জনতা ব্যাংকের বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত

আগের সংবাদ

প্রবেশে কড়াকড়ি, স্বাস্থ্যবিধি মেনেই চলছে ট্রেন

পরের সংবাদ

মানুষের মনুষ্যত্বকে করোনা আঘাত করেছে

প্রকাশিত: জুলাই ২৯, ২০২০ , ৮:০৫ অপরাহ্ণ আপডেট: জুলাই ২৯, ২০২০ , ৮:০৫ অপরাহ্ণ

গত ঈদ তো খুব খারাপভাবে উদযাপিত হলো দু’দিক থেকেই। আমাদের জীবনেও কোনো উৎসব এলো না। অবশ্য ঈদ তো অল্প বয়সী ছেলেমেয়েদের জন্যই। এটা তাদের জন্য মস্ত বড় উৎসব। আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা হওয়ার উৎসব। এটা তো মুছে গেছে। এইবার কুরবানির ঈদেও তো তেমন উৎসব হবে না। কুরবানি নিয়েও যে একটা উৎসব হয় সেটাও হবে না, পহেলা বৈশাখেও যেমন হয়নি।
অবশ্য আমি আমার ছেলেবেলায় ঈদ সবসময়ই উপভোগ করেছি। ঈদের মূল উৎসবটা হচ্ছে সামাজিকতার উৎসব। অর্থাৎ এতে শুধু খাওয়া-দাওয়া হয় ভালো, আনন্দ হয়, সবার সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ হয়। কিন্তু আমরা ছেলেবেলায় যেটা করেছি তা হচ্ছে নতুন জামা পরে এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি যেতাম। আত্মীয়রা আমাদের বাড়িতে আসতো, আমরা যেতাম। এটা কোনো ধর্মীয় উৎসব ছিল না। কেবলই উৎসব হয়ে উঠত। এমনকি কুরবানির ঈদের মাংস নিয়ে আত্মীয়ের বাড়ি যেতাম, তারাও আমাদের বাড়ি আসতো। সামাজিকতা না থাকলে আর উৎসব থাকে না। কিন্তু করোনা এই সামাজিকতাকে নিরুৎসাহিত করছে।
এই করোনা ভাইরাস আমাদের জন্য যা করল তা হচ্ছে মূলত মানুষকে অসামাজিক করে তুলেছে। এই যে সবাই সামাজিক দূরত্বের কথা বলছে, এটা আসলে দৈহিক দূরত্ব বোঝাচ্ছে হয়তো। কিন্তু এটা আসলেই সামাজিক দূরত্বই। মানুষের সঙ্গে মানুষের যে সামাজিক সম্পর্ক সে সম্পর্কগুলো এইরকম উৎসবের মধ্য দিয়ে হয়। পহেলা বৈশাখ যেমন একটা সার্বজনীন ধর্মনিরপেক্ষ উৎসব ছিল। আবার দুটো ঈদও মুসলমান সম্প্রদায়ের জন্য একটা বড় আনন্দের উৎসব। এই উৎসবগুলো তো মুছে গেল মানুষের জীবন থেকে। সামাজিকতা বলে যে জিনিসটা, সেটাই আজ আক্রান্ত হচ্ছে। এখন এই যে দূরত্ব বজায় রাখা বা হাটবাজারে যাবে না, লোকে গরু কিনবে, না বা ঘরে থাকবে বা মুখোশ পরে থাকবে বলা হচ্ছে। এর সবই হচ্ছে মানুষকে অসামাজিক করে দেয়া এবং করোনা ভাইরাসের লক্ষ্যটাই হচ্ছে মানুষের মনুষ্যত্বকে আঘাত করা। এটা কেবল যে মানুষকে রোগে আক্রান্ত করছে তা না, মানুষের মনুষ্যত্বকে আক্রমণ করছে। মানুষ এখন মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে পারছে না। হাত মেলাতে পারে না, আলিঙ্গন করতে পারে না। মানুষকে দেখলে মনে হয় সে জীবাণু বহন করছে। একজন আরেকজনের কাছে গেলে বিব্রত হয়। এই যে বদলে গেল পৃথিবী। তা মোটেও মানবিক পৃথিবীর লক্ষণ নয়।

হয়তো করোনার টিকা আবিষ্কার হবে, চিকিৎসা আবিষ্কার হবে, করোনা নিয়ন্ত্রণে আসবে। কিন্তু ঘটনা হলো করোনা তো এসেছিল। কেন এলো? তার মানে হলো যে- এতো উন্নতি হয়েছে, সেই উন্নতির মধ্যে মানুষের যে নিরাপত্তা সেই নিরাপত্তার দিকে উন্নতিওয়ালারা তাকায়ইনি। আর্থিক উন্নতি থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে উন্নতি করেছে। কিন্তু মানুষের আসল জায়গাটা হচ্ছে নিরাপত্তা। সবচাইতে বড় বিষয় হচ্ছে জীবনের নিরাপত্তা। সেই নিরাপত্তার দিকে এই গোটা বিশ্ব তাকায়ইনি। এখন আমার কাছে গোটা বিষয়টা খুবই পরিষ্কার পুঁজিবাদের সর্বশেষ এবং নিকৃষ্টতম রূপ।

সেই আদিম গুহার মধ্যেও একটা সামাজিকতা ছিল। রোগে শোকে সেই আদিম মানুষ পরস্পরকে সাহায্য করতো। এখন রোগী দেখে মানুষ পালাচ্ছে। বাবা-মাকে ফেলে সন্তান পালিয়ে যাচ্ছে। তার মানে হচ্ছে মানুষের মনুষ্যত্বকেই করোনা আক্রমণ করেছে। এটা সারা পৃথিবীতে মানুষের সভ্যতাকেই আক্রমণ করল। এই আক্রমণটা হলো পুঁজিবাদের আক্রমণ। ভোগবাদী যারা তাদের কাজ হলো মানুষের নিরাপত্তার দিকে না তাকানো। ভেবেই দেখুন, যে চীন থেকে এই করোনা এলো সেই চীন এখন পুরোপুরি পুঁজিবাদী দেশ। সেই দেশের বাদুরের দেহ থেকে করোনা এলো, এমনটা মনে করা হচ্ছে। বাদুর তো বাদুরের জায়গায় থাকবে তাকে বাজারে নিয়ে আসা হলো কেন? সব মিলিয়ে আমার মনে হচ্ছে এটা পুঁজিবাদের নিকৃষ্টতম রূপ এবং এই রোগটা পুঁজিবাদী রোগ। পুঁজিবাদ যেমন মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে, একাকী করে দেয়, করোনা সেটাই করেছে। মানুষকে একেবারেই বিচ্ছিন্ন করে তুলেছে। আগে যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়েছিল, তখন তারা অর্থাৎ পুঁজিবাদের মধ্যেই লড়াই করেছিল। পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী মিলে নিজেদের মধ্যে লড়াই করেছিল। এখন পুঁজিবাদ নিজেই সমগ্র মানুষের সভ্যতার উপরে আঘাত করেছে। মানুষের হাজার হাজার বছরের যে অর্জন সে অর্জনকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাচ্ছে।

এখন করোনার টিকা আবিষ্কার হবে, চিকিৎসা আবিষ্কার হবে, করোনা নিয়ন্ত্রণে আসবে। কিন্তু এরপরে যে আরেকটা বড়ো কিছু ঘটবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এটা অনেকটা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো। কোনো সামাজিক বিক্ষোভ দেখা দেবে না। সেটা আমরা কেউ বলতে পারি না। অলরেডি সামাজিক বিক্ষোভ দেখা দিচ্ছে। মানুষ অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে হচ্ছে। বেকার হচ্ছে, কর্মহীন হচ্ছে। মানুষ ক্ষুধার্ত হয়ে উঠবে। ধন বৈষম্য বাড়বে। বড় বড় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা আরো বাড়বে। তাদের কোনো জবাবদিহিতা থাকবে না। এর ফলে হয়তো আগামী দিনে একটা সামাজিক ভ‚মিকম্প হবে। সমস্ত কিছু তছনছ হয়ে যাবে। এখন পৃথিবীর সামনে বিকল্প হচ্ছে হয় চরম নৈরাজ্য, না হয় একটা পরিবর্তন। আমরা মনে করি সে পরিবর্তন হতে হবে ব্যক্তিমালিকানার জায়গা থেকে সামাজিক মালিকানায় যাওয়া। অর্থাৎ পুঁজিবাদ থেকে সমাজতন্ত্রে যাওয়া। এছাড়া আর কোনো বিকল্প আমি দেখছি না। পুঁজিবাদ এখন চরম জায়গায় চলে এসেছে। এখন সারা পৃথিবী বুঝতে পেরেছে যে, একটা পুঁজিবাদী তাণ্ডব চলছে এবং এখন যে বিক্ষোভগুলো হচ্ছে সেই বিক্ষোভগুলো আরো ব্যাপক এবং আরো গভীর হবে। সেটা অরাজকতার দিকে যেতে পারে। যদি না সামাজিক বিপ্লবের দিকে এটাকে নিয়ে যাওয়া না যায়। আমি যেটা দেখতে পাচ্ছি সেটা হলো প্রত্যেকটা দেশে এখন সামাজিক বিপ্লবের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। যাতে করে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটা আবার ওই সামাজিক দায়ের মধ্যে চলে আসে। যে সামাজিকতা করোনা ভাইরাস মিলিয়ে দিয়েছে। ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। মানুষ যাতে আবার সংঘবব্ধ হতে পারে। সেজন্য এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা যেটা মুনাফালোভী, এবং উন্নতি বোঝায় তা নয়, যেটা শুধু মুনাফার লোভ, মুনাফার লিপ্সা এবং ভোগবাদিতা বোঝে, মুনাফার লিপ্সা এবং ভোগবাদিতাকেই বিকশিত করে এইসবকে বাদ দিয়ে নতুন আন্তর্জাতিকতা তৈরি করতে হবে। যে আন্তর্জাতিকতা গ্লোবালাইজেশন বা বাজারের না। যেটা হবে মানুষের সঙ্গে মানুষের মৈত্রীর, সৌহার্দের এবং সহযোগিতার। যেটাকে বদলাতে হবে। তবে বাণিজ্যের মধ্য দিয়ে নয়।

দেশে এখন চিকিৎসা নিয়েও বাণিজ্য হচ্ছে। রোগের মধ্যেও আমাদের দেশে কতোরকম বাণিজ্য চলছে। বাণিজ্যিকতা নয়, একটা মানবিক আন্তর্জাতিকতা চাই। যেটা পুঁজিবাদকে হটিয়ে দিয়ে সমাজতান্ত্রিক জায়গায় গেলেই সম্ভব।

ডিসি

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়