করোনা ভ্যাকসিন কতটা দূরে

আগের সংবাদ

স্বাস্থ্যে কেলেঙ্কারির দায় কে নেবে

পরের সংবাদ

জনস্বার্থে টেন্ডার ব্যবস্থাপনায় মৌলিক পরিবর্তন জরুরি

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

প্রকাশিত হয়েছে: জুলাই ১৩, ২০২০ , ৫:২১ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন কেনাকাটায় জড়িত বেশকিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুদক, গণমাধ্যম এবং সরকারের শীর্ষমহল বেশ কড়া মনোভাব প্রকাশ করেছে। বেশকিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আটঘাট বেঁধে তদন্ত করা হচ্ছে। মিঠু নামক এক ঠিকাদার সম্রাটের কাহিনী দেশজুড়ে আলোচিত হচ্ছে। একইসঙ্গে এসব ঠিকাদারের সাম্রাজ্য বিস্তারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পিয়ন থেকে শীর্ষ হর্তাকর্তা পর্যন্ত কারা কারা জড়িত ছিলেন তাদের খুঁজে বের করার দাবি উঠেছে। মজার ব্যাপার হলো, ঠিকাদার সম্রাট মিঠু ২০০১ সালের পরবর্তী জোট সরকারের সময় থেকেই এই মন্ত্রণালয়ে ঠিকাদারি কারবার করতেন, ২০০৯ সালের পর থেকেও তিনি একই জায়গায় পরম শক্তিশালী মহাসম্রাটের মতো ঠিকাদারি সাম্রাজ্য বহাল রেখেছেন। বলা হয়ে থাকে তার অঙ্গুলি নির্দেশনেই এই মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের সব ঠিকাদারি কাজ বণ্টন হয়ে আসত। তার এক আত্মীয়কে ঢাকা থেকে রংপুর মেডিকেলে বদলি করিয়ে রংপুর মেডিকেলকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। দেশের কয়েকটি জায়গায় তার বিশাল সম্পদ, বিত্তবৈভব, দুটি মেডিকেল কলেজসহ নানা ধরনের প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসবই তিনি করেছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ঠিকাদারি ব্যবসায়কে নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে। নিজে তিনি থাকেন বিদেশে, দেশে তার ঠিকাদারি সাম্রাজ্য ফুলেফেঁপে ওঠার মানুষ রয়েছে, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্নীতিবাজরাও রয়েছেন। এমন অবিশ্বাস্য কাহিনী সব গোয়েন্দা কাহিনীকেও হার মানিয়েছে বললে মোটেও বাড়িয়ে কিছু বলা হবে না। তবে এ রকম মিঠু একজন নয়, কতজন আছে আমরা তা জানি না। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তরগুলোর কেনাকাটা, নির্মাণ তথা ঠিকাদারি কাজকর্মের সঙ্গে অসংখ্য মিঠু যুগ যুগ ধরে জড়িত ছিল এবং এখনো আছে। সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ঠিকাদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে ঠিকাদাররা পেয়ে থাকেন। এটিকে ঠিকাদাররা ঠিকাদারি ব্যবসায়ই বলেন। কারণ এই ব্যবসায়ের কিছু সরকারি আইন ও বিধিবিধান রয়েছে।
বাহ্যিকভাবে ঠিকাদাররা আইন ও বিধিবিধান মেনেই টেন্ডার ড্রপ করেন, সর্বনিম্ন দরদাতা কাজের অর্ডার পেয়ে থাকেন। ব্যস! সবই তো ঠিক আছে। কিন্তু পরতে পরতে কত যে ভেজাল লুকিয়ে আছে সেটা সবাই জেনেও না জানার ভান করে থাকেন। প্রকল্পের বা কেনাকাটার প্রাক্কলিত দাম রয়েছে। বাজার মূল্য থেকে প্রাক্কলিত মূল্য ২০ শতাংশের বেশি হওয়ার নিয়ম নেই। কিন্তু সরকারি অধিদপ্তরগুলোর বাজারমূল্য সবসময়ই বাস্তবে থাকে না, থাকে ভ‚তুড়ে মূল্যে। তেমন ভূতুড়ে মূল্যের কথা রূপপুরে শুনেছি, বিভিন্ন হাসপাতালে পর্দা ও যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় শুনেছি। এখন বেসরকারি হাসপাতালগুলো আইসিইউ কিনছে ৩ লাখ টাকায়, আর আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রাক্কলন বিশারদরা (!) প্রতিটির দাম রেখেছেন ৯ লাখ টাকা করে। এভাবেই আমাদের সরকারি সব কাজে প্রাক্কলন বিশারদরা প্রকল্প ব্যয়, কেনাকাটার ব্যয় ইত্যাদি নোট আকারে উপস্থাপন ও অনুমোদন করিয়ে নেন। বোঝাই যায় ঘাটে ঘাটে সবার পকেটে কী পরিমাণ অর্থ দিতে হবে সেই হিসাবের সঙ্গে ঠিকাদারের বাড়তি লাভ এর সঙ্গে যুক্ত থাকে। ঠিকাদাররা আছেন বলেই তো এসব বিশারদ কেনাকাটা বা প্রকল্প থেকে কাড়ি কাড়ি টাকা হাতিয়ে নিতে পারছেন, বাড়ি গাড়ি করতে পারছেন, অনেকেই সন্তান-স্ত্রীদের বিদেশে নাগরিকত্ব লাভের ব্যবস্থা করিয়ে নিচ্ছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক পিয়ন ও তার স্ত্রী দেড় হাজার কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন এমন সংবাদ গণমাধ্যমে কয়দিন আগে এসেছে। গণমাধ্যম আর কয়জনের খবর পায়? ঢাকার বাইরে জেলা-উপজেলায় সরকারি সব প্রতিষ্ঠানেই কম-বেশি দালাল, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের খবর স্থানীয়রা জানেন। রাস্তাঘাট, পুল, কালভার্ট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাঁধ নির্মাণ ইত্যাদি হেন কোনো কর্ম নেই যেখানে সরকারি অর্থের লোপাট হয় না, কর্মকর্তারা অনুমোদন দেন না। এদের সঙ্গে স্থানীয় রাজনীতিবিদ ও প্রভাবশালীদেরও অর্থের ভাগাভাগি হচ্ছে। এমন কোনো খাত নেই যেখানে এই অপকর্মটি কম-বেশি হয় না। আমরা সবাই এ বিষয়টি সম্পর্কে অবগত। সবাই যে এই অপরাধ অন্যায় ও দুর্নীতিকে পছন্দ করেন, ভাগ নেন এমনটি বলা ঠিক হবে না। কিন্তু এই দুষ্ট চক্রের বেড়াজাল থেকে মুক্ত হওয়ার কথা বললেও উপায় বা পথ নির্ধারণ করতে আমরা এখনো পর্যন্ত পারছি না। কিন্তু দিন দিন অবস্থা যেভাবে এগোচ্ছে তা অব্যাহত থাকতে দিলে দেশে টেন্ডারকে কেন্দ্র করে যে মাফিয়া চক্র ভয়ানকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠবে তাতে আমাদের রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যাবে, রাজনীতি সম্পূর্ণরূপে জনস্বার্থবিরোধী হয়ে উঠবে। এমনিতেই দুর্নীতির সঙ্গে এই সমাজের বিরাট সংখ্যক মানুষ কম-বেশি জড়িয়ে পড়ছে। এই করোনাকালে আমরা রিজেন্ট সম্রাট সাহেদের মতো আরো কিছু সম্রাট ও সাবরিনা সম্রাজ্ঞীর দুর্নীতি, অর্থ লোপাট, প্রতারণা, ভুয়া কাগজপত্র ইস্যু, বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা ও টেস্টের নামে নানা ধরনের হয়রানি ও অর্থ হাতিয়ে নেয়ার কাণ্ড-কীর্তির কথা শুনছি। সারাদেশে এ রকম আরো কত কী হচ্ছে তা হয়তো সামান্যই আমরা জানতে পারছি। বলতে দ্বিধা নেই একদিকে অসংখ্য মানুষ সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে, সেবা দিচ্ছে, খাদ্য ও প্রয়োজনীয় অর্থ দিয়ে সাহায্য করছে, অন্যদিকে বড় বড় হাসপাতাল থেকে শুরু করে অনেক প্রতিষ্ঠানে অনেকেই অর্থ লোপাটে ওঁৎ পেতে আছে। সমাজের তলানি পর্যন্ত দালাল, প্রতারক, ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজরা সুযোগের অপেক্ষা করছে। এমন বাস্তবতার মুখোমুখি আমরা এখন আছি।
সরকার ঠিকাদারি ব্যবসায়কে দুর্নীতিমুক্ত করার জন্য ই-টেন্ডারিং চালু করেছে তাতে ঠিকাদারদের মধ্যে মারামারি-রক্তারক্তি হচ্ছে না। কিন্তু জনস্বার্থে যেসব প্রকল্প নির্মাণ, কেনাকাটা ইত্যাদি নেয়া হচ্ছে তাতে মিঠু মাফিয়াদের দৌরাত্ম্য কমছে না, নির্মাণ ও টেকসই হচ্ছে না, বালিশ কেলেঙ্কারিও থামছে না। সরকারে অর্থ লোপাটও বহুগুণে হচ্ছে। এর কারণ যে আমলাতন্ত্র আমাদের দেশে গড়ে উঠেছে তাদের বুদ্ধির ফাঁকফোকর ডিজিটাল প্রযুক্তিকেও হার মানিয়ে দেয়। অবশ্য এদের পেছনে শক্তিশালী মহল বিশেষের আশীর্বাদ সবসময়ই থাকে। ফলে প্রতি বছর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের অধীন যে পরিমাণ অর্থ নানা উন্নয়নমূলক কাজে বরাদ্দ ও ছাড় দেয়া হয় তার একটি বড় অংশই লোপাট হয়। বাস্তব কাজে এর সুফল দীর্ঘস্থায়ী হয় না। রাস্তা নির্মাণ করলে তা এক-দুই বর্ষাতেই শেষ, পুল-কালভার্টের অবস্থা তথৈবচ! কোথাও কোথাও নির্মাণ না করিয়ে অর্থ লোপাটের ঘটনা ঘটেছে। অথচ নির্দ্বিধায় বলা চলে বর্তমান সরকারের শুরু থেকে এই পর্যন্ত লাখ লাখ কোটি টাকা বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করা হয়েছে। এসব কাজ মানসম্মতভাবে করা হলে আগামী কয়েক দশক নতুন করে বরাদ্দ দেয়ার প্রয়োজনই পড়ার কথা ছিল না। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন ঘটনা। প্রতি বছরই হয়তো মেরামত-পুনঃমেরামতের নামে টাকা বরাদ্দ করতে হয়েছে। কথা হচ্ছে বাংলাদেশ এভাবে আর কতদিন চলবে? এর একটা অবসান তো হওয়া উচিত। প্রশ্ন হচ্ছে কী করা দরকার?
আমি কোনো বিশেষজ্ঞ নই। তবে একজন সমাজের পর্যবেক্ষক হিসেবে আমি মনে করি বাংলাদেশে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন প্রকল্প, নির্মাণ, কেনাকাটা ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে যে ঠিকাদারি ব্যবস্থা বর্তমানে প্রচলিত আছে তাতে আইন ও বিধির মৌলিক বেশকিছু পরিবর্তন সাধন অপরিহার্য। সেটি সরকারের নির্বাহী ক্ষমতায় সম্ভব কিনা আমি জানি না। তবে সরকারের আইন মন্ত্রণালয় দেশের স্বার্থে আইনের কিছু কঠোর বিধিবিধান, নিয়মনীতি ও ব্যবস্থাপনাগত প্রাতিষ্ঠানিক কার্যকারিতা আইনগতভাবে নির্ধারণ করতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের সহায়তায় পদ্মা সেতু নির্মাণ, কুড়িল ফ্লাইওভার, হাতিরঝিল প্রকল্পসহ বেশকিছু কাজ অত্যন্ত প্রশংসার সঙ্গে সম্পন্ন করা হয়েছে বা হচ্ছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতিসংঘের আমন্ত্রণে বিদেশে অনেক প্রশংসনীয় কাজ করে আসছে। দেশেও নানা দুর্যোগ, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা মোকাবিলায় তাদের অবদান স্বীকৃত হচ্ছে।
পদ্মা সেতুর সঙ্গে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের সংযুক্তি এই প্রকল্পটিকে মানের উচ্চতায় যেমন নিয়ে যাবে, তেমনিভাবে আন্তর্জাতিকভাবেও পদ্মা সেতুর নির্মাণ নিয়ে সম্মানের একটি জায়গায় পৌঁছাতে আমরা পারব বলেও নিশ্চিত। সেনাবাহিনীর নির্মিত অন্য প্রকল্পগুলোও মান এবং অর্থের সাশ্রয় করেছে। সুতরাং সরকারের ভাবনাচিন্তা করার সুযোগ থাকলে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরকে সম্পৃক্ত করে যে কোনো ধরনের বাঁধ নির্মাণ, হাইওয়ের মতো বড় বড় রাস্তাঘাট, ব্রিজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ, সব ধরনের কেনাকাটার আয়োজনে এমন কোনো নীতি নির্ধারিণী ও নির্বাহী পরিষদ গঠন করা যার অন্যতম দায়-দায়িত্বে সেনা প্রকৌশলী কোরের অংশগ্রহণ-তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করার বিধান থাকবে। এটি অন্তত আগামী দেড়-দুই দশকের জন্য হলেও পরীক্ষামূলকভাবে কার্যকর করা যেতে পারে। আমার বিশ্বাস তাতে বর্তমান মাফিয়া টেন্ডারবাজ ও প্রশাসনের দুর্নীতিবাজরা গুটিয়ে যেতে বাধ্য হবে। সেক্ষেত্রে সর্বক্ষেত্রে সরকারের অর্থ অপচয় বা লোপাট হওয়ার সুযোগ থাকবে না, নির্মিত কাজ মানসম্মত ও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। বাংলাদেশ দ্রুতই উন্নয়নের রাস্তায় দৌড়াতে পারবে, জনসাধারণের জীবনযাত্রার মানও বেড়ে যাবে। কাজের বিস্তারের জন্য সেনা প্রকৌশল কোরটিকে বিস্তৃত এবং পেশায় বহুমুখী করা যেতে পারে। এর প্রভাব হয়তো এসব কাজকর্মে পড়তে পারে। সেনাবাহিনীও দেশ সেবায় তাদের যোগ্যতার প্রমাণ রাখার সুযোগ পাবে। বিষয়টি সরকারের নীতি নির্ধারণী মহল ভেবে দেখতে পারেন।

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক।
[email protected]

ডিসি