ঈদুল আজহায় আমাদের করণীয়

আগের সংবাদ

দুর্যোগেও আনন্দময় হোক ঈদ

পরের সংবাদ

করোনা-নৈরাজ্যের বেহাল চালচিত্র

প্রকাশিত: জুলাই ৩০, ২০২০ , ৯:২৬ অপরাহ্ণ আপডেট: জুলাই ৩০, ২০২০ , ৯:২৬ অপরাহ্ণ

করোনা ভাইরাস সংক্রমণ আমাদের সমাজে এক ব্যাপক, বহুমাত্রিক নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছে। জাতীয় জীবনের এমন কোনো দিক নেই যেখানে করোনার প্রভাব বিপর্যয় সৃষ্টি করেনি। এ নৈরাজ্যের উৎস যে অব্যবস্থাপনা, তার দায়-দায়িত্ব কার সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। তার আগে নৈরাজ্যের চিত্রপটটিতে একবার শুধু চোখ বুলিয়ে নিলেই গোটা বিষয়টি সে আভাসে-ইঙ্গিতে স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
শুরুতেই দেখা গেছে করোনা আসছে, এ ভয়ঙ্কর দুঃসংবাদ জানার পরও চিকিৎসাসেবা, প্রতিরোধ ব্যবস্থা, চিকিৎসক-সেবিকা, হাসপাতাল কোথাও করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মজবুত ব্যবস্থা দেখা যায়নি। ফলে একদিকে চিকিৎসক-সেবিকা শ্রেণিতে আতঙ্কজনিত দূরত্ব, আর সে কারণে চিকিৎসাসেবায় ঘাটতি। অন্যদিকে দুর্নীতিবাজ, দুর্বৃত্তের দল সুযোগসন্ধানী, মুনাফাবাজরা এক পায়ে খাড়া। মাস্ক থেকে পিপিই শুধু বহুগুণ মূল্য বৃদ্ধিতে সন্তুষ্ট নয়, নকলবাজির মুনাফা লুটতে গিয়ে বহু চিকিৎসক-সেবিকা-স্বাস্থ্যকর্মীর প্রাণ নিয়ে নিল, অর্থাৎ সেইসব মৃত্যুর জন্য দায়ী হলো। তাদের বড় সাইজের কথা উঠে এসেছে সংবাদপত্রে। কিন্তু এতবড় অপরাধের বিচার এবং শাস্তি হয়েছে কি?
তবে এটা ঠিক বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে, যেমন সামাজিক স্তরে, তেমনি দৈনিক পত্রিকাগুলোতে হয়েছে প্রচুর লেখালেখি ও খবর পরিবেশন মোটা হরফে। তাতে শাসনবৃক্ষের একটি পাতাও নড়েনি। সরকার কর্মহীন, অনাহার-ক্লিষ্ট নি¤œবর্গীয়দের জন্য ত্রাণ বিতরণের ব্যবস্থা করেছেন, সেখানেও কালো হাত পড়েছে দুর্নীতিবাজ জনপ্রতিনিধিদের। দীর্ঘ সময় ধরে এ দুর্নীতি চলেছে।
অবাক হওয়ার মতো ঘটনা, করোনাজনিত এ সামাজিক দুর্যোগ-দুর্ভোগে যাদের দায়িত্ব সমাজসেবার, তারাই ত্রাণের উপকরণ লুট করে নিচ্ছে, বরখাস্ত, জেল-জরিমানা অগ্রাহ্য করে। তাদের কোনো শাস্তি হয়নি। বরং এখন দেখছি একটি খবরে বরখাস্ত জনপ্রতিনিধিরা নাকি ফের যথাস্থানে নিয়োগ পেতে যাচ্ছেন। খবরটি যদি সঠিক হয়, তাহলে বলতে হয়, এ দেশের জনপ্রতিনিধিরা ত্রাণের চাল আত্মসাৎ করার পর প্রচলিত শাসনব্যবস্থা বিরোধী অপরাধ করেও বিচারের ঊর্ধ্বে। তারা যে কোনো প্রকার অন্যায়ের অধিকারী, নাকি এটা করোনা-মাহাত্ম্য।

দুই.
করোনা সংক্রমণকালে সর্বাধিক নৈরাজ্যের উৎস ছিল বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো, যাদের অমানবিক আচরণের ফলে বেশকিছু সংখ্যক রোগীর মৃত্যু ঘটেছে। এ অঘটন নিয়েও সংবাদপত্রে যথেষ্ট লেখালেখি হয়েছে, যুক্তিবাদী বিশিষ্টজন সমালোচনায় মুখর হয়েছেন, কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এ বিষয়ে কোনো আইনসম্মত ব্যবস্থা নেয়া দরকার মনে করেনি।
সম্প্রতি রিজেন্ট হাসপাতালের ভয়ঙ্কর দুর্নীতিমূলক কীর্তিকলাপ ফাঁস হওয়া এবং এর মূর্তিমান নায়ক সাহেদ করিম ধরা পড়ার পর যেসব ঘটনার খবর বেরিয়ে আসছে তা অবিশ^াস্যই বলতে হবে। করোনা নিয়ে জাল-জালিয়াতির চরম কর্মকাÐ এবং শত শত কোটি টাকা বস্তা ভর্তির ঘটনায় মানুষ বিস্মিত, ভাবছে দেশে কি কোনো কার্যকর শাসনব্যবস্থা নেই। অবশ্যই আছে। না হলে নায়ক ধরা পড়ল কীভাবে? কিন্তু পড়ল বহু কুকীর্তির পর। সেসব কুকীর্তি ঘটেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চোখের সামনে।
করোনা নিয়ে অব্যবস্থাপনার নৈরাজ্য চলছেÑ কথাটা বলা হয়েছে এ কারণে যে করোনা সংক্রমণের প্রতিটি খাতে এক প্রকার দুর্বলতা প্রকট। বলা হয়ে থাকে সমন্বয়হীনতা এর কারণ। বিশাল বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠিত হয়েছে। তাদের প্রধানদের প্রায়ই অভিযোগ তুলতে দেখা গেছে সংবাদপত্রের খবরে, তাদের পরামর্শে কোনো প্রকার গুরুত্ব দেয়া হয় না। ঘটনা যদি তাই হবে, তাহলে তারা পদত্যাগ করে সংবাদ সম্মেলন করে সে খবর দেশবাসীকে জানিয়ে দায়মুক্ত হন না কেন? এর মধ্যেও কি কোনো দলীয় রাজনীতির প্রভাব রয়েছে? এ ধরনের কারণে দেখা যাচ্ছে করোনা পরীক্ষা নিয়ে নানাবিধ প্রশ্ন। নমুনা পরীক্ষা কোন স্তরে, কত সংখ্যায় করা হচ্ছে এবং তা জনসংখ্যার তুলনায় যথেষ্ট কিনা তা নিয়েও প্রশ্নের অবকাশ রয়েছে।
হয়তো তাই একটি দৈনিকে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ শিরোনাম প্রথম পাতায়, মোটা হরফে : ‘টেস্ট হাসপাতালে আস্থা নেই’। বুঝুন তাহলে অবস্থাটাÑ নৈরাজ্য কাকে বলে? এ উপলক্ষে লেখা হয়েছে : ‘করোনা ভাইরাস সংক্রমণের প্রথমদিকে পরীক্ষার সংখ্যা ছিল কম। এখন পরীক্ষার সুবিধা বাড়লেও প্রকৃত ফল নিয়ে সংশয়, ফি আরোপ, সিরিয়াল পেতে হয়রানির কারণে পরীক্ষার ওপর আস্থা হারাচ্ছে মানুষ। অন্যদিকে শুরুতে হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা, অতিরিক্ত বিল আদায়, রিজেন্ট কাণ্ড এসব কারণে মানুষের মধ্যে এক ধরনের ভয় তৈরি হয়েছে।’
তাহলে প্রশ্ন : কি করবে অসুস্থ মানুষ, কোথায় যাবে মানুষ? এখন করোনা-বহিভর্‚ত রোগের চিকিৎসা প্রায় বন্ধ বললেও চলে। হাসপাতাল-অব্যবস্থাপনা দূর করা কি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষে একান্তই অসম্ভব? নাকি সেখানে অন্য স্বার্থ কাজ করছে। অন্যদিকে করোনা-নমুনা পরীক্ষার ক্ষেত্রে সুব্যবস্থাপনা কি খুবই কষ্টকর ‘স্বাস্থ্য খাতের’ সংশ্লিষ্ট বিভাগের পক্ষে। বিষয়টি খুবই জরুরি বিধায় বলতে হচ্ছে এ ক্ষেত্রে শিথিলতা করোনা সংক্রমণের বিস্তার ঘটানোর পক্ষে সুযোগ তৈরি হবে। নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা যত বাড়বে, করোনা পজিটিভদের বিচ্ছিন্নতার ব্যবস্থা যত সুচারুরূপে সম্পন্ন করা হবে, করোনার সংক্রমণ হার সেই অনুপাতে কমে আসবে। শুধু আমাদের মতো সাধারণদের লেখায়ই নয়, নমুনা পরীক্ষার দ্রæত সংখ্যা বৃদ্ধির ব্যবস্থা নেয়া এবং পরীক্ষার ফল ভিত্তিক ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞ মহল থেকেও এসেছে, কিন্তু নমুনা পরীক্ষা তেমন বাড়েনি। উল্লিখিত প্রতিবেদনে এর কারণ হিসেবে রিজেন্ট জালিয়াতি ফি আরোপ ইত্যাদি প্রসঙ্গ এসেছে। ভুলে গেলে চলবে না, বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের বয়স চার মাস পেরিয়ে গেছে। ইতোপূর্বে বিশেষজ্ঞদের অভিমত ছিল তিন থেকে চার মাস পর সংক্রমণ কমতে থাকবে। কিন্তু তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। তাহলে করোনা কি আমাদের সমাজ-জীবনে দীর্ঘদিনের সঙ্গী হয়ে সামাজিক স্থবিরতা দীর্ঘস্থায়ী করে তুলবে?
পেশাজীবীদের কাজ বন্ধ, সচেতন নাগরিক গৃহবন্দি, নিম্নবর্গীয়দের কাজ নেই, কারখানাগুলোরও একই অবস্থা, অর্থনৈতিক মন্দা ক্রমে গভীর। এ অবস্থায় জাতীয় দুর্যোগ বিবেচনায় করোনা দমনে সম্মিলিত সর্বমাত্রিক শক্তি নিয়োগে করোনাকে পরাস্ত করা এখন আমাদের জাতীয় কর্তব্য। করোনা যেখানে তার বিস্তার ঘটাচ্ছে গ্রামাঞ্চলের দিকে, সে ক্ষেত্রে সংক্রমণ হার কমানো আবশ্যিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাজেই নমুনা পরীক্ষার দিকটাতেও গুরুত্ব আরোপ জরুরি।
ইতোপূর্বে করোনা সংক্রান্ত যে নৈরাজ্যের কথা বলছিলাম, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ আরেক শ্রেণির দুর্নীতিবাজদের এ সুযোগে মানুষের রোগ নিরামক ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধেও অনুপ্রবেশ। অর্থাৎ নকল ওষুধে, ভেজাল ওষুধে মুনাফাবাজি। মানুষের রোগ নিরাময় ও জীবন নিয়ে খেলায় যাদের বিবেক বাধা দেয় না, তাদের কী শাস্তি হওয়া উচিত। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে ওষুধ শিল্প নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর স্থাপিত হয়েছিল ওষুধের সর্বপ্রকার সুস্থ নিয়ন্ত্রণের জন্য, জনগণের সুস্বাস্থ্যের বিবেচনা মাথায় রেখে। প্রথম দিকে তাতে বেশ সুফলও দেখা গিয়েছিল। ক্রমে সেখানেও যথারীতি শর্ষের মধ্যে ভূতের আবির্ভাব এক কথায় দুর্নীতি ওষুধ কোম্পানিগুলোর অনেকের সঙ্গে যোগসাজশে। আর মূল্য বৃদ্ধির বিষয়টি তো সর্বক্ষেত্রে।
এ অবস্থায় একটি দৈনিকে ভয়ঙ্কর সংবাদ শিরোনাম : ‘করোনাকালেও ভেজাল ওষুধের রমরমা।’ এ খবরে প্রথম প্রতিক্রিয়া, কী হবে ওইসব রোগীর যারা না জেনে, না বুঝে সরল মনে ওষুধের নামে বিষ পান করছে? কারণ প্রতিবেদনে প্রকাশ, এগুলোর মধ্যে এমন উপাদানও আছে যা দেহের অত্যাবশ্যকীয় অঙ্গের জন্য মারাত্মক রকম ক্ষতিকর, যেমন কিডনি। যারা এগুলো তৈুির করছে, যারা বিক্রি করছে সেইসব সমাজবিরোধীদের সম্ভাব্য মানুষ হত্যার অপরাধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত, প্রয়োজনে বিশেষ আদালতে। তাই বলছিলাম, এমনিতেই বাংলাদেশি সমাজের সর্বাঙ্গে দুর্নীতি, করোনা এসে তা শুধু বাড়ায়নি, তার উন্মোচনও ঘটিয়েছে। তবে অতি চতুরগণ গা-ঢাকা দিয়ে আছে। আমরা বারবার বলছি, বাংলাদেশের ভাবমূর্তি রক্ষায় এখন প্রধান কাজ দুর্নীতির বিরুদ্ধে লাগাতার সর্বাত্মক অভিযান চালনা শুরু করা।

আহমদ রফিক : লেখক, গবেষক ও ভাষাসংগ্রামী।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়
close