ডিএনসিসির চিরুনি অভিযান, ৮৭ স্থাপনায় এডিসের লার্ভা

আগের সংবাদ

জনস্বার্থে টেন্ডার ব্যবস্থাপনায় মৌলিক পরিবর্তন জরুরি

পরের সংবাদ

করোনা ভ্যাকসিন কতটা দূরে

মেজর (অব.) সুধীর সাহা

প্রকাশিত হয়েছে: জুলাই ১৩, ২০২০ , ৫:১৭ অপরাহ্ণ

পৃথিবীজুড়ে এখন চলছে কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন তৈরির প্রতিযোগিতা। কয়েকটি দেশ, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা কেন্দ্র ইতোমধ্যেই এ নিয়ে গবেষণায় অনেকখানি অগ্রগতি সাধন করতে সক্ষম হয়েছে। তবে বিষয়টি যেহেতু নতুন ভ্যাকসিন আবিষ্কার এবং তৈরি করা, তাই এর অনুমোদনের লক্ষ্যে একটি লম্বা সময় ধরে মোট তিনটি স্তর অতিক্রম করে যেতে হয়। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করে আবিষ্কারক। তবে কোভিড-১৯ এর ক্ষেত্রে যেহেতু সারা বিশ্ব আক্রান্ত হয়েছে এবং ভয়াবহ মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে মানুষের গড়া সভ্যতা, কাজেই একটু তাড়াতাড়িই স্তরগুলো অতিক্রম করতে পারছে গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো। ইতোমধ্যেই কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান তৃতীয় স্তরে পৌঁছে গেছে। এখানে স্তরগুলো বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন বোধ করছি। প্রথম স্তরটি শুরুর পরীক্ষা। অল্পসংখ্যক আক্রান্ত ব্যক্তি নিয়ে এই স্তরটি সম্পন্ন করা হয়। এই স্তরে ভ্যাকসিনের কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে কিনা এবং একজন রোগীর জন্য কতটুকু ডোজ প্রয়োজন তা নির্ধারণ হয়। দ্বিতীয় স্তরে কয়েকশ আক্রান্ত রোগীর ওপর পরীক্ষা করা হয়। এখানে ভ্যাকসিনের প্রয়োগ ক্ষমতা বুঝার চেষ্টা করা হয় এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া যা প্রথম স্তরে বুঝা যায়নি তাও পরীক্ষা করা হয়। তৃতীয় স্তরটি অনেক বড় পরিসরে পরীক্ষার আওতায় আনা হয়। কয়েক হাজার আক্রান্ত রোগীর ওপর এই স্তরে পরীক্ষা পরিচালিত হয়। এই স্তরটি দীর্ঘসময় ধরে চলার কথা। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এই স্তরে বিজ্ঞানীরা ১-৪ বছর সময় ব্যয় করে। এই স্তরে সুস্পষ্ট করে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।

যদিও করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কারের জন্য প্রায় ১৪০টি প্রতিষ্ঠান কাজ করে যাচ্ছে এবং এর মধ্যে ১৩টি প্রতিষ্ঠান ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে যেতে সমর্থ হয়েছে। এই ১৩টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আছে মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়, চীনের উহান ইনস্টিটিউট, বেইজিং ইনস্টিটিউট, সিনোভ্যাক, জেনেক্সিন, গ্যামেলিয়া গবেষণা, ক্যানসিনো, নোভাভ্যাক্স, বায়ো-এনটেক, ইনোভিউ ফার্মাসিউটিক্যালস, ক্লোভার বায়ো-ফার্মাসিউটিক্যালস, এনহুই ঝিফেই লংগকম, মডার্না, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়। করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কারের সবচেয়ে অগ্রসর ভ‚মিকায় আছে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের মডার্না। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে ওষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানি অ্যাস্ট্রাজেনেকা। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় গত এপ্রিল মাসে ৫০০ জন আক্রান্তকারীর মধ্যে তাদের প্রথম স্তরের টেস্টটি করতে সক্ষম হয়েছিল। তার আগে এই বিশ্ববিদ্যালয় বানরের ওপর ভ্যাকসিন ব্যবহার করে সফলতা লাভ করে।

তৃতীয় স্তরে পৌঁছে গিয়ে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং অ্যাস্ট্রাজেনেকা কোম্পানি ব্রাজিলের সঙ্গে ব্রাজিলে স্থানীয়ভাবে এই ভ্যাকসিনটি প্রস্তুত করার লক্ষ্যে ১২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের চুক্তি ইতোমধ্যে সম্পাদন করেছে। ব্রাজিলের স্বাস্থ্য বিভাগ ঘোষণা দিয়ে রেখেছে যে, তারা মোট ৩০ মিলিয়ন ভ্যাকসিন স্থানীয়ভাবে প্রস্তুত করবে; যার অর্ধেক হবে ২০২০-এর ডিসেম্বরের মধ্যে এবং বাকি অর্ধেকটা হবে ২০২১ সালের জানুয়ারিতে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার তিনটি ওষুধ কোম্পানিকে তাদের তৃতীয় স্তরের পরীক্ষা পরিচালনা করার ক্ষেত্রে অনুদানের জন্য নির্বাচিত করেছে। তারা জুলাই মাসে অনুদান প্রদান করবে মডার্নাকে, আগস্ট মাসে করবে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও অ্যাস্ট্রাজেনেকাকে এবং সেপ্টেম্বরে করবে ফাইজার কোম্পানিকে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষণা দলটি এর পূর্বে ‘মার্স’ নামের ভাইরাসের ওপর ভ্যাকসিন আবিষ্কারের চেষ্টা করেছিলেন। এবার সেই গবেষণা তারা আরো এগিয়ে নিয়ে যান এবং করোনার প্রতিষেধক ভ্যাকসিনরূপে রূপান্তরিত করেন। দ্বিতীয় স্তরে তারা ১৮-৫৪ বছর বয়সী ১ হাজার ৯০ জন আক্রান্ত ব্যক্তির ওপর গবেষণা পরিচালনা করেন। তারা এই পর্যায়ে ৪টি ধাপে চারবার ভ্যাকসিন প্রদানের চিন্তা করেন। পরপর দুবার সিঙ্গেল ডোজ পাওয়ার পর আক্রান্তকারীরা তৃতীয় ডোজ পাওয়ার ৪ সপ্তাহ পর বোস্টার ডোজ লাভ করে। ইতোমধ্যে সাউথ আফ্রিকার উইটওয়াটারস্ট্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সহযোগিতামূলক কাজ করার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। সাউথ আফ্রিকাতে বিভিন্ন স্তরের পরীক্ষা করার ব্যবস্থাও করেছে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি। তারা অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে তাদের দেশে আক্রান্তকারীদের ওপর পরীক্ষা পরিচালনা করছে। সাউথ আফ্রিকার হেলথ প্রোডাক্টস রেগুলেটরি অথরিটি তাদের দেশে এই পরীক্ষাকে স্বাগত জানিয়েছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় স্তরে টার্গেট ১০ হাজার আক্রান্তকারীর মধ্যে ৪ হাজার আক্রান্তকারীর ওপর যথারীতি কাজ শুরু হয়েছে যুক্তরাজ্যে। বিশ্ববিদ্যালয় ব্রাজিলে ৩ হাজার আক্রান্তকারীর ওপর এই পরীক্ষা করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। অবশিষ্ট অংশ তারা সাউথ আফ্রিকাতে পরিচালনা করার আশা রাখছে। ২০২০ সালের ২১ মে অ্যাস্ট্রাজেনেকা ঘোষণা দেয় যে, তারা বায়োমেডিকেল অ্যাডভান্সড রিসার্স এন্ড ডেপেলপমেন্ট অথরিটির (বারডা) কাছ থেকে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থ সংগ্রহ করেছে এবং ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে ভ্যাকসিনটি বাজারজাত করার আশা রাখে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা দলটি আশা করেন, তারা বিভিন্ন বয়সের ১০ হাজার লোকের ওপর চূড়ান্ত পরীক্ষা সম্পন্ন করতে সক্ষম হবে। তৃতীয় স্তরের পরীক্ষা করার জন্য তারা অপারেশন র‌্যাপ স্পিড থেকে ফান্ড গ্রহণ করে।

ভ্যাকসিন গবেষণার দ্বিতীয় অবস্থানে আছে যুক্তরাষ্ট্রের মডার্না। মডার্না ড্রাগমেকার ক্যাটালেন্টের সঙ্গে পার্টনারশিপের চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। অন্যদিকে ক্যাটালেন্ট অ্যাস্ট্রাজেনেকার সঙ্গেও পার্টনারশিপের চুক্তি সম্পাদন করেছে। বর্তমানে মডার্না দ্বিতীয় স্তর শেষ করে তৃতীয় স্তরে প্রবেশ করেছে। তারা আশা করছে, আগামী নভেম্বরের মধ্যে তাদের আবিষ্কৃত ভ্যাকসিন বাজারে নিয়ে আসতে পারবে। আগামী মাস থেকে তারা ৩০ হাজার মানুষের মধ্যে তৃতীয় এবং চূড়ান্ত পরীক্ষা শুরু করতে যাচ্ছে। সবকিছু ঠিকঠাক মতো এগিয়ে গেলে আমরা এই মুহূর্তে আশা করতেই পারি যে, যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাস্টাজেনেকার যৌথ উদ্যোগ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মডার্না খুব শিগগিরই আমাদের জন্য একটি স্বস্তিদায়ক সংবাদ নিয়ে আসবে। তার জন্য আর খুব বেশি বিলম্ব করতে হবে না। এ বছরের শেষের দিকেই এই শুভ সংবাদটি পৃথিবীর মানুষকে অনেক বড় প্রশান্তির জায়গা উপহার দিতে পারে। এমনটি হলে আমরা অন্তত একটু আশ্বস্ত হতে পারব যে, করোনাকে ঠেকাতে আমাদের ভ্যাকসিন আছে। তবে প্রতিটি দেশের সরকারকে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে যে, এবারের ভ্যাকসিনের প্রয়োজন কোনো বিশেষ দেশের জন্য নয় এটির প্রয়োজনীয়তা আছে ২১৮টি দেশের সবারই এবং প্রতিটি দেশের সব মানুষের জন্য না লাগলেও অধিকাংশ মানুষের জন্যই ভ্যাকসিনের ব্যবহার আবশ্যকীয়। ভ্যাকসিনের অনুমোদন লাভের পর তার প্রস্তুত ও সরবরাহের বিষয়টি আরো একটি মহাযজ্ঞ বিষয় হবে তা সহজেই অনুমান করা যায়। ২১৮টি দেশের জন্যই তাৎক্ষণিকভাবে তা প্রয়োজন পড়বে। সুতরাং ভ্যাকসিন আবিষ্কার, বাজারজাতকরণ, সরবরাহকরণ এবং স্ব-স্ব দেশের মাধ্যমে নিজ নিজ প্রতিটি নাগরিকের কাছে ভ্যাকসিন পৌঁছে দেয়ার কাজটি হবে আরো একটি বিশাল কর্মকাণ্ড। অর্থনৈতিক বিষয়টিও সমানভাবে জড়িত। প্রতিটি দেশের বিশেষ করে গরিব দেশের মানুষের জন্য এই ভ্যাকসিনটি নিজ অর্থ দিয়ে ক্রয় করার সামর্থ্য থাকবে এমনটা ভাবা যাচ্ছে না। কেননা এখনো আমরা এই ভ্যাকসিনের বিক্রয়মূল্য জানি না। তবে তা যে বেশ চড়া দামেই ক্রয় করতে হবে তা বেশ বুঝা যাচ্ছে। কারণ গবেষণাটি দ্রুত ও স্বল্প সময়ে করার ফলে উৎপাদন ব্যয় অনেকাংশেই বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রত্যেক দেশের সরকারকে তাই এই ভ্যাকসিন সরকারি অর্থে ক্রয় করার চিন্তা করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। বাংলাদেশকেও অগ্রিম পরিকল্পনা করে রাখতে হবে কখন কার মাধ্যমে তারা তাদের সব জনগণের জন্য এই ভ্যাকসিন সংগ্রহের কাজটি একেবারে শুরুতেই করতে পারবে এবং প্রতি বছরই তা করতে পারবে।

মেজর (অব.) সুধীর সাহা : কলাম লেখক।
[email protected]

ডিসি