বছরে ৬ লাখ মানুষকে সাপ দংশন করে

আগের সংবাদ

অ্যান্টিবডি কিট থেকে পাটকল

পরের সংবাদ

প্রেক্ষিত : বাংলাদেশ বিমানবাহিনী ঘাঁটি বাশার

করোনা জয়ের অভাবনীয় সাফল্য

মাহমুদ মেহেদী হুসেইন:

প্রকাশিত হয়েছে: জুলাই ৯, ২০২০ , ৮:১৬ অপরাহ্ণ

করোনার ভয়াবহতায় হতবিহ্বল না হয়ে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ও বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী স্বল্প থেকে মাঝারি লক্ষণযুক্ত করোনা আক্রান্ত রোগীদের অস্থায়ী হাসপাতাল অথবা ঘরে রেখে চিকিৎসা করানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী ঘাঁটি বাশারের অস্থায়ী হাসপাতালটি হতে পারে একটি রোল মডেল।

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে এক অদৃশ্য আতঙ্কের নাম ‘করোনা ভাইরাস’, যার পোশাকি নাম কোভিড-১৯। গত ডিসেম্বর ২০১৯ থেকে এই ভাইরাসটি চীনের উহান শহরে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে তা অতিদ্রুত সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ইউরোপ, আমেরিকায় এ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে প্রতিদিন অসংখ্য প্রাণহানিসহ দৈনন্দিন জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে মার্চের প্রথম সপ্তাহে সর্বপ্রথম করোনা পজিটিভ রোগী শনাক্ত হওয়ার পর তা ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়তে থাকে।

এমতাবস্থায় বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং দূরদর্শী কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তন্মধ্যে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করা, গণপরিবহন বন্ধ করা ও সাধারণ ছুটি প্রদান উল্লেখযোগ্য। এরই ধারাবাহিকতায় বিমানবাহিনী প্রধানের নির্দেশে বিমানবাহিনী ঘাঁটি বাশার করোনা ভাইরাস সংক্রমণ রোধে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করে। অত্যন্ত সংক্রমণশীল ও ভয়াবহ এ রোগের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতি মোকাবিলায় কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও রোগ সংক্রমণ রোধে এয়ার অধিনায়কের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এ ঘাঁটি সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। করোনা সংক্রমণরোধে বাংলাদেশ সরকার এবং বিমান সদরের বিভিন্ন নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঘাঁটির সদস্যদের জন্য গত ২০ মার্চ গঠন করা হয় ‘করোনা স্ক্রিনিং সেন্টার’ ও ‘করোনা মনিটরিং সেল’। ঘাঁটির বাইরে থেকে আগত, ভেতরে অবস্থানরত, ছুটি অথবা বিদেশ ফেরত বিমানবাহিনীর যে কোনো সদস্যকে প্রথমেই ‘করোনা স্ক্রিনিং সেন্টার’ কর্তৃক প্রাথমিক নিরীক্ষণকরত পরিস্থিতি ও উপসর্গ বিবেচনায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং কোয়ারেন্টাইন অথবা আইসোলেশনে থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়ে থাকে। অতঃপর ‘করোনা মনিটরিং সেল’-এর তত্ত্বাবধানে তাদের পূর্বঘোষিত কোয়ারেন্টাইন অথবা আইসোলেশন সেন্টারে স্থানান্তরকরত খাদ্য, চিকিৎসা ও বিনোদনসহ সার্বিক দেখভাল করা হয়।

প্রয়োজনবোধে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে কোভিড-১৯ পরীক্ষার জন্য সিএমএইচে প্রেরণ করা হয়। উল্লেখ্য, রোগের উপসর্গ অনুযায়ী সন্দেহযুক্ত রোগীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের কোয়ারেন্টাইন অথবা আইসোলেশন সেন্টারের ব্যবস্থা করা হলেও শুরুতে করোনা আক্রান্ত রোগীদের জন্য কোনো ধরনের ব্যবস্থা ছিল না। এমতাবস্থায় করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের সুচিকিৎসার জন্য সিএমএইচে প্রেরণ করা হতো। কিন্তু দিন দিন করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এ ঘাঁটি অল্প কিছুদিনের মধ্যেই একটি অস্থায়ী হাসপাতাল স্থাপন করে এবং মৃদু লক্ষণযুক্ত (পজিটিভ) রোগীদের এ হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেয়া শুরু করে। এ পর্যন্ত প্রায় অর্ধশত করোনা আক্রান্ত রোগী, দেড় শতাধিক সদস্য আইসোলেশন এবং সাত শতাধিক সদস্য কোয়ারেন্টাইন কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে।

অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ১২৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি কন্টিনজেন্ট সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক (ঈঅজ) এ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের জন্য মনোনীত হলে গত ১০ মে সিএমএইচে তাদের কোভিড-১৯ টেস্ট করানো হয়। এদের মধ্যে মোট ৩৯ জনের করোনা পজিটিভ নিশ্চিত হলে তাদের মধ্য থেকে স্বল্প থেকে মাঝারি লক্ষণযুক্ত মোট ২৯ জনকে বিমানবাহিনী প্রধানের নির্দেশনায় সিএমএইচে না পাঠিয়ে, ঘাঁটির নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নির্মিত অস্থায়ী হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে সামরিক চিকিৎসা মহাপরিদপ্তরের প্রটোকল অনুযায়ী ওই ঘাঁটির চিকিৎসকরা আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা প্রদান শুরু করেন। পাশাপাশি ঘাঁটি কর্তৃক আক্রান্ত ব্যক্তিদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিও জন্য নিম্নোক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় :

ক. প্রতিদিন ২ ঘণ্টা পরপর গরম পানি দিয়ে গড়গড়া করা এবং গরম পানির বাষ্প নেয়া।
খ. প্রতিদিন সকাল ১০-১১টার মধ্যে খালি গায়ে রোদে আধা ঘণ্টা হাঁটাহাঁটি করা।
গ. নিয়মিতভাবে পুষ্টিকর খাবার যেমন- মাংস, ডিম, দুধ ইত্যাদি গ্রহণ করা।
ঘ. প্রতিবেলায় খাবারের সঙ্গে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফলমূল গ্রহণ করা।
ঙ. মধু, কালোজিরা, আদা, গরম চা ইত্যাদি নিয়মিতভাবে গ্রহণ করা।

অস্থায়ী হাসপাতালে রোগীদের সার্বিক পরিস্থিতি তদারকিসহ নিয়মিত চিকিৎসাসেবার বাইরে তাদের মনোবল বৃদ্ধিকল্পে টেলিভিশন, ইন্টারনেট এবং খেলাধুলার জন্য বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জামাদির ব্যবস্থা করা হয়। রোগীদের ব্যবহৃত ডিসপোজেবল বাসন-কোসন নির্দিষ্ট স্থানে পুড়িয়ে ফেলা হয়, যাতে করে কুকুর, বানর বা অন্য কোনো প্রাণীর মাধ্যমে এ ভাইরাসের সংক্রমণ না হয়। এরই ফলে আলোচ্য ২৯ জনের মধ্যে ২৮ জনই অতি দ্রুত পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠে এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণের জন্য পুনর্নির্বাচিত হয়ে গত ২৯ মে তারিখে মধ্য আফ্রিকায় গমন করেন। বিশ্ব শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখার জন্য জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে এসব জনবল সময়মতো প্রেরণ করা ছিল বিমানবাহিনীর জন্য একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ। আর এ চ্যালেঞ্জ থেকে উত্তরণের জন্য বিমানবাহিনী প্রধানের সময়োপযোগী ও কার্যকরী নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে বা বিবাঘাঁটি বাশার যেভাবে সফলকাম হয়েছে তা বিমানবাহিনীর ভাবমূর্তি রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রশংসার দাবি রাখে।

এমতাবস্থায় দেশবাসীর কাছে এ বার্তা পৌঁছে দেয়া যেতে পারে যে তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের হাসপাতালে না পাঠিয়ে, যথোপযুক্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ও চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তোলা সম্ভব। আর এতে করে বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের চিকিৎসাসেবা সহজতর হবে। অতএব করোনার ভয়াবহতায় হতবিহ্বল না হয়ে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ও বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী স্বল্প থেকে মাঝারি লক্ষণযুক্ত করোনা আক্রান্ত রোগীদের অস্থায়ী হাসপাতাল অথবা ঘরে রেখে চিকিৎসা করানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী ঘাঁটি বাশারের অস্থায়ী হাসপাতালটি হতে পারে একটি রোল মডেল।

গ্রুপ ক্যাপ্টেন মাহমুদ মেহেদী হুসেইন : পিএসসি
অধিনায়ক, প্রশাসনিক শাখা, বিমানবাহিনী ঘাঁটি বাশার।

এমআই