সাহিত্যে মহামারির একাল ও সেকাল

আগের সংবাদ

অনিন্দ্য আহসান হাবীব

পরের সংবাদ

হোম কোয়ারেন্টাইন

রেজাউল করিম খোকন

প্রকাশিত হয়েছে: জুলাই ১০, ২০২০ , ৭:০৫ অপরাহ্ণ

সন্ধ্যেয় শাহেদ অফিস থেকে যখন বেরোয় তখন রাস্তাঘাটে যানবাহন চলাচল অনেকটাই কমে গিয়েছে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নিরাপদ আশ্রয় আপন ঘরে যারা ফিরতে চাইছে, তাদের সবার সঙ্গে শামিল হয়ে সে অদ্ভুত এক অভিজ্ঞতা অর্জন করে। কেউ কারো সঙ্গে তেমন কথা বলছে না। একজন আরেকজনের দিকে সন্দেহ আর অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। এর মধ্যেই বাসা থেকে রিমি কয়েকবার ফোন করেছে। ছেলেমেয়ে দুটোও ফোন করে জানতে চেয়েছে তার অবস্থান। এখন পর্যন্ত বাসায় কেন ফিরছে না সে, সবার উৎকণ্ঠা। টেলিভিশনে বিভিন্ন চ্যানেলে করোনা সংক্রমণের খবরগুলো দেখতে গিয়ে ভয় পেয়েছে ভীষণ। এ কারণেই তাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাসায় ফেরার তাগিদ দিচ্ছে তারা প্রত্যেকেই। এরকম অবস্থা হয়তো সবার ঘরেই। শাহেদ উপলব্ধি করে রিকশায় বসে। মুখে মাস্ক আর হাত গ্লাভস পরে আছে সে। আশপাশে অন্যান্য রিকশা, সিএনজি কিংবা প্রাইভেটকারে বসা যাত্রীদের সবারই একই অবস্থা। রাস্তায় হাঁটছে যারা, তাদের মুখেও মাস্ক লাগানো।
বাসায় ঢুকতেই রিমি চিন্তিত মুখে অনেকটা অস্থিরতা নিয়ে বলতে থাকে জানোই তো এখন থেকে ঘরের বাইরে যাওয়া যাবে না। ঘরে তো অনেক কিছুই নেই। কাল যদি বাইরে যাওয়া না যায় তাহলে আমরা চলবো কীভাবে? তুমি আমি, ছেলেমেয়েরা খাবো কী? জরুরি প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস কিনে রাখা দরকার আগামী দিনগুলোর জন্য। পরে যদি পাওয়া না যায়, আর ঘর থেকে দোকানে যেতে না পারি তাহলে কী হবে? রিমির দুশ্চিন্তা, আশঙ্কা অমূলক নয়। সে যা ভেবেছে সেটা কোনোভাবেই অযৌক্তিক নয়। শাহেদ অনুভব করে। সঙ্গে সঙ্গে সে অফিস ব্যাগটা রেখেই আবার বেরিয়ে যায় জরুরি কেনাকাটা করতে। তার পিছু পিছু রিমিও অনুসরণ করে।
দুই.
গত চার দিন ধরে ১২০০ স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাটের চার দেয়ালের মধ্যে নিজেকে আটকে রেখেছে শাহেদ। নিজের ফ্ল্যাটের বাইরে কোথাও যায়নি। দরজা খুলে লিফটের সামনে কিংবা লিফটে চড়ে নিচে কার পার্কিংয়েও না। গত তিন দিনে বাইরে থেকে বাসায় কেউ আসেনি। কাজের বুয়াকে পাঁচদিন আগেই ছুটি দেয়া হয়েছে। তাকে বলে দেয়া হয়েছে আসতে হবে না আগামী বেশ কিছুদিন।
‘আন্টি, আমি না আইলে বাসার এতো কাজ সামলাইবেন কেমনে, রান্নাবান্না, কাপড় ধোয়া, ঘর ঝাড়–মোছা, বাসানপ্লেট ধোয়া কেডা করবো?’ ময়নার মার সহানুভূতিশীল প্রশ্নে রিমি অস্থির হয়ে বলেছে, ‘তোমার এসব নিয়া চিন্তা করতে হবে না, তোমারে যা বলছি তাই করো এখন তুমি যাও। ঘরের মধ্যে তোমার আর ঢোকার প্রয়োজন নেই।’ ফ্ল্যাটের দরজার সামনে থেকেই কাজের বুয়াকে বিদায় করেছে রিমি।
শাহেদ তার ছেলেমেয়েকে নানাভাবে বুঝিয়েছে। অযথা ভয় না পেতে বলেছে। নিজের ছোটবেলায় একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার অভিজ্ঞতার গল্প তুলে ধরেছে। গত কয়েকদিন ধরে বাসায় স্বেচ্ছাবন্দি হয়ে কাটাতে গিয়ে একাত্তরের দিনগুলোর কথা খুব মনে পড়ে যায়। তখনো ঘরের বাইরে যাওয়া যেত না। বাইরে গেলেই নানা বিপদ হতে পারে। আজ এত বছর পর প্রায় একই রকম পরিস্থিতিতে দেশের সব মানুষ পড়েছে।
রিমির স্কুলে যাওয়ার প্যারা নেই এখন। সারাক্ষণ বাসায় থাকতে পারছে। ময়নার মাকে ছুটি দিয়ে তার সব কাজের বোঝা একাই বইতে হচ্ছে তাকে। সকাল থেকে দুপুর, দুপুর পেরিয়ে বিকেল এরপর বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত সংসারের যাবতীয় কাজকর্ম করতে করতে গলদঘর্ম হয়ে যাচ্ছে। রান্নাবান্না থেকে ঘরদোর ধোয়া মোছা কাপড় চোপড় ধোয়া সব কাজ এক হাতে করতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে। প্রায়ই বেসামাল হয়ে চিৎকার, চেঁচামেচি করছে। শাহেদ এবং ছেলেমেয়ে দুটিকে বকাঝকা করছে। ‘তোমরা সবাই হাত গুটিয়ে মেহমানের মতো বসে আছো আর আমি একলাই সবকিছু করে যাচ্ছি। তোমরা তো আমার সাথে কাজকর্মে হাত লাগাতে পারো। তোমাদের কারোই তো তেমন কোনো কাজকর্ম নেই। বসে বসে মোবাইল আর ল্যাপটপ টেপাটেপি করছো। আমার কাজে এটু হেলপ করলে কী হয়ে তোমাদের?
সবসময় অফিসের কাজের ব্যস্ততায় দিনগুলো কীভাবে যে পার হয়ে যায়, তখন তা টের পেত না শাহেদ। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটতে ছুটতে দিনশেষে ক্লান্ত শরীরে ঘরে ফেরাটাই যেন রুটিন ওয়ার্ক হয়ে উঠেছে তার জন্য।
প্রতিদিন অফিস শেষে বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যায়। ঘরে ঢুকে কাপড় চোপড় পাল্টে চা নাস্তা খেয়ে খানিকটা সময় টিভির সামনে বসে থাকা, এরপর রাতের খাবার খেয়ে ক্লান্ত অবসন্ন শরীরে বিছানায় শুয়ে পড়তেই গভীর ঘুমে তলিয়ে যাওয়া রোজকার অভ্যেসে পরিণত হয়েছে তার জন্য। অথচ গত কয়েকদিনে একটানা অলস, কর্মহীন, উদ্বিগ্ন সময় কাটাতে গিয়ে সম্পূর্ণ নতুন এক অভিজ্ঞতা হয়েছে শাহেদের হচ্ছে মাঝেমধ্যে।
মরণঘাতী করোনা ভাইরাসের আক্রমণে পুরো দুনিয়া আজ মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। ইউরোপ আমেরিকায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ মরছে। সেখানকার উন্নত আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থাও করোনার প্রকোপ থেকে রক্ষা করতে পারছে না। সর্বাধুনিক সুযোগ-সুবিধাও সেখানে ব্যর্থ হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়েও কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কার করতে পারছেন না। তারা নিজেদের অসহায়ত্ব স্বীকার করছেন। দেশে দেশে নানা চেষ্টা চলছে। সবার প্রত্যাশা, এর মধ্যে কেউ না কেউ করোনা ভাইরাস দমনের উপযুক্ত কার্যকর প্রতিষেধক আবিষ্কার করতে সক্ষম হবেন। তখন এই পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ করোনার ঝুঁকিমুক্ত হবে। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত এই মহামারি ঠেকানো সম্ভব না হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত গোটা মানবসভ্যতা চরম বিপর্যয়ের দিকে ছুটে যাচ্ছে। এভাবে আরো কিছুদিন চললে গোটা পৃথিবী কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে ভাবতেই বুকের মধ্যে তোলপাড় অনুভব করে শাহেদ। চুপচাপ একাকী বসে ভাবতে গিয়ে কেমন স্থবির হয়ে যায়। যদি করোনার এই সর্বনাশা প্রকোপ সহসা না থামে এভাবে যদি দেশে দেশে মানুষের মৃত্যুর মিছিল বাড়তেই থাকে, দিনের পর দিন ব্যবসায়ীরা কাজকর্ম, স্বাভাবিক জীবনযাপন থামিয়ে সবাই জীবন বাঁচাতে নিজেদের ঘরবন্দি করে রাখে তাহলে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো আমরা, নিজেকে প্রশ্ন করে শাহেদ।
এর মধ্যে কেউ কেউ বলছেন, আগামী দিনগুলোতে আরো ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। তখন আরো কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হতে পারে। সতর্কতা অবলম্বন করে সাবধানী হয়ে ঘরের মধ্যে থাকছে সবাই। অনেক প্রয়োজনেও বাইরে যাচ্ছে না। কিন্তু তারপরও বিপদমুক্ত থাকার নিশ্চয়তা কতটুকু রয়েছে? জীবনে নানা সংকট মোকাবিলা করলেও এরকম পরিস্থিতিতে পড়েনি কেউ, অনেকের সঙ্গে কথা বলে বুঝেছে সে। এরপর কী ঘটতে যাচ্ছে কেউ বলতে পারছে না। অনিশ্চয়তার দোলাচালে দুলছে সবাই।
অনিশ্চিত আরেকটি আগামীকালের অপেক্ষায় থাকা ছাড়া আর বিকল্প পথ খোলা নেই কারো। অন্য সবার মতো অনিশ্চিত আরেকটি দিনের অপেক্ষা করতে থাকে ঘরবন্দি মানুষগুলো।

এসআর