করোনা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দাবি

আগের সংবাদ

বিসিবি সভাপতিকে নিয়ে ধোঁয়াশা

পরের সংবাদ

শুধু সরকার নয়, বিত্তবানদের দায় রয়েছে

প্রকাশিত: জুলাই ৫, ২০২০ , ৮:১৭ অপরাহ্ণ আপডেট: জুলাই ৫, ২০২০ , ৮:১৯ অপরাহ্ণ

করোনা আমাদের দেখিয়ে দিল দেশে চিকিৎসা ব্যবস্থা কত দুর্বল। কোনো কোনো সময় সাধারণ রোগী পর্যন্ত করোনা সন্দেহে চিকিৎসা না পেয়ে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতাল ছোটাছুটি করে মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ছে। তাছাড়া দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে করোনা সন্দেহে জরুরি চিকিৎসাগুলো যেমন- হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, কিডনি, ডায়রিয়া, বিভিন্ন দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের চিকিৎসা ঠিকমতো হচ্ছে না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এসব অবহেলার কারণে এসব জরুরি রোগী ও অভিভাবকরা হাসপাতালে যেতে অনীহা প্রকাশ করায় বিনা চিকিৎসায় অনেকেই বাড়িতেই মৃত্যুবরণ করছে। সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা, ইতোমধ্যে মন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তা করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন।
দেশ উন্নয়নে এগিয়ে যাওয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্ব বহন করে শিক্ষা ও চিকিৎসা। স্পর্শকাতর এ দুটি বিষয়কে কোনোভাবেই অবহেলা করার সুযোগ নেই, কিন্তু দুর্নীতি, অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে এই দুটি বিষয়ে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। ২০১৯-২০ অর্থবছরে চিকিৎসা খাতে বাজেট ছিল ২৫ হাজার ৭৩২ কোটি টাকা। আমাদের দেশে চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর আস্থার অভাব শুধু সাধারণ রোগীদেরই নয়, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সরকারি আমলা ছাড়াও মন্ত্রী-এমপিদের এ অনাস্থার কারণেই তারা বিদেশে চিকিৎসার জন্য প্রায়ই গিয়ে থাকেন। দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর আস্থা না থাকার কারণ, প্রয়োজনীয় দক্ষ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরি না হওয়া, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের স্বল্পতা, মেধাবী চিকিৎসকদের সঠিকভাবে মূল্যায়ন না করা, কম মেধাবী শিক্ষার্থীদের চিকিৎসক হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা। এছাড়া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে জরুরি রোগী দেখানোর ক্ষেত্রে অধিক সিরিয়াল, বেশিরভাগ নির্ভুল রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে এক ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সঙ্গে অন্য ডায়াগনস্টিক সেন্টারের রিপোর্টে মিল না থাকা, টেকনিশিয়ানের অভাব, প্রয়োজনীয় ডাক্তারের স্বল্পতা, ডাক্তারদের বাসা ও চেম্বারের অভাব, নিরাপত্তার অভাব, এছাড়া প্রভাবশালীদের প্রভাবের কারণে চিকিৎসা ব্যবস্থাকে অনেক পিছিয়ে রেখেছে। দেশে প্রতি বছর ৩৬টি সরকারি মেডিকেল কলেজ থেকে ৪ হাজার ৬৮ জন ও প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ থেকে ৬ হাজার ২৩৩ জন অর্থাৎ ১০ হাজার ২৯৯ জন কমবেশি ডাক্তার বেরিয়ে থাকেন, অথচ হাসপাতালগুলোতে ডাক্তারের সংকট প্রায় লেগেই থাকে। এতে প্রতি উপজেলায় ৩-৪ লাখ মানুষের চিকিৎসা ব্যবস্থা ডাক্তারের স্বল্পতায় ঠিকমতো চিকিৎসাসেবা দেয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। অথচ পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো চিকিৎসার ক্ষেত্রে অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে। সেখানে উগউঈ-এর ১৯১৮ সালের তথ্যমতে, আমাদের দেশে মোট ডাক্তারের হিসাবে ১ হাজার ৮৪৭ জনে ১ জন ডাক্তার নিয়োজিত আছেন।

দেশের মানুষের সব চিকিৎসা দেশেই হলে, কষ্ট লাঘব হবে, কম টাকায় চিকিৎসা পাবে ও দুঃসময়ে আপনজন কাছে থাকবে, এতে সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা আরো বেড়ে যাবে এবং ভবিষ্যতে করোনা ভাইরাসের মতো বিপর্যয় মোকাবিলা করা সহজ হবে।

দেশে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অনেক অভাব রয়েছে। তাছাড়া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সঠিকভাবে মূল্যায়ন না করার কারণে বেশিরভাগ চিকিৎসক দেশের বাইরে চলে যান, ফলে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় চিকিৎসকের স্বল্পতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে কিছু ডাক্তারের সঙ্গে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের একটা বড় কমিশন বাণিজ্য রয়েছে। অনেক ডাক্তারের নির্ধারিত ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে রিপোর্ট না করলে গ্রহণ করতে চান না। এছাড়া ভুল রোগ নির্ণয়, ভুল অপারেশন ও ওষুধের দাম অধিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় রোগীরা দেশের চিকিৎসার ওপর বিমুখ হচ্ছে। দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর বর্তমান সরকারের সঠিক পরিকল্পনা ও নজরদারির কারণে ইদানীং আমরা অনেক সুফলও পাচ্ছি। গত কয়েক বছর আগে হার্টের চিকিৎসা ব্যবস্থা দেশে ভালো না থাকায় অধিকাংশ রোগী মারা যেত। শুধু ধনী সামর্থ্যবানরা ভারতসহ বিদেশে চিকিৎসা নিতে পারত কিন্তু ইদানীং সরকারের সঠিক পরিকল্পনার কারণে আমাদের দেশে স্বল্প খরচে অনেক ভালো নির্ভুল চিকিৎসা হচ্ছে। এছাড়া দেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য অত্যাধুনিক আন্তর্জাতিক মানের নিউরোসাইন্স হাসপাতাল, জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, জাতীয় হার্ট ফাউন্ডেশন, ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন হাসপাতালসহ কয়েকটি সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগে হাসপাতাল তৈরি হওয়ায় আমরা তার সুফল ভোগ করছি। তাছাড়া ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় পাশেই আন্তর্জাতিক মানের সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল নির্মাণের কাজ শুরু করেছেন। এখানে সর্বপ্রকার জটিল রোগের অপারেশন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দেশের জনগণের জন্য চিকিৎসা ব্যবস্থা অধিক গুরুত্ব বহন করে এবং বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হওয়ায় সরকারকে অবশ্যই দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে নিরপেক্ষতার সঙ্গে দুর্নীতি দমন করে চিকিৎসা ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে সবচেয়ে মেধাবীরাই ডাক্তারির মতো মহৎ পেশায় সেবা দিয়ে থাকেন। এ কারণে তাদের অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। সমাজে তাদের সর্বোচ্চ মর্যাদা, বেতনসহ সর্বপ্রকার সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। যোগ্য ডাক্তারদের সঠিকভাবে মূল্যায়ন হলে মেধাবী ডাক্তারদের বিদেশে যাওয়া বন্ধ হবে এবং দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার অনেক উন্নয়ন ঘটবে, এতে দেশের জনগণের চিকিৎসার প্রতি আস্থা ফিরে এলে বিদেশে চিকিৎসার জন্য যাওয়া বন্ধ হবে, ফলে দেশের টাকা দেশেই থাকবে। আধুনিক ও উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক নয়, জেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে দিতে হবে। বর্তমানে দেশে হৃদরোগের ঝুঁকি অনেক বেড়ে গেছে, প্রচুর মানুষ হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছে, সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না পাওয়ায় বেশিরভাগ রোগী মারা যাচ্ছে। অন্তত প্রত্যেক মেডিকেল কলেজে করোনারি কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ) চালু থাকলে বেশিরভাগ রোগী বাঁচানো সম্ভব হবে। হাসপাতালগুলোতে ডাক্তার সরবরাহের ধারাবাহিকতা থাকতে হবে। কোনো সময় ২০ জন, আবার কোনো সময় ৪ জন থাকলে চিকিৎসার বিঘ্ন ঘটবে, এতে মানুষের আস্থা হারাবে। উপজেলা শহরগুলোতে ডাক্তারের পোস্টিংয়ের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ রেখে নিরপেক্ষতার সঙ্গে পোস্টিং দিতে হবে। ডাক্তারদের ডিউটির ক্ষেত্রে সেবামূলক মনোভাব ও আন্তরিকতা থাকতে হবে। ডাক্তারদের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক ও উন্নত চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল, যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসকের ব্যবস্থা করতে হবে। এর জন্য বাজেটে চিকিৎসা খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাজেট বৃদ্ধি করতে হবে, এতে দেশ উন্নয়নের দিকে আরেক ধাপ এগিয়ে যাবে। তাছাড়া দেশে সঠিক চিকিৎসা পেলে, অধিক ব্যয়ে, অনেক কষ্টে দুঃসময়ে আপনজন ছাড়া বিদেশে চিকিৎসার জন্য যাওয়া একেবারে বন্ধ হয়ে যাবে। দেশে নির্ভরযোগ্য চিকিৎসায় বিশ্বাস সৃষ্টি হলে আশপাশের দেশ থেকে রোগী এ দেশে চিকিৎসা নিতে আসবে। এতে দেশের মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে, অনেক বেকার সমস্যা দূর হবে ও অধিক হারে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হবে। দেশের মানুষের সব চিকিৎসা দেশেই হলে, কষ্ট লাঘব হবে, কম টাকায় চিকিৎসা পাবে ও দুঃসময়ে আপনজন কাছে থাকবে, এতে সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা আরো বেড়ে যাবে এবং ভবিষ্যতে করোনা ভাইরাসের মতো বিপর্যয় মোকাবিলা করা সহজ হবে। চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য শুধু সরকার নয়, দেশের বিত্তবানরা যদি এগিয়ে আসেন তাহলে এস আলম গ্রুপের পরিচালক মোরশেদুল আলমের মতো হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েও সামান্য একটি ভেন্টিলেটরের জন্য আর কাউকে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করতে হবে না।

এম এ কাদের : কলাম লেখক।
[email protected]

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়