সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় হচ্ছে সাইবার থানা

আগের সংবাদ

দিনাজপুরে বাসের চাপায় ভ্যানের ৬ যাত্রী নিহত

পরের সংবাদ

মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ

কুন্তল বড়ুয়া

প্রকাশিত হয়েছে: জুলাই ৬, ২০২০ , ৭:৫৩ অপরাহ্ণ

মহাপ্রলয়ের পরে বৈরাগ্যের মেঘমুক্ত আকাশে ইতিহাসের একটি নির্মল আত্মপ্রকাশ হয়তো আরম্ভ হবে এই পূর্বাচলের সূর্যোদয়ের দিগন্ত থেকে। আর এ একদিন অপরাজিত মানুষ নিজের জয়যাত্রা অভিযানে সকল বাধা অতিক্রম করে অগ্রসর হবে তার মহৎ মর্যাদা ফিরে পাবার পথে।

প্রতিদিন মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। কোথায় গিয়ে থামবে বা এর সমাপনী কোথায়? কারো জানা আছে কি? বিস্ময়ে স্তম্ভিত আজ বিশ্ব আর মনুষ্যজাতি। নানাবিধ সুরক্ষা কবজ ভেদ করে করোনা আপনার-আমার ঘরে অবলীলায় বাসা বাঁধছে। পৃথিবীর এমন কোনো দেশ নেই তাকে আটকাতে পারে। আমেরিকা, রাশিয়া, ফ্রান্স, চীনের কারো কাছে কোনো সমরাস্ত্র নেই যে, করোনাকে তাক করে এক টিপে ধ্বংস করে ফেলতে পারে। মৃত্যু না হয় জীবনকে থামিয়ে দিল মেনে নিলাম। আমি আক্রান্ত হলে বা আপনার আত্মীয়-পরিজন, পাড়া-প্রতিবেশী, গ্রামের পর গ্রাম আক্রান্ত হলে এক নজর দেখতেও যেতে পারছি না। যেতে ইচ্ছে হয় কি? তাহলে আমি বা আমরা যাই না কেন? কে বাধা দিচ্ছে? কতজন আজ আমরা সম্মুখযুদ্ধে?
নিজের জীবনকে বাঁচানোর জন্য এই যে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, তার শেষ কোথায়? পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে বাঁচাবে, তার বৈজ্ঞানিক আবেদন এবং অনেক সনাতনী বিশ্বাসের মূলেও আঘাত করেছে এ ব্যাধি। ফলে সর্বত্র এক অসম, দুঃসহ অস্থিরতা। ডাক্তারের ঘরের মা, বাবা, স্ত্রী, সন্তানকে দেখার জন্য ডিউটি করে বাড়ি ফিরে ছয় ফুট দূরত্ব মেনে একবার দেখা করতে আসেন ডাক্তার সাহেব। সেবাদানকারী নার্স তার সন্তানকে স্তনপান করাতে পারছেন না। অথচ জীবন বাজি রেখে তারা অন্যের সেবায় ব্যস্ত। তাদের নত শিরে স্যালুট জানাই। এত বিষণ্ণতার মাঝেও যখন দেখি, কিছু মানুষ এগিয়ে আসছেন তখন জোরে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হয়, মানুষ আছে রে আছে। ডাক্তার, সংবাদকর্মী, পুলিশ, স্বেচ্ছাসেবী কর্মীর পরিবার জানালায় দাঁড়িয়ে অনিমেষ নেত্রে তাকিয়ে থাকেন কখন ফিরে আসবেন তার প্রিয়জনরা। মায়ের চোখের জল, স্ত্রীর আকুতি, বাবার করুণ চোখের ভাষা, অবুঝ শিশুর হামাগুড়ির কোনো মূল্য নেই এই সময়।
সারা দুনিয়া অন্ধকারে চেয়ে গেছে। ক্ষমতার দাপট করোনার কাছে কিছুই না। ক্ষমতা, সায়েন্স, মন্দির, মসজিদ, গির্জা ও প্যাগোডার সমবেত প্রার্থনাও পরাস্ত। আমরা ঘরে গৃহবাসী, প্রকৃতি খোলা আঙিনায় তার তিলোত্তমা সৌন্দর্য প্রকাশে ব্যস্ত। পাখি মনের আনন্দে গান ধরছে, সমুদ্রের প্রাণীরা মুদ্রা তুলে নৃত্য করছে, না দেখা ফুলও তার সৌন্দর্য প্রকাশে দুলে উঠছে। তারপরেও মানুষ বদলাবে না, ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারে ব্যস্ত। চীন-ভারত ভারী অস্ত্র মজুত করেছে। নেপাল ভারতের মানচিত্র পাল্টিয়ে দিয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি, অনিয়ম, সরকারি ও প্রাইভেট হাসপাতাল বা ক্লিনিকে রোগী না নেয়ার অঘোষিত সমন জারি। এগুলো মানুষ দেখছে, ভাবছে, ঘৃণা করছে, ধিক্কার দিচ্ছে। এই সংকটেও পরিবর্তনের লক্ষণ নেই অহঙ্কারী মানুষের। পরিবর্তন হবে না চিন্তা-চেতনার। থামবে না যুদ্ধবিগ্রহ। মানুষ আরো নিষ্ঠুর হবে, পাষাণ হবে। লোভ, মোহ, ক্ষমতা, অসহায়ত্বের সুযোগে আরো বাড়বে। মানুষ ছুটছে হাসপাতালে, ক্লিনিকে, কোথাও কোনো সিট নেই, প্রিয়জনের নিশ্চিত মৃত্যু মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে স্বজনরা।
আমরা অস্থির হলে সমাজের অনেকে কিছুই অস্থির হয়ে উঠবে। আমরা সভ্য সমাজের অংশ। ‘সিভিলাইজেশন’ যাকে আমরা নাম দিয়েছি- সভ্যতা, আবার মনু তাকে বলেছেন- ‘সদাচার’। তাই প্রচলিত সমাজব্যবস্থা, নিয়ম-নীতি-রীতি মেনে আমাদের ভাবতে হবে। ওই যে মনুর সদাচারের কথা বললাম, সে সদাচারের আদর্শ আমাদের মেনে চলতে হবে। জাতি আমাদের কাছে তা আশা করেন। কোনোক্রমেই সদাচার, নিয়ম-নীতি, রীতি-নীতি, আবেগের বশে রাষ্ট্র ও মানুষের চাওয়ার বিপক্ষে যেন না যায়। যে বেষ্টন এখন আছে সে বেষ্টন আমরা মানব। মানা মানে পরাজয় নয়, মান্য করা মানে ‘সদাচার’, ভদ্রতা, শিষ্টাচার। মানুষের শরীর পক্ষে, মনের পক্ষে, মঙ্গলের পক্ষে যা কিছু অত্যাবশক তা আমরা মানব। সরকারের ঘোষিত ‘খধি ধহফ ড়ৎফবৎ’ স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থা মানব এবং প্রয়োজনে সরকারকে সহযোগিতা করব। থিয়েটার আমাদের মুখোমুখি দাঁড়াতে শিখিয়েছে। ভালোবাসা দিয়ে দুর্দিনে আমাদের স্পর্শে মানুষ ভরসা পায়।
তবে যারা থিয়েটার করতে পথে নেমেছেন বা নামার কথা ভাবছেন তাদের জন্য শুভকামনা। পথে নেমেছেন বা নামবেন ঠিক আছে। পথ থেকে বাড়ি ফিরে যেন পরিবারের অন্য কাউকে করোনা আক্রান্ত না করি। সে দিকটার ভাববার সময় এসেছে আমাদের। পরিবারের স্ত্রী, পুত্র-কন্যা, বাবা-মা, ভাই-বোন, পিসি, মাসি, কাকা, কাকি এবং পাড়া-প্রতিবেশীরা যেন সুরক্ষিত থাকেন। যেন কেউ আঙুল উঁচিয়ে আমাদের বলতে না পারেন, থিয়েটারওয়ালাদের জন্য আমাদের এ দশা, আমরা সংক্রমিত হচ্ছি। আমি বা আমরা যে বাড়ি থেকে মহড়া করার জন্য বা নাটক প্রদর্শনী করার জন্য যেসব মেয়ে বা ছেলে নিয়ে আসছি তাদের যেন তার পরিবারে সযতে্ন ফিরিয়ে দিয়ে আসতে পারি।
যদি না পারি তাহলে কী হবে? কী জবাব দেব তার বাবা-মাকে? ভবিষ্যতে পাব কি আমাদের সহযাত্রী হিসেবে? না পাব না, আমি হলফ করে বলতে পারি। একটু ভাবুন! একটু ভাবা দরকার এবং পথের নামার সাথীদেরও ভাবতে হবে, আমি-আমরা কখন ‘থেটার’ করব? আর কখন ‘থেটার’ করব না? এবার একটু বিশ্রাম নেয়া দরকার, গত তিন মাসে আমাদের যারা দেখছেন তারা বিরক্ত, তারা বিভ্রান্ত, আমরা রাত-দিন শুধু আমাদের কথা ভাবছি। ছক কষে চলেছি অবিরাম। করোনাকালীন থিয়েটার কৌশল নিয়ে, ভাবছি সামাজিক দূরত্ব মেনে আগত দর্শককে কীভাবে সম্পৃক্ত করা যায়। দর্শককে আমি বা আমরা বললে তিনি কেন থিয়েটারের নিয়ম মেনে নাটক দেখতে আসবেন? আমরা থিয়েটারের লোকেরা কি জানি না দর্শককে কীভাবে আনতে হয়? দয়া করে আমরা একটু সাময়িক বিশ্রাম নিই। গলায় চিড় ধরেছে, ভাবনায় জট লেগেছে, শরীর, মন বড্ড ক্লান্ত। এবার বোধহয় ‘ইন্টারবেল’ দেয়া দরকার। থিয়েটার আমাদের জানান দেবে কবে, কখন, কোথায়, কীভাবে নামতে হবে? বিশ্বাস করি সাময়িক বিরতি আমাদের থিয়েটারের কোনো ক্ষতি হবে না। আমরা তো ঐক্যবদ্ধ ছিলাম, আছি। ভাবনাতেও আমাদের যোগ। ‘কলুষ-নাচন রুদ্রতা’ বেশিদিন থাকে না। এখন ‘তিমির নিবিড় নিশীথিনী ভয় দামিনী’ সময়। এই প্রাচীনতম শিল্পটা আমাদের শিখিয়েছে মুখোমুখি দাঁড়াবার এবং সংকট উত্তরণের মন্ত্র। থিয়েটার যৌথ শিল্প, যৌথ মানসিকতায় থিয়েটার শিল্পটার জন্ম। মানুষে মানুষে সেতু রচনা করে এই শিল্প। অহঙ্কার, স্বার্থপরতা, দীনতা, সুখ-দুঃখ সবকিছু ভাগ করে নিতে শেখায়। সবচেয়ে বড় কথা মনুষ্যত্ব জাগিয়ে তোলা। আমি বিশ্বাস করি মনুষ্যজীবন একদিন পূর্ণ হয়ে উঠবে। দুর্দিন, সংকট থাকবে না, পূর্ণতায় মানুষ আবার যাত্রা শুরু করবে। এই মিলনযাত্রায় আবার পূর্ণ হয়ে উঠবে সবার যোগে। এখন প্রমাণ করার সময় এসেছে, মানুষ মানুষের জন্য। মানুষই মানুষের অনিবার্য আশ্রয়। প্রতিটি যুগেই নিহিত থাকে সংকট। থিয়েটার যোদ্ধারা, সংস্কৃতকর্মীরা এগিয়ে এসেছেন সবকিছুকে তুচ্ছ করে। সাহসে ভর করে অনেকে পথে নামছেন। আগামীতেও নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সামনে যখন সুদিন আসবে, যেন চটজলদি নেমে পড়তে পারি এ প্রস্তুতিও আমাদের থাকা দরকার। সভ্যতার সংকট প্রবন্ধের রবীন্দ্রনাথের আশার বাণী দিয়ে শেষ করতে চাই- ‘… মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ, সে বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রক্ষা করব।
আশা করব, মহাপ্রলয়ের পরে বৈরাগ্যের মেঘমুক্ত আকাশে ইতিহাসের একটি নির্মল আত্মপ্রকাশ হয়তো আরম্ভ হবে এই পূর্বাচলের সূর্যোদয়ের দিগন্ত থেকে। আর এ একদিন অপরাজিত মানুষ নিজের জয়যাত্রা অভিযানে সকল বাধা অতিক্রম করে অগ্রসর হবে তার মহৎ মর্যাদা ফিরে পাবার পথে।’

কুন্তল বড়ুয়া : অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

এসআর