আমার কাছে ঈদ পুজো দুটোই সমান

আগের সংবাদ

পথশিশুদের মাঝে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের ঈদ উপহার বিতরণ

পরের সংবাদ

সম্প্রীতির মধ্যেই কেটেছে ছেলেবেলা

প্রকাশিত: জুলাই ২৯, ২০২০ , ৭:৪১ অপরাহ্ণ আপডেট: জুলাই ২৯, ২০২০ , ৭:৪১ অপরাহ্ণ

মাঝে মাঝে পৃথিবী উজাড় হয়ে যাবে। মনুষ্যশূন্য হয়ে যাবে। এরকম একেকটা সময় আসে। স্রোতের মতোই আসে সে সময়। সব ভাসিয়ে নিয়ে যায়। মৃত্যু এসে সব ভাসিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু মানুষ শেষ পর্যন্ত এগুতে থাকে। মানুষ সত্যি সত্যি শেষ পর্যন্ত বিলুপ্ত হয় না।

আমার ছোটবেলায় দেখেছি কলেরা ছিল। একেকটা গ্রামে একজন লোকও রেহাই পেতো না। পুরো গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যেতো কলেরাতে। তবে সেই কলেরা আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছি। এখন সেই কলেরা বন্ধই বলা যায়। এরপর এলো গুটি বসন্ত, জল বসন্ত ছিল বরাবরই হালকা টাইপ। কিন্তু গুটিবসন্ত! উফ! সেও আমি ছোটবেলায় দেখেছি শরীরের মাংস খসে খসে পড়ছে। মাংস খসে পড়ে হাড় বেরিয়ে যাচ্ছে! মানুষকে আর ঘরের মধ্যে রাখা যায়নি। বাড়ির বাইরে কোনো একটা জায়গায় অথবা নিম গাছের ছায়ার নিচে হাড়শুদ্ধ রেখে দেয়া হতো। এরকম বসন্তও দেখেছি। সেসঙ্গে আরো একটা রোগ ছিল নাম টাইফয়েড। এর নাম হয়তো অনেকে ভুলেই গেছে। টাইফয়েডে যে কতো মানুষের মৃত্যু হয়েছে, কতো মানুষ যে পঙ্গু হয়ে গেছে! সেই টাইফয়েড ছিল ২৭ দিনের, ২১ দিনের, কোনো কোনো সময় ৩ মাস থাকত এবং কোনো কোনো সময় একটা অঙ্গই নিয়ে যেতো। কারো চোখ অন্ধ হয়ে যেতো, কারো একটা হাত শুকিয়ে যেতো, কারো হয়তো একটা পা চিরকালের জন্য খোড়া হয়ে যেতো। টাইফয়েড এসব কাণ্ড করেছে। গত শতাব্দীর ১৯৫০ সাল পর্যন্ত এর কোনো প্রতিষেধক বা টাইফয়েড ঠেকানোর মতো কোনো ওষুধ বেরোয়নি। এরপরে এন্টিবায়োটিক এসে মোটামুটি টাইফয়েডটাকে নিয়ন্ত্রণে আনল। এখন আর টাইফয়েডের নাম শোনাই যায় না। অথচ এই টাইফয়েডে কতো শত মানুষের মৃত্যু হয়েছে! আরেকটা রোগ ছিল নিউমোনিয়া। এটাও ভয়ানক জিনিস। শরীরের দুটো লাঞ্চ যখন আক্রান্ত হতো, তখন এটাকে বলা হতো ডাবল নিউমোনিয়া। সেই ডাবল নিউমোনিয়াতেও অনেক মানুষ মারা গেছে। আমার আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে কেউ কেউ মারা না গেলেও তাদের শরীরে এমন একটা কিছু হয়েছে, তা ভয়ানক কষ্টের ছিল। দেখা গেছে, শ্বাস ফেলতে কষ্ট হচ্ছে। শোঁ শোঁ করে শব্দ হচ্ছে এমনও শোনা যেত। এসব রোগ তো তখন ছিল। এ কালের ছেলেমেয়েরা ওইসব রোগ সম্পর্কে জানেও না। তাদের সাবধানতা অবলম্বন করারও দরকার নেই। কারণ এসব রোগকে আমরা মানুষরাই প্রতিরোধ করতে পেরেছি। বসন্তের জন্য টিকা আবিষ্কার হয়েছে। কলেরার জন্যও আবিষ্কার হয়েছে এক ধরনের ইঞ্জেকশন। কলেরা কিংবা বসন্ত এখন প্রায় নির্মূল। এখন এসবের খোঁজও পাওয়া যাবে না।
আমি একটা কথা বারেবারেই বলি, এরকম করে মাড়ি-মড়ক আসবে। একেকবার মনে হবে গোটা পৃথিবী শেষ। পৃথিবী অনেকবার প্রায় শূন্য হয়ে যাওয়ার উপক্রমও হয়েছিল। মন্বন্তর কিংবা দুর্ভিক্ষ কী হয়নি? যারা সাহিত্য ইতিহাস পড়েছে তারা নিশ্চয়ই পড়েছে, এসব বিষয়গুলো সেখানে কীভাবে বর্ণিত হয়েছে। ভারত বর্ষ যখন পরাধীন ছিল তখনও এসব জিনিসগুলো হয়েছে। তা কবিতায়, সাহিত্যে ছাপ রেখে গেছে। বসন্তে কলেরায় মানুষের মৃত্যুর কথা তো আমরা বিভিন্ন লেখায় খুঁজে পাই।

আমার নিজেরও অভিজ্ঞতা আছে। ছোটবেলায় আমি নিজেই জল বসন্তে আক্রান্ত হয়েছিলাম। কলেরার তখন ইঞ্জেকশন বেরিয়েছিল। সেই ইঞ্জেকশন নিয়ে সারাদিন হাতের যন্ত্রণায় ভুগেছিলাম। সে কী কঠিন যন্ত্রণা! এই সমস্ত রোগের হাত থেকে আমরা পরিত্রাণও পেয়েছি। তেমনি করোনাও পৃথিবীজোড়া ভয়ঙ্কর মৃত্যুদূত হিসেবে দেখা দিয়েছে। ইউরোপের সমস্ত দেশকেই একের পর এক আক্রমণ করেছে। ইতালি, ইংল্যান্ড, ফ্রান্সসহ ছাড়েনি কাউকেই। ধীরে ধীরে চলে এসেছে এইদিকে। ভারত বাংলাদেশকেও আক্রমণ করেছে। অনেক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অনেকে আক্রান্ত হয়েছে। এর কোনো প্রতিষেধক এখনও পর্যন্ত বের হয়নি। চেষ্টা চলছে, হয়তো কোনোদিন বের হবে। হয়তো চীন, জার্মানি, জাপান বের করবে। এরকম অনেক ভয়ানক জিনিসই তো আমরা পার করেছি। শেষ পর্যন্ত করোনাকেও আমরা পার করবো। তাই এই সময়ে সবাইকে আতঙ্কহীন থাকতে হবে। ভয় পেলে চলবে না। শতভাগ সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। বলা হচ্ছে এটা ধূলিবাহিত এবং বায়ুর মধ্য দিয়ে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। তাই যথেষ্ট সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। বাংলাদেশের মানুষ এখনও স্বাস্থ্য সচেতন হয়নি। সেই অর্থে ব্যাপকভাবে শিক্ষিত ও সচেতন হয়নি। এসব তো বাস্তবতা। এখন হয়তো হবে। এখন তো কুরবানি ঈদের হাট বাজার হচ্ছে। যেখানে গরু ছাগল ইত্যাদি বিক্রি হচ্ছে। এসব জায়গায় খুব সাবধানতা অবলম্বন করা দরকার।

আরেকটা কথা, এবার মনে হচ্ছে ঈদ উৎসব ওভাবে হয়তো হবে না। কিন্তু হবেই। আমার মনে হচ্ছে এবার অনেকটা সীমিতভাবেই হবে। সচেতনভাবেই সীমিত আকারে করবে। আগে যেমন একটু সচ্ছল হলেই পুরো একটা গরু বা মোষ কুরবানি দিয়ে দিত। এখন হয়তো ভাগাভাগি করে দেবে।

ঈদে আমার ছেলেবেলায় গ্রামেই ছিলাম আমি। সেই সময় বিরাট আকারে কিছু হতে দেখিনি। আমাদের ছিল হিন্দুপ্রধান গ্রাম। মুসলিম সম্প্রদায়ের আলাদা পাড়া ছিল। কিন্তু ভীষণ সম্প্রীতি ছিল। কেউ কোনোরকম বিঘ্ন সৃষ্টি করতো না। তবে কুরবানির ঈদের সময় মুসলমান পাড়ার দিকে হিন্দুরা আসতেন না। কারণ গরু জবাইয়ের পর পুরো গ্রামই গন্ধ হয়ে যেত। যে কারণে দু’চার দিন হিন্দুরা আমাদের পাড়ার দিকে আসতেন না। সেটা খুব স্বাভাবিক। অনেক সম্প্রীতির মধ্যেই আমার ছেলেবেলা কেটেছে। কলকাতায় যখন দাঙ্গা হয়েছিল তখন দু’চারটা এদিক ওদিক ঘটনা ঘটেছিল, তা-ও ঠিক। অবশ্য ওগুলো সব ঘটিয়ে তোলা জিনিস।
তখন দেখেছি অবস্থাপন্ন এবং সচ্ছল অবস্থায় যারা ছিল, ঈদে তারা ছেলেমেয়েদের নতুন জামাকাপড় দিত। আমরাও নতুন জামাকাপড় পরতাম। কোনো কোনো অভিভাবককে দেখতাম কোনো একটা দর্জির কাছে গিয়ে ছেলেমেয়েদের শরীরের মাপ নিয়ে ঢালাও একটা অর্ডার দিয়ে মাপ নিয়ে একইরকম ড্রেস বানিয়ে দিচ্ছেন। তেমনটি আমাদের বেলায়ও হতো। আমাদের যেমন সঙ্গতি ছিল সেভাবেই ছোটবেলাটায় যথেষ্ট আনন্দ করতাম।

ঈদের দিন আমি সবার সঙ্গে সকালে গোসল করতাম। এরপর আঁতর মেখে, গোলাপজল মিশিয়ে মিছরির শরবত খেয়ে, তুলোতে একটু আতর লাগিয়ে একটু বুকে এবং কানে গুঁজে দেয়া হতো। আরেকটা জিনিস ভালো লাগতো, সেটা হচ্ছে গ্রামের বাইরে ঈদগাঁ ছিল। সকাল সকাল গোসল করে নতুন জামাকাপড় পরে সেন্ট মেখে আমরা গ্রাম থেকে বেরিয়ে আল পথ ধরে ঘাসে পরিপূর্ণ একটা জায়গায় হাজির হতাম। সকলকে দেখতাম জায়নামাজ বগলে নিয়ে আসতো। যাদের ছিল না তারা অন্যদের জায়নামাজে অথবা খোলা ঘাসের উপরেই নামাজ পড়তো। সেখানে গ্রামের একজন মৌলভী থাকতেন। তিনি মদুত শরিফ পড়াতেন এবং ঈদের নামাজে ইমামতি করাতেন। তার কণ্ঠস্বর বড়ই মধুর ছিল। নামাজ শেষ হয়ে যাবার পর কিছুক্ষণ ওয়াজ করতে হতো, কোরান পাঠ এবং খানিকক্ষণ বসে কথা বলতেন তিনি। বেশ মজা পেতাম আমি। সেসব কথা আজও স্মৃতিতে জেগে আছে।

ডিসি

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়