বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহার শুরু করেছে ভারত

আগের সংবাদ

করোনায় সাফল্য দেখানো উগান্ডায় প্রথম মৃত্যু

পরের সংবাদ

সম্পর্কে নতুন মোড়!

শ্যামল দত্ত

প্রকাশিত হয়েছে: জুলাই ২৪, ২০২০ , ১০:০৭ পূর্বাহ্ণ

শেখ হাসিনাকে ইমরান খানের ফোন

১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পাকিস্তানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান নিয়াজির চাচা লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আলী খান নিয়াজী তার লেখা বইতে বাংলাদেশিদের গাদ্দার বলে অভিহিত করেছিলেন। ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত ‘বিট্রেয়াল ইন ইস্ট পাকিস্তান’ বইয়ে পাকিস্তানের পরাজয়ের জন্য তৎকালীন সামরিক-বেসামরিক নেতৃত্বকে দায়ী করলেও ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পরাজয় মেনে নিতে পারেননি তিনি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে স্বীকার না করে এই যুদ্ধে জয়ী হওয়ার মতো সামর্থ্য ছিল, এমন অবাস্তব দাবি করে পাকিস্তানের এই ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান রাওয়ালপিন্ডিতে বসে থাকা সেনা নেতৃত্বের অবাস্তব সিদ্ধান্তে ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্সে আত্মসমর্পণ করেন বলে পরবর্তীতে ১৯৮১ সালে ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক খুশবন্ত সিং কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছিলেন। বাংলাদেশের ৩০ লাখ শহীদ ও অসংখ্য নারীর সম্ভ্রম হারানোসহ খুন, ধর্ষণ ও নির্যাতনের সব ঘটনা ভারতীয়দের অপপ্রচার বলেও উল্লেখ করেছিলেন এই সাক্ষাৎকারে।

’৭১ পরবর্তী বাস্তবতায় প্রকৃত ঘটনা স্বীকার করার চাইতে পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সেনা নেতৃত্বের মধ্যে এই ইস্যুতে একে অপরকে দায়ী করার রাজনীতিই বরং অব্যাহত ছিল। এমনকি ১৯৭১ সালের বর্বরতম হত্যাকাণ্ড নিয়ে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি হামুদুর রহমান কমিশনের তদন্ত রিপোর্ট আর কোনোদিন আলোর মুখ দেখেনি। ফলে দীর্ঘ সময় পাকিস্তানের টালমাটাল রাজনীতির ঘটনায় ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের ঘটে যাওয়া ইতিহাসের বর্বরতম হত্যাকাণ্ডের জন্য পাকিস্তানের কোনো পর্যায়ের কোনো নেতৃত্ব ক্ষমা চাওয়া তো দূরের কথা, দুঃখ প্রকাশ করতেও দেখা যায়নি। বরং ইনিয়ে-বিনিয়ে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী এ হত্যাযজ্ঞ, অপরাধ, খুন ও ধর্ষণের ঘটনা অস্বীকার করেছেন। কখনো কখনো এটাকে ভারতের ইন্ধনে বাংলাদেশের অপপ্রচার বলে চালানোরও চেষ্টা করেছেন। ফলে দুদেশের সম্পর্কে একটি অমীমাংসিত ক্ষত হিসেবে এই বিষয়গুলো থেকে গেছে বিগত প্রায় ৫০ বছর। ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর বাংলাদেশ আবার পাকিস্তানি ভাবধারায় পরিচালিত হলেও বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কের ক্ষতের বেদনা বাংলাদেশের তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলগুলোর ভুলিয়ে দেয়ার চেষ্টা মানুষের মনে কোনো প্রভাব রাখেনি। এমন একটা সময় আসবে, যখন একজন মুক্তিযোদ্ধাও হয়তো আর বেঁচে থাকবেন না। কিন্তু প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে মুক্তিযুদ্ধের অগণিত শহীদের মৃত্যু আর নির্যাতনের বেদনার স্রোত প্রবাহিত থেকেই যাবে সাধারণ মানুষের মনে। ২০১৩ সালের গণজাগরণ মঞ্চের প্রভাব আমাদের সে কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

ফলে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান নিয়াজী যখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোন আলাপে দুদেশের সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বলেন, তখন সম্পর্কের অমসৃণ পথে কাঁটা বিছিয়ে রেখে সেটা কতখানি সম্ভব সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। ক্রিকেট মাঠ থেকে নেপথ্যের সেনা সমর্থন নিয়ে রাজনীতির মাঠে আসা ইমরান খান নিয়াজী গত বুধবার দুপুরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ১৫ মিনিটের টেলিফোন আলাপে সেই চেষ্টাই করেছেন। কিন্তু টেলিফোন আলাপ নিয়ে দুদেশের দুরকম সরকারি ভাষ্য বলে দেয় সম্পর্ক উন্নয়নে পাকিস্তানকে এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।

প্রথমে দেখে নিই, দুদেশের সরকারি ভাষ্যে কী আছে? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ইমরান খানের মধ্যে টেলিফোন আলাপ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সেক্রেটারি এহসানুল করিম জানিয়েছেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী কীভাবে বাংলাদেশ সরকার করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলা করছেন, সে সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। দুই প্রধানমন্ত্রীর ১৫ মিনিট ধরে চলা টেলিফোন আলোচনায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী করোনা রোগীদের চিকিৎসা ও বিস্তার রোধে সরকার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানান। বাংলাদেশের বন্যা পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে শেখ হাসিনা সে সম্পর্কেও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন বলে এহসানুল করিম জানান।

অন্যদিকে ইসলামাবাদের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে দেয়া বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ইমরান খানের টেলিফোন আলোচনা সম্পর্কে যে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছে, তা একেবারেই ভিন্ন। ইমরান খানের কার্যালয় থেকে দেয়া বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক চায় পাকিস্তান। নিয়মিত যোগাযোগ চায় এবং বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখতে তার দেশ আগ্রহী বলেও উল্লেখ করা হয়। পাকিস্তানের সরকারি বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েট প্রেস অফ পাকিস্তান (এপিপি) সে দেশের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে উদ্ধৃত করে বলেছে, পারস্পরিক বিশ্বাস, সম্মান এবং সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বমূলক সম্পর্ক গভীর করতে পাকিস্তান প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এপিপি আরো বলেছে, টেলিফোন আলাপের সময় ইমরান খান ‘ভারত অধিকৃত জম্মু-কাশ্মিরের প্রসঙ্গ গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন এবং পাকিস্তানের দৃষ্টিভঙ্গিও তুলে ধরেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী একটি শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধশালী অঞ্চল গড়ে তুলতে জম্মু ও কাশ্মির সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।’ এপিপি আরো বলেছে, সার্কের প্রতি পাকিস্তানের সমর্থনের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান পাকিস্তান ও বাংলাদেশ যৌথভাবে আঞ্চলিক সহযোগিতা সৃষ্টি করে টেকসই শান্তি ও উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে সুবিধামতো সময়ে পাকিস্তান সফরেরও আমন্ত্রণ জানান।

প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে একটি টেলিফোন আলোচনা নিয়ে দুদেশের বিবৃতিতে এই বিস্তর পার্থক্য নানা কৌতুহলের জন্ম দিয়েছে কূটনৈতিক মহলে। বাংলাদেশের বিবৃতিতে অত্যন্ত কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে কাশ্মির ও সার্কসহ আরো নানা প্রসঙ্গ। অন্যদিকে পাকিস্তানের বিবৃতিতে এই বিষয়গুলোর ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেয়া হয়েছে। এছাড়া ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি ও নিয়মিত যোগাযোগের ওপর জোর দেয়া হয়েছে যার অভাব ছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে। বাংলাদেশের বিবৃতিতে করোনা পরিস্থিতি এবং বন্যা সম্পর্কে জানতে ফোন করেছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এমন একটা ধারণা দেয়া হলেও বন্যা এবং করোনা পরিস্থিতি জানার জন্য একজন প্রধানমন্ত্রী ফোন করছেন আরেকজন প্রধানমন্ত্রীকে এটা অনেকেই বিশ্বাস করতে চান না। ইমরান খানের টেলিফোন করার আগ্রহ ও পাকিস্তানের বিবৃতির ধরন দেখে বোঝা যায়, এই আলাপে তিনি আঞ্চলিক রাজনীতিকে গুরুত্ব দিয়েছেন, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের উষ্ণতার মধ্যে পাকিস্তানি শীতলতা যুক্ত করে নতুন একটি মাত্রা তিনি যোগ করতে চান।

সাম্প্রতিক বাংলাদেশ-পাকিস্তান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে এমন কিছু ঘটনা ঘটছে, যা দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে উভয় মহল নতুন করে ভাবছে এমন বিশ্লেষণ কূটনৈতিক মহলের। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার দ্বিতীয় মেয়াদে ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হওয়ার পর থেকে পাকিস্তানে অস্বস্তি শুরু হয়ে যায়। পাকিস্তান বারবার ১৯৭৪ সালের এপ্রিল মাসে সিমলায় অনুষ্ঠিত ত্রিপক্ষীয় চুক্তির কথা উল্লেখ করে বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়েছে বলে বারবার উল্লেখ করেছিল। এমনকি বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের পার্লামেন্টে নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ ও পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য মৌলবাদী দল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে নানা বিক্ষোভ করেছে ইসলামাবাদের রাস্তায়। যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকরের পর গায়েবানা জানাজা হয়েছে পাকিস্তানে। এমনকি ২০১৬ সালে জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার পর ইসলামাবাদে দায়িত্বপালনরত বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছিল পাকিস্তান। যদিও বাংলাদেশ বলেছিল, এটা বাংলাদেশ সরকারের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং সরকার বাংলাদেশি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছে। এই বিচার হচ্ছে প্রকাশ্যে ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী। পাকিস্তানের যে ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধী, যারা হত্যা, খুন ও ধর্ষণের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, তাদের বিচারের জন্য পাকিস্তান মৌখিক প্রতিশ্রুতি দিলেও এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ পাকিস্তানের পরবর্তী সরকারগুলো নেয়নি। ফলে যুদ্ধাপরাধের বিচারসহ অন্যান্য ইস্যুতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের পাল্টাপাল্টি কূটনীতিক বহিষ্কার দুদেশের সম্পর্কে ফাটল নিয়ে এসেছিল। জঙ্গিবাদে মদদ, জাল নোট ছাপা ও নানা রকম অপরাধ কার্যক্রমের কারণে ঢাকাস্থ পাকিস্তান হাইকমিশনের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিল বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে। ১৯৯৯ সালে কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার অভিযোগে ঢাকাস্থ পাকিস্তানি হাইকমিশনের ডেপুটি হাইকমিশনার ইরফান রাজাকে বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। কিন্তু তৃতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগ ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার পর পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে মৌলিক কিছু পরিবর্তন ঘটছে বলে অনেকের অভিমত।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দায়িত্বপালনরত উপদেষ্টাদের মধ্যে পাকিস্তানের প্রতি সহানুভূতিশীল উপদেষ্টার সংখ্যা বেড়েছে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষাকারী উপদেষ্টারা গুরুত্ব হারিয়েছেন এবং দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতার বলয়ে জোরালোভাবে উপস্থিত হয়েছে চীন। চীন-পাকিস্তান যৌথ প্রয়াসে বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে নতুন সমীকরণ এনেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। যে কারণে বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে সম্পর্কের টানাপড়েন তৈরি হয়েছে। যদিও দুদেশ প্রকাশ্যে এখনো এ বিষয়ে কিছু বলতে রাজি নয়।

২০১৯ সালে বাংলাদেশের নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হওয়ার পর থেকে ভারতীয় প্রকল্পগুলোর কার্যক্রম পিছিয়ে পড়েছে। অন্যদিকে চীনের প্রকল্পগুলোর ব্যাপারে উৎসাহ দেখা গেছে দৃষ্টিকটু পর্যায়ে। ভারতের উদ্বেগ সত্ত্বেও সীমান্তবর্তী সিলেট বিমানবন্দর সম্প্রসারণের প্রকল্প চীনা কোম্পানিকেই দেয়া হয়েছে। এমনকি ঢাকায় দায়িত্বরত ভারতের হাইকমিশনার রিভা গাঙ্গুলি দাস গত ৪ মাসে অ্যাপয়নমেন্ট চেয়েও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ পাননি বলে ভারতীয় গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে। করোনা মোকাবিলায় ভারত সরকার বিভিন্ন সামগ্রী দিলেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে একটি ধন্যবাদ চিঠিও পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে চীনের একটি ডাক্তারের প্রতিনিধি দলকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য বিমানবন্দরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেনের উপস্থিতি ও বিদায় জানানোর সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের সংবর্ধনা নিয়ে নানা বিশ্লেষণ চলছে নয়াদিল্লির সাউথ ব্লকে। এর মধ্যে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের এই নতুন মেরুকরণ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে ভিন্ন বিশ্লেষণ দাবি করছে। গত পহেলা জুলাই এই করোনা পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশে নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনার ইমরান আহমেদ সিদ্দিকী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এই সাক্ষাতের খবর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোনো মিডিয়ায় প্রচার না করলেও খবরটি প্রচারের জন্য পাকিস্তান হাইকমিশনের বিশেষ প্রচেষ্টা ছিল লক্ষণীয়।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান মেয়াদে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সরকারের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে একটি মহল পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরালো করার অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে কাজে নেমেছে। গত নভেম্বরে পেঁয়াজ সংকটের কারণে ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিলে এই পাকিস্তানপন্থিরা দ্রুত পাকিস্তান থেকে ৩ হাজার টন পেঁয়াজ আনার উদ্যোগ নেয়। এই পেঁয়াজ আমদানির মধ্য দিয়ে ১৫ বছর পর পাকিস্তান থেকে কোনো খাদ্যসামগ্রী বাংলাদেশে এলো। সম্পর্কের অবনতিতে এর আগের ২ বছর অর্থাৎ ২০১৮-১৯ পর্যন্ত বাংলাদেশে পাকিস্তানের কোনো হাইকমিশনার পর্যন্ত ছিল না। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন পাকিস্তানি হাইকমিশনার রফিকুজ্জামান সিদ্দিকী দায়িত্ব পালন শেষে চলে যাওয়ার পর মার্চ মাসে ঢাকায় নতুন হাইকমিশনার হিসেবে সাকলাইন সাঈদের নাম ঘোষণা করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হাইকমিশনার হিসেবে পাকিস্তানি এই ক‚টনীতিকের নামের অনুমোদন দেয়নি। দীর্ঘ দুবছর হাইকমিশনার ছাড়া অবস্থায় ছিল ঢাকাস্থ পাকিস্তানের হাইকমিশন। দুদেশের সম্পর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে দুই দেশ একে অপরকে ভিসা দেয়াও বন্ধ করে দেয়। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তান নতুন করে ইমরান আহমেদ সিদ্দিকীকে বাংলাদেশে হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়। সরকারের ভিতরে থাকা পাকিস্তানি লবির জোর তৎপরতায় দ্রুত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি পাওয়া যায় এবং জানুয়ারিতে তিনি ঢাকায় এসে পৌঁছান। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি মহামান্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের কাছে তিনি তার পরিচয়পত্র পেশ করেন। অন্যদিকে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টায় সরকারের বিভিন্ন মহলের সঙ্গে পাকিস্তানি হাইকমিশনারের তৎপরতা ছিল লক্ষণীয়। এরই অংশ হিসেবে গত পহেলা জুলাই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর পাকিস্তানের হাইকমিশনার ইমরান আহমেদ সিদ্দিকীর মন্তব্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তুরস্কের বার্তা সংস্থা আনাদুলুকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ- ইতিহাস, ধর্ম ও সংস্কৃতির বন্ধনে একসঙ্গে আবদ্ধ। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ এ মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন পর্যন্ত ইতিহাস হচ্ছে পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশকে পাকিস্তানের শোষণ এবং বঞ্চনার ইতিহাস, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ধর্মের নামে ৩০ লক্ষ মানুষকে হত্যার ইতিহাস এবং সংস্কৃতির দিক থেকে ১৭শ কিলোমিটার দূরের ভিন্ন এক জীবনধারা ও জীবনাচারের সংস্কৃতি। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে এই আকস্মিক সাক্ষাৎকারটির পেছনে সরকারের ভেতরের লবিটি জোরালো ভূমিকা পালন করেছে বলে জানা যায়। এই লবির তৎপরতায় গত জানুয়ারিতে নিরাপত্তার কারণে বিশ্বের সব দেশের বয়কট সত্ত্বেও বাংলাদেশের ক্রিকেট দল অদ্ভুত ৩ দফা সফরসূচি তৈরি করে। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে একটি টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলিয়ে আনতেও তারা সক্ষম হয়; যদিও কোনো কোনো খেলোয়াড় নিরাপত্তার কারণ উল্লেখ করে পাকিস্তান সফরে যেতে রাজি হয়নি এবং করোনার কারণে বাকি দুটি সফর আর অনুষ্ঠিত হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশ-পাকিস্তানের সুসম্পর্ক তৈরির চেষ্টায় ওই পাকিস্তানি গোষ্ঠীর সক্রিয়তা ও নানা উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রতিবেশী দেশ নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশে নতুন প্রভাব বলয় সৃষ্টির জন্য পাকিস্তান-চীনের সক্রিয় তৎপরতাও লক্ষণীয়। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতির একটি ধারাবাহিক উদ্যোগ না থাকায় এই শক্তি ভারতকে কিছুটা বিব্রত করতে সক্ষমও হয়েছে। পুলাওয়ান ওয়ালায় কাশ্মীরি জঙ্গিদের হামলায় ভারতীয় সেনা নিহতের ঘটনায় বাংলাদেশ নিন্দা জানালেও ভারত-চীন সীমান্তের গালওয়ানে ভারতের ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তাসহ ২০ সেনা সদস্য নিহতের ঘটনায় বাংলাদেশ একেবারে নিশ্চুপ ছিল। বাংলাদেশের এই অবস্থান ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটা উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন কিনা সেটা এখনো বলার সময় আসেনি। তবে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়াসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে চীনের সংঘাত দিন দিন যেভাবে বাড়ছে; তাতে পাকিস্তান-চীন জোট এই উপমহাদেশে কি প্রভাব বলয় তৈরি করতে পাবে তা নিয়ে সন্দেহ আছে। বিশেষ করে দক্ষিণ চীন সাগরের উপকূলবর্তী দেশ ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইন ও মালয়েশিয়াসহ অনেক দেশের সঙ্গে চীনের বিরোধ ক্রমাগত বাড়ছেই। ইউনান প্রদেশে উইঘুর মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর অমানবিক নির্যাতনের ঘটনায় চীনের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের চাপ নতুন করে বিপদে ফেলেছে চীনকে। হংকংয়েও নতুন নিরাপত্তা আইন চীনকে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি করে তুলছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার উদারনৈতিক চিন্তায় পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়ে ওআইসির লাহোর সামিটে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু তার এক বছরের মাথায় জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার পর সবচেয়ে উল্লাস ছিল পাকিস্তানের। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট ভোরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার নৃশংস ঘটনা বাংলাদেশ বেতারে প্রচারের পর পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর উল্লাস ছিল দৃষ্টিকটু পর্যায়ের। সে সময় খুনি খন্দকার মোশতাক কিছুক্ষণের জন্য বাংলাদেশকে পাকিস্তানি আদলে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ বাদ দিয়ে ইসলামিক রিপাবলিক অফ বাংলাদেশ ঘোষণা করেছিলেন। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জুলফিকার আলী ভুট্টোর অভিনন্দন বার্তা পৌঁছেছিল ঢাকায়। অভিনন্দন বার্তার সঙ্গে শুভেচ্ছা হিসেবে কাপড়ের সংকটে ভোগা বাংলাদেশকে ১৫ হাজার গজ কাপড় ও ৫০ হাজার টন গম পাঠিয়েছিলেন শুভেচ্ছা হিসেবে। যদিও খুনি মোশতাক সরকার কিছুক্ষণের মধ্যেই বাংলাদেশকে ইসলামিক রিপাবলিক ঘোষণা করা থেকে সরে আসে নানা আন্তর্জাতিক চাপে। কিন্তু পাকিস্তানি আদলে আবার দেশ পরিচালনার সূত্রপাত হয়ে যায় পাকিস্তানের পরাজয়ের মাত্র সাড়ে ৫ বছরের মাথায়। পঁচাত্তর পরবর্তী স্বৈরশাসনের আমলে এই পাকিস্তানি ভাবধারা আরো গভীরে প্রোথিত হয়েছে এবং মুক্তিযুদ্ধের মৌল চেতনাগুলো বিসর্জন দেয়া হয়েছে অত্যন্ত সচেতনভাবে। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগেও তারা জায়গা করে নিয়েছে শক্তভাবে। তাদেরই প্রভাবে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ আওয়ামী লীগ আপস করছে ১৯৭১-এ পরাজিত ধর্মান্ধ শক্তির সঙ্গে। ক‚টনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কোনো দেশের সঙ্গে চিরস্থায়ী বৈরিতা কখনোই কাম্য নয়; কিন্তু সম্পর্কের উন্নয়ন হতে হবে ন্যায্যতা, সমতা ও পরস্পরের মর্যাদার ভিত্তিতে। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে অমীমাংসিত যে বিষয়গুলো আছে, সম্পর্ক উন্নয়নের স্বার্থে সেগুলোর সুরাহা আগেই জরুরি। বাংলাদেশে আটকে পড়া পাকিস্তানিদের ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়টি মনে হয় বাংলাদেশ এখন ভুলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু পাকিস্তান ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা যেমন জরুরি, অন্যদিকে সম্পর্ক উন্নয়নের স্বার্থে এই মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের একটি প্রতীকী বিচার হলেও পাকিস্তানকে করতে হবে। এছাড়া ’৭১ পূর্ববর্তী সম্পদের ন্যায্য পাওনা বাংলাদেশ এখনো পায়নি। এই বিষয়গুলোর মীমাংসার ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশ-পাকিস্তান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নয়ন। জাপান-চীন, চীন-কোরিয়া এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বাস্তবতায় ইউরোপের সঙ্গে জার্মানির সম্পর্কোন্নয়নের এরকম ভূরি ভূরি উদাহরণ আছে। দীর্ঘ সময়ে হিমশীতল অবস্থায় থাকা সম্পর্ক উষ্ণ করতে হলে উষ্ণতা তৈরির প্রেক্ষাপট আগ্রহী দেশকেই উদ্যোগী হয়ে করতে হয়।

ডিসি