ইতালিতে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া সব ফ্লাইট নিষিদ্ধ

আগের সংবাদ

সোনা পাচারের হোতা মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরে

পরের সংবাদ

আকাশ বাড়িয়ে দাও

ঝর্ণা মনি

প্রকাশিত হয়েছে: জুলাই ৭, ২০২০ , ৯:০৫ অপরাহ্ণ

‘দেখ আলোয় আলো আকাশ
দেখ আকাশ তারায় ভরা
দেখ যাওয়ার পথের পাশে
ছোটে হাওয়া পাগল পারা।
এত আনন্দ আয়োজন
সবই বৃথা আমায় ছাড়া।
ভরে থাকুক আমার মুঠো
দুই চোখে থাকুক ধারা
এল সময় রাজার মত
হল কাজের হিসেব সারা।’

জীর্ণপাতা ঝরার বেলায় ঠিক কতখানি দহন হয়, আমার জানার সৌভাগ্য হয়নি। কিন্তু প্রিয় স্বজনের শূন্যতায় বুকের পাঁজর ভাঙার কষ্ট আমি বুঝি। হৃৎপিণ্ড জানান দেয়, কতটা রক্তক্ষরণ হয়! যিনি মহাকালে হারিয়ে যান, তিনি হয়তো জানতে পারেন না কতটা দীর্ঘ হয় পেছনে ফেলে রেখে যাওয়া ছায়া। শুধু ছায়ারা জানে হিম হয়ে যাওয়া নীল কষ্ট!

আখতারুজ্জামান লাবলুর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী ৮ জুলাই

মৃত্যুসম্পর্কে আপনার ফিলোসফি ছিল অন্যদের থেকে ভিন্ন। প্রায়ই এ নিয়ে আমার সঙ্গে কথা হতো আপনার। সুনসান সন্ধ্যায় হাতে তেমন কোনো কাজ না থাকলে বোর্ড রুমে পাশাপাশি চেয়ারে বসে কত গল্প করতাম দুই ভাই বোন। সহকর্মী থেকে নিজ যোগ্যতায় কখন যে ‘বড়ভাই’ হয়ে উঠলেন তা ভুলে গেলাম আমরা।

মৃত্যু নিয়ে বলতেন, ‘বেঁচে থাকা মানেই নিঃশ্বাস। আর মৃত্যু মানেই মহাকালের সঙ্গে শেষ নিঃশ্বাসটুকুর মিশে যাওয়া। এরপর আর কিছু নেই। বাকি সবই মানুষের কল্পনা। পরকাল বলতে কিছুই নেই। মানুষ তার ভালোমন্দ কৃতকর্মের সব ফল পৃথিবীতেই পাবে।’

ভোরের কাগজ কার্যালয়ে সস্ত্রীক আক্তারুজ্জামান লাবলু

মৃত্যু নিয়ে এমন চমৎকার ভাবনা ছিল আপনার। মৃত্যুর মতো জীবনটাও ছিল সহজ-সরল। কঠিন উপপাদ্যের মতো নয়, বরং জীবনকে আপনি বেছে নিয়েছিলেন পাটিগণিতের সরল অঙ্কের মতোই। ঝুট-ঝামেলাকে তুড়ি মেড়ে উড়িয়ে দিয়ে চঞ্চল ঝরনার মতো অনুপম ছন্দে ছুটে চলা ছিল আপনার স্বভাব। উচ্ছল-হাসি-খুশি-আমুদে জীবনে আতিশয্য ছিল না, তবে খামতি ছিল না সুখের। ঘৃণা করতেন অসততাকে। তাই ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের (ক্র্যাব) মতো সংগঠনের ছয়বারের সভাপতি হয়েও কোনো লোভ আপনাকে স্পর্শ করতে পারেনি।

ভোরের কাগজের প্রধান প্রতিবেদক ছিলেন। ভালো স্পোর্টসম্যান ছিলেন। ক্রিকেট, ফুটবলে ছিলেন ‘ম্যান অব দ্যা ম্যাচ।’ দাবা, ব্যাডমিন্টনে ছিলেন চ্যাম্পিয়ন। গাড়ি বাড়ির প্রতি কোনো লোভ ছিল না। এসব তৈরির মতো টাকাপয়সাও ছিল না আপনার। তাই রিকশা আর সহকর্মীদের বাইকই ছিল নিত্যসঙ্গী। মন্ত্রী, এমপি, পুলিশপ্রধান, র‌্যাবপ্রধান- কে ছিলেন না আপনার প্রিয় বন্ধুদের দীর্ঘ তালিকায়!

পরিবারের সদস্যদের অনেকেই সমাজের এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আসীন। স্ট্র্যান্ডার্ন্ড ব্যাংকের মালিক, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি, সাবেক তথ্যমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ এবং দায়িত্বশীল পদে থাকা আপনার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কোনোদিন আপনাকে অহংকার করতে দেখেনি কেউ। বরং নীরবে নিভৃতে কাজ করে গেছেন অন্যের জন্য।

কার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, কাকে পুলিশে ধরেছে মুক্ত করতে হবে, কার গাড়ি পুলিশ আটক করেছে ছাড়াতে হবে, কার মেয়ের বিয়ের জন্য গোপনে টাকা দিতে হবে, কার পারিবারিক ঝামেলা মেটাতে হবে, কার বাচ্চাকে শহরের নামি স্কুলে ভর্তি করাতে হবে, কার চিকিৎসার খরচ দিতে হবে- এসব নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন বেশি।

আপনার মৃত্যুর এক মাস পর অফিসের ড্রয়ার থেকে আপনার কাগজপত্র নেয়ার সময় অনেকগুলো এক হাজার টাকার নোট (২০ হাজারেরও বেশি) পেয়েছিলাম আমরা। ভাবি অবাক হয়নি। উদাস চোখে বললো, ‘কার কখন কী কাজে লাগবে, সেজন্য তোমার ভাইয়া কিছু টাকা ড্রয়ারে রেখে দিতো। আমি এসব জানতাম।’ চৈত্র্যের কাঠফাটা পোড়া চোখে অশ্রু আসেনি ভাইয়া! হৃদয়ের রক্তক্ষরণ টের পেয়েছিলেন কি?

২৬শে মার্চ, ২০১৯। কাজের এক ফাঁকে সহকর্মীদের স্বাধীনতা দিবসের ফটোসেশন। কে জানতো প্রিয় কর্মস্থলে এটিই ছিল আক্তারুজ্জামান লাবলুর শেষ ফটোসেশন!

সহকর্মী থেকে আত্মার অংশ হয়ে ওঠেছিলেন আপনি। কোনো এক ভ্রাতৃদ্বিতীয়ায় রাখি পরিয়েছিলাম হাতে। সোনালিপাড়ের বেগুনি কাতান শাড়ি দিয়েছিলেন বোনকে। দুই বছর আগে প্রথম যেদিন আমাদের মাথায় আকাশ ভাঙার খবর আসে আপনার লিভার সিরোসিস, সেদিন বেগুনি কাতান শাড়িটি জড়িয়ে সারারাত কেঁদেছিলাম। কান্না থামাতে এসে নিজেই থমকে যায় মা। পরে এটি শুনে আমাকে নিয়ে ব্যাপক হাসাহাসি করে বলেছিলেন, ‘আমার সাহসী বোনটা, যে কি না জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য একাই দৌড়ে বেড়ায় ভারতের আনাচে কানাচে, সে এমন ছিচকাঁদুনে হলো কবে থেকে?’ আমি কাঁদতে চাইনি ভাইয়া। কিন্তু হৃদয়ে তো ফারাক্কা বাঁধ নেই!

ধর্মের চেয়ে মানবতাই বড় ছিল আপনার কাছে। কথাপ্রসঙ্গে একাধিকবার বলেছেন আপনি। আমিও তাই বিশ্বাস করি। রাজস্থান ট্যুরের একদিন আজমির শরীফে বেড়াতে গিয়ে মায়ের নির্দেশে আপনার সুস্থতা কামনায় গিলাপ, গোলাপ ফুল, সুতা দিয়েছিলাম মাজারে। হাতে বাঁধা বোনের ওই সুতাটুকু সবাইকে দেখিয়ে বলতেন, আমার কিচ্ছু হবে না। এই যে, বোনের আনা আজমির শরীফের সুতা আমার হাতে বাঁধা।

লাইফসাপোর্টটা খুলে নেয়ার আধাঘণ্টা খানেক আগে ভাবি যখন বলল, সুতাটা টাইট হয়ে গেছে, একটু হালকা করে দিই? তখন আবছাভাবে বলছিলেন, ‘না, বোন এনেছে। খুলবে না।’ লাইফসাপোর্ট খুলে নেয়ার পর বুকে পাথর চেপে আপনাকে শেষবারের মতো ছুঁয়ে দেখতে কয়েক মুহূর্তের জন্য ঢুকেছিলাম আইসিইউতে। তখনো গরম ছিল হাতটা। চোখ আটকে গেল আজমির শরীফের সুতাতেই। দমবন্ধ হয়ে আসছিল। সহ্য করতে পারিনি। কেউ একজন আমাকে বাইরে নিয়ে এলেন।

দিল্লির চিকিৎসার পর বেশ সুস্থ ছিলেন আপনি। ফিরে এলেন দায়িত্বে। আবার সরব হলেন কাজে। নিজের চেয়ারে বসার চেয়ে প্রত্যেকের চেয়ারে ঘুরে ঘুরে কাজ করাতেই স্বাচ্ছন্দ্য বেশি ছিল আপনার। ঠোঁঠের কোণে এক চিলতে মিষ্টি হাসি রেখেই সবার সঙ্গে সমান দুষ্টুমিতে মেতে উঠতেন। ভেবেছিলাম, ভাইয়া পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গেছেন। আবার ফুটবল মাঠে দাঁপিয়ে বেড়াবেন। ক্রিকেট-বলে ছন্দ তুলবেন। প্রেসক্লাব-ডিআরইউতে কলব্রিজ, ব্যাডমিন্টনে চ্যাম্পিয়ন হবেন। ভাবির হাত ধরে ঘুরে বেড়াবেন প্রিয় ঢাকা শহর। আবার ভূয়া সাংবাদিক ধরার জন্য মাঠে নামবেন।

আখতারুজ্জামান লাবলু, মহাকাশে হারিয়ে যাওয়া একজন

কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক। আমাদের সকল প্রার্থনা, ভাবির নিরলস সেবা, চিকিৎসকদের প্রাণান্তকর চেষ্টা ব্যর্থ প্রমাণ করে আমাদের হৃদয়ে কান্নার ধারা বহমান রেখে আপনি চলে গেলেন রাজার মতো। হালখাতায় রয়ে গেল না মেলানো অনেক হিসেব।

ড্যাফোডিল ফুলের মতোই স্বল্প আয়ু নিয়ে পৃথিবীতে আসা সৈয়দ আখতারুজ্জামান সিদ্দিকী লাবলু তার প্রিয় মহাবিশ্বে হারিয়ে গেলেন বড্ড অকালে। পেছনে পড়ে রইলো দীর্ঘ ছায়ার মতো হাজারো কথামালা, হাজারো স্মৃতি এবং নির্ভীক ও সৎ একজন মানুষের প্রতিচ্ছবি। যে ছবি প্রিয়জনদের মাঝে নিত্য আলো ছড়াবে।

লেখক: সিনিয়র রিপোর্টার, ভোরের কাগজ।

এনএম