তাব পাস হয়। ওই সময় বিষয়টি জাতিসংঘে তোলার কথাও বলে পাকিস্তান। তখন ইমরান খানের পার্টি এবং ইমরান খান নিজে উত্তেজনা তৈরির চেষ্টা করেছেন। বিষয়টি নিয়ে তিনি উসকানিমূলক বক্তব্যও দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, ফাঁসির বিরোধিতা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চিঠিও দিয়েছিলেন। এসব কারণে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অবনতির সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছায়। এরপর সম্পর্কোন্নয়নের আর কোনো কারণ সৃষ্টি হয়নি।
ক্রিকেটার থেকে হঠাৎ রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া ইমরান খান দীর্ঘ ২২ বছরের কষ্টের ফসল ঘরে তোলেন ২০১৮ সালে পাক সেনাবাহিনীর বদান্যতায়। তার দল তেহরিক-ই-ইনসাফ ছিল ছাগলের ৫ নম্বর বাচ্চা কিংবা তারও পরের। সে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল হচ্ছে জুলফিকার আলি ভুট্টো গঠিত পাকিস্তান পিপলস পার্টি সংক্ষেপে পিপিপি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের পাকিস্তান মুসলিম লীগ (নওয়াজ)। এরপরই ধরা হয় জামায়াতে ইসলামীকে। এরপরও বহু বড় দল আছে। তবে এসব দলের নেতারা সেনাবাহিনীর পছন্দের ছিলেন না।
২৪ বছর আগে ১৯৯৬ সালের ২৫ এপ্রিল ইমরান খান যখন দল গঠন করেন তখন তিনি অনেক উগ্রবাদী স্লোগান দিয়েছেন। জনগণের কাছে তার প্রথম ওয়াদা ছিল ক্ষমতায় গেলে ভারতের কাছ থেকে কাশ্মির ছিনিয়ে আনব, আর সর্বশেষ ওয়াদা হচ্ছে পাকিস্তানকে সুইডেন বানাব। ক্ষমতায় যাওয়ার পর তিনি সব ভুলে গেছেন।
প্রথম ওয়াদা কাশ্মির দখল দূরের কথা তার শামনামলে পাকিস্তানের দখলে থাকা কাশ্মিরের একাংশও যে কোনো সময় হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয়ত ক্ষমতার বাইরে থাকার সময় ইমরান খান পাকিস্তানকে যে সুইডেন বানাবার অঙ্গীকার করেছিলেন সেদেশের জনগণ তা ভোলেনি। তবে তারা পাকিস্তানকে সুইডেন বানিয়ে দেয়ার মতো অসম্ভব আবদার করতে নারাজ। ইমরান খানের কাছে তাদের প্রত্যাশা ‘সুইডেন নয়, পাকিস্তানকে বাংলাদেশের সমান বানিয়ে দেও’। ক্ষমতার বাইরে থাকার সময় ইমরান খানও কয়েক স্থানে বলেছেন, ’৭১ সালে যে বাংলাদেশ সবদিক থেকে পিছিয়ে ছিল সেই বাংলাদেশ এখন পাকিস্তান থেকে কয়েক গুণ এগিয়ে’।
শেখ হাসিনাকে ইমরান খানের টেলিফোন নিয়ে এ অঞ্চলের ক‚টনৈতিক মহলও তৎপর। তারাও নানারকম মেসেজ দিচ্ছেন। কারণ এ মুহূর্তে চীন-ভারত দ্ব›দ্ব চলছে। পাকিস্তান যেহেতু চীনের মদদপুষ্ট, সে কারণে হাসিনাকে ইমরানের টেলিফোন একটি বড় ঘটনাই। বাংলাদেশ যদি ইমরানের আহ্বানে সাড়া দেয় তবে চীন-ভারত দ্বন্দ্বের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান পরিষ্কার হয়ে যাবে।
বাস্তবে টেলিফোন করে সম্পর্কের উন্নয়ন সম্ভব নয়। অন্তত মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে এটা একেবারেই অলীক কল্পনা। তবে যেসব কারণে তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের তিক্ত সম্পর্ক রয়েছে, সেই বিষয়গুলোর মীমাংসা হলে কিছুটা হলেও সম্পর্কের উন্নতি ঘটতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ১. একাত্তরে গণহত্যাসহ জঘন্য অপরাধগুলোর জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা, ২. পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের পাওনাদি বর্তমান বাজার মূল্যে পরিশোধ এবং ৩. বাংলাদেশ থেকে ৪০ লাখ পাকিস্তানির প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা।
পাকিস্তানের কারণে দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা-সার্কের অবস্থাও নড়বড়ে। ২০১৬ সালে পাকিস্তানে সার্ক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও বাংলাদেশসহ চার সদস্য রাষ্ট্র ওই সম্মেলন থেকে সরে দাঁড়ালে সম্মেলন স্থগিত হয়ে যায়। কাশ্মির ইস্যুতে এখন ভারতের সঙ্গে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি চলছে। সব মিলিয়ে আঞ্চলিক অবস্থানে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে দেশটি। এই পরিস্থিতিতে ইমরান খান বাংলাদেশকে পাশে পাওয়ার নিষ্ফল প্রয়াস চালাচ্ছেন। এ ধরনের ফোনে বাংলাদেশের অবস্থানে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হবে না।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরোধিতা ছাড়াও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে অস্থিতিশীল করার অপতৎপরতায় লিপ্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ও জঙ্গিগোষ্ঠীকে তারা পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে। বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের জামানায় পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ভারতের আসাম রাজ্যে বিদ্রোহীদের অস্ত্র-গোলাবারুদ সরবরাহে বাংলাদেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করত। জানা যায়, বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের কেউ কেউ এবং বাচ্চু রাজাকারসহ কয়েকজন যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানে আত্মগোপন করে আছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের বিদ্যমান সম্পর্কোন্নয়নের কথা কেবল বিকারগ্রস্তরাই বিশ্বাস করতে পারে।

ফারাজী আজমল হোসেন : লেখক ও সাংবাদিক।

ডিসি