ঢাবির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ

আগের সংবাদ

সুষ্ঠু তদন্ত চান স্বাস্থ্যকর্মীরা

পরের সংবাদ

কোথাও উন্নতি কোথাও অবনতি

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশিত হয়েছে: জুলাই ১, ২০২০ , ৯:৪৫ পূর্বাহ্ণ

গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট ও তিস্তা, জামালপুরে যমুনা এবং রাজবাড়ীতে পদ্মা নদীর পানি এখনো বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে এসব জেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। অপরদিকে সুনামগঞ্জে সুরমা নদীর পানি খানিকটা কমায় জেলায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। তবে জেলাগুলোতে লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এসব স্থানে রাস্তাঘাট তলিয়ে মানুষের দুর্ভোগ বেড়ে গেছে। ত্রাণ তৎপরতা চলছে ঢিমেতালে। এ সম্পর্কে আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো রিপোর্ট

গাইবান্ধা : গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট ও তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানিয়েছে, মঙ্গলবার দুপুরে ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদসীমার ৮০ সে.মি. ও ঘাঘট নদীর পানি বিপদসীমার ৫৪ সে.মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এদিকে করতোয়া নদীর পানি ২৪ ঘণ্টায় ৫০ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে নতুন নতুন এলাকা বন্যায় কবলিত হচ্ছে এবং বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে বন্যা পরিস্থিতির আরো মারাত্মক অবনতি হচ্ছে। সেই সঙ্গে গোবিন্দগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্টে করতোয়া নদীর ভাঙন ব্যাপক আকার ধারণ করেছে।
এছাড়া গাইবান্ধা সদরের নতুন ব্রিজ থেকে ডেভিড কোম্পানিপাড়ায় শহর রক্ষা বাঁধটি পানি উন্নয়ন বোর্ড বন্যার আগে তড়িঘড়ি করে বালু দিয়ে সংস্কার শুরু করে। বন্যার পানির তোড়ে বালু সরে গিয়ে বাঁধের ৪টি পয়েন্টে ফুটো দিয়ে পানি চুইয়ে পড়ছে। সেই সঙ্গে বাঁধের গোড়ার মাটি ধসে যাচ্ছে। ফলে শহর রক্ষা বাঁধটি এখন চরম হুমকির মুখে রয়েছে।
এদিকে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার হরিরামপুর ইউনিয়নের ২৫টি গ্রামে বসতবাড়িতে বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় প্রায় ৫০০ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এছাড়া ব্যাপক এলাকার ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। সেই সঙ্গে করতোয়া নদীর ভাঙনে ওই ইউনিয়নের ধনদিয়া গ্রামজুড়ে ব্যাপক নদীভাঙন শুরু হয়েছে। এতে দুই দিনে ওই গ্রামে ২০টি পরিবার এবং ফুলছড়ি উপজেলার পশ্চিম জিগাবাড়ী গ্রামের ৪২টি পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে গৃহহারা হয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে।
এদিকে ফুলছড়ি উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্টে ব্যাপক নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে। ভাঙনে চরম হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে এরেন্ডাবাড়ী ইউনিয়নের জিগাবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি বাজার, নুরানী হাফিজিয়া মাদ্রাসা, ঈদগা মাঠ, একটি বিএস কোয়ার্টার, এরেন্ডাবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র, দুটি জামে মসজিদ, ৩টি মোবাইল টাওয়ার ও একটি বাজার। নদীভাঙন এলাকা থেকে মাত্র কয়েক গজ দূরেই এসব প্রতিষ্ঠান অবস্থান করছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোখলেছুর রহমান জানান, পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও গাইবান্ধা শহর রক্ষা বাঁধের বিভিন্ন পয়েন্ট ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। তবে বাঁধ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
এদিকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জেলায় মোট ১৮টি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে সুন্দরগঞ্জে ৪, ফুলছড়িতে ৬, সাঘাটায় ৫ ও সদর উপজেলায় ৩টি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত।
জামালপুর : যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি না পেলেও জামালপুরে বন্যার সার্বিক পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। বন্যায় জেলার ছয়টি উপজেলার ১৮৫টি গ্রামের ২ লাখ ৫৬ হাজার ১১২ জন মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। যমুনা নদীর পানি বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টায় বিপদসীমার ৮৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জেলার ৬টি উপজেলার প্রায় ৩৮টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। জেলার দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার বাহাদুরাবাদ, চুকাইবাড়ী, চিকাজানী ইউনিয়ন ও পৌর শহরের আংশিক এবং ইসলামপুর উপজেলার পাথর্শী, কুলকান্দি, বেলগাছা, চীনাডুলি, নোয়ারপাড়া ও সাপধরী ইউনিয়ন, বকশীগঞ্জ উপজেলার সাধুরপাড়া, মেরুরচর, নীলক্ষিয়া ও বগারচর ইউনিয়নসহ জেলার প্রায় ৩৮টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম জানান, বন্যার পানিতে জেলার পাঁচটি উপজেলার ৬ হাজার ৯০৮ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। নিমজ্জিত ফসলের মধ্যে পাট ৫ হাজার ৫৯৩ হেক্টর, আউশ ধান ৬৭৭ হেক্টর, সবজি ৪৭৮ হেক্টর, রোপা আমন ধানের বীজতলা ১২৩ হেক্টর, তিল ১৪ হেক্টর, বাদাম ২ হেক্টর, মরিচ ১১ হেক্টর, কলা ৩ হেক্টর এবং ভুট্টা ৫ হেক্টর।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. নায়েব আলী জানান, বন্যায় এ পর্যন্ত পানিতে ডুবে তিনজন আর সাপের কামড়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। তিনি আরো বলেন, জেলার ১০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৩০৫টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। বন্যার্তদের মাঝে নগদ পাঁচ লাখ টাকার শুকনো খাবার ও ৬০ টন চাল বিতরণ করা হয়েছে।
জামালপুরের সিভিল সার্জন ডা. প্রণয় কান্তি দাস জানান, জেলার বন্যাদুর্গত এলাকায় ৮০টি মেডিকেল টিম কাজ করে যাচ্ছে। অপরদিকে কোথাও কোথাও কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে বন্যার পানি ঢুকে পড়লেও পার্শ্ববর্তী উঁচু জায়গা থেকে ক্লিনিকগুলো তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
দেওয়ানগঞ্জ (জামালপুর) : ফুসে উঠেছে যমুনা, বাড়ছে পানি তলিয়ে যাচ্ছে বাড়িঘর, সড়ক ও ফসলি জমি। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন লক্ষাধিক মানুষ। আশ্রয় নিয়েছেন বানভাসি মানুষ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও উঁচু সড়কে। সংকট দেখা দিয়েছে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির। গত ২৪ ঘন্টায় যমুনার পানি বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ৮৬ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার ফলে উপজেলার পৌর শহরসহ ৮টি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। উপজেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা এনামুল হাসান জানান, বানভাসিদের জন্য নগদ ১ লাখ ৭৭ হাজার টাকা ও ২১ টন চাল বরাদ্দ এসেছে। আমরা প্লাবিত এলাকা ও আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রেখেছি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দিলরুবা ইয়াসমিন জানান, বন্যায় উপজেলার ২ হাজার ৯৯০ হেক্টর জমির আউস, সবজি, পাট, বীজতলা পানি নিচে নিমজ্জিত রয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুলতানা রাজিয়া জানান, উপজেলার প্রায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। তাদের বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে আনা হয়েছে এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।
রাজবাড়ী : গত ২৪ ঘণ্টায় রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া গেজ স্টেশন পয়েন্টে পদ্মা নদীর পানি ২১ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে বাঁধের বাইরে থাকা নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলে পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। তবে জেলার মহেন্দ্রপুর ও সেনগ্রাম পয়েন্টে পদ্মার পানি এখনো বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। মঙ্গলবার বিকালে রাজবাড়ী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সফিকুল ইসলাম শেখ এসব তথ্য জানান।
তিনি জানান, পদ্মা নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে। রাজবাড়ীর তিনটি গেজ স্টেশন পয়েন্টের মধ্যে গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া পয়েন্টে পদ্মার পানি বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে সদরের মহেন্দ্রপুর ও পাংশা সেনগ্রাম গেজ স্টেশন পয়েন্টে এখনো পদ্মার পানি বিপদসীমার নিচে রয়েছে।
এদিকে পানি বৃদ্ধির ফলে জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ও দেবগ্রাম ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলসহ জেলার নদী তীরবর্তী ফসলি জমিতে পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো বসতবাড়িতে পানি প্রবেশের খবর পাওয়া যায়নি।
সুনামগঞ্জ : উজানের ঢল ও নদীর পানি কমে যাওয়ায় সুনামগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৯টার দিকে সুনামগঞ্জের ষোলঘর পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ১৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় পানি উন্নয়ন বোর্ড ৪৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত পরিমাপ করেছে। উজানে ভারতের চেরাপুঞ্জিতে ৭৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।
সুনামগঞ্জ শহরের নিচু এলাকা এখনো পানিতে নিমজ্জিত হয়ে আছে। নিচু এলাকার লোকজন ঘরবাড়ি ছেড়ে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন। বন্যার পানিতে সড়ক ডুবে যাওয়ায় জেলা সদরের সঙ্গে তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, দোয়ারাবাজার, জামালগঞ্জ উপজেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। জেলার ৯টি উপজেলার ৬১টি ইউনিয়ন ঢলের পানিতে প্লাবিত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলায় ১২৭টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সেখানে ১ হাজার ১৯৪টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকায় ৬৬ হাজার ৮৬৯টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে চাল, নগদ টাকা, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সবিবুর রহমান জানান, সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় পানি নামতে শুরু করেছে। আগামী দু-তিন দিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে।

ডিসি