লঞ্চেই মারা যান মর্নিংবার্ডের মাস্টার ও গ্রিজার

আগের সংবাদ

সাহিত্যে মহামারির একাল ও সেকাল

পরের সংবাদ

পাঠক ঘনিষ্ঠ লেখক আলাউদ্দিন আল আজাদ

মনিরুজ্জামান

প্রকাশিত হয়েছে: জুলাই ২, ২০২০ , ৮:৫৬ অপরাহ্ণ

আলাউদ্দিন আল আজাদের অসামান্য পরিচিতি থাকা সত্ত্বে, তাঁর জীবনের সামান্য দিকগুলিও বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। যেমন তাঁর ছোটখাটো কোনো স্মকারকপত্র, বিস্মৃতিযোগ্য কোনো লেখার টুকরো বা সামান্য একটু চিরকুট, কিংবা সাহিত্যপদবাচ্য নয় এমন কোনো লেখা বা নোট ইত্যাদি। লেখকে লেখকে যে পার্থক্য তা শুধু সৃজনবোধ বা কোনো সুজনী-ঘরানা ও সংরাগেই নয়, তা এই রস প্রসারতাও। আজাদ কেবল লেখক-সত্তাই নন, এক কিংবদন্তি-সত্ত্বাও; ইতিহাসের এক প্রান্ত বেলার পথিক। আজাদ ছাড়া আমাদের সংস্কৃতির অঙ্গনে আজাদীর বালার্ক রেখাটি কখনো স্ফুট হতো কিনা প্রশ্ন থেকে যায়!
আমাদের কবিতার যখন কেবল হাঁটিহাঁটি ভাব, তখন কলকাতা থেকে শান্তিরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় লিখলেন, আলাউদ্দিন আল আজাদ তরুণ লেখক, ‘জেগে আছি’ তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ। ইতস্তত তাঁর কিছু কিছু প্রবন্ধ এর আগে পড়েছি, চমক দিয়েছে। ‘জেগে আছি’ সেই চমককে বিস্ময়ে পরিণত করেছে। বিনা দ্বিধায় স্বীকার করতে পারি, জেগে আছি সাম্প্রতিক মুসলিম সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ গল্পগ্রন্থ এবং সামগ্রিকভাবে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সেরা বই। পূর্ববঙ্গ নিয়ে সার্থক সাহিত্য সৃষ্টি মুসলিম লেখকদের দ্বারা সম্ভব। আজাদের সৃষ্টিসচেতনতা নিয়ে তিনি আরও লেখেন, ‘আলাউদ্দিন আল আজাদ পূর্ববঙ্গ সম্পর্কে আমাদের কিছু সচেতন করে তুলেছেন। কিন্তু তাঁর এই সচেতনতার রূপ আলাদা।’
আজাদের বয়স তখন ১৭ বছর মাত্র। এরপর তাঁর সৃষ্টির পালা চলছে দিগন্ত থেকে দিগন্ত ছাড়িয়ে। ইউনেস্কো পুরস্কার পেয়েছে তাঁর ‘কর্ণফুলি,’ এক ডাকে সেরা উপন্যাসের (‘বেস্ট সেলার’) ঘরে নাম কিনেছে তাঁর ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’। তাঁর ‘স্মৃতির মিনার’ হয়ে উঠলো শহীদ মিনারের একতম স্মারক কবিতা। হলেন তিনি বহুমাত্রিক ও সব্যসাচী লেখক- কথাসাহিত্যিক, কবি, সনেটকার, নাট্যকার, চলচ্চিত্রের গল্পকার ও স্ক্রিপ্ট লেখক, টিভির জনপ্রিয় ধারাবাহিক আলেখ্যানুষ্ঠান (‘রত্নদীপ’)-এর স্রষ্টা, শিশুসাহিত্যিক আদর্শ পত্রলেখক, মুক্তিযুদ্ধের কথাকার এবং গীতিকারও। প্রতিভার ভারসেটাইলিটির এক আদর্শ উদাহরণ যেন আজাদ। সাহিত্যের সর্ব শাখাতেই সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি।
অথচ বাংলা সাহিত্যে আলাউদ্দিন আল আজাদের নাম এখন তো প্রায় বিস্মরণের পথে! দীর্ঘদিন পত্রপত্রিকায় অনুল্লেখিত তিনি। কে বলবে এক সময় এই লেখকই ছিলেন কিংবদন্তি স্বরূপ। পাকিস্তান সৃষ্টির পর যখন সাহিত্যের পথ কি হবে এ নিয়ে সংশয়ের সৃষ্টি হতে শুরু করে, যখন মাহবুব-উল আলম ১৯৫০-এ লিখছেন ‘পথ জানা নেই’, তখন আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘জেগে আছি’, ‘ধানকন্যা’, ‘মৃগ-নাভি’ প্রগতিশীল ধারার পথ সৃষ্টি করেছিল; শহীদ মিনার ভেঙে ফেলার সময়ও তিনি সাহস দিয়ে লিখেছিলেন, ‘ইটের মিনার ভেঙ্গেছে ভাঙ্গুক, ভয় কি বন্ধু, এখনও সাত কোটি পরিবার খাড়া রয়েছি তো’। পিতৃ-মাতৃহীন এক অনাথ গ্রাম্য বালক তাঁর পাশের বাড়ির এক নিঃসঙ্গ ও ‘শন পাটের মতো সাদা চুলের’ দাদীর আশ্রয়ে থেকে বড় হয়ে আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির অঙ্গন তথা নবসৃষ্ট রাজধানী ঢাকা শহরকে কাঁপিয়ে তুলেছিলেন ’৫০-এর সেই সম্মুখ-আদর্শহীন দশকে। তাঁর সম্পর্কে তখন আমরা সেকালে কত গল্প না শুনেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনি অনার্স-এম.এর অসধারণ কৃতিত্ব অর্জনকারী ছাত্র তথা ‘ব্রিলিয়েন্ট প্রোডাক্ট’। তিরিশোত্তরকালের অসাধারণ গল্প লিখিয়ে তিন খণ্ড বিভক্ত নামের এক বিস্ময়কর তরুণ লেখক; তিনিই- আলাউদ্দিন আল আজাদ।
প্রথম যে গল্প আমি স্কুল জীবনেই শুনেছিলাম তা ছিল আমাদের বাড়ি থেকে ৮/১০ মাইল দূরের গ্রাম রামনগরের অসম সাহসী ও রচনা-দক্ষ এক বালকের প্রসঙ্গ। আমার বড় ভাইদের মুখে শোনা সে গল্প। তাঁর অষ্টম শ্রেণিতে থাকাকালে, কিংবা তখনকার দ্বিজাতিতত্ত্বমুখী দেশ তথা ভারত-পাকিস্তান ভাগের আন্দোলনকালে, আসাম-বাংলাব্যাপী এক রচনা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। আমাদের থানা (নরসিংদীর) রায়পুরারই নারায়ণপুর স্কুলের ছাত্র হিসেবে উল্লিখিত সুকান্ত-বয়সী আলাউদ্দিন আল আজাদ সেই পুরস্কার ছিনিয়ে এনেছিলেন। এ খবর শুধু নরসিংদীই নয়, সমগ্র ঢাকায় বা সারা দেশই সম্ভবত দেশ বিজয়ের আনন্দ বয়ে এনেছিল।
এরপর তাঁর কথা শুনি শহরে এসে। তখন তিনি প্রতিষ্ঠিত লেখক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ থেকে এমএ ক্লাসের পরীক্ষার্থী (১৯৫৪ইং)। আমি লক্ষ্মীবাজারের সেন্ট গ্রেগরীজ কলেজে প্রথম বর্ষের ছাত্র। থাকি সদরঘাটের ব্যাপটিস্ট মিশন কসমোপলিটন হোস্টেলে। এখানে ঢাকার বিভিন্ন কলেজের ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্ররাই শুধু থাকতো। একদিন সকালের কাগজে আলাউদ্দিন আল আজাদের এম.এ-তে বাংলায় প্রথম শ্রেণি পাওয়ার খবরটা বেরুলে হোস্টেলের চত্বরে বসে আমরা অনেকে মিলে আনন্দ করেছিলাম। যতদূর মনে পড়ে সেদিন সেখানে হোস্টেলের সিনিয়র ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন ইউসুফ ভাই (পরে মন্ত্রী), সিলেটের এনাম ভাই (তুখোড় অর্থনীতিবিদ ও রাজনীতিবিদ ড. এনাম আহমদ) এবং আমাদের শ্রেণির বন্ধুরা, যেমন- ময়মনসিংহের আজিজুর রহমান খান (অধুনা বহির্বিশ্বের নামি অর্থনীতিবিদ), অনন্তবিহারী খীসা (পরে খাগড়াছড়ির খ্যাতনামা হেডমাস্টার) এবং আরো কেউ কেউ। আজাদ সাহেব এমনিভাবেই পরিচিত বা জনপ্রিয় ছিলেন কলেজ পর্যায়ের ছাত্রদের কাছেও। ‘জেগে আছি’, ‘ধানকন্যা’-র কথা তখন প্রায় সবারই মুখে মুখে।
আমি ফার্স্ট ইয়ারে থাকতেই পাশের পাটুয়াটুলী রোডে ‘সওগাত’ অফিসের সাহিত্য আড্ডার সাথে মিশে যাই। এখানে শামসুর রাহমান, আতাউর রহমান, ফয়েজ ভাই, আবদুস সাত্তার, আল কামাল-আবদুল ওহাব প্রমুখের মতো যাঁরা আসতেন, তাদের মাঝে আজাদ সাহেবকেও আমি দেখি , কিন্তু আলাপের সুযোগ ঘটেনি। তবে সম্ভবত তিনি তখন আমার কথা জেনে থাকবেন। কেননা, ১৯৫৫ সালের দিকে আমার মামাতো বোনের মেজো দেবর খোরশেদ ভাই (পরবর্তীকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর) একদিন আমাকে তাদের বাসার কাছেই তাদের ভগ্নিপতি আলাউদ্দিন আল আজাদের বাসায় আমাকে নিয়ে গেলে তিনি এমনভাবে গ্রহণ করলেন যেন আমি পূর্ব পরিচিত। তখন তিনি সম্ভবত তুলারাম কলেজ কিংবা জগন্নাথে পড়াচ্ছেন। সে দিন তিনি আমাকে তাঁর দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘ধানকন্যা’ বইটি উপহার দেন। বইটি আমার কাছে একটি অবিশ্বাস্য সৃষ্টি বলে মনে হয়েছিল সে সময়। বইটি তখনই প্রায় দুষ্প্রাপ্য।
আজাদ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নিয়েও কথা বলেছেন, উপমাহাদেশে অস্ত্রের প্রতিযোগিতারও সমালোচনা করেছেন। দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বলতে গিয়ে নিজের উদাহরণ টেনেও কথা বলেন তিনি। বলেন, সাহিত্যচেতনা ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধও আজ পরীক্ষার সম্মুখীন। প্রশ্ন করেন, ‘যে শিক্ষা ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে আমি ভালোবেসেছিলাম, যাদের আমার রক্ত ও ঘামের সেবা দিয়েছি তাদের বর্তমান কর্মকর্তারা কেন তিন কোটি টাকার বই কেনার সময় আমার একটি বইও তালিকাবদ্ধ করার দায়িত্ব অনুভব করলেন না?…. আমি তো ভাষাসৈনিক এবং মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম।’ দেশের এমনি অনেক বিষয় নিয়েই লেখকের ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে অনেক রচনায়। ‘অমাবশ্যা সংক্রান্তি’ রচনায় তিনি এ মন্তব্যও করেন, ‘আজকের শোচনীয় পরিস্থিতি পটভ‚মিরূপে একাত্তর-উত্তর ইতিহাস আমাদের দিকে তাকিয়েই আছে। আমরা যদি তা দেখতে না চাই, তাহলে অনেক কিছুই কুয়াশাবৃত থাকবে।’
আজাদের বক্তব্য স্পষ্ট। তাঁর ভাষাও তেমনি। তাঁর সৃষ্টিশীল গদ্য যেমন চিত্রময় ও আনন্দমগ্ন, কবিতা যেমন ‘টেনসিটি’ লাভ করে উপমা বিরল গঠন তথা উৎপ্রেক্ষা, রূপকল্পাদির বাতাবরণে, প্রবন্ধ যেমন তাত্তি¡ক আবহ আনে ভাষায়, তেমনি তাঁর সাধারণ গদ্যও অসাধারণ।

এসআর