হালদায় অবৈধভাবে মা মাছ শিকার থামছে না

আগের সংবাদ

করোনা উপসর্গ নিয়ে আট জেলায় ১০ জনের মৃত্যু

পরের সংবাদ

করোনাকালে বন্ধু হয়ে উঠেছে প্রকৃতি

শরীফা বুলবুল

প্রকাশিত হয়েছে: জুলাই ৫, ২০২০ , ১০:৪৮ পূর্বাহ্ণ

বিশেষ সাক্ষাৎকার
দিলারা জামান
অভিনয়শিল্পী

দিলারা জামান। বর্ষীয়াণ অভিনয়শিল্পী। বিনোদন জগতের তারকারা তাকে ‘মা’ বলেই ডাকেন। পর্দায় অভিনয়ের পাশাপাশি বাস্তবেও সবার মা হয়ে উঠেছেন। অভিনয়ে ছয় দশকের ক্যারিয়ার তার। ১৯৬৬ সালে বিটিভিতে ‘ত্রিধারা’ নাটকের মাধ্যমে অভিনয় শুরু। প্রথম ধারাবাহিক নাটক ‘সকাল সন্ধ্যা’। তবে দিলারা জামানের কর্মজীবন শুরু হয় শিক্ষকতা দিয়ে। এই সময়ে অসংখ্য নাটক, টেলিছবিতে তার অনবদ্য অভিনয় দর্শকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। চলচ্চিত্রেও কাজ করেছেন। তিনি ‌‘চাকা’, ‌‘আগুনের পরশমণি’ ‘ব্যাচেলর’, ‘মেড ইন বাংলাদেশ’, ‘চন্দ্রগ্রহণ’, ‘প্রিয়তমেষু’ ও ‘মনপুরা’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একুশে পদক ও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।

বিশিষ্ট এই অভিনয়শিল্পীর করোনাকাল কেমন কাটছে ভোরের কাগজের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চার মাস ধরে ঘরে বন্দি জীবন যাপন করছি। একেবারেই ভালো নেই, মনটা ভীষন খারাপ। সারাক্ষণ দুশ্চিন্তা আর আতংকের মধ্যে দিন কাটছে। করোনার পাশাপাশি চারিদিকে বন্যায় মানুষের কষ্ট আর সহ্য হচ্ছে না। বাড়িতে তিনটা পত্রিকা আসে সেগুলোই পড়ি আর টিভিতে খবর দেখি। এ ছাড়া আর কিছু পড়তেও পারছি না, লিখতেও পারছি না। কিছু করতেও পারছি না। কষ্টে কষ্টে মনই মরে যাচ্ছে। তার ওপর নেই বাড়ির কাজের মানুষ নেই। ঊনাশি বছর বয়েসে কাজ করতে হচ্ছে। আমি তো ডায়বেটিকের রোগী বাসার দরজায়ও যাওয়া নিষেধ।

দিলারা জামান

করোনার এই সময়টায় আপনার চেনা পৃথিবীটার কতোটা বদল ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে? জবাবে এই শিল্পী বলেন, একটা পজিটিভ দিক হচ্ছে ঘরে থেকেই সবাই খবর নিচ্ছে কে কেমন আছে। বদলে যাওয়া মানুষদের চারিত্রিক রূপ। আবার কিছু নিষ্ঠুরতাও মানুষের মধ্যে দেখা যাচ্ছে। কেবল নিজে বাঁচার জন্যে একেবারে কাছের রক্তের সম্পর্ককে অস্বীকার করছে। তার কাছেও যাচ্ছে না। এগুলো শুনে দেখে বেশ কষ্ট পাচ্ছি। তবে প্রকৃতির মধ্যে সবচে যে বড় পরিবর্তন দেখছি তা হচ্ছে- আমি যখন উত্তরাতে বাড়ি করি তখন ছিল ধানক্ষেত। ব্যাঙ ডাকতো। এখন অবশ্য চতুর্পাশে বাড়ি ওঠার পর আমিই পেছনে পড়ে গেছি। যেখানে অন্ধকার হয়ে গেছে। আলোর দেখা আর মেলে না। তো আমার বাড়ির পেছনে ছোট্ট একটা বারান্দা আছে। সেই বারান্দায় সকালে দাঁড়ালে একটু আলোর দেখা পাওয়া যায়। ওই বারান্দায় চড়ুই আসে নিয়মিতই। আমি ওদের খেতে দেই। ওই পাখিগুলোই আমার বন্ধু হয়ে গেছে। আগে যেটা কখনই করিনি। দেখিও নি। করোনাকালে প্রকৃতি বন্ধু হয়ে উঠেছে। দূর থেকে দেখা যায় মানুষ ছাদে হাঁটছে, দূরে ঘুড়ি উড়ছে। আমি পুরনো ঢাকার লালবাগে বড় হয়েছি। ছোট বেলায় চৈত্র সংক্রান্তির দিনের উৎসবে ঘুড়ি উড়িয়েছি। বহু বছর পরে অর্থাৎ পঞ্চাশ ষাট বছর পরে আবার সেই ঘুড়ি ওড়াতে দেখছি।

এই দীর্ঘজীবনে আমার উপলব্ধি হচ্ছে, মানুষ আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে বলেই মানবজাতিকে কষ্ট পেতে হয়। মানুষ যদি একে অন্যের কথা ভাবে, তাহলে সে নিজে ভালো থাকে, তার আশপাশের মানুষ ভালো থাকে। ভালোবাসা ও মায়া যদি ছড়িয়ে দেয়া যায়, তাহলে সবার জন্যই মঙ্গল। আমি যে কাজটি করি, সেটা বিরাট কোনো প্রাপ্তির জন্য নয়, অন্যকে আনন্দ দিয়ে তাদের ভালোবাসা পাওয়ার জন্য। আরেকটা ব্যাপার মনে হয়েছে, অনেক বেশি চাওয়া থেকেই মানুষের জীবনে অশান্তির সৃষ্টি হয়। প্রয়োজনকে সীমার মধ্যে রাখলে মানুষ ভালো থাকতে পারে।

দিলারা জামান

বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াতে পারবে বলে মনে করেন কী না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অবশ্যই বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। একাত্তরে তো আমরা একেবারে বিধ্বস্ত অবস্থায় ছিলাম। আমার তখন পঁচিশ ছাব্বিশের ভরা বয়স। তখন গোলাঘরের পেছনে সারাদিন লুকিয়ে থাকতাম। সেখানে খাবার দিয়ে আসা হতো। কারণ শান্তি বাহিনীর লোকজন ছিল আশেপাশে। ওই সময় দেখেছি পাকিস্তানিরা চলে যাবার সময় সব শেষ করে দিয়ে গেছে। রাস্তাঘাট কিচ্ছু ছিল না। ভাঙা সব। ঢাকার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ ছিল না। বাবা মা বেঁচে ছিলেন কি না কিছুই জানি না। ২৫ মার্চের পরে আমাদের জাতির পিতাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। তার কোনো খবর পাচ্ছিলাম না। কীরকম একটা দুঃসহ এবং অনিশ্চিত জীবন। তারপরও সেই অবস্থা থেকে আমরা বাঙালি ঘুরে দাঁড়িয়েছি। আমাদের যথেষ্ট মনোবলের কারণে। এবারও ঘুরে দাঁড়াবই আমরা। কিছু মানুষের লোভ আমাদের এগিয়ে যাওয়াকে টেনে ধরে হয়তো। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষই মানুষের পাশে দাঁড়ায়। আমাদের প্রধানমন্ত্রী যেভাবে একাকি চারিদিকে সামাল দিচ্ছেন তাঁর কাছ থেকে আমরা প্রেরণা পাচ্ছি। আমি তাঁকে স্যালুট দেই। সম্মান জানাই প্রতিনিয়ত।

সবার প্রতি অনুরোধ সাহস হারাবেন না। আমরা এগিয়ে যাব। করোনা যুদ্ধ জয় করতে হবে। হ্যাঁ অনেক কাছের মানুষ হারিয়ে ফেলছি। তাদের কাছে গিয়ে শেষ দেখা দেখতে পারিনি। এটা আরেক কষ্ট।

ডিসি