এতোদিন ভুল পৃথিবীর ব্যবস্থাপক ছিলাম

আগের সংবাদ

নদী গিলছে জনপদ!

পরের সংবাদ

করোনায় থেমে গেছে নৃত্যের ঝংকার

শরীফা বুলবুল

প্রকাশিত হয়েছে: জুলাই ২৬, ২০২০ , ১:৫৯ পূর্বাহ্ণ

বলা হয়ে থাকে নৃত্য দৃশ্যকাব্য। কিন্তু বিশ্ব কাঁপানো করোনা মহামারীর ধাক্কায় থেমে গেছে দৃশ্যকাব্য রচয়িতাদের নূপুরের ঝংকার। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের এখন চরম দুর্দিন। সিনিয়র থেকে শুরু করে জুনিয়র নৃত্যশিল্পী, তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঢোল এবং বংশী বাদকদেরও বেকার করে দিয়েছে এই করোনা। দেশের বিভিন্ন জাতীয় অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে মঞ্চের নানা আয়োজন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের প্রতিদিনের ক্ষতির পরিমাণ কেবলই বাড়ছে। এমনকি কেউ কেউ দীর্ঘদিনের চর্চিত এই পেশাকে বিদায় জানানোর জন্য মনস্থির করেছেন। নৃত্যশিল্পী সংস্থার সূত্র মতে, দেশে প্রায় ১০ হাজারের বেশি রয়েছে নৃত্য সংগঠন। এ ছাড়া ২২৫টির বেশি নৃত্যস্কুলে নৃত্যচর্চার সঙ্গে জড়িত রয়েছে প্রায় ২৫ হাজারের মতো শিক্ষার্থী। যারা করোনা থাবায় ধুকছেন।

জানতে চাইলে নৃত্য সংগঠন নৃত্যাঞ্চলের অন্যতম পরিচালক ও জনপ্রিয় নৃত্যশিল্পী শিবলী মোহাম্মদ ভোরের কাগজকে বলেন, বাংলাদেশে শাস্ত্রীয় ও সুস্থ ধারার নাচে পৃষ্ঠপোষকতা এমনিতেই কমছে। তার ওপর করোনা এসে নৃত্যশিল্পীদের আনন্দ কেড়ে নিয়েছে। আমার নিজেরই সংগঠনের শতাধিকের মতো নৃত্যশিল্পী বেকার হয়ে গেছে। যারা আমার চেয়ে ভালো নাচ করে এমন অনেক ছেলেমেয়ে আছে, যারা নিরূপায় হয়ে ঘরে বসে আছে।

শিবলী আরো বলেন, যাদের এই পেশার ওপর নির্ভর করেই পরিবার পরিজন নিয়ে টিকে আছে, তাদের কেউ কেউ অসুস্থ বাবা মায়ের ওষুধ পর্যন্ত কেনার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেছে। এরা সরকার থেকেও কোনো প্রণোদনা পায়নি। ব্যক্তিগতভাবে আমি আর নীপা তাদের সহযোগিতা দিয়েছি। এটা দিয়ে কতোদিন চলবে? আমরা সংশ্লিষ্টদের সুদৃষ্টি আশা করছি।

নৃত্যশিল্পী ডলি ইকবাল বলেন, নাচ খুব অবহেলিত। অথচ এই মাধ্যমটি খুব ব্যয়বহুল একটা মাধ্যম। করোনার কারণে এখন নাচের আয়োজন হচ্ছে না। কিন্তু দেশের ২৬ থেকে ২৭টা চ্যানেলে নাটক তো হচ্ছে। তারা কি ঈদের কোনো আয়োজনে নাচ রাখতে পারতেন না? অন্তত ২০টা চ্যানেলে যদি ২০টি নাচের আয়োজন রাখতো তাহলে ২০ জন নৃত্যশিল্পী উপার্জন করতে পারতো না? অনেকে হতাশ হয়ে পড়ছে। এতো অবহেলিত কেন আমরা?

সাংস্কৃতিক সংগঠন সাধনার শিল্পনির্দেশক লুবনা মারিয়াম বলেন, সরকার যে একটা ভাতা দিয়েছে সেটা নিয়েও গণ্ডগোল আছে। কে যে ভাতা পেল কিছুই জানি না। শিল্পকলা একাডেমির পক্ষ থেকে অনলাইনে নৃত্যশিল্পীদের দিয়ে কোরিওগ্রাফির কাজ করাচ্ছে। তাও সিনিয়দের এবং মধ্যম মানের শিল্পীদের। কিন্তু এরা মুষ্টিমেয় কিছু শিল্পী। বেশিরভাগ যারা নানা অনুষ্ঠান করে জীবিকা নির্বাহ করতো তারা তো একদমই বসে পড়েছে।

শামীম আর নীপা

নৃত্যশিল্পী সংস্থার সভাপতি মিনু হক বলেন, আমাদের নৃত্যশিল্পীদের এখন চরম দুর্দিন চলছে। অথচ করোনা শুরুর আগেও আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম জাতির জনকের জন্মশতবর্ষের অনুষ্ঠানের। কিন্তু করোনা সব ভেস্তে দিল। আমরা সংগঠনের পক্ষ থেকে দেশের ৩০ জেলায় ১০ হাজার টাকা করে অর্থ সহায়তা দিয়েছি।

নৃত্যশিল্পী মুনমুন আহমেদ বলেন, আমাদের অবস্থা খুব খারাপ। আমি নিজে এতো কাজ করি। এখন আমি নিজেই বেকার হয়ে গেছি। আমার নাচের স্কুল বন্ধ, প্রোগ্রামসহ সবই বন্ধ। আমার সোর্স অব ইনকাম বলতে যেটা বোঝায় আমার জায়গা থেকে করতে পারছি না। সেই জায়গায় ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা শুধুমাত্র নাচের ওপর নির্ভর করে টিকে আছে। এমনকি যারা নাচের ড্রেস বানায়, ফুলের অর্নামেন্ট বানায়, ঘুংঘুর বানায় তারাও বেকার হয়ে গেছে। আমাদের সঙ্গে ওরাও জড়িত। ওরা একেবারেই অসহায়। আমরা চেষ্টা করছি ওদের কাউকে কাউকে সহযোগিতা করার। পরিস্থিতি এতোটাই ভয়াবহ।

মুনমুন আহমেদ

নৃত্যশিল্পী মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান সাকিব বলেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যানেজমেন্টে পাস করে বেছে নিয়েছি নাচকে। প্রায় ২০ বছর চলছে আমার নৃত্যচর্চা। এর মধ্যে আমাদের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রোগ্রামেও অংশ নিয়েছি। কিন্তু এখন আমাদের জীবন বড্ড সংকটময়। সীমাহীন মনোকষ্টে আছি। তারপরও কারো কাছে কিছু চাইতে পারি না লজ্জায়। আমি তো শিল্পী বুক ফেটে যাচ্ছে, কিন্তু মুখ ফুটে চাইতে পারি না। আত্মসম্মানে লাগে। সরকার যদি একটু নজর দিত, তাহলে আমরা রেহাই পেতাম।

এনএম