হোম কোয়ারেন্টাইন

আগের সংবাদ

দেশে ফিরলেই বনানী কবরস্থানে দাফন

পরের সংবাদ

অনিন্দ্য আহসান হাবীব

বাবুল আনোয়ার

প্রকাশিত হয়েছে: জুলাই ১০, ২০২০ , ৭:২০ অপরাহ্ণ

গত শতকের ত্রিশ দশকে বাংলা কবিতার উল্লেখযোগ্য পটপরিবর্তন ঘটে। এর পূর্ববর্তী সময় ধরে রবীন্দ্রনাথের অতুলনীয় প্রতিভার স্পর্শে বাংলা সাহিত্য আপন মহিমায় বিকশিত ও প্রসারিত হয়। রবি ঠাকুরের বলয় থেকে ত্রিশের পঞ্চ পাণ্ডব বলে খ্যাত কবিবৃন্দ কবিতায় চতুর্থ যুগের দ্বার উন্মোচিত করেন। অত্যন্ত সফলতার সাথে। বাংলা কবিতা এক নতুন অবয়বে যাত্রা শুরু হয়। আর কবিতার এ পথে ধরে যারা নতুন নির্মিতিকে সফলভাবে ধারণ করতে সক্ষম হন আহসান হাবীব তাদের একজন। নিঃসন্দেহে বলা যায় আহসান হাবীব ত্রিশ উত্তর বাংলা কবিতার এক উজ্জ্বল নাম। চল্লিশ দশকের শুরুতে বাংলা কবিতার রুপান্তরের ধারাকে লালন করে অগ্রসর ভ‚মিকা পালনকারী কবিদের মধ্যে শীর্ষতম। তিনি ত্রিশের কবিদের নিরীক্ষিত ধারাকে সমুন্নত রেখে বাংলা কবিতায় নিজস্ব ভুবন নির্মাণে সফল হয়েছেন। নিজস্ব বলয়ে তিনি ছিলেন অন্তর্মুখী, সৃষ্টির জন্য ব্যাকুল নিভৃতচারী একজন। নিজ স্বভাবের মতোই চুপচাপ।
কবিতার ক্ষেত্রে তার নিভৃত সাধনা তাকে অভিষিক্ত করেছে সফল কবির মহিমায়। কবিতার শব্দ প্রয়োগ, উপমা, উৎপ্রেক্ষা, ছন্দ, বাক্য গঠনে তিনি যেমন ছিলেন পরিশীলিত, তেমনি সচেতনও। সমকালীন সমাজ ও জীবনের বিরুদ্ধবোধ তাকে আহত করেছে, পীড়িত করেছে। তার শুভবোধকে করেছে বিপন্ন একজন সচেতন কবি হিসেবে। আর এসবের প্রকাশ ঘটেছে তার কবিতায় শব্দ ও শিল্পের বিন্যাসে। তিনি এ ব্যাপারে ছিলেন অনেকটা আপসহীন, কবিতার সার্বভৌমত্বে তার আস্থা ছিল প্রবল। তার কবিতায় চল্লিশের কাব্য চেতনার সুর যেমন নানাভাবে ধ্বনিত, তেমনি দেশকালের চেতনায় তার কবি মানস সমানভাবে প্লাবিত। আর তার প্রকাশ ঘটে তার কবিতায়। পরিচ্ছন্ন, পরিমিত বোধ ও রুচির স্নিগ্ধতা তার কবিতাকে করেছে লাবণ্যমণ্ডিত। এক ধরনের অভিমান, নিঃসঙ্গবোধ, অন্তর্লীণ ক্ষরণ কবিতা ও জীবনে তিনি নিঃশব্দে লালন করেছেন। তার কবিতায় মানবিকতা ও রোমান্টিকতার সমন্বয় ঘটেছে এক আশ্চর্য কুশলতায়। এটি আহসান হাবীবের কবিতার এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট লেখক, গবেষক আহমদ রফিক বলেন, রোমান্টিকতা ও সমাজচেতনার সংমিশ্রণ সত্যই যদি দেশকালকে ইতিবাচক ফলপ্রসূ চরিত্রে ধারণ করতে পারে এবং সচেতন রোমান্টিকতা নামক একটি স্বাতন্ত্র্য কাব্য চরিত্রের জন্ম দিতে পারে, তাহলে আহসান হাবীবের প্রথম কবিতার বই রাত্রিশেষ প্রথম হয়েও সেই অর্থে সবিশেষ। শুধুমাত্র বইটির নামেই সমাজসচেতনতার প্রকাশ নয়, স্বদেশের কাছে ঋণ স্বীকার করে তবেই রাত্রি শেষ হবার স্বাপ্নিকতায় কবিতাগুলোর যাত্রা প্রহর থেকে সচেতন পদক্ষেপ গ্রহণের গুণ অর্জন করেছে। যুগ চেতনার সুস্পষ্ট আভাস এদের অঙ্গে, এদের চরিত্রে।
(আহসান হাবীব স্মারক গ্রন্থ, পৃষ্ঠা -১১৫)
আহসান হাবীব কবি হিসেবে যেমন মহৎ, তেমনি সম্পাদক হিসেবেও অনন্য। এর সাথে যোগ হয়েছিল তার ব্যক্তিগত জীবনের অরূপ শুদ্ধাচার। তিনি সেই সব বিরল কবিদের একজন যিনি যাপিত জীবনে সকল মিথ্যাচার, কপটতা থেকে নিজকে সরিয়ে রেখেছিলেন। প্রচার, খ্যাতি, প্রতিষ্ঠা, অর্থ কোনো কিছুই তাকে মোহগ্রস্ত করতে পারেনি। কবি হিসেবে নিজের লালিত নৈতিকতা, সৌন্দর্যবোধ, স্বনির্মিত আলোক ভুবনের তিনি ছিলেন একক সম্রাট। প্রচুর লেখক, কবির পথ নির্মাণ করে দিয়েছেন তিনি তার ঋদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি ও মননের গভীর উৎকর্ষতায়। এ প্রসঙ্গে কবি শামসুর রাহমান লিখেছেন ‘যে লেখকের মধ্যে তিনি শৈল্পিক গুণাবলীর পরিচয় পেয়েছেন তার লেখা প্রকাশ করেছেন নির্দ্বিধায়, আনন্দ চিত্তে, আর যাকে মনে হয়েছে নির্গুণ তাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন অকুণ্ঠ নিষ্পৃহতায়।’ (আহসান হাবীব স্মারক গ্রন্থ, পৃষ্ঠা -৫২)
কবি আহসান হাবীবের সৃষ্টিশীলতার ভাণ্ডার খুব কম নয়। ২৫টির মতো গ্রন্থ তিনি রচনা করেছেন। এর মধ্যে কবিতা, উপন্যাস, শিশুতোষ রচনা, অনুবাদ রয়েছে। রাত্রিশেষ, ছায়া হরিণ, সারা দুপুর, আশায় বসতি, মেঘ বলে চৈত্রে যাবো, দু’হাতে দুই আদিম পাথর, প্রেমের কবিতা, বিদীর্ণ দর্পণে মুখ, কাব্যলোক তার কবিতার বই। অন্যান্যের মধ্যে, অরণ্য নীলিমা, রাণীখালের সাঁকো (উপন্যাস) জোছনা রাতের গল্প, বিদেশের সেরা গল্প, রত্নদ্বীপ, বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর, ছুটির দিন দুপুরে, বোকা বোকাই (শিশু সাহিত্য) রাজা বাদশা হাজার মানুষ (ইতিহাস) খসড়া (অনূদিত কবিতা) ইত্যাদি।
পেশা হিসেবে মূলত সাংবাদিকতাই ছিল প্রধান। বাংলা সাহিত্যে অনবদ্য অবদানের জন্য তিনি বাংলা একাডেমী, একুশের পদকসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত হয়েছেন।
কবি আহসান হাবীব আমাদের মাঝে নেই। ১৯৮৫ সালের ১০ জুলাই তিনি পাড়ি জমিয়েছেন মহাকালের পথে। বড়বেশি আপন ছিলেন তিনি বাংলা কবিতার, এদেশের কবি, সাহিত্যিকদের কাছে ছিলেন আলোর অগ্রজ নির্দেশক। তার কবিতার ভাষায় বারবার মনে পড়ে সেই সব অমিয় শব্দমালা- ‘আমি কোন আগন্তুক নই/
আমি ছিলাম এখানে, /আমি স্বাপ্নিক নিয়মে
এখানে থাকি আর /
এখানে থাকার নাম সর্বত্রই থাকা সারা দেশে। / (আমি কোনো আগন্তক নই, দু’হাতে দুই আদিম পাথর)
মাথা ভর্তি সেই ধবধবে চুলের শান্ত মুখাবয়বের কবি আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না। কিন্তু তার সৃষ্টির মধ্য দিয়ে আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে তিনি স্মরণীয়। কবিতার ভুবনে পরিশীলিত ও পরিমিত বোধের এক অনন্য কবি আহসান হাবীব।

এসআর