ডা. চিত্তরঞ্জনকে হেলিকপ্টারে ঢাকায় আনা হচ্ছে

আগের সংবাদ

লঞ্চেই মারা যান মর্নিংবার্ডের মাস্টার ও গ্রিজার

পরের সংবাদ

গল্প

বিস্ময়-বালিকা

ফরিদ আহমদ দুলাল

প্রকাশিত হয়েছে: জুলাই ২, ২০২০ , ৮:৪০ অপরাহ্ণ

কয়েক দিনেই বালিকার বয়স বাড়িয়া পূর্ণ নারী হইয়া উঠিল। যেন দশভুজা-অন্নপূর্ণা হইয়া উঠিল বালিকা। অতঃপর বালিকাটিকে বালিকা বলিয়া ভাবিতে মনে সংশয় জাগিল সবার। দুঃসময়ের আবর্তে কতোজন যে কতোভাবে সবার অলক্ষে প্রভাবিত-পরিবর্তিত হইয়া উঠিতেছে, তাহার নিকাশ কে করিয়াছে! হয়তো কেহ কেহ করিয়াছেন; মানব-সেবায় জীবন উৎসর্গ করিয়া চলিয়াছেন প্রতিদিন। ইহার ফাঁকেও কেউ কেউ কিছু একটা করিয়া খাইবার কলা আবিষ্কার করিয়া লইয়াছেন! বিচিত্র মানব চরিত্র! বৈচিত্র্যময় তাহার কলাকৌশলও। কিন্তু আমাদের বিস্ময়-বালিকার মনে সামান্য কলাকৌশল করিবার গূঢ় চিন্তা নাই। সে কেবল নিজেই নিজের অজান্তে নিজেকে পরিবর্তন করিয়া ফেলিয়াছে। বালিকা হইতে নারী হইয়া উঠিয়াছে, কন্যা হইতে জননী হইয়া গিয়াছে।

\২\
টিনের চৌচালা বাড়িটির তিনখানা ঘরে একসময় এগারজন মনুষ্য থাকিত। বালিকার বাবা-কাকারা পাঁচভাই, একজন বোন; বাবার বাবা-মা, বালিকার বাবার দাদা এবং দুইজন সাহায্যকারী স্বজন। সেই জমজমাট সময় দেখিবার সুযোগ বালিকার হয় নাই। জীবনের আবশ্যিক প্রয়োজনে বাড়িটিতে বর্তমানে শুধুমাত্র বালিকার বাবা একাই থাকেন। বৈবাহিক সূত্রে বাবার সহিত যুক্ত হইয়াছেন বালিকার মাতা এবং তাহাদের উত্তর প্রজন্ম হইয়া আগমন ঘটিয়াছে বালিকা আর তাহার একমাত্র ভাই পবনের। পবনের গোঁফ গজাইতে শুরু করিলেও সে ছোট, খেলাধুলাতেই আগ্রহী। বয়সের চপলতায় বালিকার ভ্রাতাটি বর্তমানে ধান কাটিয়া কৃষকদের সাহায্য করিবার উদ্দেশ্যে দূরের কোনো গ্রামে বন্ধুদের সহিত অবস্থান করিতেছে। বালিকার মাতা শয্যাশায়ী নহেন, চলিতে ফিরিতে পারেন, গৃহস্থালিও পারেন কিন্তু ক্ষীণস্বাস্থ্যÑসম্বৎসর রুগী। বালিকার জীবনে যত সমস্যা তাহার বাবাকে লইয়া। মানুষটা মন্দ নন, কিন্তু কিছুটা গোঁয়ারস্বভাব। কাহারও কথায় কর্ণপাত করিবার প্রবণতা তাহার মধ্যে নাই। যখন যাহা মনে চায় তাহাই করিয়া বেড়ান। বালক বয়স হইতেই দুরন্তপনায় সিদ্ধ, তাহার দুরন্তপনার কথা বলিয়া শেষ করা যায় না। গুরুজনদের কাছে বালিকা তাহার বাবার দুরন্তপনার অনেক গল্পই শুনিয়াছে; শুনিয়া কখনো আহ্লাদিত, কখনো বা চিন্তামগ্ন হইয়াছে।

\৩\
পৃথিবীতে করোনাকাল শুরু হইবার পর সবাই যখন উদ্বিগ্ন, সামাজিক দূরত্ব যখন মানুষের নতুন সংস্কৃতি হইয়া উঠিয়াছে; করোনা আক্রান্ত হইলে সবাই নিরাপদ দূরত্বে থাকিতেছে; এমন কী নিকট আত্মীয় হইলেও কেহ কাছে ঘেঁষিতেছে না। বাবার মৃত্যু হইলে সন্তান দেখিতে যায় না; ভাইয়ের মৃত্যু হইলে ভাই কাছে আসে না। কেহ রাস্তায় বাহির হইলে পুলিশ তাড়া করে। তেমন দুঃসময়েও বালিকার বাবা সব ধরনের লকডাউন উপেক্ষা করিয়া যত্রতত্র ঘুরিয়া বেড়াইতে ছিলেন। সংক্রমণ যখন আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়া চলিয়াছে, তখন বালিকার বাবা জ্বরাক্রান্ত হইলেন। কাহারও জ্বর হইলে করোনা আক্রান্ত বলিয়া ধারণা করা হয়। তাহার ক্ষেত্রেও অন্যথা হইল না। জ্বরের পাশাপাশি করোনা আক্রান্ত হইবার আরও কিছু আলামত বালিকার বাবার মধ্যে পরিলক্ষিত হইল; তাহার পেটের পীড়া হইল, নিয়মিত শ্বাসকষ্ট হইতে শুরু করিল; আর মুহূর্তে আত্মীয় পরিজন-বন্ধুবান্ধব তাহাকে পরিহার করিতে লাগিলেন; এই অবস্থায় রুগী লইয়া কে ছোটাছুটি করে? ক্ষণিকের জন্য বালিকা দিশাহারা হইল। করোনাভীতি যেন মানুষের মানবিক মূল্যবোধকে গ্রাস করিয়া ফেলিতেছে। কবরস্থান হইতে করোনায় মৃত ব্যক্তির লাশ ফিরাইয়া দেওয়া হইতেছে; ডাক্তার-নার্সদের বাড়ি হইতে উচ্ছেদের চেষ্টা চলিতেছে; এইসব ভাবিয়া বালিকা কাহারো উপর অভিমান করিতে পারিল না। বিস্ময়-বালিকা পলকেই যেন পূর্ণ নারী হইয়া উঠিল, আর বাবার সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলিয়া লইল। কন্যা তখন জননী হইয়া উঠিল। পরিপার্শ্ব দেখিল, মা যেমন বুক দিয়া তাহার সন্তানকে আগলাইয়া রাখেন, বালিকাও তাহাই করিতেছে। দ্বিতীয়বার পরীক্ষার পরও যখন বালিকার বাবা করোনা আক্রান্ত নয় বলিয়া ডাক্তার ঘোষণা করিলেন; বালিকা তখন কিছুটা স্বস্তি পাইল বটে, কিন্তু আত্মীয়-পরিজন, পাড়া-প্রতিবেশীদের কেহ সেই কথা বিশ্বাস করিতে চাহিল না। চোখে বালিকা ঘোর অন্ধকার দেখিল! বালিকা তখন ভাবিতেছে, “পুনর্বার আমি কি বালিকা হইয়া উঠিতে পারিব?”

এসআর