অনিয়ম প্রতিরোধে ইসির তদন্ত কমিটি

আগের সংবাদ

হোম কোয়ারেন্টাইন

পরের সংবাদ

ধারাবাহিক গদ্য- ২

সাহিত্যে মহামারির একাল ও সেকাল

মজিদ মাহমুদ

প্রকাশিত হয়েছে: জুলাই ১০, ২০২০ , ৬:৫৭ অপরাহ্ণ

লন্ডন তার বইয়ে দেখান প্লেগের পরে বেঁচে থাকা অবশিষ্ট মানুষকে কীভাবে আদিম পৃথিবীতে টিকে থাকার লড়াই করতে হয়েছিল। তার বইতে ডারউইনের তত্ত্বের প্রতিধ্বনি শুনতে পাওয়া যায়। ‘সভ্যতা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল এবং যে যার মতো বাঁচার চেষ্টা করছিল।’ লন্ডন এ অবস্থার জন্য তার পূর্ববর্তী কয়েকজন লেখকের মতো কায়েমি সমাজ ব্যবস্থাকেই দায়ী করছিলেন। বিশেষ করে লন্ডনের মতে পুঁজিবাদ এই মহামারির দায় এড়াতে পারে না। শিল্পের প্রয়োজনে কারখানার প্রয়োজনে তারা মানুষকে একত্রে জড়ো করে তোলে; আর এই উপচেপড়া ভিড়, জনাকীর্ণ বসতি মহামারি সৃষ্টির জন্য সহায়ক হয়। লন্ডনের মতে পুঁজিবাদই এই মহামারির জন্য একমাত্র দায়ী।
বইয়ের বর্ণনায় মানবজাতি তখন মারা যাচ্ছিল আর পৃথিবী অগ্নিকুণ্ডে নিপতিত হচ্ছিল- ‘জ্বলন্ত ধোঁয়া আকাশকে ভরিয়ে তুলছিল, মধ্যাহ্ন উজ্জ্বলতা গোধূলির অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছিল, বাতাস হালকা হয়ে আসছিল এবং মাঝে মাঝে সূর্যের আলো নিস্তেজ ও রক্তবর্ণ ধারণ করছিল। সত্যিই এটি পৃথিবীর শেষদিনের মতো ছিল।’ সেদিনের লোকজনের কাছে পৃথিবীর অনুভ‚তিগুলো ঠিক এমনই ছিল। তারা কেবল এমনটিই মনে করছিল না যে তারা মারা যাচ্ছে, তারা অনুভব করছিল তারা পৃথিবীর শেষদিনের কাছে চলে এসেছে। শহরগুলো ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, লোকজন মূর্ছা রোগীর মতো মোহাচ্ছন্ন হয়ে পালিয়ে যাচ্ছিল। মানুষের মনে এই আতঙ্ক আরো বেড়ে গিয়েছিল এই জন্য যে, পৃথিবীর অন্য প্রান্তের সঙ্গে তাদের সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। আর এটিই আশ্চর্যজনকভাবে লোকজনকে ভীতগ্রস্ত করে তুলেছিল যে-পৃথিবীর বাকি আর সব সম্ভবত আগেই ধ্বংস হয়ে গেছে।
লন্ডনের দ্য স্কার্লেট প্লেগ বইটি কেবল তার নিজের সৃষ্টির মধ্যেই সেরা নয়, এটি আধুনিক বিজ্ঞান ও চিকিৎসা শাস্ত্রের মানুষজনের কাছেও মহামারি অবস্থার সতর্কবার্তা। তার এই বই লেখার মাত্র ছয় বছর পরে ১৯১৮ সালে প্রধানত ইউরোপ আমেরিকায় মহামারি হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে। বলা হয় তৎকালীন পৃথিবীর প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ এই ফ্লুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং এতে প্রায় পাঁচ কোটি লোক মারা গিয়েছিলেন মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে। এই স্প্যানিশ ফ্লু নিয়েও বেশ কয়েকটি ফিকশন রচিত হয়েছে তার মধ্যে বিলম্বে রচিত টমাস মুলারের (১৯৭৪) ‘দ্য লাস্ট টাউন অন আর্থ’ (২০০৬) উল্লেখযোগ্য। কমনওয়েলথ নামে একটি কাল্পনিক শহরকে কেন্দ্র করে এর আখ্যান গড়ে ওঠে। স্প্যানিশ ফ্লু’র মহামারির সময়ে শহরটিকে বাঁচানোর জন্য বহির্বিশ^ থেকে এটি আলাদা করে ফেলা হয়। কিন্তু শহরের প্রতিষ্ঠাতা চার্লস ওয়ার্দির দত্তক পুত্র ফিলিপ ওয়ার্দি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে হারিয়ে একজন সৈন্যকে হঠাৎ করে শহরে নিয়ে আসে। যদিও শুরুতে তাকে সুস্থ মনে হচ্ছিল; কিন্তু ওই সৈন্য শহরে আসার কিছুদিন পরে শহরে লোকজন স্প্যানিশ ফ্লুতে আক্রান্ত হতে শুরু করে। এ থেকে পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস শুরু হয় এবং একে অপরের বিরুদ্ধে যেতে শুরু করে। পোস্ট অ্যাপকিলিপটিক উপন্যাসে আমরা একটি বিষয় লক্ষ করেছি যে, প্রায় সব ঔপন্যাসিকই মানবসমাজে অতিরিক্ত বস্তুবাদিতা এবং নীতিহীন পুঁজির বিকাশকে সমর্থন করেননি। এমনকি তারা মানুষের এ ধরনের লোভ ও লাগামহীন বৈশ্য-বৃত্তিকেই মূলত মহামারির জন্য দায়ী করেছেন। কারণ মানুষ যখন অর্থ ও ভোগবিলাসে মত্ত হয়ে পড়ে, সমাজের অসম বিকাশ এবং প্রকৃতির প্রতি নির্বিচারতার ফলে সবকিছুর মধ্যে একটা ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। তখন এক ধরনের প্রকৃতির প্রতিশোধ হিসেবে মহামারির আবির্ভাব ঘটে। টমাস রবার্ট ম্যালথাসের (১৭৬৬-১৮৩৪) মতে, এটি প্রকৃতির স্থিতি অবস্থার নীতি। জনসংখ্যা বেড়ে গেলে, কিংবা মহাপ্রকৃতির জন্য যা বহনযোগ্য নয় তা আপন নিয়মের এক সময় প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণের পথ বেছে নেয়।
এবার আলবেয়ার ক্যামু’র দ্য প্লেগ নিয়ে কিছু আলোকপাত করা যাক। মাত্র চুয়াল্লিশ বছর বয়সে আলবার্ট ক্যামু সাহিত্যে নোবেল পান। তিনি সাহিত্যে দ্বিতীয় কনিষ্ঠ নোবেল বিজেতা। মাত্র ৫৭ বছর বয়সে তিনি প্যারিসে এক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। মার্কসবাদের প্রতি আস্থাশীলতার পাশাপাশি অস্তিত্ববাদী এই দার্শনিক লেখক তার আউটসাইডারের জন্য যেমন খ্যাতিমান তেমনি মহামারি নিয়ে লেখা ‘দ্য প্লেগ’ বা ‘লা পেস্তে’ উপন্যাসের জন্যও বিশ্বব্যাপী সমান পরিচিত। বিশেষ করে পৃথিবীতে যখন মহামারি নেমে আসে, তখন এই বিপর্যয়ের সামাজিক দার্শনিক ও রাজনৈতিক চরিত্র নিরূপণে এই বইটির প্রাসঙ্গিকতা পাঠককে মুগ্ধ করে থাকে। ক্যামুর উপন্যাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য কেবল জীবন ও জীবিত মানুষের সমাজ কাঠামোর সংঘাত নয়। তার উপন্যাসে অস্তিত্ববাদী দর্শনের আলোকে মৃত্যু জীবনবোধের নতুন মাত্রা তৈরি করে। লা পেস্ত বা দ্য প্লেগ উপন্যাসেও এই মহামারির কেবল মৃত্যুর প্রতিনিধিত্ব করেনি; বরং প্লেগকে প্রতীকী ব্যঞ্জনায় উপস্থাপন করেছেন। ক্যামুর উপন্যাসের কাহিনী সংক্ষেপ এখানে বলে নেয়া ভালো।
ঘটনাস্থল ফরাসি উপনিবেশ আলজেরিয়ার উপক‚লীয় ওরান ওঁরা শহর। হঠাৎ করেই দেখে গেল রাস্তায় বাড়িতে হোটেলের লবিতে শত শত ইঁদুর মারা যাচ্ছে। তখনো কেউ সন্দেহ করেনি- এটি প্লেগের পূর্ব-লক্ষণ হতে পারে। কিন্তু স্থানীয় পত্রিকায় খরবটি ছাপা হওয়ার পরে শহরের বাসিন্দাদের মধ্যে ভয় ছড়িয়ে পড়ে। লোকজনের চাপের মুখে নগর কর্তৃপক্ষ মৃত ইঁদুর পরিষ্কারের কাজ শুরু করলেও তাদের অসতর্ক কর্মকাণ্ডের ফলে প্লেগের প্রাদুর্ভাব আরো ত্বরান্বিত হয়ে পড়ে। এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র বার্নাড রিউ পেশায় ডাক্তার, শহরের একটি ফ্ল্যাট বাড়ির বাসিন্দা। সেখানেও মৃত ইঁদুরের উপস্থিতি লক্ষ করেন তিনি। এরই মধ্যে দেখা গেল তার ভবনের নিরাপত্তারক্ষী কয়েক দিনের জ¦র নিয়ে হঠাৎ মারা গেল। বিষয়টি নিয়ে ডা. রিউ তার সহকর্মী ড. ক্যাস্টেলের সঙ্গে আলাপ করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন- শহরের প্লেগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। তারা বিষয়টি নগর কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে নিয়োজিত তাদের সহকর্মী ডাক্তারকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানালেন যে, তাদের মনে হচ্ছে শহরে প্লেগ দেখা দিয়েছে। কিন্তু এই একটি মাত্র মৃত্যুর ঘটনায় তিনি বিষয়টি পাত্তা দিতে চাননি। সময়মতো সতর্ক ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে; এবং মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে। তখন আর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকে না। এর মধ্যে ডা. রিউয়ের স্ত্রী অসুস্থতাজনিত কারণে অন্য এক শহরের স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ভর্তি হন।
কর্তৃপক্ষের গড়িমসি তথ্য গোপন ও পদক্ষেপ নিতে বিলম্ব করায় পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে যায়। খারাপ পরিস্থিতি ও সরকারি কর্মকর্তাদের অহেতুক আশাব্যঞ্জক ভাষা আসল চিত্র ধোঁয়াশা করে তোলে। তারা বলতে থাকে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার সকল প্রস্তুতি তাদের রয়েছে। অথচ মাত্র তিনদিনের মধ্যে হাসপাতালের বেডগুলো প্লেগ রোগীতে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। একের পর এক মানুষ মরতে থাকে; অন্ত্যেষ্টিয়ার স্থান সংকুলান হয় না। বাড়িগুলো তখন কোয়ারেন্টাইন হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত প্লেগের ওষুধ এলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এক হাসপাতালেই প্রতিদিন ত্রিশ জনের বেশি লোক মারা যাচ্ছিল। এমতাবস্থায় শহর সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়া হয়; এবং মহামারির কথা সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়। শহর পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া হয়। শহরের সকল প্রবেশ ও বহির্গমন পথ বন্ধ করে দেয়া হয়; সড়ক রেলপথসহ যাবতীয় যোগাযোগ বন্ধ করা হয়; এমনকি চিঠিপত্র ডাক যোগাযোগও নিষিদ্ধ করা হয়। কেবল দুএকটি জরুরি টেলিযোগাযোগ খোলা থাকে- শহরের বাইরে আত্মীয়-পরিজনের জরুরি খবরাখবর আদান-প্রদানের জন্য। এই বিচ্ছিন্নতার ফলে কাজকর্ম ব্যাহত হতে থাকে এবং শহরের লোকজনের মধ্যে একাকীত্ব, হতাশার জন্ম দেয়ায় নানা রকম অসুবিধা তৈরি হতে থাকে।
রেমন্ড রেম্বার্ট নামে প্যারিসের এক নামি কাগজের সাংবাদিক অরনের স্থানীয় আরব জনগণের ওপরে সংবাদ সংগ্রহে এসে আটকে পড়ে। প্লেগ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়লে সে প্যারিসে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু পুরো শহর লকডাউন থাকায় তার সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। অবশ্য সে আন্ডার গ্রাউন্ডের হোতাদের ধরেও শহর থেকে পালানোর চেষ্টা করে। এদিকে ফাদার প্যানেলু মহামারির সুযোগকে তার বিশ্বাসের পক্ষে সুযোগ তৈরি করতে চেষ্টা করে যে, এটি ঈশ্বরের পক্ষ থেকে পাপের শাস্তি। মানুষ যতই চেষ্টা করুক, ঈশ্বর না চাইলে এই মহামারি থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো উপায় নেই। শহরের লোকজন অন্য সময়ের চেয়ে তার এই ধর্মীয় উপদেশে বেশি আকৃষ্ট হয়। কোটাড নামের আরেকজন অসাধু ব্যবসায়ী যে অবৈধপথে প্রচুর অর্থ সম্পদের মালিক হয়েছে। বিরূপ পরিস্থিতিতে হতভম্ভ সে আত্মহত্যারও চেষ্টা করে। পুলিশ তাকে তার অপরাধের জন্য গ্রেপ্তার করে। এদিকে ছুটি কাটাতে আসা আটকে পড়া জ্যাঁ তারু, প্রকৌশলী জোশেফ গ্রান্ড এবং ডা. রিউ মিলে মহামারি থেকে লোকজনকে বাঁচানোর জন্য রাতদিন পরিশ্রম করতে থাকে। জ্যাঁ তারু অবশ্য প্রথমে শহর থেকে পালানোর পরিকল্পনা করে। কিন্তু ড. রিউয়ের সঙ্গে আলাপের পর সে তার মত পরিবর্তন করে প্লেগ রোগীদের সেবায় নিয়োজিত হন।
আগস্টের মাঝামাঝি অবস্থা আরো খারাপ হয়ে পড়ে। লোকজন শহর ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করলে তাদের ওপর গুলি চালানো হয়। শহরে কিছুটা লুটপাটেরও ঘটনা শুরু হয়। শেষে পরিস্থিতি সামাল দিতে সামরিক শাসন জারি করা হয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা দেখা দেয় লাশের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া নিয়ে; এত লাশ সৎকারের ব্যবস্থা করতে হিমশিম খেতে হয় কর্তৃপক্ষকে। পরিবারের সদস্যদের কাছে থেকেও দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হয়। মানুষজন শারীরিক ও মানসিকভাবে একদম ভেঙে পড়ে।
সেপ্টেম্বর-অক্টোবরেও শহরে প্লেগের প্রকোপ থেকে যায়। এর মধ্যে ডা. রিউ খবর পায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তার স্ত্রীর অবস্থা ভালো নয়। কিন্তু শহরের মহামারি আক্রান্ত মানুষদের সেবাব্রতকেই তার অন্তর সর্বাধিক সাড়া দেয়। এদিকে কোটাডও নিজেকে প্লেগাক্রান্তদের সেবায় নিজেকে নিযুক্ত করছেন; কারণ তারও মনে হয়েছে- সব লোকের ভাগ্যই যখন একসূত্রে গাথা হয়ে গেছে তখন পালানোর তো কোনো মানে হয় না। কোটাড ও তারু স্থানীয় একটি মঞ্চে যাত্রা দেখতে গিয়ে লক্ষ করেন, নায়ক অভিনয়ের সময়ে প্লেগের লক্ষণ নিয়ে মঞ্চেই ঢলে পড়ছেন। রেম্বার্ট শেষে উৎকোচের বিনিময়ে শহর থেকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেলেও তার মন সায় দেয়নি। মনে হয়েছে, এই অবস্থায় শহর ছেড়ে গেলে সে তার নিজের কাছে ছোট হয়ে যাবে।

এসআর