লালমনিরহাটে বজ্রপাতে ৪ জনের মৃত্যু

আগের সংবাদ

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন বেড়েছে দ্বিগুন

পরের সংবাদ

করোনা-সুরক্ষা, মুনাফাবাজি ও দারিদ্র্য দুর্দশা

আহমদ রফিক

প্রকাশিত হয়েছে: জুলাই ২, ২০২০ , ৭:৪২ অপরাহ্ণ

করোনায় দরিদ্র হয়ে গেছে ১ কোটি ৬৩ লাখ মানুষ। এ ঘটনা সমাজে কতটা নেতিবাচক অভিঘাত সৃষ্টি করতে পারে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ সংবাদ পরিসংখ্যান সরকারি গবেষণা সংস্থা বিআইডিএসের। সংবাদটি শুধু অর্থনীতিবিদদের কাছেই নয়, সরকার এবং সমাজসচেতন মানুষের জন্য অশনি সংকেতের মতোই তাৎপর্য বহন করবে সন্দেহ নেই।

করোনা মহামারি বাংলাদেশের সমাজকে যে কত বিপরীতমুখী ধারায় প্রভাবিত করছে বিচার-বিশ্লেষণ করতে গেলে অবাক হতে হয়। সাধারণ হিসাবে একটি সমাজে ব্যাপক দুর্যোগ-দুর্ভোগে মানুষের মধ্যে সহমর্মিতার বোধ তৈরি হয়। করোনা ভিন্ন চিত্রটাই তুলে ধরেছে, কিছু ব্যতিক্রম বাদে।
মানবিক চেতনা, নীতি-নৈতিকতাবোধ সমাজে বেশ কিছুদিন থেকেই ক্ষয়ের পথ ধরে হাঁটছিল, এখন তার বহুগুণ বৃদ্ধি হঠাৎ করেই। করোনা নানা দিক থেকে সমাজে যে সার্বিক সংকট তৈরি করেছে, বিশেষ করে অর্থনৈতিক সংকট, তার সমাধানে যে যার মতো করে সামান্য অবদান রাখলেও বিন্দু থেকে সিন্ধু তৈরি হতে পারে।
পরিবর্তে সমাজের প্রভাবশালী শ্রেণির বড়সড় অংশকেই দেখা যাচ্ছে সংকটের সুযোগ নিয়ে অনৈতিকতার পথ ধরে স্বার্থসিদ্ধি ও বিচিত্র রকম দুর্নীতির পথ ধরে চলতে শুরু করেছে। মজুতদারি থেকে ব্যাপক ধারায় মুনাফাবাজির সূত্রে বিত্ত ও সম্পদ গড়ে তুলতে শুরু করেছে। একদিকে চরম দারিদ্র্য, অন্যদিকে প্রভ‚ত বিত্তের পরম স্পর্শ দুই ভিন্ন মাত্রার ঐতিহ্য সৃষ্টি করে চলেছে।
করোনায় শুরু থেকেই লকডাউনের কারণে নিম্নবর্গীয়দের কর্মসংস্থানে যে আঘাত পড়ে, তাতো আর সরকারি ত্রাণে স্বাভাবিক হওয়ার কথা নয়, বেঁচে থাকার প্রয়োজন চেষ্টাই হলো ত্রাণ। তখন একটা কথা প্রশ্নের মতো উঠে এসেছে- জীবন ও জীবিকা, কোনটা বড়, কোনটাকে প্রাধান্য দিতে হবে। এ প্রশ্নের জবাব খুব সরল ও সহজ- জীবনের ঊর্ধ্বে কিছু নেই।
জীবিকার সমস্যাকে সহনীয় কষ্টের মাত্রায় এনে হলেও মানুষের চেষ্টা থাকে জীবনটাকে বাঁচিয়ে রাখা- কারণ জীবন গেলে তা আর ফিরে পাওয়া যায় না। জীবিকার ক্ষয়ক্ষতি ভবিষ্যতের স্বাভাবিক অবস্থায় পূরণ করার সুযোগ-সুবিধা থাকে। বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ সে সুযোগের সদ্ব্যবহার করে পূর্বাবস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে, কেউ অংশত হলেও পারে।
তাই জীবন বাঁচানোর চেষ্টাটাই ফরজ, তথা প্রাথমিক কর্তব্য বিবেচিত হওয়া উচিত। সে হিসাব ধরেই চলছে সরকারি-বেসরকারি ত্রাণের ব্যবস্থা। এর মধ্যে যদি দুর্নীতি হাত বাড়ায় তাহলে সর্বনাশের বাকি থাকে না। আমরা পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটতে চাই না। কয়েক সপ্তাহ বা মাস কয়েক আগের পত্রপত্রিকার খবর-শিরোনামে চোখ রাখলেই দেখা যাবে ত্রাণে-বিতরণে কী মাত্রায় দুর্নীতি-জনপ্রতিনিধি থেকে ব্যবসায়ীকুলের।
আশ্চর্য, প্রধানমন্ত্রীর এত হুঁশিয়ারি সত্তে¡ও এ প্রবণতা কিছুতেই বন্ধ হচ্ছে না। বরং তা ফুলে ফুলে একাধিক ধারায় বিকশিত হচ্ছে। নানা রূপ ও চরিত্র তার। মাদক থেকে পাচার ইত্যাদি। সেসব হিসাবে না গিয়ে মোটা দাগেই দেখছি একটি খবর-শিরোনাম : ‘মজুতদারের কবলে চাল’ (১.৭.২০২০)। খবর প্রকাশিত একটি দৈনিকে। চাল এমন এক জিনিস যা জীবনরক্ষার প্রাথমিক উপাদান, সেখানে যদি দুর্নীতির কালো হাত ঢোকে, তাহলে এর প্রভাব হয় সর্বনাশা। ওই প্রতিবেদনের মূল্য বৃদ্ধির বিশদ বিবরণে না গিয়ে তাদের ভাষ্যে শুধু এটুকুই বলা যাক : ‘চালকলের মালিক এবং নতুন এক শ্রেণির ব্যবসায়ী ধান-চাল মজুত করছেন।’ ভয়ঙ্কর সংবাদ সন্দেহ নেই।
খাদ্য অধিদপ্তর নাকি এ সংবাদের প্রতিক্রিয়ায় অধস্তন দপ্তরে অনুসন্ধানের জন্য চিঠি পাঠিয়েছেন। এটা কি চিঠি চালাচালির সময় বা বিষয়, নাকি ঘটনার গুরুত্ব এতই যে দরকার সরকারি কল মালিকগুলোর এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীকুলের গুদামে গুদামে অনুসন্ধানী অভিযান চালানো!
আমরা এর আগেও দেখেছি, একাধিকবার দেখেছি গুদামে গুদামে চাল মজুত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে মানুষের প্রধান খাদ্য চালের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি ঘটানো হয়েছে। দেখা গেছে, গত বছর পেঁয়াজের আকাশচুম্বী মূল্য বৃদ্ধির সময় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। আর পচনশীল পণ্য বলে পেঁয়াজ দীর্ঘ সময় গুদামে মজুত রাখা যায়নি। তবু দাম ঠিকই রয়েছে আকাশ চ‚ড়ায়, দীর্ঘ সময় ধরে- চলেছে ব্যাপক মুনাফাবাজি মজুতদারির কল্যাণে।
এবার করোনা সংকটের সময়ও দেখা যাচ্ছে চাল নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের দুরভিসন্ধি- মজুতদারি, আর সেই সুযোগে মুনাফাবাজি, বিত্তের পাহাড়ি সঞ্চয়। এগুলোর একটাই দাওয়াই- আছে সরকারের হাতে, কঠিন হাতে ব্যবহার। তাতে মধ্যবিত্ত থেকে নিম্নবর্গীয় মানুষ একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারে।

দুই.
সরকার পক্ষে অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের মজুতদারি এবং মুনাফাবাজির বিরুদ্ধে কড়া হাতে ব্যবস্থা নেয়া দরকার এ কারণে যে এসব পণ্যের মূল্য বৃদ্ধিতে উচ্চ-মধ্যবিত্ত থেকে বিত্তবানদের কোনো অসুবিধা না হলেও চরম দুর্ভোগে পড়বে নিম্ন আয়ের মানুষ। ইতোমধ্যে করোনা সংক্রমণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাপনা গ্রহণের প্রতিক্রিয়ায় মধ্যবিত্ত তাদের সঞ্চয়ে হাত দিচ্ছে, নিম্নবিত্ত দারিদ্র্যসীমার নিচের দিকে নামতে শুরু করেছে, আর নিম্নবর্গীয়দের তো কথাই নেই।
একটি দৈনিকের সংবাদ-শিরোনাম এই সত্যটিই তুলে ধরেছে এভাবে : ‘করোনায় দরিদ্র হয়ে গেছে ১ কোটি ৬৩ লাখ মানুষ।’ এ ঘটনা সমাজে কতটা নেতিবাচক অভিঘাত সৃষ্টি করতে পারে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ সংবাদ পরিসংখ্যান সরকারি গবেষণা সংস্থা বিআইডিএসের।
সংবাদটি শুধু অর্থনীতিবিদদের কাছেই নয়, সরকার এবং সমাজসচেতন মানুষের জন্য অশনি সংকেতের মতোই তাৎপর্য বহন করবে সন্দেহ নেই। বলাই বাহুল্য, করোনা প্রতিরোধক ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্থবিরতার কারণে দারিদ্র্য হার বৃদ্ধি। অর্থাৎ দিনে ১.৯০ ডলারের কম আয় করছে এমন মানুষের সংখ্যা বেড়ে চলেছে।
এমনিতেই এদের গবেষণা হিসাব মতে, বাংলাদেশে ‘এখন দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে ৪ কোটি ৮০ লাখ মানুষ’। তাই করোনা সংক্রমণ যত দ্রুত না কমবে, দেশের অর্থনীতির ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব ক্রমেই বেড়ে চলবে। এর প্রভাব পড়বে প্রবৃদ্ধির ওপরও।

তিন.
উল্লিখিত পরিসংখ্যানের তাৎপর্য বিশ্লেষণে সাধারণ জ্ঞানসম্পন্ন মানুষও শঙ্কিত হবেন দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ দুর্দশার কথা ভেবে। বুঝতে কষ্ট হয় না, কেন সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়ে কিছু পোশাক কারখানা খুলে দেয়া হয়েছে। অথচ পাটকলগুলোর ক্ষেত্রে কেন বিপরীত ব্যবস্থা তা আমরা বুঝতে অক্ষম।
যাই হোক, বড় প্রশ্ন- এ অবস্থায় সর্বোত্তম প্রতিরোধক ও চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থা রয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগগুলোর হাতে। আর সেজন্যই কি সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেদেরই সাংসদের তোপের মুখে, বলাবাহুল্য তাদের সমষ্টিগত তথা দলগত স্বার্থের কারণে। এখন দরকার দ্রুত দক্ষ; সমন্বিত সুরক্ষামূলক ব্যবস্থাপনা যাতে করোনা সংক্রমণ দ্রুত হ্রাস পায়, রক্ষা পায়। মানুষ, রক্ষা পায় দেশের অর্থনীতি। এখানেই সফলতার চাবিকাঠি। তবে মজুতদারি, মুনাফাবাজি, অনৈতিকতার মতো বিষয়গুলো সমান গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অর্থনীতির ক্ষেত্রে।
উল্লিখিত দুটি বিষয় নিয়ে দৈনিক পত্রিকাগুলোতে এ পর্যন্ত অনেক লেখালেখি হয়েছে। হয়েছে স্বাস্থ্য খাতে দক্ষ সমন্বিত ব্যবস্থাপনার। তাতে যদি প্রয়োজন হয় গোটা স্বাস্থ্য বিভাগকে ঢেলে সাজাতে হবে জাতীয় স্বার্থের প্রয়োজনে। সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে এমন ধারণাই পোষণ করতে দেখা যাচ্ছে।
আর সময় নেই। অনেক দেরি হয়ে গেছে। অবিলম্বে সংস্কারের কাজে হাত লাগানো দরকার।

আহমদ রফিক : লেখক, গবেষক ও ভাষাসংগ্রামী।

এসআর