আত্মহত্যা নয়, সুশান্তকে খুন করা হয়েছে! 

আগের সংবাদ

বিশ্বে করোনায় মৃত্যু ৫ লাখ ৬০ হাজার ছাড়িয়ে

পরের সংবাদ

অপকর্মের ব্যাখ্যা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী

প্রতারক সাহেদ কোথায়

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশিত হয়েছে: জুলাই ১১, ২০২০ , ৯:১৮ পূর্বাহ্ণ

রাজধানীর উত্তরা ও মিরপুরের রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান পেশাদার প্রতারক মো. সাহেদ করিম এখনো লাপাত্তা। র‌্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দারা তার খোঁজে হন্যে হলেও হদিস মিলছে না। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে র‌্যাব-পুলিশের একাধিক টিম তার খোঁজে অভিযান চালাচ্ছে। তবে তিনি কোথায় আত্মগোপন করেছেন তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তাকে ধরতে প্রযুক্তির সহায়তা নেয়া হচ্ছে। ধূর্ত এই প্রতারকের অপকীর্তির ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে তথ্য চেয়েছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। লাইসেন্সের মেয়াদ নবায়ন না করে রিজেন্ট হাসপাতাল কীভাবে ‘কোভিড ডেডিকেটেড’ হাসপাতাল হিসেবে চুক্তিবদ্ধ হলো, সে বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ব্যাখ্যা চেয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব উম্মে হাবিবা স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। সাহেদের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে করোনায় বাবা মারা গেলেও লাশ পর্যন্ত দেখতে যাননি সাহেদ।

সাহেদ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল গতকাল শুক্রবার তার বাসভবনে সাংবাদিকদের জানান, করোনা ভাইরাস মহামারির মধ্যে রিজেন্ট হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিয়ে প্রতারণার ঘটনা কীভাবে ঘটল, তার ব্যাখ্যা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সাহেদকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, তিনি আটক হয়ে যাবেন। তারও উচিত সারেন্ডার করা। আকাম করলে নিস্তার নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সাহেদ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘এগুলো কী? কেমনে, কী করে হলো?’ জবাবে আমি বলেছি, আমি তো জানি না। একদিন দেখলাম দুটি হাসপাতাল কোভিডের জন্য উৎসর্গ করেছে। আমার কাছে সে একদিন বুক ফুলিয়ে কথা বলল। আমি বললাম, আমি তাহলে রোগী পাঠব। রোগী পাঠিয়েছি। কতজন ভালো হয়ে আসছে; তপন নামে আমাদের এক নেতা মারাও গেছেন।’ রিজেন্ট হাসপাতাল থেকে কোভিড-১৯ এর ভুয়া প্রতিবেদন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এগুলো প্রমাণিত হলে তাকে শাস্তি পেতেই হবে।
তথ্যমতে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের সঙ্গে সাহেদের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। এমনকি ৬ জুলাই রিজেন্ট হাসপাতালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চলাকালেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ফোন করে তার সাহায্য চায় সাহেদ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেও তা স্বীকার করেছেন। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্যমতে, জবাবে ‘ এ বিষয়ে আমার কিছু করার নেই’ বলে সাহেদকে জানিয়ে দেন তিনি। ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের এক চিঠিতে ভুয়া সেনাকর্মকর্তা পরিচয়ে প্রতারণার অপরাধে সাহেদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। প্রশ্ন উঠেছে, খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে এরকম একটা গুরুতর অপরাধে ব্যবস্থা নিতে

লিখিত নির্দেশ দিয়েছে; সেই প্রতারক সাহেদ কীভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে সক্ষম হয়?
এদিকে গত মঙ্গলবার স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থেকে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়েছে, রিজেন্ট হাসপাতালে চালানো র‌্যাবের অভিযান, বিভিন্ন গণমাধ্যমে হাসপাতালটির বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশিত হওয়ার পর ‘দেশ ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে’। এ অবস্থায় রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমঝোতা চুক্তি বাতিল করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে চিঠিতে। এছাড়া সমঝোতা চুক্তির শর্ত ভেঙে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নমুনা সংগ্রহ ও ভুয়া রিপোর্ট দেয়ার বিষয়ে তদন্ত করে দ্রুত মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠাতে বলা হয়েছে। হাসপাতালটির সব কার্যক্রম বাতিল করে সিলগালা করার কথা ওই চিঠিতে বলা হলেও র‌্যাব তা আগেই করেছে।

এদিকে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় হাওয়া ভবন ঘনিষ্ঠ সাহেদের বিরুদ্ধে মামলা করার কথা ভাবছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র ডা. আয়েশা আক্তার এ তথ্য জানিয়ে বলেন, তার বিরুদ্ধে র‌্যাব মামলা করেছে, তাকে খুঁজছে। কিন্তু সংক্রামক ব্যাধি আইন (২০১৮) অনুসারে তার বিরুদ্ধে মামলা করার কথা ভাবছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এগুলো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, প্রস্তুতি নিতে তো একটু সময় দরকার। র‌্যাব, দুদক (দুর্নীতি দমন কমিশন) তদন্ত করছে। ডা. আয়েশা আক্তার বলেন, রিজেন্টে তো অনেক ভুয়া রিপোর্ট দেয়া হয়েছে, তার মানে হচ্ছে রোগটাকে লুকানো হয়েছে। যদি পজিটিভ হওয়া কাউকে নেগেটিভ বলে থাকে, সেগুলো তো সব ফলস্। তাহলে এই যে পজিটিভ রোগীদের দ্বারা রোগটা ছড়িয়ে গেল। কেবল এই কারণেও সংক্রামক ব্যাধি আইন অনুসারে তার বিরুদ্ধে মামলা করা যায়। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ভাবছে।
অন্যদিকে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সাহেদের বাবা সিরাজুল করিম বৃহস্পতিবার রাতে মহাখালীর ইউনির্ভাসেল মেডিকেল কলেজ এন্ড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। গ্রেপ্তার এড়াতে সাহেদ তার বাবার লাশও দেখতে যাননি। ওই হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্তী জানান, সাহেদের হাসপাতালে সব ধরনের সুবিধা না থাকায় তার বাবা সিরাজুল ইসলাম ইউনাইটেড হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তিনি বলেন, আমাদের কাছে মো. সাহেদের ফোন নম্ব^র ছাড়া আর কারো নম্বর ছিল না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সাহেদের স্ত্রীর ফোন নম্বর জোগাড় করে মারা যাওয়ার খবর দেন। পরে দুই ব্যক্তি এসে (বাড়ির কেয়ারটেকার ও গাড়িচালক) মৃতদেহ নিয়ে যায়। পরে লাশ স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঢাকায় দাফন করা হয়েছে।
সাহেদের স্ত্রী বিটিভির সংবাদ পাঠিকা সাদিয়া আরাবী রাম্মী জানান, তিন দিন আগে তার স্বামীর সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল। তখন তিনি ফোন করে জানিয়েছিলেন তিনি ভালো আছেন। এরপর থেকে তার আর যোগাযোগ নেই। এর আগে জেল থেকে বের হওয়ার পর সাহেদ ভালো হয়ে গিয়েছিলেন বলে তার স্ত্রীর ধারণা ছিল। যা এখন পাল্টে গেছে।
এদিকে সাহেদকে ধরতে র‌্যাবের একাধিক টিম ঢাকা ও ঢাকার বাইরে রয়েছে। তার বন্ধু ও স্বজনদের বাসায় খোঁজ নেয়া হয়েছে। সাতক্ষীরায় তার গ্রামের বাড়িতেও খবর নেয়া হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে তিনি ঢাকায় আত্মগোপন করে আছেন। চেষ্টা করছেন গোপনে দেশত্যাগের। তবে সবকটি সীমান্তে এ ব্যাপারে বার্তা দেয়া রয়েছে। হাওয়া ভবন ঘনিষ্ঠ সাহেদ কীভাবে কার মাধ্যমে আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ করলেন, সে ব্যাপারেও খোঁজ করছে গোয়েন্দারা। সাহেদ পাঁচ তারকা হোটেল শেরাটন থেকে হাওয়া ভবনে তারেক রহমান ও গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের জন্য নিয়মিত খাবার পাঠাতেন বলে গোয়েন্দারা জানতে পেরেছে। তার সঙ্গে তারেক রহমানের যোগাযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার আব্দুল বাতেন জানান, তারাও সাহেদের বিষয়ে খোঁজখবর করছেন। তথ্য পেলেই গ্রেপ্তার করা হবে।
সাহেদের অন্যতম সহযোগী তরিকুল ইসলাম ওরফে তারেক শিবলীর পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। শুক্রবার শিবলীকে আদালতে হাজির করে মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তার সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার পুলিশ পরিদর্শক আলমগীর গাজী। পরে আদালত তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে বুধবার দিবাগত রাতে রাজধানীর নাখালপাড়া এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া ৫ দিনের রিমান্ডে থাকা রিজেন্ট হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আহসান হাবীব (১), হেলথ টেকনিশিয়ান হাবীব (২), হেলথ টেকনোলজিস্ট হাতিম আলী, রিজেন্ট গ্রুপের প্রকল্প প্রশাসক মো. রাকিবুল ইসলাম, রিজেন্ট গ্রুপের মানবসম্পদ কর্মকর্তা অমিত বণিক, রিজেন্ট গ্রুপের গাড়িচালক আবদুস সালাম ও হাসপাতালের কর্মী আবদুর রশিদ খান জুয়েলকে জিজ্ঞানসাবাদ চলছে। হাসপাতালের আড়ালে সাহেদ কি ধরনের অপকীর্তি করতেন তারা সে ব্যাপারেও তথ্য দিতে শুরু করেছে। ওই হাসপাতালের অভ্যর্থনাকারী কামরুল ইসলাম কিশোর হওয়ায় তাকে গাজীপুরের কিশোর সংশোধনীতে পাঠিয়েছেন আদালত।

প্রসঙ্গত, গত ৬ জুলাই সাহেদের মালিকানাধীন রিজেন্ট হাসপাতালের উত্তরা ও মিরপুর শাখায় অভিযান চালায় র‌্যাব। এই হাসপাতালের বিরুদ্ধে নমুনা টেস্ট না করেই রোগীদের করোনার রিপোর্ট দেয়ার অভিযোগ পায় তারা। এ ঘটনায় উত্তরা পশ্চিম থানায় রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ, এমডি মাসুদ পারভেজসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। এ ঘটনায় ৯ জন গ্রেপ্তার হয়। তবে সাহেদ এখনো পলাতক। হাসপাতাল দুটি ও রিজেন্ট গ্রুপের অফিস সিলগালা করে দিয়েছে র‌্যাব।

নকি