চীনে করোনার পর বিউবনিক প্লেগ আতঙ্ক

আগের সংবাদ

কন্ডিশনিং কোচের চুক্তির মেয়াদ বাড়াল বিসিবি

পরের সংবাদ

পৃথিবীর কোনো বাতাসই সুবাতাস নয়

ফারুক যোশী:

প্রকাশিত হয়েছে: জুলাই ৭, ২০২০ , ১০:০৪ অপরাহ্ণ

নিজেকে সুরক্ষা দেয়াটাই এখন দেশ-জাতি তথা পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখার একমাত্র মাধ্যম। কারণ ভ্যাকসিন আবিষ্কার হলেও আমাদের অপেক্ষায় থাকতেই হবে। আর অপেক্ষার সময়ে আমাদের বেঁচে থাকতেও হবে। বেঁচে থাকতে হলে এখন শুধু চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখার কোনো সুযোগ নেই।

বিশ্বে করোনা ভাইরাস মহামারির দ্বিতীয় ঢেউ এখনো শুরু হয়নি যদিও, কিন্তু ব্রিটেনের লেস্টার শহরে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ লেগেছে। সেজন্য নতুন করে লকডাউন দেয়া হয়েছে শুধু এই শহরে। এছাড়া সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে ব্রিটেনের আরো কয়েকটা শহর। তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশ আছে, যেখানে মৃত্যু এবং সংক্রমণ হয়তো জানাই যাচ্ছে না। কারণ কোনো দেশে যদি টেস্ট হয় ১ লাখ এবং আক্রান্ত হয় ৮শ, সেদেশে সংক্রমণের হিসাবটা ১০ শতাংশেরও কম। অন্যদিকে কোনো দেশে যখন ১৫ হাজার টেস্টে ৩ হাজার আক্রান্ত হন, সেখানে আক্রান্তের সংখ্যা আসছে ৩০ শতাংশের মতো। কিন্তু এই দেশগুলোতে ১ লাখ টেস্ট হলে ডেইলি আক্রান্তের সংখ্যা আসত ৩০ হাজারের কাছাকাছি। সে হিসাবে এসব দেশে প্রতিদিন করোনায় মৃত্যুর সংখ্যাটাও থেকে যাচ্ছে অনুচ্চারিত। কারণ সেসব দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মৃত্যু-পরবর্তী সময়ে পোস্টমর্টেম কিংবা পূর্ববর্তী রোগ লিপিবদ্ধ করাকে খুব একটা গুরুত্বের মাঝে আনা হয় না। অর্থাৎ পৃথিবীর অগণিত করোনা আক্রান্ত মানুষ এমনকি এ রোগে মৃত মানুষকেও আমরা শনাক্ত করতে পারছি না। চীন, তাইওয়ান, ভিয়েতনামের মতো কিছু দেশ মহামারি নিয়ন্ত্রণে, লাতিন আমেরিকা, দক্ষিণ এশিয়ায় ভাইরাসের তাণ্ডব চলছে; যুক্তরাষ্ট্রের মতো আরো কিছু দেশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না; আফ্রিকার দেশগুলো রয়েছে মহামারির প্রাথমিক পর্যায়ে; ইউরোপ আছে এগুলোর মাঝামাঝি কোনো অবস্থানে।

বিশ্বটা এরকমই এখন। আতঙ্ক কি কাটছে? মৃত্যু কি কমবে? সংক্রমণ কি রোধ করা যাবে? সর্বোপরি এ রোগের ভ্যাকসিন কি অচীরেই পেয়ে যাব? এরকম অনেক প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে এখন দুনিয়াজুড়ে। কত লাখ-কোটিবার এই করোনা শব্দটি উচ্চারিত হচ্ছে মানুষের মুখে মুখে তার কি কোনো শেষ আছে?

সত্যিটা হলো, আরো ভয়াবহ দিন যেন সামনে আসছে। ব্রাজিলের দিকে যদি তাকাই, সেখানে একদিনেই আক্রান্তের সংখ্যা ৩৮ হাজারের বেশি। মেক্সিকোতে ৫ জুলাই পর্যন্ত মৃত্যু ৩০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশে ৫ জুলাই মাত্র ১৩ হাজার ৯৬৪ জন টেস্ট করাতে পেরেছেন, অথচ ওইদিন দেখা গেছে আক্রান্তের সংখ্যা ২ হাজার ৭৩৮ জন। ভারতে প্রতি ঘণ্টায় ১ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। দেশটিতে ৫ জুলাই ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছে আরো ৬১৩ জন মানুষ। এভাবেই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে বাড়ছে মৃত্যু।

শুধু তাই নয়, ব্রিটেনও আছে ঝুঁকির মাঝে। দেশটিতে লকডাউন অনেকাংশেই শিথিল করা হয়েছে। গত ৪ জুলাই থেকে পাব রেস্টুরেন্ট, হেয়ারড্রেসার, দোকানপাট খুলে দেয়ার নির্দেশনা এসেছে। উইক এন্ড থাকায় সারা ব্রিটেনেই মানুষের ঢল নেমেছে। দীর্ঘ চার মাসের প্রতীক্ষার পর যেন বাঁধ ভেঙেছে। সোসিয়েল ডিসটেন্সিং ২ মিটারের কঠোর নির্দেশনার জায়গায় এক মিটারের অধিক থাকার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। কিন্তু পানশালাগুলোতে সে নির্দেশনা কি মানতে চাইবে মাতাল মানুষগুলো। মানছেও না তারা। গিজ গিজ করছে পানশালাগুলো। একই টেবিলে গোল হয়ে বসে আছে এলকোহল পিয়াসী মানুষগুলো। আগের মতোই চলছে, পাশাপাশি বসে কিংবা দাঁড়িয়ে দিব্যি গল্প কিংবা মাতলামো। এ নিয়মনীতি করাই হয়েছে যেন নিয়ম না মানার জন্য।

স্বাস্থ্য বিভাগের অনেকের আপত্তি ছিল এ শিথিলতায়, তবুও বরিস জনসন তার কোষাগার শূন্য হতে দিতে চাইছেন না। কারণ শত শত বিলিয়ন পাউন্ডের অর্থনৈতিক প্রণোদনার চাপ আর নিতে রাজি নয় দেশটি। অর্থনীতিকে প্রবহমান রাখতেই দেশটিতে শুরু হচ্ছে স্বাভাবিক জীবন। সামাজিক দূরত্ব না মানা হলে কিংবা নিজেকে সুরক্ষা না দিলে ব্রিটেনে মৃত্যু আরো ভয়াবহ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইন্ডিপেন্ডেন্স, দ্য গার্ডিয়ান, দ্য সানডে টাইমস, দ্য এক্সপ্রেস প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ নিউজপেপারগুলো খবর দিয়েছে, এভাবে চলতে থাকলে আরো ৩০ হাজার মানুষ মারা যাবে শুধু এই রোগে। যদিও এখন ব্রিটেনের হাসপাতালগুলো ফাঁকা। করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা দিনপ্রতি গড়ে ১শ’র নিচে নেমে এসেছে। তবে এমনকি সাধারণ মানুষও খুব একটা হাসপাতালে যাচ্ছে না। জনগণকে আতঙ্কমুক্ত রাখতে এনএইচএস (জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা) থেকে ঘোষণা আসছে, সাধারণ মানুষ যেন হাসপাতালমুখী হয়।

অক্সফোর্ড নতুন ভ্যাকসিনের খবর দিলেও ব্যাপকসংখ্যক আক্রান্তদের এখনো এ পরীক্ষামূলক টিকাটাও প্রয়োগ করা যাচ্ছে না। অনিশ্চিত হয়ে আছে ভ্যাকসিন বাজারে আসার বিষয়টা। সারা পৃথিবীতেই এ নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। কিন্তু আঁধার যেন কাটছে না। ব্যাপকহারে করোনা ভ্যাকসিন ব্যবহার এখনো অনেক দূরে, তবে ইতোমধ্যে প্রাথমিক থেরাপিগুলো পাওয়া যাচ্ছে। যদিও সুচিকিৎসার কারণেই ব্রিটেনে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি রোগীর সংখ্যা এখন ১ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি নামের বেসরকারি গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় এক গবেষণায় দেখিয়েছে, উপযুক্ত চিকিৎসা পদ্ধতি না এলে ২০২১ সালের মাঝামাঝি করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াতে পারে ২০-৬০ কোটিতে। এ সময়ের মধ্যে মারা যেতে পারে ১৪-৩৭ লাখ মানুষ। ওই সময়ও বিশ্বের ৯০ শতাংশ মানুষ প্রাণঘাতী এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে।

করোনা ভাইরাস কতটা ছড়াবে তা নির্ভর করে মূলত সামাজিক নিয়ন্ত্রণের ওপর। ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করা যায় তিনটি ধাপে- টেস্টিং, ট্রেসিং (শনাক্ত) ও আইসোলেশন। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বারবার তার আলোচনায় বলছেন। এগুলো যদি ব্যর্থ হয় তবে আবারো এলাকাভিত্তিক লকডাউন হতেই পারে।

কিন্তু তারপরও এমনকি প্রথম বিশ্বের দেশগুলোও তো হিমশিম খাচ্ছে। মাসের পর মাস লকডাউনে থাকলে জনজীবন স্থবির হয়ে যাবেই। সংকট দেখা দেবে সব ক্ষেত্রেই। উৎপাদনও স্লথ হয়ে যাবে, আর সেজন্যই বিগত দিনগুলোর বিপজ্জনক দেশ যেমন ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স প্রভৃতি দেশগুলোও এখন খুলে দেয়া হয়েছে। আকাশপথে উড়ছে উড়োজাহাজ, পর্যটকদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে, বাণিজ্য বিস্তৃত হচ্ছে। যদিও অর্থনৈতিক স্বাভাবিকত্ব ফিরে আসবে না এখনই। বেকারত্ব সহসাই ঘুচবে না। কিন্তু তবুও জীবনের প্রয়োজনে এখন ঝুঁকিটাকেই সাথী করে আগাতে হচ্ছে। শুধু ইউরোপ-ব্রিটেন নয়, পৃথিবীর দেশে দেশে এর বিকল্পও নেই আপাতত। যেহেতু পৃথিবীর কোনো বাতাসই এ করোনাকালে সুবাতাস নয়, অতএব টাকাওয়ালাদেরও পালাবার জায়গা রুদ্ধ।

আর তাই ইউরোপ-আমেরিকার মানুষগুলো পালাতে চাচ্ছে না। নিজের দেশেই নিজেকে প্রতিরোধী করার চেষ্টাই আছে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো থেকে কেউ যদি নিজেকে রক্ষা করতে কানাডা-ব্রিটেন-আমেরিকা কিংবা মালয়েশিয়ায় পালাতে চায়, তবে হোঁচট খাবে। নেতা কিংবা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের এ সময়ে বিদেশ ভ্রমণ পালিয়ে বেড়ানোর নামান্তর, প্রকারান্তরে জাতির সঙ্গে প্রতারণা। ব্রিটেনে করোনা আক্রান্ত সাধারণ নাগরিকের সঙ্গে হাসপাতালে থাকতে হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর সংকটজন করোনা আক্রান্তকালেও এবং তিনি ফিরেও এসেছেন ওই সাধারণ মানুষেরই মতো। এ করোনা দেখিয়েছে, নিজেকে সুরক্ষা দিতে হলে সমাজকেই বাঁচাতে হবে। নিরাপত্তা দিতে হবে গোটা জাতিকে। সমাজ কিংবা জাতিকে সুরক্ষা দেয়ার উদাহরণটা দেখিয়েছে ভিয়েতনাম এমনকি ভারতের কেরালা। তারা এ জায়গাটাতে সবচেয়ে সফল। ভিআইপিদের বিশেষ হাসপাতাল কনসেপ্ট করোনার কাছে বেমানান।তাই ব্রিটেন এই ব্যক্তিগত সচেতনতার ওপরই ছেড়ে দিয়েছে তার দেশের নাগরিকদের। নিজেকে সুরক্ষা দেয়াটাই এখন দেশ-জাতি তথা পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখার একমাত্র মাধ্যম। কারণ ভ্যাকসিন আবিষ্কার হলেও আমাদের অপেক্ষায় থাকতেই হবে। আর অপেক্ষার সময়ে আমাদের বেঁচে থাকতেও হবে। বেঁচে থাকতে হলে এখন শুধু চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখার কোনো সুযোগ নেই।

ফারুক যোশী : কলাম লেখক।
[email protected]

এমআই